খাট



খাট

গড়পরতা বাঙালির জীবনকাব্য বোধহয় শুরুই হয় ফুলশয্যার খাটের স্বপ্নে বিভোর হয়েই। গত শতকের অধিকাংশ জনপ্রিয় ছায়ছবির সমাপ্তি ঘটানো হতো দর্শকের মনে নায়ক নায়িকাকে সেই ফুলশয্যার খাটে পৌঁছিয়ে দিয়েই। এবং গোটা সিনেমা জুড়ে একটিই প্রতীক্ষার বীজ বপন করে রাখা থাকতো। কখন চারহাত এক হবে। আর চার হাত এক হয়ে গেলেই পায়ে পায়ে ফুলশয্যার খাটে গিয়ে পৌঁছানো যাবে। টিকিটের দীর্ঘ লাইনের গুঁতোগুঁতি সহ্য করেই হোক বা ব্ল্যাকে অতিরিক্ত টাকা খসিয়েই হোক, দুই ঘন্টার বিনোদন শেষে পয়সা উসুল করে ঘরে ফেরা। বাংলা সিনেমার বক্স অফিস হিট। মূলত ফুলশয্যার খাটের এই ফর্মূলার বাইরে স্ক্রীপ্ট লিখতে গেলে, সে কালে বুকের পাটা লাগতো। এবং প্রযোজকের আনুকুল্য লাভ করতে পারলেও দর্শকের মন ভারানো সম্ভব হতো না। ফলে এক সপ্তাহেই ছবি ফ্লপ। সেই ফুলশয্যার খাটেই আমাদের বঙ্গ সমাজের নোঙড়।

সমাজ স্বীকৃত এই ফুলশয্যার খাাটের ঘেরাটোপেই এগিয়ে চলেছে আবহমান বঙ্গ সমাজ। ফুলশয্যার খাটের বাইরে নরনারীর সম্পর্ককে সমাজ আজও কোন স্বীকৃতি দেয় নি। ফলে নরনারীর সব সম্পর্কেরই একটিই অভিমুখ। সে ঐ ফুলশয্যার খাট। সেই খাটই প্রণয় ঘঠিত যেকোন সম্পর্কের সম্পর্কবীমা। বা জীবনবীমাও বলা যেতে পারে। সমাজ স্বীকৃত পুরুষের বহু বিবাহের কালে ফুলশয্যার খাটের দখল নিয়ে বিশেষ কোন প্রতিযোগিতা ছিল না। সুয়োরাণী দুয়োরাণী যাই হোক, সংসারে একটা মীমাংস হয়েই যেত। কারুর কপাল পুড়তো বড়ো জোর। কিন্তু তথাকথিত নারী স্বাধীনতার এই যুগে। ফুলশয্যার খাটের কোন ভাগ হয় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই একটা তীব্র প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা গড়ে ওঠার সুযোগ থাকে। আর থাকলেই যত গণ্ডগোল। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হলো আমাদের এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ফুলশয্যার খাটের মালিকানা নিয়ে। নারী কি কোনদিন এই সমাজে ফুলশয্যার খাটের মালিকানা লাভ করেছে? নিশ্চয়ই নয়। নয় বলেই কন্যদায়গ্রস্ত পিতা কন্যা সম্প্রদানের মতো একটি বীভৎস প্রথায় কন্যাকে তুলে দেন নির্বাচিত জামাইয়ের হাতে। যে হাত ধরে কন্যার শ্বশুরালয়ে গমন। স্বামীর খাটে গিয়ে ওঠার জন্য। এই যে স্বামীর খাট। সেই খাটে একটি মেয়ের ওঠার অধিকার প্রাপ্তি। এই গোটা প্রক্রিয়ারই গালাভরা নাম শুভবিবাহ। তার ভিতর শুভ কতটুকু। আর অশুভ কোথায়। সেসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আর কি হবে। কথায় বলে অপ্রিয় সত্য বলতে নাই।

অপ্রিয় সত্যের কথা না হয় থাক। কিন্তু এটা তো সত্যি। আমদের সমাজ সংসারে মেয়েদের নিজস্ব কোন খাট আজও তৈরী হয় নি! তাকে হয় অভিভাবকদের নির্দেশ মতো কোন একজনের নির্দিষ্ট খাটে গিয়ে উঠতে হয়। না হলে অনেকটা আলু পটল বেছে নেওয়ার মতো পয়সাওয়ালা বা ভালো রোজগারের সম্ভাবনাময় তথাকথিত ব্রাইট ফিউচার যুক্ত কোন ছেলেকে খুজে নিতে হয়। কিংবা কন্যা রূপে গুণে হেমামালিনী হলে উপযুক্ত খাটের মালিকদের লম্বা লাইন লেগে যায় কন্যার পিছনে। তখন আবার কাকে ছেড়ে কাকে বাছা। সেও এক টেনশনের বিষয়। সে যাই হোক। খাটের মালিকানা কিন্তু থাকে ছেলেদের হাতেই। আপন পছন্দ মতো সেই খাটে মনের আনন্দে গিয়ে ওঠার মধ্যেই আমার দেশের মেয়েরা নারী স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার চেষ্টা করে। এবং সত্যিই যদি কল্পনার সাথে খাট মিলে যায় খাপে খাপে। তহলে বাঙালি মেয়ে মাত্রেই আহ্লাদে প্রায় আটখানা। বহু বিবাহের যুগ আর নাই। ফলে কোন মেয়েই তার স্বামীর খাটের অধিকার ছাড়তে রাজি নয়। রাজি নয় সেই অধিকারের ভাগ অন্য কাউকে দিতে। এটা তার সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের বিষয়।

মুশকিল হয় সেই মৌলিক অধিকারের উপরেই যদি কোন অশনিসংকেতের ছায়াপাত ঘটে। সাহিত্যের জন্যে সেই ছায়াপাত খুবই দরকারী। না হলে গল্পের প্লট জমাট হয় না। সিনেমা নাটকের আলোছায়ায় আবার এই ছায়াপাত ছাড়া দর্শক মজানো মুশকিল। হল ভরবে না কোনমতে। কিন্তু যে কোন সংসারের পক্ষেই এই ছায়াপাত ঘোর দুর্বিপাকের বিষয়। তাই আপন স্বামীর খাটের অধিকার নিয়ে যে কোন নারীই সতর্ক থাকে। এতো গেল পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থান ও পরিস্থিতি। কিন্তু খাটের মালিকানা যাদের, এই যুগের বহু বিবাহের সুযোগ বঞ্চিত সেই পুরুষ সমাজ যদি রোজকার বৌ ছাড়াও অন্য নারীতে আসক্ত হয়? সমাজ কি গেল গেল রবে সচকিত হয়ে উঠে কোলাহল জুড়ে দেয়? নিশ্চয় নয়। দিলে তো প্রতিদিনই সংবাদের হেডলাইন একটিই থাকতো। শুধু পাত্র পাত্রীর নামটা বদলিয়ে দিলেই রোজকার টাটকা সংবাদ প্রচারিত হয়ে যেত।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে খাটের মালিকানার সনদ প্রাপ্ত পুরুষ, কখন কার সাথে খাট ভাগ করে নেবে, সেটা তার ব্যপার। যতক্ষণ না তাই নিয়ে কোন সীনক্রিয়েট হচ্ছে, ততক্ষণ সমাজ চোখ বন্ধ করেই থাকে। রগড়ের শুরু হয় তারপর। এখানে ধনী দরিদ্র নির্ধন এই তিন সমাজের আবার তিন রকমের আলাদা ধারা। বিত্তবানদের বিষয়ে সমাজ নাক গলানোর হিম্মত রাখে না। সমাজের জ্যাঠামশাইগিরি শুরু হয় মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণীর বিষয়েই। নির্ধনদের বিষয় নিয়ে সমাজ মাথা ঘামায় না কোনদিন। পুরুষের মালিকানাধীন এই খাটের মাহাত্ম্যও কম নয়। সেই খাটে উঠতে গেলে নারীকে কম মাশুল দিতে হয় না। বিবাহিত অবিবাহিত না-বিবাহিত সকল নারীই সেকথা জানেন। আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না কিছুই। তবে পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের খাটেই কিন্তু নারী তার সুরক্ষার নিশ্চয়তা খুঁজে বেড়ায়। এই খাটই আবার অনেক নারীর কাছে সমাজে মান সম্মান অর্থ বিত্ত খ্যাতি জনপ্রিয়তা প্রাপ্তির একটি শর্টকার্ট পথ। না, এই কথায় হারে রেরে করে উঠেও লাভ নাই। সমাজবাস্তবতার কথাই হচ্ছে এখানে। উচিৎ অনুচিত বা কাউকে কালিমালিপ্ত করার বিষয় নিয়ে এই আলোচনা নয়।

একটি মেয়েই জানে, এই সমাজে নিজের একটা আত্ম পরিচয় গড়ে তুলতে গেলে কত রকমের বাধা এসে দাঁড়িয়ে যায় বিন্ধ্যাচলের মতো। একটি মেয়েই জানে সেই বিন্ধ্যাচল পার হতে গেলে কত ধরণের মাশুল দিতে হতে পারে জীবন যৌবন আত্মসম্মান দিয়ে। তার একটিই কারণ। আমদের খাটের মালিকানা কেবলমাত্র পুরুষের কব্জায় থাকে। পুরুষ সেই খাটের মালিকানার বলেই মেয়েদের সামনে এক একটি বিন্ধ্যাচল সৃষ্টি করে। এবং সেই খাট নিয়েই বিন্ধ্যাচল পার করে দেওয়ার কান্ডারী সেজে উপস্থিত হয় মেয়েদের সমানে। একটি মেয়ের সামনে তখন দুইটি পথই খোলা থাকে। হয় সেই খাটে সওয়ারী হওয়া। আর নয়তো আত্মপরিচয় গড়ে তোলার বাসনা ত্যাগ করে সমাজ স্বীকৃত ফুলশয্যার খাটে গিয়ে ওঠা। খাটে উঠতেই হবে। সামনে এগোতে গেলেও উঠতে হবে। পিছনে এগোতে গেলেও উঠতে হবে। এর বাইরে পিতৃতন্ত্র এই সমাজে একটি মেয়ের জন্য অন্য কোন পথ খোলা রাখেনি। ফলে সিনেমায় মুখ দেখাতে গেলে প্রযোজক পরিচালকের খাট। কিংবা অভিনেতা টেকনিশিয়ানের খাট। রাজনীতিতে মুখ দেখাতে গেলে নেতা মন্ত্রীর খাট। উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে গেলে শিক্ষক অধ্যাপকের খাট। ধর্ম কর্ম করতে গেলে সাধুসন্তের খাট। সেনা বাহিনীতে নাম করতে গেলে সেনাপতিদের খাট। চাকরিতে পদন্নোতি করতে গেলে বসের খাট। ব্যাবসায় নামতে গেলে সরকারী আধিকারিকদের খাট। পাড়া টস্কাতে গেলে ফুটো মাস্তানের খাট। খাটে না উঠলে কোথাও পৌঁছানো যাবে না। সব মেয়েই জানে একথা। একথা নতুন কিছু নয়। তাই বুদ্ধিমান কোন মেয়ে যদি, সামাজিক এই খাট সংস্কৃতির সুযোগ নিয়েই সমাজের মই বেয়ে সমাজসংসারের মগডালে উঠতে চায়, তখন তাকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় কি? যে সমাজ মেয়েদের জন্য সুস্থ স্বাভাবিক কোন পথ খোলা রাখে না। অন্তত সেই সমাজের পক্ষে আর যাই হোক জ্যাঠামশাইগিরি মানায় না।

নারী তার শরীর যৌবন মেধা ও যৌনতা নিয়ে কি করবে। কিভাবে কোন পথে সেই সম্পদ কাজে লাগিয়ে নিজের একটা আত্মপরিচয় গড়ে তুলবে সেই মৌলিক অধিকারটুকু অন্তত নারীরই থাক। সেই অধিকারে সমাজ যেন জ্যাঠামশাই সেজে ন্যাকামি করে নাক গলাতে না যায়। গেলে তার থেকে বড়ো হিপোক্রেসি আর কিছুই হতে পারে না। আবার সেই সাথে একথাও স্মরণে রাখা দরকার। পুরুষের খাটকে মই হিসাবে ব্যবহার করে নিজের গন্তব্যে পৌঁছিয়ে, পৌছানোর পথটিকেই অস্বীকার করে সতীসাদ্ধী সাজাও কম হিপোক্রেসি নয়। একটা গোটা সমাজ যখন আপাদমস্তক আগাগোড়া হিপোক্রিট হয়ে ওঠে, তখন সেই রোগ কিন্তু নারী পুরুষ কাউকেই ছাড়ে না। সমাজের পরতে পরতে সেই রোগই আমাদের এই বঙ্গসংস্কৃতির মূল ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। আমরা সে সত্য স্বীকার করি আর নাই করি। সমাজ সংসারে ঘরে ঘরে এই খাট সংস্কৃতি থেকে যতদিন না সমাজ নিজেকে মুক্ত করবে ততদিন এই ট্র্যাডিশান চলছে চলবে। চলতেই থাকবে। খাট শুধু খাটই নয়। একটি খাঁটি সংস্কৃতি।

২৫শে জুলাই’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত