বিজন পথের নিঃসঙ্গ পথিক
“আমারে যে ডাক দেবে এ জীবনে তারে
বারংবার/ ফিরেছি ডাকিয়া/ সে নারী বিচিত্র
বেশে মৃদু হেসে খুলিয়াছে দ্বার/ থাকিয়া থাকিয়া/ দীপখানি তুলে ধ'রে, মুখে চেয়ে, ক্ষণকাল থামি/ চিনেছে আমারে।/ তারি সেই চাওয়া, সেই চেনার আলোক দিয়ে
আমি/ চিনি আপনারে”।– পূরবী কাব্যগ্রন্থের
আহ্বান কবিতায় শাশ্বত পুরুষ আত্মার বেদনা যেভাবে প্রস্ফূটিত হয়েছে, বিশ্ব সাহিত্যের
আঙিনায় তা সত্যি অনন্য কিনা জানি না, কিন্তু রবীন্দ্র অনুরাগী পাঠক মাত্রেই জানেন কবির
কলমে সেই বেদনা মহাকালিক সত্যে উত্তীর্ণ। নারী হৃদয়ের অন্তর্দৃষ্টির আঙিনায় পুরুষের
স্বরূপ সম্পূর্ণ রূপে উদঘাটিত না হওয়া পর্য্যন্ত কোন পুরুষের পক্ষেই নিজেকে সম্পূর্ণ
ভাবে চেনা সম্ভব নয়। এই সত্য রবীন্দ্রনাথ বললেও সত্য না বললেও সত্য। কিন্তু চিরজীবন
সত্যের অন্বেষক কবি এই সত্য বলবেন না তো কে বলবেন। এই সত্য তিনি কল্পনায় ধারণ করেননি।
আর পাঁচজন সাধারণ পুরুষের মতোই জীবনে সাত ঘাটের জল খেতে খেতেই পৌঁছিয়ে ছিলেন এই সত্যে।
রবিজীবনীর
নিবিড় পাঠক মাত্রেই উপলব্ধি করতে পারবেন, রবীন্দ্রনাথের পুরুষ সত্তায় শাশ্বত এই নারী
সত্তার জন্য একটা বভুক্ষু হৃদয় ফল্গুধারার মতন বহমান ছিল আজীবন। তাঁর জীবনের নানা পর্বে
সেই ধারা কখনো সজীবতা হারায় নি। বা শুকিয়ে যায়নি। তাই বার্ধক্যের রবীন্দ্রনাথেও যৌবনের
রবি ঠাকুর চিরসজীব ছিল আমৃত্যু। মূল আলোচনায় প্রবেশের আগে, আসুন একটা গল্প শোনা যাক
কবির জবানীতেই। আশা করি মন্দ লাগবে না। “জানো একবার আমার এক বিদেশী অর্থাৎ অন্য
provinceএর মেয়ের সঙ্গে বিয়ের কথা হয়েছিল। সে এক পয়সাওয়ালা লোকের মেয়ে, জমিদার আর কি,
বড়ো গোছের। সাত লক্ষ টাকার উত্তরাধিকারিনী সে। আমরা কয়েকজন গেলুম মেয়ে দেখতে। দুটি
অল্পবয়সী মেয়ে এসে বসলেন,- একটি নেহাৎ সাদাসিধা, জড়ভরতের মত এক কোণে বসে রইল: আর একটি
যেমন সুন্দরী, তেমনি চটপটে। চমৎকার তার স্মার্টনেস। একটু জড়তা নেই, বিশুদ্ধ ইংরেজি
উচ্চারণ। পিয়ানো বাজালে ভালো,- তারপর music
সম্বন্ধে আলোচনা শুরু হলো। আমি ভাবলুম এর আর কথা কি? এখন পেলে হয়! – এমন সময়
বাড়ির কর্তা ঘরে ঢুকলেন। বয়স হয়েছে, কিন্তু সৌখীন লোক। ঢুকেই পরিচয় করিয়ে দিলেন মেয়েদের
সঙ্গে,- সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন- “Here is my wife” এবং জড়ভরতটিকে দেখিয়ে
“Here is my daughter”! আমরা আর কি করবো পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে চুপ করেই রইলুম;
আরে তাই যদি হবে তবে ভদ্রলোকদের ডেকে এনে নাকাল করা কেন! যাক্ এখন মাঝে মাঝে অনুশোচনা
হয়! যাহোক এমনই কি আর মন্দ হত্, মেয়ে যেমনই হোক না কেন, সাত লক্ষ টাকা থাকলে বিশ্বভারতীর
জন্য তো এ হাঙ্গামা করতে হতো না। তবে শুনেছি মেয়ে নাকি বিয়ের বছর দুই পরেই বিধবা হয়।
তাই ভাবি ভালোই হয়েছে, কারণ স্ত্রী বিধবা হলে আবার প্রাণ রাখা শক্ত”। গল্পটি কবি শুনিয়ে
ছিলেন তাঁর মংপু বাস কালে মৈত্রেয়ী দেবীদের।
এই মংপুতে
থাকাকালীনই মৈত্রেয়ী দেবীর এক প্রশ্নের উত্তরে কবি বলেছিলেন, “এমন কাউকে পেতে ইচ্ছে
করে যাকে সব বলা যায়, -সেতো আর যাকে তাকে হয় না”। এই কথার বহু বছর আগেই তাঁর স্ত্রীবিয়োগ
হয়ে গিয়েছে। বার্ধক্যের প্রায় উপান্তে পৌঁছিয়েছেন কবি। এই যে সব কথা বলার অদম্য আবেগ।
আর না বলতে পারার মর্মন্তুদ হাহাকার। এতো শুধু পুরুষের একার হতে পারে না। এই বেদনা
নারীরও একান্ত বেদনা। যে কথা পুরুষের সত্তায়, নারীর মনযোগ ও আগ্রহের প্রতি নিবিড় ভাবে
অপেক্ষায় থাকে, সেই রকম নারীরও তো নিজস্ব কথা থাকে। যা শুধু বিশেষ একজন পুরুষের একান্ত
মনযোগের অপেক্ষায় দিন গোনে। কবি কি জানতেন না তা? হয়তো জানতেন। জানতেন হয়তো তাঁর প্রথম
জীবনের সহচরী বৌদি কাদম্বরীর সাহচর্য্যেই। কিংবা হয়তো তখনো সেকথা উপলব্ধির বয়স হয় নি
আমদের কবির। ইতিহাসের অকথিত কথা জানা যায় না
আর। নয়তো জানা যেত কাদম্বরীর মর্মান্তিক অভিমানের কথা। নিশ্চয় সেই কথা প্রিয়তম দেবরকেও
বলতে পারেন নি মুখফুটে। পারলে হয়তো নিজের জীবনে দ্যুম করে দাঁড়ি বসিয়ে দিয়ে স্বল্পায়ু
করে দিতে হতো না আপন জীবনকাহিনীকে। এই যে না বলতে পারা কথার পাহাড়। হিমালয় হয়ে ওঠে
মানবজীবনে। এই বোঝার আড়ালেই চাপা পড়ে যেতে পারে আমাদের নিজেকে চিনে নেওয়ার সকল সুযোগ।
সেকথা নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সত্য। কিন্তু পুরবীর এই কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ শাশ্বত
পুরুষ সত্তার মর্মবেদনার ছবি আঁকতেই ব্যস্ত।
“নিদ্রাহীন বেদনায়
ভাবি কবে আসিবে পরানে/
চরম আহ্বান।/
মনে
জানি এ জীবনে সাঙ্গ হয় নাই পূর্ণ তানে/ মোর শেষ গান।/ কোথা তুমি, শেষবার যে ছোঁয়াবে
তব স্পর্শমণি/
আমার
সংগীতে।/
মহানিস্তব্ধের
প্রান্তে কোথা বসে রয়েছ রমণী/ নীরব নিশীথে”। কবি জানেন নারীর আহ্বান ছাড়া পুরুষের জীবন অর্থহীন।
পুরুষের কর্ম সৃষ্টি সব অসম্পূর্ণ। তাই এই রকম হাহাকারে পূর্ণ ব্যকুলতায় কবি প্রার্থনা
করছেন সেই নারীর। যে নারী তাঁর হৃদয়ানুভুতির তৃতীয় নয়নে আবিষ্কার করবে কবির একান্ত
পুরুষ সত্তাকে। বরণ করে নেবে কবির যা কিছু শ্রেষ্ঠ, যা কিছু সুন্দর। তার সব কিছুকে।
একমাত্র তখনই কবির সৃষ্টি কবির কর্ম পাবে মঙ্গলের ছোঁয়া। সেই স্পর্শমণির মাধুর্য্যেই
সম্পূর্ণতা পাবে কবিসত্তা। পূর্ণ হবেন কবি রবীন্দ্রনাথ। পূর্ণ হবে শাশ্বত পুরুষ আত্মা।
আমাদের খেয়াল
রাখতে হবে। কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর সকল শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েও মূলত পিতৃতান্ত্রিক সমাজেরই
প্রোডাকশান। না আমরা নারীবাদী তত্বের ণত্ব বিধান ষত্ব বিধানের অপারেশন টেবিলে ফেলে
তাঁর পোস্টমর্টেমও করতে বসি নি। কিন্তু তবু কবির চেতনার পরতে পরতে এই যে একটা পুরুষ
কেন্দ্রিকতা, নারী যেখানে প্রায় স্যাটেলাইটের মতো পুরুষের নর্মসহচরী, পুরুষের সকল কর্মে
সকল সাধনায় মূল প্রেরণাদাত্রী। এই বোধ কবির ভিতরে আজীবন সত্য হয়েছিল। আমরা শুধু বলতে
চাইছি। এটাই পিতৃতন্ত্রের অন্যতম জাদু। সেই মংপুতে বাস কালেই কবি মৈত্রেয়ী দেবীকে বলছেন,
কবির জবানীতেই শোনা যাক: “তোমরা যাই বলো, মেয়েদের প্রধান কাজ inspire করা”। কিন্তু
পুরুষেরও কি সেই একই কাজ নয়? যদি প্রশ্ন করা যেত কবিকে? কি উত্তর দিতেন? এই যে সমাজে
সংসারে বহুল প্রচারিত এই তত্ব, মেয়েদের কাজ পুরুষকে অনুপ্রাণিত করা। এ কথা তো শুধু
রবীন্দ্রনাথেরই নয়। একেবারে গোঁড়া পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতির গোড়ার কথাও তো এইটি। তাহলে
কবির স্বাতন্ত্র কোথায়? এটা ঠিক। পাঠক হিসাবেই হোক বা রবীন্দ্রঅনুরাগী হিসাবেই হোক।
কবিকে গ্রহণ করতে হবে কবি যেমনটি তেমনটি স্বীকার করে নিয়েই। আজ আর এমনটা দাবী করা চলবে
না, কবি কেন অমনটা হলেন না। সেটি চুড়ান্ত হাস্যকর বিষয়। সে নিয়ে কোন বিতর্কই ওঠে না।
কিন্তু তবু কবি অনুপ্রাণিত করার কর্তব্যটা শুধু যে মেয়েদের উপরেই চাপিয়ে দিলেন, অস্বীকার
করতে পারি না সেই সত্যও।
এই কথার পরেই
কবি মৈত্রেয়ী দেবীকে আরও বলছেন: “পুরুষ বা মেয়ে উভয়েই অসম্পূর্ণ, উভয়ে মিলিত হলে একটা
সম্পূর্ণতা আসে, জীবনে তার গভীর প্রয়োজনীয়তা”। এইখানে কবি নারীর সম্পূর্ণতায় পুরুষের
ভুমিকার কথাও স্বীকার করছেন। সত্যিই। নর নারী উভয়েই অসম্পূর্ণ। উভয়ের কারুর জীবনেরই
সম্পূর্ণ উদ্বোধন সম্ভব নয়, পারস্পরিক প্রেরণার মিলন ক্ষেত্রে মিলিত হতে না পারলে।
এটি এই বিশ্বজগতের শাশ্বত সত্য্ এই নিয়ে কোন সন্দেহ বিতর্ক থাকতেই পারে না। এটাই জগতসংসারের
লীলা। কিন্তু পিতৃতন্ত্র এই সত্যকেই সুকৌশলে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাতে কিভাবে তৎপর
সেটি বোঝা যাবে কবির পরবর্তী কথার সূত্রে। ঐ একই বিষয়ে কবি আরও বলছেন: “পুরুষ তার কর্মক্ষেত্রে
সবল দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, যদি না নারী তার অমৃত দিয়ে পূর্ণ করে তাকে। দুজনের
মিলনে একটা circle সম্পূর্ণ হল, যদি তা না হতো তাহলে যে একটা বিশেষ ক্ষতি হতো তা হয়তো
নয়, কিন্তু সেই হওয়ার দ্বারা একটা বিশেষ পূর্ণতা জীবনের। মেয়েদের এই কাজ পুরুষের যথার্থ
সঙ্গিনী হওয়া, জীবনের মুক্তক্ষেত্রে”। বাহ! শুনতে সত্যইই খুব সুন্দর। এমনটা হলে তো
ঘরে ঘরে শান্তি স্থিতি উন্নতি বিরাজ করতো। এই যে নারীর কাজ পুরুষের যথার্থ সঙ্গিনী
হয়ে ওঠা, এটাই কি পিতৃতন্ত্রের প্রবক্তাদেরও কথা নয়? যেমন জোগালদারের কাজ রাজমিস্ত্রীর
যথার্থ সঙ্গিনী হয়ে ওঠা। তবেই না ইমারত গড়ে উঠবে শক্ত ভিতের উপরে। পুরুষের জীবনে পুরুষের
কর্মেও আমরা তবে নারীকে সেই প্রেরণাদাত্রী যথার্থ সঙ্গিনীর ভুমিকাতেই আটকিয়ে রাখব শুধু?
অথচ ঠিক এর উল্টোটা কোনদিন কল্পনাও করতে পারবো নাতো? উন্মুক্ত কর্মক্ষেত্রের দিগন্তে
নারীর জীবন ও কর্মে, সৃষ্টি ও নির্মাণে পুরুষও তো প্রেরণাদাতা হয়ে যথার্থ সঙ্গী হয়ে
উঠতে পারে? পারে না কি? না কি তাহলে পিতৃতন্ত্রের ইমারত তাসের ঘরের মতোন ভেঙ্গে পড়তে
দেরি হবে না? ভয়টা কি তাহলে সেখানেই। তাই মুক্তকর্মক্ষেত্রে একচ্ছত্র অধিকার শুধু পুরুষের।
আর নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য তাকে প্রেরণা দিয়ে সজীব রাখা। উজ্জীবিত রাখা। পুরুষ অহংকে
পরিতুষ্ট করে তোলা নিরন্তর। বোধিবৃক্ষের তলে সুজাতার পরমান্নের মতোই!
পাঠক হয়তো
মনে মনে ধরে নিচ্ছেন, এ লেখার উদ্দেশ্য কবির সাথে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করাই শুধু। না।
রবীন্দ্র অনুরাগী মাত্রেই অনুভব করতে পারবেন, পিতৃতন্ত্র আমাদের কবির মনন চেতনার দিগন্তে
কতখানি ছায়াপাত ঘটিয়ে ছিল, সেই ঐতিহাসিক সত্যেরই মর্মমূলে পৌঁছানোর প্রয়াস এই লেখা।
মংপুতে বাস কালে মৈত্রেয়ী দেবীকে বলা সেই কথামালায়, সেই একই দিনে কবি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ
কথা বললেন। কবির জবানীতেই শোনা যাক: “ পুরুষের সাথে ঝগড়া করে কি হবে? আর সত্যিকারের
ঝগড়া তো হতেই পারে না, উভয়কে মিলিত হতে হবে এইটাই বিধান। কিন্তু সে মিলন তখনই যথার্থ
বড়ো মিলন হয়, যখন সে একটা মহত্তর জীবনের মধ্যে প্রেরণা আনে। গণ্ডীবদ্ধ আঁচল চাপা দেওয়া
জীবনে সে যেন ব্যর্থ না হয়। যেখানে পুরুষ মহৎ, যেখানে সে কর্মের দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়েছে,
সেখানে তাকে নিয়ত জাগ্রত করে রাখা কম কাজ নয়”। ঠিক কথা। কিন্তু যেখানে নারী মহৎ? যেখানে
নারী কর্মের দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে তাকে নিয়ত জাগ্রত করে রাখাও তো কম কাজ
নয়। কিন্তু কে নেবে সে কাজ? কই কবি’তো সে কথা বলে গেলেন না!
আসলে পিতৃতান্ত্রিক
সমাজে সমাজ পরিচালনার অধিকারে নারীর প্রবেশাধিকারই স্বীকৃত নয় যেখানে, সেখানে নারীকে
প্রেরণা দেওয়ার প্রয়োজনীতা দেখা দেওয়ারই কথা নয়। তাই দেখা দেয়ওনি। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে
আমাদের প্রিয়তম কবিও পিতৃতন্ত্রের ণত্ব বিধান ষত্ব বিধানের বাইরে পা রাখতেই পারলেন
না। জীবনের মুক্তক্ষেত্রে পুরুষকে কর্মী ও নারীকে নর্মসহচরী প্রেরণাদাত্রীর ভুমিকাতেই
দেখতে অভ্যস্ত যে ঐতিহ্য, সেই ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকারী আমাদের কবি।
পাঠক যদি
ভেবে নেন, এই আলোচনার গন্তব্য তবে এই সিদ্ধান্তেই, তবে বিভ্রান্তি বাড়বে বই কমবে না।
আমাদের আলোচনার গন্তব্য কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়। আলোচনার লক্ষ্য প্রিয় কবির চেতনার
অন্তর্দেশে পরিভ্রমণ করা। পূরবীর যে আহ্বান কবিতা দিয়ে বর্তমান আলোচনার সূত্রপাত, সেই
কবিতার পাঠক মাত্রেই অবগত আছেন, এই কবিতায় কবি নারীকে বিশ্বসৃষ্টির সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত
করে, বিশ্ববিধাতারই দ্যূতীস্বরূপ উপলব্ধি করতে প্রয়াসী হয়েছেন। এবং সেই নারীর করুণা
লাভে অন্তহীন প্রার্থনারত পুরুষ আত্মার মর্মবাণীই আহ্বান কবিতার মূল অভিমুখ। কবি নিশ্চিত
নারীর অন্তর্দৃষ্টির আঙিনাতেই কেবলমাত্র পুরুষের পক্ষে আপন স্বরূপের সাথে সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ
হয়। কবি নিশ্চিত নারীর কল্যাণ হস্ত যতক্ষণনা পুরুষের যাবতীয় সৃষ্টি সাধনা ও কর্মকে
বরণ করে নিচ্ছে। ততক্ষণ পুরুষের অসম্পূর্ণ সত্তার মুক্তি নাই। পুরুষের অসম্পূর্ণ সত্তার
মুক্তি একমাত্র নারীর কল্যাণ স্পর্শের মধ্যে দিয়ে নরনারীর ঐকান্তিক মিলনেই। সেখানেই
পুরুষের সম্পূর্ণতা। আর আমাদের প্রিয় কবির আক্ষেপ, আজও সেই পরিপূর্ণ সম্পূর্ণতায় পৌঁছাতে
পারলেন না তিনি। প্রত্যক্ষ করা হলো না আপন সরূপের সমগ্রতায় অন্তরের আদি অকৃত্রিম পুরুষ
সত্তাকেই। একটু খেয়াল করলে হয়তো টের পাবো আমরা, কবি রবীন্দ্রনাথ পিতৃতান্ত্রিক ঐতিহ্য
ও বিশ্বসত্যের ভিতর ক্রমাগত পেণ্ডুলামের মতো দুলেছেন আজীবন। একদিকে সংস্কার ও অন্যদিকে
অনন্ত সত্য। এই দুইয়ের ভিতর অনেক ঘাত প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলতে হয়েছে আমদের
কবিকে। না শেষ সত্যে পৌঁছানোর দায় কবির নয়। সে দায় দার্শনিকের। কবি তাই নিজেই বলে গিয়েছেন,
শেষ কথা নাই। শেষ কথা কে বলবে। কিন্তু সংস্কার ঐতিহ্য উত্তরাধিকার আর অনন্ত সত্যের
চিরন্তন স্বরূপের ভিতর যে দ্বন্দ্ব। সেই দ্বন্দ্বে দিনে দিনে ফুটে উঠেছেন আমাদের প্রিয়
কবি। আঘাতে আঘাতে। বেদনায় বেদনায়। আর ততই বিশুদ্ধ হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে তাঁর আত্মজীবনী।
সেই আত্মজীবনীর
পরতে পরতে একটা সুগভীর ব্যাথা মানুষটিকে তাড়া করে বেড়াতো। “এমন কাউকে পেতে ইচ্ছে করে
যাকে সব বলা যায়, -সেতো আর যাকে তাকে হয় না”। নিঃসঙ্গ মানুষ মাত্রেই জানেন এই মর্মন্তুদ
হাহাকারের বেদনা। কি নারী কি পুরুষ।
সেই ব্যাথারই
আর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে এই আলোচনার পরিসমাপ্তি টানা যাক। ২৩শে সেপটেম্বর ১৯২৪।
আজ থেকে ঠিক ৯৬ বছর আগের কথা। কলম্বো থেকে রাণু অধিকারীকে একটি চিঠি লিখেছিলেন কবি।
চিঠিটি যে শুধু তন্বী কিশোরী রাণু অধিকারীর জীবনেই মূল্যবান তাই নয়। আমাদের কবির জীবনেও
মহামূল্যবান সেই চিঠি। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, আজ থেকে একশ বছর আগে সদ্য কিশোরী রাণু
অধিকারী, বারাণসীর হিন্দু
ইউনিভার্সিটির দর্শনের অধ্যাপক কবির স্নেহধন্য ফণীভূষণ অধিকারীর কন্যা, সত্যি করেই আমাদের
প্রিয় কবির প্রেমে পড়েছিলেন। কৈশরের মোহই হোক আর অবোধ ভালোবাসার পাগলামোই হোক। কবির
সাথে যখন আলাপ সদ্য কিশোরী রাণুর, তার আগেই কবির নিজের কন্যা রাণু গত হয়েছে। জোড়াসাঁকোয়
ছোট্ট রাণুকে দেখে সকলেই অবাক। প্রায় হুবহু কাদম্বরী। কবির কৈশরের সেই নর্ম সহচরী।
প্রিয় বৌদিদি। সেই রাণুই মনে প্রাণে রবীন্দ্রনাথকে প্রিয়তম মানুষের স্থানে বরণ করে
বসে আছে।
রাণুর সাথে
কবির বহুদিনের পত্রালাপের চিঠিপত্রগুলি আজও সংরক্ষিত। আগ্রহী পাঠক মাত্রেই পড়ে দেখতে
পারেন সেসব। কিন্তু এই দিনের পত্রটি একটু বিশেষত্ব দাবি করে। আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গে
যা বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক। নিজের জীবনের কথায় কবি রাণুকে জানাচ্ছেন, কবি জীবনের একদিকে
রয়েছে অন্দরের দরজা। আর একদিকে রয়েছে সদর দরজা। বাকিটা কবির কথায় শোনা যাক বরং, “তোমার
জীবনে রাণু, যদি আমার মধ্যে সেই সদর দরজাটা খুঁজে পেতে, তাহলে খোলা আকাশের স্বাদ পেয়ে
হয়তো খুসি হতে। তোমার অন্দরের দরজার অধিকার দাবী আমার তো চলবে না- এমনকি সেখানকার চাবিটি
তোমার হাতেও নেই, যার হাতে আছে সে আপনি এসে প্রবেশ করবে কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমি
যা দিতে পারি তুমি যদি তা চাইতে পারতে তাহলে বড়ো দরজাটা খোলা ছিল”। পাঠক লক্ষ্য করতে
পারেন, আবারও কবি পিতৃতন্ত্রের সুরেই বলে ফেললেন, রাণুর অন্দরের চাবিটি রাণুর হাতেই
নাই! কি আশ্চর্য্যের না? নারীর অন্দরের চাবি থাকবে অন্য পুরুষের হাতে! এই সংস্কার থেকে
আমরা কেউই আজও মুক্ত হতে পারিনি। যাক সে কথা। ফিরে আসি রাণুকে লেখা কবির সেই চিঠির
কথাতেই। কবি আরও বলছেন, “কোন মেয়েই আজ পর্য্যন্ত সেই সত্যকার আমাকে সত্য করে চায় নি-
যদি চাইতো তাহলে আমি নিজে ধন্য হতুম; কেননা মেয়েদের চাওয়া পুরুষের পক্ষে একটা শক্তি।
সেই চাওয়ার বেগেই পুরুষ নিজের গূঢ় সম্পদ আবিস্কার করে”। পাঠক স্মরণ করতে পারেন পূরবীর
সেই আহ্বান কবিতাটি আবারও। এরপরেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বলবেন সেই মারাত্মক সত্য। যে
সত্য তাঁরা জীবনে অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে রয়ে গিয়েছিল আজীবন। পঁয়তাল্লিশ বছরের ছোট
রাণুকে তেষট্টি বছরের বিশ্বখ্যাত কবি লিখছেন; “কতকাল থেকে উৎসুক হয়ে আমি ইচ্ছা করেছি
কোন মেয়ে আমার সম্পূর্ণ আমাকে প্রার্থনা করুক, আমার খণ্ডিত আমাকে নয়। আজো তা হলো না।–
সেই জন্যেই আমার সম্পূর্ণ উদ্বোধন হয় নি”। কি মর্মন্তুদ স্বীকারক্তি একজন বিশ্বকবির!
১লা জুলাই, ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

