কবি’র কবিতা ও তার ব্যক্তিচরিত্র



কবি’র কবিতা ও তার ব্যক্তিচরিত্র

কাব্য সাহিত্যের একজন একনিষ্ঠ পাঠকের কাছে, কবির কবিতাই তো শেষ কথা হওয়া উচিৎ। কবির জীবনী নিশ্চয় কবির সাহিত্য কীর্তি’র থেকে বড়ো নয়। বিশেষ করে কবি’র ব্যক্তি চরিত্র কবির কাব্য উপভোগের পথে কোন অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে কি? পাঠক যদি জানতে পারে। কবির ব্যক্তি চরিত্রের কোন গণ্ডগোলের কথা। তবে কি পাঠকের চোখে সেটি কবি’র পদস্খলন বলেই গণ্য হবে? প্রশ্নগুলি সহজ নয়। উত্তরও নির্দিষ্ট করে দেওয়া শক্ত। একজন কবি, সাহিত্যক্ষেত্রে যদি সত্যিই কোন নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে যেতে পারেন। তবে তাঁর কাব্যের বিচার নিশ্চয় সাহিত্যের ণত্ব ষত্ব অনুসারেই হবে। নিশ্চয় তাঁর ব্যক্তি চরিত্রের ধরণ দিয়ে নয়। অন্তত তেমনটাই তো হওয়ার কথা। কিন্তু সাধারণ ভাবে একজন পাঠক হিসাবে আমরা যখন কবি’র কাব্য সাহিত্য উপভোগ করি। তখন কি আমরা কবি’র ব্যক্তি চরিত্রের কথা খেয়াল রেখে তাঁর সাহিত্য পাঠে মগ্ন হই? মনে হয় না। কিন্তু হঠাৎ যখন জানা যায়। বিশেষ কোন খ্যাতিমান কবি। জনপ্রিয় কবি। ব্যক্তি চরিত্রের দিগন্তে আত্মসম্মান বজায় রাখতে পারেননি ঠিক মত। তখন কি পাঠক হিসাবে আমরা সেই কবি’র সাহিত্য কীর্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবো?

নিশ্চয় এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোন উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। পাঠক নির্বিশেষে সকলেই যে একই উত্তর দেবেন। তাও নয়। বিভিন্ন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী আলাদা। কিন্তু সাধারণ ভাবে, কবি’র ব্যক্তি চরিত্রের পদস্খলন। তাঁর কাব্য পাঠের উপরে বিশেষত সমসাময়িক সময়ে নংর্থক একটা প্রভাব তো ফেলেই। দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষিতে হয়ত সেই প্রভাব অনেকটাই হালকা হয়ে যেতে পারে। কালের সীমায় যুগ পরিবর্তনের হাত ধরে। এই একটা মুশকিলের অবস্থা। পাঠকের পক্ষে। পাঠক কবি’র সাহিত্যকীর্তির পরিসরেই কবির কাব্য সাহিত্যকে উপভোগ করবে না’কি কবি’র ব্যক্তিচরিত্রের প্রেক্ষিতে বিচার করবে কবি’র কবিতা?

এখন একটা বিষয় স্মরণে রাখা ভালো। পাঠকের কাছে কবি তাঁর সাহিত্যকীর্তির ডালি নিয়েই পৌঁছান। কবি’র কবিতায় কবি থাকেন না। যদি থাকেন, তবে কবিতাই মাটি। তাই পাঠক হিসাবে আমরা যদি কবি’র কবিতায় কবিকেই খুঁজতে চেষ্টা করি। তবে সেটা পাঠক হিসাবে আমাদের পদস্খলন বলে গণ্য হতে পারে। পাঠকের কাজ তো কবিকে নিয়ে নয়। পাঠকের কাজ কবি’র কবিতাকে নিয়ে। কবি’র ভুবন নয়। কবি’র কবিতার ভুবনেই পাঠকের অধিকার। তাই সেখানে ব্যক্তি চরিত্রের প্রেক্ষিতে কোন কবি ভালো। আর কোন কবি মন্দ, সেটি পাঠকের আগ্রহের বিষয় হতে পারে না। অন্তত প্রকৃত পাঠকের কাছে। যাঁরা কবিখ্যাতির জনপ্রিয়তার মোহে কাব্যসংকলন ঘরে সাজিয়ে রাখতে চান। মাঝে মধ্যে পাতা উল্টিয়ে জনপ্রিয় কবিতার অক্ষরে চোখ বুলিয়ে নেন। সেই ধরণের পাঠকের কথা বলছি না। বলতে চাইছি, সহিত্যানুরাগী পাঠকের কথা। পাঠকের অবস্থান থেকে সাহিত্যচর্চা যাঁদের কাছে সাধনার বিষয়। তাঁদের কাছে নিশ্চয় কবি’র কবিতার থেকে কবি বা তাঁর ব্যক্তিচরিত্র বেশি মূল্যবান নয়। সেইরকম একজন প্রকৃত পাঠক নিশ্চয় কবিতা দিয়েই কবিকে বিচার করবেন। কবি’র ব্যক্তিচরিত্র দিয়ে নয়।

এর উল্টোদিকেও কথা রয়েছে। পাঠক যদি মনে করতে প্রয়াসী হন। একজন কবিকে আগে মানুষ হিসাবে সৎ ও চরিত্রবান হতে হবে। তারপর সাহিত্য সাধনা। তবে সেই পাঠকের দাবিকেও নস্যাৎ করা যায় না পুরোপুরি। যদিও রত্নাকরের বাল্মীকি হয়ে ওঠার গল্পের ভিতর দিয়ে এই উপমহাদেশের সাহিত্যের জয়যাত্রার সূচনা। যে কোন কর্ম ও সাধনার ক্ষেত্রেই আমরা আগে সৎ ও চরিত্রবান মানুষের দাবি করি। সেটাই আমাদের একটি স্বাভাবিক চাহিদা। পাঠকের ব্যক্তিচরিত্র যাই হোক না কেন। পাঠকের মননে কবি সাহিত্যিক শিল্পীদের সম্বন্ধে সবসময়েই একটা উচ্চ ধারণা থাকে। আমরা ধরেই নিই। কবি সাহিত্যিক শিল্পী মানুষেরা সৎ ও চরিত্রবান হবেন। হঠাৎ করে আমাদের সেই ধারণায় আঘাত লাগলে, স্বভাবতই আমাদের প্রতিক্রিয়া খুব তীব্র হয়ে উঠতেই পারে। এবং সেক্ষেত্রে আমরা সেই অসৎ চরিত্রের কবিকে সাহিত্যের আঙিনায় বয়কট করতেই পারি। এবং সেটি সমসাময়িক সময়ে ঘটা ঘটনাবলীর ক্ষেত্রেই বেশি ঘটে থাকে। আজ থেকে কয়েক শতাব্দী আগের কবি’র সম্বন্ধে সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া ততটা প্রবল না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। যতটা পাঠকের জীবদ্দশায় সমসাময়িক কবি’র বিষয় নিয়ে হতে পারে।

আপামর ভারতবাসী রামায়ণের সাহিত্যরস আস্বাদন করার সময় বাল্মীকির প্রথম জীবনের দস্যুবৃত্তির ছবি মাথায় রাখে না। রাখলে কারুরই রামায়ণ ভালো লাগতো না নিশ্চয়। কয়েক সহস্রাব্দ পূর্বের কবি’র ব্যক্তিচরিত্র আজ আর তাঁর অমর সাহিত্যকীর্তির উপরে কোন রকম প্রভাব ফেলে না। তেমনি আজ যদি ইতিহাস খুঁড়ে জানাও যায়। মানুষ হিসাবে কালিদাস অত্যন্ত অসৎ চরিত্রের একজন মানুষ ছিলেন। তাহলেও পাঠকের চেতনায় কবি কালিদাসের সিংহাসন এতটুকুও টলবে না বলেই বিশ্বাস। কিন্তু এই সময়ের একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত কবি যখন তাঁর অসৎ কাজের কারণে সমাজের চোখে খলনায়ক বনে যান। তখন সমাসাময়িক পাঠকের মননে তাঁর সাহিত্যকীর্তি সম্বন্ধেই মস্ত বড়ো একটা প্রশ্নচিহ্ন দাঁড়িয়ে যায়। পাঠক ভাবতে থাকেন। ব্যক্তি জীবনে এমন অসৎ ও খারাপ চরিত্রের একজন মানুষ কি ভাবে ভালো কবিতা লিখতে পারেন? নিশ্চয় সেই কবিতার ভিতরেও কোন অসৎ কারবার থাকতে পারে। সমসাময়িক পাঠক সেই কারণেই বাতিল করতে পারেন একজন কবি ও তাঁর সাহিত্যকীর্তিকে।

আবার এটাও ঠিক। যুগ পরিবর্তনের হাত ধরে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে পুনরাবিষ্কৃত হতে পারেন আজকের সমাজে বাতিল কোন কবি। হতে পারেন তখনই। যদি তাঁর কবিতা ও সাহিত্যকীর্তির মজ্জায় থেকে যায় শাশ্বত কোন সত্য। সেই সত্যমূল্যেই নবজন্ম লাভ করতে পারেন কোন কবি। বর্তমান সময়ে সমাজের বিচারে খলনায়ক বনে গেলেও। এখানেই সাহিত্যের মূল্য। রবি ঠাকুরের কথায়, ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী। আমরই সোনার ধানে গিয়াছে ভরি। কবি নয়। কবি’র ব্যক্তি জীবন নয়। নয় কবি’র ব্যক্তিচরিত্র। কালের বিচারে ঠাঁই পায় কবি’র সাহিত্যকীর্তি শুধু। আর কিছু নয়। যদি কবি’র সাহিত্যকীর্তির দিগন্তে কবি প্রতিষ্ঠিত করে যেতে পারেন শাশ্বত কোন সত্যকে আধুনিক যুগভাষ্যের কলতানে। সেখানেই কবি’র অমরত্ব। ব্যক্তিচরিত্রের ভুমিকা সেখানে নাই বললেই চলে।

তবে সমকালের বিচার বড়ো কড়া। সেখানে পান থেকে চুন খসলেই বিপদ। সেখানে কবি’র সাহিত্যকীর্তি নয়। বিচার্য্য কবি’র ব্যক্তিচরিত্র। সে ব্যক্তিচরিত্রে একবার সামাজিক কলঙ্কের দাগ লেগে গেলে কবি’র জীবদ্দশায় তার থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই কঠিন। কঠিন একজন কবি’র পক্ষে। সাধারণ ভাবে পাঠকের চোখে খলনায়ক বনে যাওয়া সেই কবি’র কবিতা আর কোন বিশেষত্বের দাবি করতে পারে না। পাঠক তখন কবি’র কবিতা ও তাঁর ব্যক্তি জীবনকে এক করেই বিচার করে ফেলতে চায়। যাঁর চরিত্রের ঠিক নাই। তার লেখার আবার সাহিত্যমূল্য কি থাকবে? এমনটাই ভাবতে থাকেন সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক। কারণ পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ ভাবে সাধারণ পাঠকের পক্ষে কবি’র সাহিত্যকীর্তিকে কবি’র জীবনী থেকে পৃথক করে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে। বরং একজন ভক্ত পাঠকের চোখে, কবি’র ব্যক্তি জীবন তাঁর সাহিত্যকীর্তির সমান্তরাল হয়ে উঠতে থাকে। তাঁর কবিখ্যাতি ও জনপ্রিয়তার  নিক্তিতেই কবি’র জীবনী লেখা হতে থাকে প্রিয় পাঠকের চেতনায়। তাই সেই সকল্পিত জীবনীতে একবার চোট লাগলে। পাঠকের মনের মিনার একেবারে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়ে। জনপ্রিয় কবি রাতারাতি খলনায়ক হয়ে ওঠেন সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকসমাজে।

না, আমরা পাঠকেরও বিচার করতে পারি না। পারি না কবি’রও বিচার করতে। সেই বিচারের অধিকার ও সামর্থ্য একমাত্র মহাকালের হাতে। সমকালে কবি’র বিচার যাই হোক না কেন। সমসাময়িক পাঠক যে দৃষ্টিভঙ্গীতেই কবি’র জীবন ও তাঁর সাহিত্যকীর্তিকে মেলানোর প্রয়াস করুক না কেন। মহাকালের বিচারে নির্ধারিত হবে কবি’র সাহিত্যকীর্তির ভাগ্য। কবি’র থেকেও যখন তাঁর কবিতার মূল্য অধিক হয়ে ওঠার অবকাশ পাবে। উঠলে টিকে যাবে তাঁর কবিতা। না উঠলে তো কথাই নাই। কালের ইরেজার মুছে দিয়ে যাবে সব কিছুই। কবি কবিতা ও তার পাঠকের বিচার।

৩১শে আগস্ট’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত