স্তন
বিবেকানন্দের বিশ্বদর্শন হয়েছিল
পরমহংস রামকৃষ্ণে। আর আমাদের বিশ্বদর্শন হয় নারীর স্তনে। বয়সন্ধির পাঁচিলটা টপকিয়ে
গেলেই শুরু হয় যায় আমাদের বিশ্বদর্শনের অব্যাহত জয়যাত্রা। আর আমাদের ঠেকায় কে। কৈশরের
অনুভবে নারীর স্তনে যে মোহের শুরু বার্ধক্যের উপবনে পৌঁছিয়েও তার সাধ মেটে না। এ সাধের
শেষ নেই। এ স্বাদের ভাগ হবে না। তাই বৈবাহিক সূত্রেই পাওয়া যাক আর প্রেমের সূত্রেই
লাভ হোক। একবার কোন নারীর স্তনের অধিকার অর্জন করলেই হোল। আর তার ভাগ দিতে রাজি নয়
কেউ। পরকীয়া ততক্ষণই মধুর যতক্ষণ নিজে করা যায়। কিন্তু স্ত্রী করলেই সব গণ্ডগোল। আমার
বৌয়ের স্তন। তার দিকে অন্য কেউ তাকাবে কেন? অথচ নিজে যখন পথে ঘাটে রূপসী ললনাদের বক্ষ
সৌন্দর্যে হিপনোটাইজড হয়ে থাকি। কয়েক সেকেণ্ডের জন্য হলেও, তাতে মহাভারত অসুদ্ধ হয়
না। পাশে সুন্দরী বৌ নিয়ে পথে নামলেই যত টেনশন শুরু হয়ে যায়।
হ্যাঁ মেয়েরাও
জানে ছেলেদের মনস্তত্ব। খুব ভালো করেই। কোন দৃষ্টির কোন সুর বুঝতে কোন মেয়েরই দেরি
হয় না। কিন্তু সেটাই যে নারীর তৃপ্তির মূল ভরকেন্দ্র। সে কথা স্বীকার করতে রাজি নয়
কোন মেয়েই। আপন বক্ষ সৌন্দর্য্যের বিষয়ে সচেতন সকল নারীই। ভরাট স্তনের অধিকারিণীদের
সম্বন্ধে ঈর্শা বোধ করতে থাকে ক্ষীণস্তনী রমণী। পোশাক নির্বাচনের ভিতরেও প্রভাব পড়তে
থাকে সেই সচেতনতার। সামজিক মিলন ক্ষেত্রে রকমারী পোশাকে সজ্জিত নারীকুলের ভিতর একটা
অদৃশ্য প্রতিযোগিতাও চলে। সেটা মুখে কেউই প্রকাশ করে না। এমন কি ঘোর ঠাণ্ডাতেও গায়ের
উপরে শাল চড়াতে দেরি হয়ে যায় মেয়েদের। খুব স্বাভাবিক ভাবেই। যেখানে পুরুষের জমায়েত
যত বেশি।
আবার সেই
স্তন নিয়েই পথে ঘাটে বাসে ট্রামে মেয়েদেরকেই সবচেয়ে বেশি বিব্রত হতে হয়। সেই পুরুষের
কারণেই। এই অভিজ্ঞতা নাই, এমন নারীর দেখা পাওয়া দুর্লভ এই দেশে। ফলে সেই অস্বস্তির
সাথে মোকাবিলা করতে করতেই পথ চলতে হয় আমাদের ঘরের মেয়েদের। এমনই সুন্দর রাস্তা ঘাট
কর্মক্ষেত্র বানিয়ে রেখেছি আমরা। কিন্তু আপন ঘরের চারদেওয়ালের ভিতরে? সেখানে, বাড়িতে
বৌ থাকলে তো কথাই নাই। আর আমাদের পায় কে। না থাকলে? কেন, নেট আছে। গুগুল আছে। চিন্তা
কি? দিন চলে যাবে স্তন দেখে। মুখে স্বীকার না করলেও, প্রথম দর্শনে আমরা নারীর স্তনের
দিকেই নজর দিই্। অনেকটা জরীপের ফিতে নিয়ে জমি কেনার আগে মেপে নেওয়ার মতো। কার স্তন
কতো চিত্তাকর্ষক। মৌখিক আলাপের তলায় তলায় আমাদের সেই জরীপের ফিতে তার কাজ করতে থাকে।
ওপরে যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানি না। একেবারে মায়ের আঁচল ধরে থাকা সুবোধ বালক যেন।
মাতৃবৎ পর দারেষু।
ফুলশয্যার
রাত থেকেই হোক। আর প্রথম ডেটিং এর দিন থেকেই হোক। হাতে পাওয়া নারীকে ভালোবাসার টোপে
কাছে টেনে আনার কাজে নারীর স্তনবন্দনায় টোপ গেলে না, এমন মেয়ে পাওয়াও দুর্লভ। ফলে স্তনের
কার্যকারীতার শেষ নাই। তাই স্তন সম্বন্ধে আমাদের আগ্রহও অশেষ। স্তন্যপায়ী জীব আমরা।
আর স্তন নিয়ে আগ্রহ থাকবে না, তাই কি হয়। আগ্রহের সূত্রপাত সেই অবোধ শৈশবে। নাড়িছেঁড়া
যন্ত্রণার পর। এই বিশ্বের সাথে। এই জীবনের সাথে প্রথম দেখার সেই দিনের প্রথম পরিচয়ের
সূত্রপাতই তো হয় মাতৃস্তনের উদ্বোধনের ভিতর দিয়ে। জন্মদিনের প্রথম শুভক্ষণে। সেই থেকেই
আমরা স্তন নিয়েই পড়ে আছি। বিশেষ করে এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় আবিশ্ব পুরুষকুল।
স্তন্যপায়ী জীব হিসাবে পুরুষের জীবন সার্থক। পিতৃতন্ত্র আমাদের উপরে স্তনের পূর্ণ অধিকার
সমর্পণ করেছে। হয়তো সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের পর সভ্যতার ঊষালগ্নেই। শৈশবে মাতৃস্তনের
অধিকার ছাড়তে রাজি থাকে না কোন শিশুই। শিশু হলে কি হয়, অধিকারের বিষয়ে জ্ঞান টনটনে।
পিঠাপিঠি ভাইবোন হলে তো কথাই নাই। সেই অধিকারের একটা অন্তঃসলিল যুদ্ধ জায়মান থাকে মনের
অজানা প্রোকষ্ঠে। শিশুর শৈশবে মাতৃস্তনের অধিকার মূলত খাদ্যের অধিকার। অন্ন বস্ত্র
বাসস্থানের ভিতর সবচেয়ে মৌলিক প্রয়োজন ও দাবির বিষয়ে শৈশব থেকেই আমরা সচেতন। দিতে হবে
দিতে হবে। স্তনের সাথে এই খাদ্য ও খাদকের সম্পর্কের ভিতর দিয়েই আমাদের চোখ ফোটে। চোখ
মেলে তাকিয়ে দেখি এই বিশ্ব। শিশুর চোখে যা মাতৃস্তনেই প্রতিবিম্বিত। সাম্প্রতিক কালে
বাধ সেধেছে অকালকুষ্মাণ্ড বেবিফুডের কারবারীরা। শিশুর অধিকারের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তখেপ
করে। শিশু তো আর গণআন্দোলন সংগঠিত করতে পারে না। কিন্তু হরতাল পালন করতে পারে। করেও।
বেবিফুড শিশুদের ঘরে ঘরে উঁকি দিলেই শোনা যাবে মায়েদের সেই এক অভিযোগ। জানেন তো, খেতে
চায় না কিছুতেই। জোর করে ঠেসে ধরে না খাওয়ালে খাবেই না। এমন বদমায়েশ হয়েছে তারপর কাশির
ভান করবে। ওয়াক দিতে থাকবে। কি যে ঝামেলা সারাদিন। ঝামেলা তো হবেই দিদি। আপনি আধুনিকা
জননী। সৌন্দর্য্য সচেতন নারী। পাছে সেই সৌন্দর্য্য ঝুলে পড়ে, তাই আগে ভাগেই বেবিফুড
ঠুসে দিচ্ছেন সন্তানের মুখে। সে তার মৌলিক অধিকার ছাড়বে কেন? হরতাল পালন করবে না?
সেই শৈশব
থেকে আমরা যেমন মাতৃস্তনকে অধিকার করে মায়ের সকল পুষ্টি শুষে নিয়ে নিজেকে পুষ্ট করতে
থাকি, ঠিক তেমনই মানুষের এই সভ্যতাও পৃথিবীকে সেই রকম ভাবেই শোষণ করতে করতে, ছিবড়ে
করতে করতে নিজের ঘরে সম্পদ মজুত করার খেলায় মেতেছে। মানুষের সভ্যতার চোখে এই পৃথিবীও
যেন মাতৃস্তনের মতোই একান্ত অধিকারের সামগ্রী। সেই অধিকারে পৃথিবীর মানুষ অন্য কোন
প্রজাতির জীবকুলকে আর ভাগ দিতে রাজি নয়। সম্পর্ণ ভাগটাই তার নিজের চাই। তাতে জীবজগতের
ইকোসিস্টেম নষ্ট হয়ে যাক। পরিবেশ দুষিত হয়ে যাক। জলবায়ুর পরিবর্তন হয়ে পৃথিবী ক্রমেই
মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠুক। তাতেও কিছু এসে যায় না। আজ পৃথিবীর বেশির ভাগ ধন
আমার ঘরেই মজুত রাখতে হবে। যুদ্ধ আর রাজনীতি সেই কাজটাই সুরক্ষিত করতে কার্যকরী ভুমিকা
পালন করে থাকে। পৃথিবীর সম্পদের উপরে যেন তেন প্রকারে অধিকার বিস্তার করতেই হবে। ঠিক
যেন সুন্দরী রূপসীর স্তনের ভোগসত্বের দখলের মতো বিষয়।
পৃথিবীর সম্পদকে
শোষণ করতে করতে যেভাবে ছিবড়ে করে চলেছি, একটু খেয়াল করলে অনুভব হয়, নারীর উপরে আমদের
যে অধিকার বোধ, সেও ঠিক সেই রকমই শোষণের অধিকার। স্ত্রী রূপেই হোক। প্রেমিকা রূপেই
হোক। বান্ধবী রূপেই হোক। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মিনী রূপেও যদি হয়। এমন কি জননী রূপেও।
এত এত বিভিন্ন রূপেই নারী পুরুষের হাতে শোষণের শিকার হতে হতে, পুরুষের ভোগলিপ্সাকে
চরিতার্থ করতে করতে, ভিতরে ভিতরে ক্রমেই নিঃস্ব হতে থাকে। এই ভাবে সমস্ত যৌবন পুরুষের
জন্য উৎসর্গ করে দিয়ে নিঃস্ব হতে হতে একদিন জরা ধরা শরীরে রিক্ততার বার্ধক্যে নারী
যখন নিঃসঙ্গ, সেদিন তার পাশে থাকার পুরুষ পাওয়া ভার।
আমাদের এই
সবুজ পৃথিবীও হয়তো, আর বেশিদিন নাই জরাগ্রস্ত রমণীর মতো নিঃস্ব রিক্ত হয়ে রসহীন সম্পদহীন
হয়ে আগাগোড়া সাহারায় পরিণত হয়ে যাবে। দুর্ভিক্ষের শিশুর মতো হয়তো আমরাও তখন সদ্যমৃত
জননীর স্তনে বেঁচে থাকার শেষ টান দিতে থাকবো। হয়তো সেদিনই আমরা প্রথম টের পেতে পারি।
নারীর স্তনই হোক আর এই পৃথিবীই হোক। সে শোষণের জন্য নয়। অধিকারের জন্য নয়। ছিবড়ে করে
দেওয়ার সামগ্রী নয়। নারীর স্তনই হোক আর এই পৃথিবী। সে পুষ্টির জন্য। যত্নের জন্য। লালনের
জন্য। পিতৃতন্ত্রের যেদিন সেই বোধ জাগ্রত হবে, নারী ও পৃথিবীর সেইদিন নবজন্ম ঘটবে।
কিন্তু তারও আগে সভ্য হতে হবে আমাদের। পুরুষ বলে যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে কেশর ফোলাতে
থাকে কেবলি।
৭ই জুলাই’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

