দিল্লী জ্বলছে পুড়ছে
ভারতবর্ষ
দিল্লী জ্বলছে। মৃত্যু
মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। মৃত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রতু হারে। আহতদের
সংখ্যা শত শত। বাড়িঘর দোকানপাট জ্বালিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থের সুবন্দোবস্ত
করা হয়েছে টানা তিন চার দিন ধরে। প্রথম তিনদিন সংবাদমাধ্যমকে প্রায় অবরুদ্ধ করে এলাকা
ভিত্তিক ধ্বংস যজ্ঞ চালানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের হাত থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে ভেঙে
ফেলা হয়েছে। দাঙ্গাবাজদের ছবি যাতে বাইরে ছড়িয়ে না পড়ে। সন্ত্রস্ত দিশাহারা ক্ষতিগ্রস্ত
মানুষ নিরাপত্তার অভাবে আতঙ্কিত। অনেকেই বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার
বিরুদ্ধে মুখ খোলার জন্য দিল্লী হাইকোর্টের বিচারপতিকে বদলি করে দেওয়া হয়েছে রাতারাতি।
অনেকেই দিল্লী পুলিশের অপদার্থতার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। অনেকেই ভারত সরকারের অপদার্থতার
কথা বলছেন। মানুষের নিরাপত্তা দিতে সরকার ও তার পুলিশে দায়বদ্ধ। ঘটনার তিনদিন বাদে
জাতীয় সুরক্ষা পরামর্শদাতা অজিত ডোভাল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। জনতার সাথে
কথা বলে সকলকে আশ্বস্ত করার চেষ্টায় স্পষ্ট বলেছেন, যা হয়েছে তা হয়েছে। আর কোন ভয় নাই।
সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় রয়েছে। খুবই আশার কথা, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে
সক্রিয় থাকবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সেখানেই আসল রহস্য। ভয়াবহ এই দাঙ্গার প্রথম
তিনদিন সরকার কোথায় ছিল? দেশের রাজধানী সহরে সরকারে নাকের ডগায় কি করে এমন ঘটনা চলতে
পারে একটানা তিনদিন ধরে?
দিল্লীর ঘটনায় কয়েকটি
বিষয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বেশ কয়েকটি ভিডিওতে পুলিশকেই পাথর ছুঁড়তে দেখা গিয়েছে বাকি
দাঙ্গাবাজদের সাথেই। কোথাও রাজপথে পড়ে থাকা আহত ক্ষতবিক্ষত নিরস্ত্র মানুষদেরকে উদ্ধারের
বদলে পুলিশকে তাদের দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াতে দেখা গিয়েছে উদ্ধত লাঠির ডগায়। কোথাও
বা দাঙ্গাবাজদের পাশাপাশিই পুলিশকে দেখা গিয়েছে। আবার কোথাও পুলিশকে দেখা গিয়েছে লাঠির
ঘায়ে রাস্তার সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙতেও। অন্যত্র জনতাকে উত্তেজিত করতে রাজনৈতিক নেতার
বিদ্বেষমূলক ভাষণের পাশে উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিককেও দেখা গিয়েছে নিস্পৃহ ভাবে দাঁড়িয়ে
থাকতে। এছাড়াও একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বয়ানে উঠে এসেছে দাঙ্গাবাজদেরকে প্রতিহত
করার বদলে তাদেরকে মদত দেওয়ার বিষয়েই পুলিশের সক্রিয় ভুমিকার কথা। আর এইসব ঘটনার প্রেক্ষিতেই
দিল্লী হাইকোর্টের বিচারপতি দিল্লী পুলিশকে ভর্ৎসনা করেন। বিদ্বেষমূলক বিবৃতি দিয়ে
জনতাকে খেপিয়ে তোলার অভিযোগে অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে এফ আই আর দায়ের না
করার জন্য। ঠিক এক রাত্রির ভিতরেই সরকার থেকে দিল্লী হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বিচারপতিকে
অন্যত্র বদলি করে দেওয়া হল। ইঙ্গিত খুবই স্পষ্ট। বিচারপতি যে চারজন রাজনৈতিক নেতার
বিরুদ্ধে দিল্লী পুলিশকে অইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে ভর্ৎসনা করেন, সেই চার নেতাই
কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত সরকারী দলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
এবার দেখা যাক, দিল্লীর
এই ঘটনা ঘটানোর পিছনের প্রেক্ষাপটটি। দুই মাসের অধিক সময় ধরে দেশের নানান অঞ্চলেই ডিসেম্বরে
পাশ হওয়া সংশোধিত নাগরিক আইন ২০১৯ এর বিরুদ্ধে এবং তৎসহ প্রস্তাবিত এনপিআর ও এনারসি’র
বিরুদ্ধে লাগাতার সরকার বিরোধী আন্দোলন সংগঠিত হয়ে চলেছে। বিশেষ করে দিল্লীর শাহিনবাগ
এখন মানুষের আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উল্ল্যেখযোগ্য স্থান করে নিতে চলেছে। সরকার পক্ষ
নানান ভাবে চেষ্টা করেও শাহিনবাগ সহ সরকার বিরোধী এই আন্দোলন দমন করতে সফল হয়ননি এখনো।
নানাবিধ প্ররোচনা সত্তেও শাহিনবাগ সহ অন্যান্য অঞ্চলে চলতে থাকা এই নাগরিক আন্দোলন
শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিচালিত হচ্ছে। যেটি সরকারের পক্ষে যথেষ্টই অশনি সংকেত।
রাজনৈতিক ভাবে এই আন্দোলনকে মোকাবিলা করতে ব্যার্থ হওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই অনেকের ধৈর্য্যের
বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। ইতিমধ্যে দিল্লী বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত সরকারী
দলের বিরুদ্ধে গিয়েছে। ফলত নাগরিকপঞ্জী বিরোধী আন্দোলন আরও সংঘবদ্ধ হয়ে ওঠার ঝুঁকি
রয়েছে। সরকারের পক্ষে যেটা খুবই বিপদজনক।
যে কোন সরকারের পক্ষেই
হিংসাত্মক আন্দোলন যত সহজে দমন করা সম্ভব, অহিংস আন্দোলন দমন করা ততটাই কঠিন। সরকার
পক্ষ হিংসাত্মক আন্দোলনকে সরাসরি সহিংস পথে দমন করতে পারে। কারণ সেটা আইনি পরিকাঠামোর
ভিতরেই করা সম্ভব। দরকারে সেনাবাহিনীর সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একটি অহিংস
শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে গোলাগুলি বোমা বন্দুক দিয়ে দমন করার পথ খোলা থাকে
না। অন্তত ঘোষিত গণতন্ত্রে সেটি সম্ভব নয়। আর ঠিক সেইখানেই আটকিয়ে গিয়েছে বর্তমান ভারত
সরকার। এই সময় যে কোন সহিংস দাঙ্গাই সরকারের কাছে তুরুপের তাস হয়ে উঠতে পারে। হারানো
জমি পুনরুদ্ধারের পক্ষে সেটি খুবই সহায়ক। মানুষকে বোঝানো যাবে, সরকার বিরোধী আন্দোলন
মানেই দেশবিরোধী শান্তিবিরোধী চক্রান্ত।
সুখের কথা, গত দুইমাসের
বেশি সময় ধরে, নানাবিধ প্ররোচনা সত্তেও অহিংস পথে আন্দোলনরত নাগরিক সমাজ কোনরকম ফাঁদেই
পা দেয় নি। আর সেইটিই অনেকের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে দিয়েছে। একাধিক রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের
উস্কানিমূলক হিংসাত্বক ভাষণ ও হুমকি, সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরছে। ঠিক এই প্রেক্ষিতেই
দিল্লীতে গত রবিবার ২৩শে ফেব্রুয়ারী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে
শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলনরত মহিলাদের উপর পাথর ছুঁড়ে হামলা করা হয়। উদ্দেশ্য খুবই
পরিস্কার। নিরস্ত্র নিরীহ মহিলাদের উপর হামলা করলে, পাল্টা হামলা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনাই
বেশি থাকে। মানুষ প্রথমে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করবে। তারপর পাল্টা হামলা করে হামলাকারীদের
হটিয়ে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু অন্যপক্ষ পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর
হওয়ায়, এই সুযোগে পাল্টা হামলা ঘটার অজুহাতে স্বাভাবিক ভাবেই আরও বড়ো হামলা চালানোর
লাইসেন্স পেয়ে যায়। আর ঠিক সেইভাবেই পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক দিল্লীর বাইরে থেকে নিয়ে
আসা গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত করা হয় টানা তিনদিন ধরে। এমনটাই দিল্লীবাসীদের
অভিযোগ। সংবাদ মাধ্যমে পাওয়া খবরে। সংবাদে প্রকাশ দুই শতাধিক আহতদের ভিতর কমপক্ষে সত্তর
জন গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। ইতিমধ্যেই ৩৪ জনের প্রাণ চলে গিয়েছে।
শতশত আহত এখনো চিকিৎসাধীন। একাধিক মহল্লায় অগ্নিসংযোগ করে দোকানপাট বাড়িঘর ভস্মীভুত
করা হয়েছে। অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে শতশত যানবাহনে। বাদ যায়নি স্কুল মাদ্রাসা মসজিদও।
একমাত্র, কোন মন্দির আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি এখনো।
সামগ্রিক ভাবে গোটা ঘটনাটি
বিশ্বের দরবারে ভারতের পক্ষে অত্যন্ত অসম্মানের ও লজ্জার। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের
দেশে, গণতান্ত্রিক ভাবে অহিংস আন্দোলনকে বিপথে চালিত করতে এমন বিপদকজন খেলা সত্যই অভিনব
সন্দেহ নাই। কিন্তু তা একটি গণতান্ত্রিক দেশের মুখ উজ্জ্বল করে না কোনভাবেই। এবারের
দাঙ্গার অভিনবত্ব এইখানেই যে এটি কিন্তু সরাসরি হিন্দু মুসলিম গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ভিতর
থেকে সংঘটিত হয় নি। দুই পক্ষের ভিতর একদিকে ছিল সদ্য পাশ হওয়া নাগরিকত্ব আইন ২০১৯ এর
বিরুদ্ধে আন্দোলনরত নাগরিক সমাজ। অন্য পক্ষে কেন্দ্রের সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা।
যারা সরাসরি এই আইনের সমর্থনে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বকে
ইন্ধন করেই রাজনৈতিক কূটকৌশলে বিষয়টা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপান্তরিত করে দেওয়া হলো।
যে প্ররোচনায় আন্দোলনকারীরা এতদিন পা দেয় নি, সেই প্ররোচনাই এই দাঙ্গা সংঘটনে সরাসরি
কার্যকরভাবে সফল হয়ে উঠল।
ফল মিলল হাতে হাতে। বিষয়টি
এখন হিন্দু মুসলিম বিরোধ, সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু জনগণের বিরোধে পরিণত করে দেওয়া
গেলো। ফলে যে আইনের বিরুদ্ধে সারা দেশব্যাপী নাগরিক সমাজ সংঘবদ্ধ হচ্ছিল, সেই সমাজকে
এই পথে সাম্প্রদায়িক ভাবে বিভাজিত করে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। এখন কে কার ঘরে আগুন
জ্বালিয়েছে, কে কার বুকে গুলি করেছে, কে কার মাথায় পাথর ছুঁড়েছে, সেসবের থেকেও অনেক
বড়ো হয়ে উঠবে এই দাঙ্গা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ এর বিরুদ্ধে চলতে থাকা আন্দোলনকে
কতটা বিভ্রান্ত করতে সম্ভব হল, সেটিই। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতিকে হাতিয়ার করে
স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলনকে প্রতিহত করার এই ছক যে কোন দেশের গণতন্ত্র এবং রাজনীতির পক্ষেই
বিপদজনক। একবার এই ছক সফল হয়ে গেলেই, যুগের পর যুগ এই ছককেই অনুসরণ করে ক্ষমতা দখল
ও ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি চলতে থাকবে। ১৯৪৭ এর ভারত ভাগের পিছনে ঠিক এই ছককেই সুচতুর
ভাবে কাজে লাগিয়ে সফল হয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ শক্তি তাদের ভারতীয় এজেন্টদের সরাসরি
সহায়তায়। এখন দেখার একুশ শতকের তৃতীয় দশকে পৌঁছিয়ে ভারতবর্ষের মানুষ এই ছককে আদৌ মোকাবিলা
করতে পারে কিনা।
২৭শে ফেব্রুয়ারী’ ২০২০

