মুক্তি



মুক্তি
মুক্তি। বেশ জাদু ছড়ানো একটা শব্দ। শৈশব থেকেই মুক্তির পিছনে ছুটছি আমরা। মায়ের শাসন থেকে মুক্তি। বাবার ভয় থেকে মুক্তি। স্কুলের অংকের শিক্ষকের বেত থেকে মুক্তি। সকালে উঠেই পড়তে বসা থেকে মুক্তি। বছর ভর পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করা থেকে মুক্তি। কারণ এইগুলির কোনটির ভিতরেই মনের আনন্দ পাই নি আমরা। মা যদি কথায় কথায় না বকে। বাবা যদি ভীতির কারণ না হয়। অংকের শিক্ষক যদি বেত না উঁচিয়ে খাতা দেখেন। সকালে উঠেই যদি দমবন্ধ করা বইয়ের অক্ষরের স্তুপে চাপা না পড়তে হয়। পরীক্ষায় নম্বর তোলার কোন প্রতিযোগিতা যদি না থাকে, তাহলে হয়তো এইগুলির ভিতরেও আনন্দের সলুক সন্ধান খুঁজতাম আমরা। বিকেল হলেই যেমন মন নেচে উঠতো মাঠে যাওয়ার জন্য। এই একটা দিগন্ত ছিল। অন্তত আমাদের ছেলে বেলায়। ষাটের দশক। সত্তরের দশক। খোলা মাঠের বিশেষ অভাব ছিল না। আশে পাশে ধারে কাছে জুটে যেত। সেই মাঠের সাথে মুক্তির একটা সংযোগ ছিল অবিচ্ছেদ্দ। মাঠ আর মুক্তি আনন্দ আর আকাশ আমাদের ছেলেবেলাটিকে ভরিয়ে রাখতো। মুক্তির সেই একটা জানলা ছিল খোলা। মেয়েদের কথা বিশেষ বলতে পারি না। ইউরোপ আমেরিকার মতো মুক্ত সমাজ নয় আমাদের। মুক্তির যেটুকু অবকাশ ছেলেদের ভাগ্যে ছিল। মেয়েদের ভাগ্যে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। বিধাতাকে অশেষ ধন্যবাদ। দরকারী পার্টসগুলি বেছে নেওয়ার সময় আমদের মুক্তির পায়ে জন্মের প্রথম শুভক্ষণেই বেড়ি পড়িয়ে দেন নি। কিন্তু সেই মেয়েদের কথা যখন ভাবি, অবাক হতেই হয়। কি অসীম সহ্য শক্তি। যে খোলা মাঠের মুক্তির হদিশ ছিল আমাদের হাতের মুঠোয়, সেখানেও বাংলার সমাজ সংসার মেয়েদের যেন বেণীর প্যাঁচে প্যাঁচে বেঁধে রেখে দম দেওয়া পুতুলের মতোই স্থবির করে রেখে দিয়েছিল। অন্তত আমাদের প্রজন্ম অব্দি তো বটেই। যতটুকু চাবি ঘোরাবে, মেয়েদের হাত পা মাথা ততটুকুই হেলবে দুলবে লাফাবে। তাই মেয়েদের মননে মুক্তির অভিঘাত, একমাত্র ভুক্তভুগীরাই বলতে পারবে।

হয়তো সেখান থেকেই স্বপ্নে দেখা রাজপুত্তুরের কল্পনায় মেয়েদের মনে মুক্তির ছবি ফুটে উঠতো কৈশরে পা রাখতে না রাখতেই। জীবধর্মের প্রকৃতি মেয়েদের শরীরে জ্ঞানবৃক্ষের ফল ফুটিয়ে দেয় তুলনামূলক আগেভাগেই। ফলে যাকে বলে মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা। একে মেয়ে বলে রক্ষে নাই। তায় ঋতুমতী! না ওখানে ওরকম করে দাঁড়াতে নাই। অমুকের সামনে লাফিয়ে যেও না। তমুকের কোলে চড়তে চেও না। অত হাসার কি হয়েছে? ওরকম ভাবে কারুর গায়ে ঢলে পড়ো না। লোকে কি বলবে? বড়ো হচ্ছো। এসব বুঝতে শেখো। এই আর এক গেরো। লোকে কি বলবে? এর থেকে বুঝি মেয়েদের সারাজীবনেও মুক্তি নাই। সেই প্রথম ঋতুমতী হওয়ার দিন থেকে। মৃত্যুর মুহুর্ত পর্য্যন্ত। লোকে কি বলবে। লোকলজ্জা। সংসারের নিয়ম। সব কিছুই যেন বাঙালার মেয়েদেরকে সাজিয়ে গুছিয়ে আজীবন দম দেওয়া পুতুলের মতো গৃহের শোভা করে রাখার বন্দোবস্ত। সেই শোভায় একচুল অসঙ্গতি ঘটলেই সংসার রসাতলে! না ঘটলেই সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে।

আরও আশ্চর্যের কথা কি জানেন? যে ছেলেরা ছেলেবেলায় খোলা মাঠে মুক্তির স্বাদের স্বাধীনতা পেয়েছিল। সেই অপগণ্ডগুলোই প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে নিজের বৌকেই স্বামীত্বের শিকলে বেঁধে রাখতে তৎপর বেশি। নিজে একরাত বাড়ি না ফিরলে কোন জবাবদিহির দায় নাই। কিন্তু বৌ একরাত বাড়ি না ফিরলেই মহাভারত অসুদ্ধ হয়ে যাবে। মিলিটারীর কোর্ট মার্শালের থেকেও সেই বিচারের প্রক্রিয়া যেমন লম্বা তেমন শক্ত। এদেরই আবার যৌবনে ছাত্র রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় মেহনতী মানুষের মুক্তির দাবিতে। আরে ভাই, তোমার বাড়িতেও তো একজন মেহনতী মানুষ আছেন। নিজের বৌয়ের মুখটা আর মনে পড়ে না রাজনৈতিক মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার সময়। স্মৃতি এতটাই ঝাপসা হয়ে থাকে, নিজের মায়ের মেহনতের মহাকাব্যও স্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়, মুক্তি চাই মুক্তি চাই রাজনৈতিক শ্লোগানের রণ হুঙ্কারের সময়। কিসের মুক্তি চাই আমরা্? না মেহনতী মানুষের মুক্তি চাই। কেন চাই? না শ্রমের একসপ্লয়টেশন থেকে মুক্তি দিতে হবে। কাকে দিতে হবে? মেহনতী মানুষকে। তা, মেহনতী মানুষ কি শুধুই কলকারখানায় খেতখামারে খনিতে রাস্তাঘাট দোকান বাজারেই শ্রম দেয় সস্তায়? নিজের বাড়িতে দেয় না? বৌ রূপে। মা রূপে?

না অপ্রিয় সত্য নিয়ে আর বেশি গভীরে ঢোকার দরকার নাই। মধ্যরাতের মেহনত থেকেও মেয়েদের মন কি মুক্তি খোঁজে না সময় অসময়? কিন্তু পায় কি? সেখানেও কি একসপ্লয়টেশন অব লেবারের ইতিহাস রচনা হয় না। আমাদের এই বাংলার সমাজ জীবনে। ইতিহাস ও বর্তমানে? নাকি লেবার পেইন উঠলেই বংশ রক্ষার বাতি জ্বলতেই সাতখুন মাফ? আসলে মুক্তির সাথে আমাদের প্রত্যেকেরই কোন না কোন স্বার্থবোধ জড়িত। সেই স্বার্থ অটুট থাকলেই সব শান্তি। না থাকলেই আন্দোলনের দামামা বাজতে থাকে। ঘর থেকে পথে। সংসার থেকে রাজনীতিতে। দজ্জাল শাশুড়ীর হাতে থেকে মুক্তি। স্বৈরাচারী শাসকের গ্রাস থেকে মুক্তি। স্বামীর তর্জন গর্জন থেকে মুক্তি। রাজনৈতিক নেতার দাদাগিরি থেকে মুক্তি। সংসারের অভাব থেকে মুক্তি। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে মুক্তি। পারিবারিক অনুশাসন থেকে মুক্তি। সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামী থেকে মুক্তি। এই মুক্তির একদিকে দুর্বল অন্য দিকে সবল। এই যে দুটি আলাদা শক্তির ভারসাম্যহীন অসাম্য। এর থেকে মুক্তি তখনই সম্ভব যখন শক্তির ভরকেন্দ্র দিক বদল করবে। সেটা কিভাবে করবে। সময়ের সাথে, না বিপ্লবের পথে সেটা পরের কথা। কিন্তু যেভাবেই করুক না কেনো তখনো আবার নতুন একটা ভারসাম্যহীন অসাম্য দেখা দেবে উল্টো আঙ্গিকে। পুত্রবধুর গঞ্জনা থেকে বৃদ্ধ অসমর্থ্য শাশুড়ীর মুক্তি। গণতন্ত্রের ধনতান্ত্রিক নাগপাশ থেকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তি। শ্রীমতি ভয়ঙ্করীর হুকুম পালন থেকে নিরীহ পতিদেবতার মুক্তি। ট্রেডইউনিয়নের দাদাগিরি থেকে মালিকের মুক্তি। সর্বহারা জনশক্তির আস্ফালন থেকে সুস্থ সমাজের মুক্তি। না, এই মুক্তির মহাকাব্যের শুরু আছে শেষ নাই। আসলে মুক্তির মানে ক্ষমতায়ন নয়। ক্ষমতা দখল নয়। এটাই আমরা উপলব্ধি করতে পারি নি কোনদিন। মুক্তি মানে কোন কিছুকে এড়িয়ে যাওয়াও না। অসম লড়াই থেকে পালিয়ে যাওয়াও নয়।

মুক্তির প্রথম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থই হলো আত্মোপলব্ধির শক্তি অর্জন। নিজেকে জানা। আত্মানাং বৃদ্ধি। সেই পথে নিজের অধিকার ক্ষমতা দায়িত্ব কর্তব্য প্রাপ্য ও অপ্রাপ্য ভোগ ও ত্যাগের বোধ সম্বন্ধে সম্যক সচেতনতাই আসল মুক্তি। মুক্তি অন্ধকার থেকে। মুক্তি অজ্ঞানতা থেকে। মুক্তি অচলায়তন থেকে। রবি ঠাকুরের কথায় মুক্তি ক্ষুদ্র আমি থেকে বৃহৎ আমিতে।

মুক্তির সেই দিগন্তে পৌঁছালে দেখবো, মনের মাঝে গুন গুন করে উঠছে, ‘আমার যে সব দিতে হবে সে’তো আমি জানি। আমার যত বিত্ত প্রভু আমার যত বাণী’। এই যে ‘নিজের বলে যা পেয়েছি, শুভক্ষণে যবে তোমার করে দেবো তখন তারা আমার হবে’ এই হলো মুক্তির আর এক রূপ। মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে স্লোগান দিয়ে নয়। বন্দুকের নলকে ক্ষমতার উৎস মনে করেও নয়। এক গালে চড়ে খেয়ে আর এক গাল শান্তিতে বাড়িয়ে দিয়েও নয়। নিজের ভিতর থেকে নিজের যাবতীয় ক্ষুদ্রতা থেকে বেড়িয়ে এসে, একা নয়। সকলে মিলে সকলেই যদি এইভাবে ক্ষুদ্র আমি থেকে বৃহৎ আমিতে পৌঁছাতে পারি। পারতাম। যদি সত্যিই কোনদিন পারি, সেইদিনই আমরা আসল মুক্তির স্বাদ পাবো। অনুভব করতে পারবো মুক্তির উন্মুক্ত আনন্দ। যে আনন্দ ছড়িয়ে রয়েছে এই নিখিল বিশ্বের পরতে পরতে। প্রতিদিন গাছে গাছে ফুলে ফুলে ফলে ফলে যা সার্থক হয়ে চলেছে। অনাদী অনন্তকাল ব্যাপি। সময় গণনার বহু পূর্ব থেকে। সময় গণনা শেষ হয়ে যাওয়ারও পরে বহু কাল ব্যাপি।

মুক্তির সেই দিগন্তকে যতদিন আমরা ওসব আধ্যাত্মিক বিষয় বলে দৈনন্দিন জীবন থেকে অচ্ছুৎ করে রাখবো, ততদিনই আমাদের শৈশব থেকে মৃত্যুর দিন অব্দি মুক্তির জন্য এমন ভাবেই হাঁসফাঁস করে যেতে হবে। আর সময়ের চাকায় ভর দিয়ে শোধ নেওয়ার জন্য ওঁৎ পেতে বসে থাকতে হবে ধূর্ত শেয়ালের মতো। কবে আমারও দিন আসবে। তোমায় দেখে নেবো সেদিন। প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ হতে হতে অন্তেষ্টি ঘটিয়ে দেবো আপন মনুষ্যত্বেরই। টেরও পাবো না কোনদিন। আত্মনির্মাণের সেই বীভৎস নরক থেকে আর যাই হোক আমদের উদ্ধার করার কেউ থাকবে না। মুক্তির পিছনে ছুটতে ছুটতে এইভাবেই আমরা আটকা পড়ে যাই আত্মনির্মিত এক একটি নরক যন্ত্রণায়। বুঝতেই পারি না সেই যন্ত্রণার থেকে মুক্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সকলের আগে। সকলেই যদি সেই যন্ত্রণার উপলব্ধি করতে পারতাম। একমাত্র তখনই বুঝতে পারতাম মুক্তির আসল স্বরূপ। সেদিন আর কোন শক্তির ক্ষমতা হতো না। আমাদের আটকিয়ে রেখে দেয়, ক্ষমতার করাল গ্রাসে।

২রা জুলাই ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত