জামার মাপ হাতার কাট
অনেকদিন আগেই তিনি আক্ষেপ করে লিখেছিলেন,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা। তার পর সাত দশকের বেশি সময় কেটে গিয়েছে।
সমাজ রাজনীতি সর্বত্র সেই অন্ধদেরই দাপট সবচেয়ে বেশি আজ। এবং পরিব্যাপ্ত এই দাপটে,
যারা এখনো দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন নি। তারও চোখ বুঁজে আত্মরক্ষার রফা করে নেন। ফলে
বর্তমানে এক আপাত শান্তির মরূদ্যানে রয়েছি আমরা। বিপ্লবের নটে গাছটি অনেক যুগ আগেই
মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সাফল্যের সাথে। সেই সাথে বাংলা থেকে স্পষ্ট চোখে দেখার মেধাগুলিকেও
ধরে ধরে নিকেশ করে দেওয়া হয়েছে সুনিপুণ দক্ষতায়। আর তারপর মধ্যমেধাদের বঙ্গবিজয়। দশকের
পর দশক জুড়ে মধ্যমেধাদের শাসনের হাত ধরে সমাজের উপরের তলায় উঠে এসেছে আজ মেধাহীনরা।
এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই মেধাহীনদের দাপটে কাঁপছে কার্শিয়াং থেকে কাঁথি। কাকদ্বীপ
থেকে কালিংপঙ। পুরুলিয়া থেকে আলিপুরদুয়ার।
এদের হাতেই
শাসিত হচ্ছে আজকের সমাজ ও সাহিত্য। শিল্প ও সংস্কৃতি। রাজনীতির অভ্যন্তরের যে দুর্বৃত্তায়ন,
তারই সরাসরি ছায়াপাতে মেধাহীন মস্তানি কুচকাওয়াজ করছে সকাল থেকে সন্ধ্যা। মধ্যরাত থেকে
ভরা দুপুর। এরাই ঠিক করে দিচ্ছে। কে কবি। কে সাহিত্যিক। কে শিল্পী। কার শো হবে আর কার
শো হবে না। দর্শক কিংবা পাঠক কার পারফর্মেন্স দেখবে আর কার কবিতা পড়বে। সেও ঠিক করে
দেওয়ার অধিকার এদেরই হাতে চলে গিয়েছে। এরাই ঠিক করে দেবে, কার পোশাকের মাপ কতটুকু হলে,
তার কবিতা শোনা যাবে না। কার হাতার কাট কোন ধরণের হলে, তার কবিতা আর পড়া যাবে না। নজর এদের সর্বত্র। অনলস পরিশ্রমে বাংলাজুড়ে এদের
নেটওয়ার্ক কাজ করে চলেছে নিরন্তর। সেই সদা সক্রিয় নেটওয়ার্কের ণত্ব ও ষত্ব মেনেই লিখতে
হবে কবিতা। গাইতে হবে গান। করতে হবে শো। সেই শো আপনি পাবলিক হলেই করুন আর নিজের বাড়িতে
সেল্ফি অন করেই করুন সোশ্যালসাইটের ওয়ালে। বহুদিন আগেই বাংলার এক মহান নেতা বলেছিলেন,
ঠিকাদারী সংস্কৃতির কথা। সমাজ সংসার রাজনীতি প্রশাসন অর্থনীতি সব কিছুরই রয়েছে নির্দিষ্ট
ঠিকাদার। সেই ঠিকাদারদের স্বার্থেই ঠিকাদারদের দ্বারা পরিচালিত ঠিকাদারদের সংস্কৃতি
রাজত্ব করছে এখনো। মাঝে মাঝে শুধু জার্সি বদলের পালা। খেলাটা একই থাকে।
খেলাটা একই
থাকে বলে, অন্য জার্সির খেলোয়ারও নতুন জার্সিতে আবারো ঝলমল করে গুছিয়ে নিতে পারে নিজের
প্রভাব প্রতিপত্তি ও সম্পত্তি। ফলে খেলোয়ারের দরও বেড়ে যায় আকাশ ছোঁয়া। ধরাকে সরা জ্ঞান
করতে অসুবিধাও হয় না। কথায় বলে বাবু যত বলে, পারিষদ দল বলে তার শতগুণ। তাই যখন তখন
যার তার বিষয়ে ফতোয়া জারি করতেও দেরি হয় না। জার্সির বদল ঘটে। খেলাটা সেই একই থাকে।
কিন্তু তার ভিতরেও একটা মোটা দাগের পার্থক্যও বিদ্যমান। সেটা হলো শুরুতেই যে কথার অবতারণা
করা হয়েছে, সেই মধ্যমেধার হাত ধরে মেধাহীনদের ক্ষমতার অলিন্দে উঠে আসা। ফলে জার্সির
বদলের সাথে সাথে অবস্থার অবনতিও ঘটতে থাকে দ্রুত হারে। পরবর্তী জার্সিও তার রং ফলাতে
শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। বাঙালি দুচোখ ভরে সেই রঙবাহারের মাহাত্ম্যও দেখতে পাচ্ছে। এবং
প্রতিনিয়ত দলবদলের মিছিলও এগিয়ে চলেছে। কিন্তু পরিবর্তন নাই শুধু খেলা ও খেলার রকম
সকমের। হয় তুমি আমাদের খোঁযাড়ে মাথা ঢোকাও। নয় তুমি মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে নাম লেখাও।
আজকাল আর শ্রেণীশত্রু কথাটা শোনা যায় না। ইতিহাসের পাতায় মমি হয়ে গিয়েছে যেন। এইযুগে
কথাটাও আর কোন বিশেষ অর্থ বহন করে না। তার জায়গা নিয়েছে গোষ্ঠী শত্রু। এটার অর্থ মারাত্মক
ও ব্যাপক। হয় তুমি আমার পক্ষে থাকো। নয় তুমি আমার গুলি খাও। সেই বিখ্যাত বাণী এখন প্রত্যেক
গোষ্ঠীর প্রবচন হয়ে গিয়েছে। তাই বলছিলাম। জার্সির রঙে রং বদলিয়ে গোষ্ঠীর খোঁয়ারে মাথা
ঢোকাতে না পারলেই বিপদ। কখন কোন দিক থেকে আসবে। টের পাওয়া যাবে না।
তখন নিজের
বাড়িতে বসে কখন কোন পোশাক পড়তে হবে, সেটাও ঠিক করে দেবে সেই গোষ্ঠী সংস্কৃতি। সেই মেধাহীন
মাথাদের দাপট। কোন কবিতার কোন লাইনে কোন শব্দটি আশালীন। কোন শব্দটি গোষ্ঠী স্বার্থ
বিরোধী। সেসবও সেই মাথারাই ঠিক করে দিতে থাকবে। আজ এর লেখায় কাল ওর লেখায়। আজ এর পোশাক
নিয়ে হুমকি। তো কাল ওর পোশাক নিয়ে হুমকি। গোষ্ঠী স্বার্থের বাইরে কোন কিছুই বরদাস্ত
করা হবে না কিছুতেই। এটাই এসময়ের দেওয়াল লিখন। এবং পরিস্কার বাংলা ভাষায়। কিছু করে
কম্মে খেতে গেলে গোষ্ঠী খোঁয়ারে নাম তুলতে হবে। সেই লিস্টে নাম তুলতে না চাইলে, সেই
আস্পর্ধা ক্ষমা করার প্রশ্নই ওঠে না। ক্ষমতার জাদুদণ্ড যখন নির্বাচনী গণতন্ত্রের পিণ্ডি
চটকে একবার করায়ত্ত করা গিয়েছে।
আজকের বাংলার
সাহিত্য সংস্কৃতির জগত সেই জাদুকরদের হাতেই পরিচালিত হচ্ছে। তারাই ঠিক করে দিচ্ছে কোন
পোশাকের কত মাপ। কোন মাপটি ছোট। কোন মাপটি বড়ো। কোন মাপটি মাফ করা যাবে। আর কোন মাপটি
মাফ করা যাবে না। সবটাই মাফ করার মর্জির উপরে নির্ভরশীল। আর সেই মর্জি নির্ভর করবে,
কে কখন গোষ্ঠী খোঁয়ারে মাথা মুড়াবে। একবার তাদের নিজেদের লোক হয়ে যেতে পারলেই কেল্লাফতে।
তখন কে কখন কোন উদ্দেশে কার খাটে গিয়ে উঠছে। কে কার প্রাপ্য নম্বর কোন নীতিতে বাড়িয়ে
দিচ্ছে। কার প্রাপ্য পুরস্কার কোন অযোগ্যের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। সেসব নিয়ে কোন শোরগোল
উঠবে না। মঞ্চের চাবির গোছাও চলে আসবে হাতের মুঠোয়। ক্যামেরা লাইট এণ্ড সাউন্ডের এক্সক্লুসিভ
ফেকাসও হাতের মুঠোয়। ফলে প্রায় সব পেয়েছি দেশে পৌঁছিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়। তাই প্রতিদিনই
খোঁযারে ঢোকার লাইনে ভিড় বাড়তেই থাকে। কে কাকে টপকিয়ে আগে মাথা গলাবে। তবে হ্যাঁ দুগ্গাপুজোর
প্যাণ্ডেলে ঢোকার লাইনের মতোই সেখানেও দুই ধরনের লাইন। সাধারণ লাইন বাদেও ভিআইপি গেটপাসের
বিশেষ লাইন। যে লাইনে দাঁড়াতে পারে শুধু অন্যান্য রঙের জার্সি হোল্ডাররাই। সকলের আগে
তাদেরই অগ্রাধিকার।
তাই একবার
অন্তত কোন একটা জার্সির রঙে রাঙিয়ে নিতে পারলেই সবচেয়ে ভালো হয়। পরে অবস্থা বুঝে জার্সিবদল
করা সময়ের অপেক্ষা শুধু। কিন্তু মুশকিল হয় তাদের নিয়েই। কবির কথায় ‘এখনো যাদের কাছে
স্বাভাবিক বলে মনে হয় মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা’, তাদেরকেই সহজে সাইজ
করা যায় না কোন মতে। আর সেই সাইজ করতে না পারার জ্বালা বড় বেশি অন্তর দহন করতে থাকে।
বাবুদের পারিষদ বর্গের। সে জ্বলুনিতেই তখন জামার মাপ। হাতার কাট। অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ
হয়ে দাঁড়ায় কবি’র কবিতা থেকেও। তাই কবিতা নয়। কবির পোশাকের মাপ দিয়ে বিচার শুরু হয়ে
যায় কবির চরিত্রের। সেই চরিত্র ততদিনই খারাপ। যতদিন না কবি খোঁয়ারে ঢোকার লাইনে পা
দিচ্ছেন।
এইভাবেই এগিয়ে
চলেছে কলিকাতা কেন্দ্রিক পশ্চিমবঙ্গের বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির বর্তমানের নীলসাদা দিগন্ত।
কাঁটাতারের অপর পারে চিত্রটা যে খুব একটা ভিন্ন তা নয়। সেখানেও তালিবানী শাসন চলছে
চলবে। তালিবানী শাসন এখানেও। কে কবিতা লিখবে কে লিখবে না। সমাজ কাকে কবি বলে মান্যতা
দেবে ও কাকে দেবে না। কার কবিতার বই বিক্রি হবে। কার বই হবে না। সব কিছুতেই জারি হয়ে
যেতে পারে তালিবানী ফতোয়া। কবি যদি গোষ্ঠী খোঁয়ারের জার্সি ধারণ না করেন। এই তালিবানী
ফতোয়ার আর একটা রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করে ছিলাম, বাংলাদেশে। একে একে মাথায় মরণ কোপ পড়েছিল।
মুক্ত চিন্তার অধিকারী কিছু তরতাজা মেধাবী তরুণের। সাইজ করে দেওয়া হয়েছিল যুবশক্তির
মন মনন মেধাকে। এবার এপারেও শুরু হয়ে গিয়েছে প্রায় অনুরূপ হুমকি। এবং ভারতবর্ষের ক্যানভাসে
এইভাবেই সাইজ করে দেওয়ার পালা চলছে গৈরিক ফরমানে। গৈরী লঙ্কেশ থেকে শুরু করে একে একে
অনেকেরই ভবলীলা সাঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গও কি তবে ভবলীলা সাঙ্গ করার সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে
চলেছে।
একজন কবির
পক্ষে আগে জীবন, না আগে সাহিত্য? এই প্রশ্নই যদি আজ সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে বাংলার সাহিত্য জগতে রাজত্ব করতেই থাকবে কবি সাহিত্যিক নয়। কবি সাহিত্যিকের বেশে,
কিছু জার্সিধারী আর জার্সিবদলকারী মেধাহীন অক্ষরপিণ্ডের কলমচী। বছরভর তাদের গ্রন্থপ্রকাশ
অনুষ্ঠানে সাহিত্যের পিণ্ডদানে বাঙালি একরকম ভাবে আত্মরক্ষার রফা করে নিতে থাকবে। মেধাহীন
এই মস্তানীর দীর্ঘকালীন সংস্কৃতি একদিন বাংলা সাহিত্যের পিণ্ডদানে বিশ্বে এক অনন্য
ইতিহাস রচনা করবে সন্দেহ নাই। যে ইতিহাসের থাকবে না কোন পূর্বপর। ততদিন কবির বিচার
হতে থাকুক তার জামার মাপে। হাতার কাটে।
২রা’ আগস্ট
২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

