আহাম্মকের আত্মকাহিনী
সত্যি এই মানুষটিকে দেখলেই খুব হাসি
পায়। সর্বনাশ। এমন কথা মুখে আনাও পাপ। চারধারে রবীন্দ্র অনুরাগীরা নাই তো? থাকলেই মানহানির
মামলা ঠুকে দেবে সরাসরি। কিন্তু হাসি এমনই বিষম বস্তু যে, পৌষ্টিক গণ্ডগোলের মতো। চেপে
রাখাই দায়। ও ঠিক ফাঁক ফোঁকর করে নিয়ে বেড়িয়ে পড়বেই পড়বে। এই কারণেই রবীন্দ্রমঞ্চের
আসে পাশে কিঞ্চিত রামগরুরের ছানাদের ভিড় বেশি হয়। তা হোক। কিন্তু বছরে দুইটি দিন বিশেষ
করে। একেবারে তারিখ মিলিয়ে আমার সত্যই হাসি সামলানো দায় হয়ে পড়ে। গোরক্ষক বাহিনীর হিন্দুয়ানীর
মতো মঞ্চজুড়ে বাঙালির রবীন্দ্রপুজোর ঘটা দেখলে, কার না হাসি পাবে? যত ভক্তি তত ঘটা।
এই এক মোক্ষম হাতিয়ার পেয়ে গেছি আমরা। রবি ঠাকুরের গান গেয়ে নাচ নেচে কবিতা পাঠ করে
নাটক মঞ্চস্থ করে এমন কি মানুষটির জীবনের এক এক মিনিট নিয়ে তারিখ মেলানো গবেষণা পত্র
লিখেও বেশ একটা শোভন সুন্দর পেশায় জীবনটাকে গুছিয়ে নেওয়া যায়। নাম যশ প্রতিপত্তি অর্থ
বিত্তের চাবিকাঠি হাতের মুঠোয়। সত্যিই মানুষটি শুধু যে প্রতিভার খনি ছিলেন তাই নয়।
সে এমন এক খনি, যে কোনদিন সেই খনিজ ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় বা সম্ভাবনা নাই। যত পারো খুঁড়ে
তোল। আর মঞ্চ জুড়ে। সেমিনার জুড়ে। ছাপা পাতা জুড়ে। বুদ্ধির রেসিপিতে মাছের তেলে মাছ
ভাজার মতো রেঁধে যাও। খদ্দেরের অভাব হবে না। হাতে গরম তেলে ভাজার মতো বাঙালি একটা টিকিটের
জন্য লাইন দিয়ে থাকবে। আজ অমুকের পারফরমেন্স। কাল তমুকের নাটক। সান্ধ্য বিনোদনের বাজারে
আজও রবি ঠাকুর এক অমোঘ পুঁজি।
সেই পুঁজি ভাঙিয়ে খেতে
খেতে বাঙালির প্রতিভা আর কোন মৌলিক প্রতিভার জন্মই দিতে পারলো না আজও। সব কিছু ঐ গঙ্গার
শাখা নদীর মতো ধার করা জলে সাগরের দিকে গড়াচ্ছে শুধু। সত্যই শুধু প্রতিভাধর বাঙালিই
নয়। আম জনতার রবীন্দ্র অনুরাগও সেই রকম ধার করা ভক্তির রসেই গড়িয়ে গড়িয়ে চলেছে। এক
প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্ম রবীন্দ্র অনুরাগের ভক্তিরস ধারাবাহিক রিলে রেসের মতো হাত
বদল করছে শুধু। আর সেটিই নাকি আমাদের বঙ্গের ঐতিহ্য। আমাদের গর্বিত উত্তরাধিকার। ওরে
ব্বাবা। সেই উত্তরাধিকার নিয়ে, না কোন প্রশ্ন তোলা যাবে না। শুধু ফলো করে যেতে হবে।
একেবারে দুগ্গাপুজোর মতো। তিথি নক্ষত্র মিলিয়ে। বাঙালির পার্বণ বলে কথা। ঘড়ির কাঁটার
এদিক ওদিক হওয়ার জো নাই। তাই আজ আবার সেই বাইশে শ্রাবণ। সেই প্রথম বাইশে শ্রাবণে মানুষটির
শ্মশান যাত্রায় যাঁরা চুল দাঁড়ি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা সমৃদ্ধ করা শুরু
করেছিলেন। সেই ট্র্যাডিশন আজও সমানে চলছে। আজ হয়তো দীর্ঘদেহী মানুষটির চুল দাঁড়ি আর
অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তাতে কি। সেদিনের চুল দাঁড়ি ছিঁড়তে ছিঁড়তে চিতায় পোড়ার মতো কয়
গাছি চুল দাঁড়ি পড়ে ছিল। জানা যায় না। আবার বলা যায় না। সেই নিয়েও হয়তো কোন গবেষক তথ্যের
গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে নামের আগে ডঃ বসিয়ে নেবেন কোনদিন। তা যে কথা বলছিলাম। আজ চুল দাঁড়ি
না থাক। হাজার হাজার পাতার লক্ষ লক্ষ বাক্য পড়ে আছে তো। হাজার হাজার গানের লাইন। শত
শত নৃত্যের ভঙ্গিমা। কোটি কোটি কাব্যিক অক্ষর। তাই আমাদের আর পায় কে। যে যেমন ছিঁড়তে
পারবে। তার সংগ্রহশালা ততই সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। হ্যাঁ চুল দাঁড়ির সংগ্রহশালার থেকে। এ
অবশ্যই অনেক ভালো। সে কথা নিয়ে আশাকরি বিতর্ক উঠবে না কোন।
ফলে পশ্চিশে বৈশাখই হোক
আর বাইশে শ্রাবণ। আমরা প্রস্তুত। ঘটি উপুর করে আমাদের শ্রদ্ধার নৈবেদ্য ঢালতে কার্পণ্য
করি না কোনদিন। গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোয় বাঙালির পারদর্শীতা বিশ্বে সর্বত্তম। তাই আজ আমাদের
মুখ দেখানোর দিন। বাড়িতে অতিথি আসলে শৈশবে গর্বিত অভিভাবকরা যেমন বলতেন, কাকুকে তোমার
নতুন ড্রয়িংটা দেখাও তো বাবুসোনা। বাবুসোনা তক্ষুনি হাসি হাসি মুখে পাড়ার কাকুকে নিজের
ড্রইং দেখিয়ে বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে খুশিতে উপচিয়ে পড়া দুই জোড়া চোখ। আজ
বাবুসোনা খুকুমনিরা সব বড়ো হয়ে উঠেছে। আজ আর বাবা মাকে পিছন থেকে ঠেলে দিতে হয় না মঞ্চের
দিকে। নিজেরাই আমরা মঞ্চ দখলের জন্য একে তেল দিতে ওকে তেল দিতে ছোটাছুটি লাগিয়ে দিই।
অন্তত সম্বচ্ছর এই দুটি দিন, মঞ্চে নিজের একটা পাকাপোক্ত জায়গা করে নিতে না পারলেই
নয়। ফলে আমাদের এই রবীন্দ্রভক্তি রসের জোয়ারে কোনদিনও ভাঁটা পড়েনি আজ অব্দি। যে যেভাবে
পারে। গান শুনিয়ে হোক। আবৃত্তি করে হোক। নাচ দেখিয়ে হোক। কিংবা মেকআপ করে অভিনয় করে
হোক। তারপর সম্পাদকদের দীর্ঘ লাইন তো আছেই। বছরে দুটি রবীন্দ্রসংখ্যা। লেখা চাই। লেখা
চাই। কলমে শান দিয়ে চল লেগে পড়ি। রবীন্দ্রভক্তি আর রবিপুজোয় আমরা তাই এক পায়ে খাড়া।
এই যাহঃ আরও একটি কথা
তো বলাই হলো না। হুঁ হুঁ বাবা। এটা ২০২০। করোনাকাল। সব মঞ্চে তালাচাবি। এবার অনেকেরই
পকেটে টান। জানা যায় না কবি কিভাবে উপভোগ করছেন বিষয়টা। তবে মনে হয়। একটু স্বচ্ছন্দে
রাজপথ ধরে হেঁটে যেতে পারছেন বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের বিদেহী আত্মা। না তারস্বরে মাইকবাদ্য
নাই। মঞ্চে মঞ্চে মেকআপ আর্টিস্টদের ভিড় নাই। অবশ্য সে বেচারাদের সত্যিই কপাল মন্দ
এবছর। রবীন্দ্র অনুরাগীদের মুখগুলি চুনকাম করেই নাহয় তাঁদের রোজগার পাতি। করোনা সেখানেও
থাবা বসিয়েছে। এঁদের জন্য কবি নিশ্চয়ই মর্মবেদনা অনুভব করছেন আজকে। কিন্তু বিধির বিধান
খণ্ডাবে কে? তবু তো মরার পর থেকে অন্তত একটি বার ঠাকুর মশাই মঞ্চবাজদের অত্যাচার থেকে
নিজেকে রক্ষা করতে পারলেন। এই শান্তির তুলনা একমাত্র কবিই দিতে পারতেন জীবিত থাকলে।
কিন্তু আমরা তো তাই বলে
বসেও নাই। পত্রিকা ছাপা হয় নি তো কি? ওয়েব পত্র রয়েছে তবে কি করতে? গুণে গুণে অগুণতি
রবীন্দ্রসংখ্যা কি বার করিনি আমারা? সেই থোরা বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর। তিনি অমুক
ছিলেন তিনি তমুক ছিলেন। আর এই করেছিলেন আর ঐ করেছিলেন। আরে করেছিলেন তো বুঝলাম। কিন্তু
বাপধন তুমি বলতো সোনা। তুমি কবির কোন আরাধ্য কাজটিকে ঠিক মতো এগিয়ে নিয়ে চলেছো? কিংবা
এমন কোন যুগান্তকারী কর্ম সম্পাদন করেছো। যে জাতি হিসাবে বাঙালির নাম উন্নত বিশ্বের
অশিক্ষিত মানুষদেরও মুখে মুখে ফিরছে? কোন মৌলিক কর্মে তুমি এমন কি অবদান রেখেছো। যে
কবির মুখ উজ্জ্বল হয়েছে? করার মধ্যে করেছো তো নিজের দেশটাকে কেটে দুই ভাগ। হ্যাঁ সেটি
একটা মৌলিক কাণ্ড বটে। তবে কিনা সেটা কালিদাসের মতো কাজ। অন্তত কবির ছবির সামনে দাঁড়িয়ে
গালভরে বলার মতো কোন কাজই নয়। আর কি করেছো? না পাড়ায় পাড়ায় ব্যঙের ছাতার মতো গড়ে তুলেছো
ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুল। যেখানে যত্নসহকারে বাঙালির মাতৃভাষাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়। গুলিয়ে
দেওয়া হয়। সেই ইংলিশ মিডিয়ামে নিজের গর্ভজাত আর ঔরসজাত সন্তানকেও তোতাপাখি বানাতে জুতে
দিয়েছো। ছাড় দাও নি। এই জন্যেই কি একদল বলে বেড়ায় কালিদাস নিশ্চয় বাঙালি ছিলেন। নয়ত
যে ডালে বসেছিলেন সেই ডালই কাটতে যাবেন কেন?
হ্যাঁ। এই সেই রবীন্দ্রনাথ।
তিনি কি জানতেন না। বাঙালির এই জাতধর্মের কথা। নিশ্চয় জানতেন। জানবেন নাই বা কেন। নিজের
বৌয়ের গয়না পর্য্যন্ত বন্ধক দিয়ে যে স্কুল গড়ে তুলেছিলেন। বাড়ি বাড়ি মোটরে করে গিয়েও
একদল সেই স্কুলে বাড়ির ছেলেমেয়েদের পাঠাতে বারণ করতে ছুটতো। রবিঠাকুরের পাঠশালায় চরিত্র
নষ্ট করে দেওয়া হয় বলে মিথ্যা প্রচার করতে। রটাতে। সেই জাতধর্মের পরিচয় তো তিনি সারাজীবন
পদেপদে পেয়েছিলেন। তারপরেও মানুষটি বোধদয় হয় না। সত্যিই এমন আশ্চর্য্য বুদ্ধি তিনি
রাখতেন কোথায়? তারপরেও সারাদিন খেটেখুটে কলমের পর কলমের কালি ফুরিয়ে লিখে গেলেন। যাদের
জন্য লিখলেন। তারা সেই লেখার ধারও ধারলো কি? বরং সেই লেখা মুখস্থ করেই সমাজের কেষ্টবিষ্টু
সেজে বসলো। এক একজন এক এক বিষয়ের গুরু ঠাকুর। আর গোটা দেশটাকেই চির অন্ধকারে রেখে দেওয়ার
পাকাপকি বন্দোবস্ত করলো। যার যেমন ক্ষমতা। সেই মতো। ধরা যাক আজ মৃত ফ্যারাওদের বিশ্বাস
মতো কবির বিদেহী আত্মা আবার কবির পোড়া দেহেই জীবন্ত হয়ে উঠলো। এই বাংলায় পা দিয়ে মৃত্যুর
আট দশক পরে কি দেখতেন কবি? যা দেখতেন, তাতে নিজের কোন সম্মানটা রক্ষা হতো তাঁর? চিত্রগুপ্তের
লিস্টের মতো অসম্মানের সেই অশেষ লিস্ট হাতে আমাদের কবি কি ডুকড়ে কেঁদে উঠতেন? না কি
নীটশের মতো রাজপথে টর্চ হাতে ছুটতেন। একটা দুটো মানুষ খুঁজে পেতে? নাকি মুখ আয়নায় নিজের
মুখ দেখে নিজের মাথার চুল নিজেই এবার জ্যন্ত ছিঁড়তে শুরু করে দিতেন? নাকি যে কাজটিতে
তিনি কোনদিন হাত দেননি। সেই কাজটিই শুরু করতেন জীবনে প্রথম বার? লিখতে বসতেন একজন রবিঠাকুরের
আত্মজীবনী? যার নাম দিতেন আহাম্মকের আত্মকাহিনী বলে।
৭ই আগস্ট ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত
