কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে
কে ঠিক। কে বেঠিক। কে সত্যি কথা বলছে। আর কে মিথ্যা কথা বলছে?
রাজ্যের বিরোধী দল থেকে ক্রমাগত হুঙ্কার দেওয়া হচ্ছে আমরা রাজ্য থেকে দুই কোটি বাংলাদেশীকে
হঠাবো। কেউ প্রশ্ন করছে না, এই দুই কোটি বাংলাদেশী এলো কোন পথে? দেশের বর্ডার সিকিউরিটি
ফোর্স কি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বেতন নেয়? বাংলাদেশী আসা মানে, ধরেই নিতে হবে তারা স্বাধীন
বাংলাদেশ থেকে এসেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের আগে ছিল
না। সেদিনের পর থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করেছে পৃথিবীতে। সৌজন্যে অবশ্যই
ভারতবর্ষ। সরাসরি পাকিস্তানকে যুদ্ধে পরাজিত করেই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের
যুগান্তকারী ভুমিকা রয়েছে। ফলে সেই দিনের পর থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক মাত্রেই
বাংলাদেশী। অন্তত স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক মাত্রেই নিজেদের বাংলাদেশী মনে করে গর্ব
অনুভব করে। প্রশ্ন এই নয় যে, সেই গর্বিত স্বাধীন বাংলাদেশীদের মধ্যে থেকে কোটি কোটি
মানুষ ভারতবর্ষে প্রবেশ করতেই বা যাবেন কেন ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭২ এর পর থেকে। প্রশ্ন এটাই
যে, ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স তখন কি করছিলো? আগে তো সেই উত্তরটা জানতে হবে আমাদেরকে।
সরকার সীমান্ত সুরক্ষার কি কি ব্যবস্থা করেছিল? সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর কাজে কোন গাফিলতি
থাকলে, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? স্বাভাবিক ভাবেই এইসকল প্রশ্নগুলিই
ওঠার কথা। না উঠলেই কিন্তু সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, প্রচার আর সত্যের ভিতর
আকাশ পাতাল ফারাক রয়েছে।
রাজ্যের বিরোধী দলের আরও এক তুঘলকী নেতা আগাম হুঁশিয়ারী দিয়ে
রেখেছেন, তারা ক্ষমতায় এলেই রাজ্যে বাঙাল খেদাও আন্দোলন শুরু করে দেবেন। কথাটা হালকা
ভাবে নিলে হবে না। কারণ, বাংলাদেশী আর বাঙাল কিন্তু সমার্থক নয়। সাধারণত বাঙাল আমরা
তাঁদেরকেই বলে থাকি, যাঁরা ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট বাংলা ভাগের পর চৌদ্দ পুরুষের ভিটে
মাটি অর্থ সম্পদ সর হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিলেন। এবং সাম্প্রদায়িক পরিচয়ে যাঁরা
কিন্তু হিন্দু। এবং খণ্ডিত ভারতে শরণার্থী। পশ্চিমবঙ্গে চৌদ্দ পুরুষ বসবাসকারী তথাকথিত
ঘটিদের কাছে যাঁদের পরিচয় বাঙাল। হ্যাঁ ব্রিটিশ ও তাদের ভারতীয় দালালদের চক্রান্তে
বাংলা ভাগ হওয়ার সময় এই কোটি কোটি বাঙালরাই পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় নিয়ে
ছিলেন। সৌভাগ্যের কথা তখন কিন্তু তথাকথিত পশ্চিমবঙ্গীয় ঘটিরা বাঙাল খেদাও আন্দোলনের
কথা স্বপ্নেও ভাবেন নি। বরং কোটি কোটি বাঙালদের রাজ্যে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এবং ঘটি বাঙাল
সম্মিলিত শক্তিতেই গড়ে উঠেছে স্বাধীনতা উত্তর আজকের পশ্চিমবঙ্গ। তাহলে প্রশ্ন বাংলা
ভাগের পর যে প্রশ্ন ওঠেনি, আজ তার ৭৩ বছর পরে হঠাৎ সেই প্রশ্ন উঠছে কেন? বাঙাল খেদানোর?
কোনটা সত্যি। কোনটা মিথ্যা। একবার প্রচার হচ্ছে সিটিজেনশীপ
এমেণ্ডমেন্ট এক্ট আফগানিস্তান পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে আসা মুসলিম
বাদে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শরণার্থীদেরকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যেই তৈরী
করা হয়েছে। পশ্চিমবাংলার জেলায় জেলায় জোর কদমে তার প্রচার চালিয়ে বলা হচ্ছে, ক্ষমতায়
এলেই সেই নাগরিকত্ব দেওয়া হবে ভুতপূর্ব পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু শরণার্থীদেরকে।
বলা হচ্ছে কোন হিন্দু শরণার্থীর এনআরসি নিয়ে ভয় পাওয়ার দরকার নাই। ঠিক তাঁদের কথা ভেবেই
সরকার সিটিজেনশীপ এমেণ্ডমেন্ট এক্ট করেছে। অর্থাৎ তথাকথিক বাঙালদের উদ্দেশেই এই অভয়
বাণী। কারণ, শরণার্থী বাঙালি হিন্দু মাত্রেই বাঙাল হিসাবে পরিচিত। আবার হুঁশিয়ারী দেওয়া
হচ্ছে, ক্ষমতায় এলেই বাঙাল খেদাও আন্দোলন শুরু করা হবে। তাই ভেবে দেখা দরকার কোনটা
সত্যি কোনটা মিথ্যা।
কোনটা সত্যি। কোনটা মিথ্যা। বলা হচ্ছে ভোটার কার্ড নাগরিকত্বের
পরিচয় নয়। তাহলে যাদের ভোটার কার্ড আছে তারা কেউ নাগরিক নয় ভারতের। আবার বছরের পর বছর
এই ভোটার কার্ডেই দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে আসছে। তাহলে তো বলতে হয় ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হচ্ছে বিদেশের নাগরিকের ভোটে। যে ভোটার কার্ডকে নাগরিকত্বের
প্রমাণ হিসাবে ধরাই হচ্ছে না, তাহলে সেই ভোটার কার্ড দেখিয়েই কোন আইনে ভারতের সাংসদ
বিধায়ক নির্বাচন করার প্রক্রিয়া চলছে? কোনটা ঠিক। কোনটা বেঠিক?
কোনটা সত্যি কোনটা নয়। একজন মন্ত্রী সংসদে তাল ঠুকে বলছেন,
দেশ জুড়ে এনআরসি করা হবে। ২০২৪ এর আগেই সারা ভারতজুড়ে এনআরসি’র কাজ সম্পন্ন করা হবে।
আর একজন মন্ত্রী ম্যারাপ বেঁধে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছেন, গত ছয় বছরে এনআরসি নিয়ে সরকারের
ভিতর কোন কথাই হয় নি। একজন বলছেন, আগে এনআরসি করে দেখা হবে কারা কারা বৈধ নাগরিক। তারপর
সিএএ -এর মাধ্যমে শুধুমাত্র হিন্দু জৈন শিখ পারসিক শরনার্থীদের মধ্যে যারা আফগানিস্তান
পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে এসেছেন তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে আবেদনপত্র
পরীক্ষা করে। আর একজন মঞ্চ কাঁপিয়ে বলছেন এনআরসি আর সিএএ-এর মধ্যে কোন সংযোগই নাই।
দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একজন বলছেন যাঁরা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবেন না, তাঁরা
বৈধ শরনার্থী হিসাবে নাগরিকত্ব পাবেন। কিন্তু মুসলিমরা সেটি করতে পারবে না। সেই কারণেই
সিএএ। আর একজন বলছেন, সিএএ শুধুমাত্র বিদেশীদের জন্য। কোন ভারতীয়র জন্যেই সিএএ নয়।
সরকারী নির্দেশে আসাম সহ বিভিন্ন রাজ্যে শতাধিক ডিটেনশন ক্যাম্প
তৈরীর কাজ চলছে। আসামের একাধিক ডিটেনশন ক্যাম্পে শতশত মানুষের নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে
আটক করে রাখা আছে, যাঁদের প্রদত্ত ভোটেই আসামের বর্তমান সরকার নির্বাচিত হয়েছিল। যেসব
ডিটেনশন ক্যম্পে আটক মানুষদের ভিতর অনেকেরই মৃত্যু হয়ে গিয়েছে এরমধ্যেই। অথচ শাসক দলের
সর্বোচ্চ নেতা প্রাকাশ্য মঞ্চে ঘোষণা করছেন, দেশে কোন ডিটেনশন ক্যাম্প নাই!
লুঙ্গি পড়ে মাথায় টুপি দিয়ে ঢিল ছোড়ার নকল ভিডিও তুলতে গিয়ে
কেন্দ্রের শাসক দলের কর্মীসহ একাধিক দুস্কৃতী পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। আর মঞ্চ কাঁপিয়ে
সেই দলেরই শীর্ষ নেতা বলে দিচ্ছেন ট্রেনে বাসে কারা আগুন লাগাচ্ছে, সেটা তাদের পোশাক
দেখেই চেনা যায়। কোনটা সত্য। কোনটা নয়। সংবাদ মাধ্যমের ছবিতে সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে
সরকারী কর্মী ডিউটিরত অবস্থায় ইউনিফর্ম পড়েই বাসে আগুন লাগাচ্ছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে
ঢুকে শিক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ করা হচ্ছে বাস পোড়ানোর অভিযোগে। কোনটা সত্য কোনটা
নয়।
সিটিজেনশীপ এমেন্ডমেন্ট এক্ট ও এনআরসি’র বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত
জন আন্দোলনকে দেশবিরোধী দেশদ্রোহীতার তকমা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। অন্তত কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন
সরকারী দল এই আন্দোলনকে দেশবিরোধী বলেই প্রচার চালাচ্ছ। আর এই একই জন-আন্দোলনকে জনবিরোধী
আইন হটানোর জন্য ভারতবর্ষের জনজাগরণ বলেই মনে করছেন জনসাধারণের বড়ো অংশ থেকে শুরু করে,
একাধিক বিরোধী রাজনেতিক শিবির। কে ঠিক আর কে বেঠিক।
সরকারে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সরকার কারুর
নাগরিকত্ব কেড়ে নেবে না। আবার এনআরসি’র স্বপক্ষে প্রচার করা হচ্ছে নাগরিকত্বের বৈধ
প্রমাণপত্র না দেখাতে পারলে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক করে রাখা হবে। সরকারী দল হিন্দু শরণার্থীদেরকে
নাগরিক্ব দেওয়া হবে বলে প্রচার করে চলেছে। অথচ আসামে ১৪ থেকে ১৫ লক্ষ হিন্দুর নাগরিকত্ব
কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যাদেরকে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক রাখার জন্য নতুন নতুন ডিটেনশন ক্যাম্প
তৈরী চলছে। কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক?
একদিকে হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের ম্যানিফেস্টো অনুসারেই
একর পর এক হুঙ্কার হুঁশিয়ারী ছাড়া হচ্ছে। আবার মুসলিম সম্প্রদায়ের কোন ভয় নাই বলে অভয়
দেওয়া হচ্ছে। কোনটা সত্যি। কোনটা মিথ্যা।
সরকারে ক্ষমতাসীন দলের নেতা মন্ত্রীরা ক্রমাগত প্রচার করছেন,
অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরাই ভারতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তারাই সব সরকারী সুযোগসুবিধায়
ভাগ বসানোর জন্য বঞ্চিত হচ্ছে বৈধ নাগরিক সমাজ। এদিকে বিগত ছয় বছরে প্রায় সাতাশ জন
গুজরাটী শিল্পপতি ধনকুবের ব্যাংক থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা তুলে নিয়ে বেপাত্তা হয়ে
গিয়েছে। যার সরাসরি ফলস্বরূপ সরকার আইন আনতে চলেছে, ব্যাংকে প্রত্যেক একাউন্ট হোল্ডারের
গচ্ছিত অর্থের মাত্র এক লক্ষ টাকা অব্দিই সরকার গ্যারান্টার থাকবে। ব্যাংক ফেল করলে,
তার বেশি জমানো টাকা কোন একাউণ্ট হোল্ডারই আর ফেরত পাবেন না। অর্থাৎ পরবর্তীতে একাধিক
ব্যাংক ফেল করিয়ে নাগরিকের সঞ্চিত অর্থ লুঠ করানোর চমৎকার সরকারী ব্যন্দোবস্ত। তাহলে
অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা ভারতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করছে, নাকি বৈধ ভারতীয় গুজরাটী শিল্পপতিরা
এদেশের সম্পদ লুঠ করে নিয়ে বিদেশে পাচার করে চলেছে। দেশদ্রোহী তাহলে কারা? কোনটা ঠিক
আর কোনটা বেঠিক?
ঠিক এই ঠিক বেঠিকের খেলাটাই চলছে বিগত ছয় বছর ধরে। সরকার
বলছে অর্থনীতি মজবুত। সরকারী তথ্য বলছে অর্থনীতি ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। সরকারী দল
বলছে নোটবাতিল সফল। রিজার্ভ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য বলছে নোটবাতিলে যে পরিমাণে কালোটাকা
ধরার কথা ছিল, তার ছিটেফোঁটাই মাত্র ধরা গিয়েছে। এবং সেই সামান্য পরিমাণের কালো টাকা
ধরতে সরকারের ব্যায় হয়ে গিয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কোনটা ঠিক কোনটা নয়।
২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে, বলা হয়েছিল সুইস
ব্যাংকের থেকে সব কালোটাকা উদ্ধার করে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাংক একাউন্টে ১৫
লক্ষ করে টাকা জমা করে দেওয়া হবে। একজন নাগরিকও সেই টাকা প্রাপ্তির কথা স্বীকার করেন
নি। কে ঠিক আর কে বেঠিক।
সেই একই সময় বলা হয়েছিল নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এলে বছরে
দুই কোটি করে নতুন চাকুরী দেওয়া হবে। বিগত ছয় বছরের তথ্য বলছে, একেবারেই উল্টো কথা।
এই সময় সীমায় কোটি কোটি চাকুরীজীবী মানুষ চাকুরী হারিয়ে বেকার হয়ে গিয়েছে। কোনটা ঠিক
আর কোনটা বেঠিক।
এবং সেই ২০১৪’র লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী
নিজে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত কাউকে কোন সাংসদ
ও বিধায়ক পদে নির্বাচনের টিকিট দেওয়া হবে না। পরপর দুই বার নির্বাচনে জয়ী বিজয়ী দলের
বর্তমান সাংসদদের ভিতর ১১৬ জনই নানান দুস্কর্মের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে এখনো আদালতে
বিচারাধীন। কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক!
যারা পথে নেমে অসাংবিধানিক আইনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সংবিধান
রক্ষার আন্দোলনে সামিল হচ্ছে তারাই দেশপ্রেমী? নাকি যারা গোটা দেশকে এনআরসি ও নাগরিকত্ব
সংশোধনী আইনের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ব্যস্ত রেখে অবাধে দেশের সম্পদ লুঠ করার অশ্বমেধ
যজ্ঞ শুরু করেছে তারাই প্রকৃত দেশপ্রেমী? কোনটা ঠিক। কোনটা বেঠিক।
৩রা জানুয়ারী ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

