ব্লক
কে যে কাকে কখন ব্লক করবে দেব ন জনান্তিঃ! আচ্ছা সারামাসে বা সপ্তাহে আমরা কজনকে ব্লক করি গড়ে? আবিশ্ব ফেসবুক ইউজারদের ভিতরে কোন জাতির ইউজার ব্লক করার কাজে শীর্ষ স্থানে রয়েছে? যাদেরকে সচ্ছন্দে বিশ্বসেরা ব্লকার বলে অভিনন্দিত করা যায়। এসব প্রশ্ন করেই বা কি হবে? ফেসবুকের ভিতরের কথা বাইরে থেকে জানা যাবেই বা কি করে। আমরা কিন্তু এই ব্লক করায় বেশ সিদ্ধহস্ত। সেটা জানি আমরা সকলেই। কুঁদুলে জাতি বলে বাঙালির নাম ইতিহাসে খোদাই করা নাই কি? স্বর্ণাক্ষরে। এই যেমন ১৯৪৭ সাল! আমরা ব্লক করে দিলাম নিজেরই ভুখণ্ডের পূর্ব পার’কে। বা পূর্ব পার তার পশ্চিম পার’কে। কিন্তু এটা কি নতুন কোন ঘটনা ছিল আমাদের জীবনে? না বোধহয়। কত শত পুরুষ আগেই না আমরা কত রকমের ব্লক যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছিলাম। নারীদেরকে শিক্ষার অধিকার থেকে ব্লক। শুদ্রদেরকে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার থেকে ব্লক। ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণের ভিতর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে ব্লক। দরিদ্র্যদের সম্পদের ভাগ থেকে ব্লক। বিধবাদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবন থেকে ব্লক। এই ভাবে গোটা সমাজটাকেই আমরা বিভিন্ন ব্লকে, ব্লক করে রেখে দিয়েছিলাম পরস্পর থেকে। তারপর তো হিন্দু মুসলমানের ভিতর আগা থেকে গোড়া ব্লক’এর ইতিহাস। ফলে আমাদের এই এতো বিভিন্ন ব্লকের সমন্বয়ে কোন জাতিগত সত্তা গড়ে ওঠে নি কোনদিন। হ্যাঁ জাতিগত সত্তা না গড়ে উঠুক। জাতিগত প্রকৃতি ও প্রবৃত্তিতে কোন বাঙালিকে অপর বাঙালি’র থেকে আলাদা করে চেনার উপায় নাই। চিনাম্যানদের মতো। সব বাঙালির এক রা। আমরা আর ওরা।
এই যে আমরা আর ওরা, এর থেকেই যত বিভেদ বিদ্বেষ ও বিরোধের শুরু। আর সেই বিচ্ছিন্নতার হাত ধরেই ক্রমাগত আমরা ওরায় ব্লক করার ঐতিহ্যের সূত্রপাত। জানা যায় না ফেসবুকের স্থপতিরা বাঙালির ইতিহাস থেকেই এই ব্লক যন্ত্র আবিষ্কার করেছে কিনা। করুক আর নাই করুক। বাঙালির ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের সেরা সংস্কৃতিকেই ফেসবুক এই ব্লকযন্ত্রে উপহার দিয়েছে বাঙালিকেই। ফলে আমাদের আর পায় কে। যত খুশি যেমন খুশি মেশো। যেই স্বার্থে ঘা লাগবে। দাও ব্লক করে। যেই মুড অফ হয়ে যাবে, দাও ব্লক করে। যেই নিজের মুখোশ খুলে ফেলতে হবে, দাও ব্লক করে। যেই নিজের গুণপনা ধরা পড়ে যাবে দাও ব্লক করে। একে ব্লক করে ওকে বলো বুক ফুলিয়ে। ওকে ব্লক করে তাকে বলো বুক ফুলিয়ে। পাঁচজন মিলে কাউকে টেনে নামাতে হবে? গণহারে ব্লক করে প্রচার করতে থাকো। দেখো বাছাধনের কি অবস্থা হয়। ফলে এসো ব্লক ব্লক খেলি বলতেই, হয়তো আমাদের ফেসবুক সংস্কৃতি এমন জমজমাট।
দুদিন আগেই যার সাথে দহরমমহরম চলছিল। হঠাৎ কোন না কোন বিষয় নিয়ে কারুর আঁতে ঘা লাগলেই হলো। দুইদিন আগের বন্ধুকে দুইদিন পরে ঘোরশত্রু বলে উচ্চস্বরে প্রচার করতে আমাদের জুড়ি নাই। তাই কাউকে ব্লক করেই যে আমরা ক্ষান্ত হব। তাও নয়। সেই ব্লক করার মত সম্পূর্ণ নংর্থক একটি কাজকে আমরা সগর্বে বুজ বাজিয়ে আসর জমিয়ে প্রচার করতেও লেগে যাবো। এটাই বাংলার সংস্কৃতি। হতেই পারে হঠাৎই জানা গেল, বোঝা গেল। যাকে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ বলে জানা ছিল। সে আসলেই মানসিক ভাবে শিক্ষায়দীক্ষায় গভীর ভাবে অসুস্থ। বেশ তো, তাহলে তার সাথে তর্কাতর্কি বাকবিতণ্ডা না করে যোগযোগ বন্ধ করে দিলেই হয়। ফেসবুকে ‘আনফ্রেণ্ড’ বলে একটি অপশানও রাখা আছে এই কারণেই সম্ভবত। কিন্তু সেই পথে কোন মজা নাই। কোন মানসিক তৃপ্তি নাই। কিন্তু ব্লক করে সেই তথ্য সবিস্তারে প্রচার করার ভিতর দিয়ে আত্মশ্লাঘা জনিত মানসিক আনন্দটা অপরিমেয়। তাই সেটাই আমদের পথ।
শতকের পর শতক ব্যাপী বাংলার সমাজে সকলে মিলে এক আধজনকে সমাজিক ভাবে একঘরে করে রাখার যে সংস্কৃতি। ভুলে গেলে চলবে না। সেটিই বাংলা ও বাঙালির জাতীয় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার। তা সে বাঙালির নাগরিকত্বের পরিচয় যাই হোক না কেন। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক পরিচয় যাই হোক না কেন। এই যে কাউকে সমাজিক ভাবে বয়কট করার তত্ব। একমেরু বিশ্বে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র যে তত্বকে অর্থনৈতিক ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশ বিশেষের সম্বন্ধে করে থাকে, সেই বয়কট করার ঐতিহ্য গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। আমাদের প্রত্যেকের ভিতর কম বেশি সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বর্তমন। কারুর ধোপা নাপিত বন্ধ করার ভিতর বাঙালির চিরকালীন স্ফূর্তি বর্তমান। বর্তমান যুগে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় সাংবিধানিক ভাবে কাউকেই সামাজিক ভাবে বয়কট করে একঘরে করে রাখা যায় না। বন্ধ করে দেওয়া যায় না কারুর ধোপা নাপিত। কিন্তু দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গ্রাম বাংলায় এখনো যে এই প্রথা বর্তমান, সেকথা দৈনিকের পাতায় চোখ রাখলে নজর এড়িয়ে যাবার কথা নয়। কিন্তু রাজনীতির বাইরে স্বাভাবিক জনজীবনে পূর্বের ন্যায় একঘরে করে রাখার উপায় আজ আর নাই। তাই সামাজিক মাধ্যমে কাউকে ব্লক করে তাকে সামাজিক মাধ্যমে একঘরে করে রাখার একটা অবদমিত বাসনা আমাদের ভিতরে সময়ে অসময়ে জেগে ওঠে। একে রক্তের দোষ বলা যেতে পারে।
ব্লক করতে আমাদের যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা। ব্লক তুলতে তার কণা মাত্রও দেখা যায় না। এখনো আমাদের মানসিকতায় জাতপাতের যে ব্লক বিন্ধ্যাচলের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। মানসিক সেই ব্লক আমরা তুলতে ভুলেও এগোই না। পাত্র চাই পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনগুলিতে আমাদের সেই মানসিক প্রতিবন্ধতার ব্লক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মত অটল হয়ে রয়েছে আজও। গোটা সমাজটিকে আমরা আজও অখণ্ড করে অনুভব করতে শিখি নি। শিখবো কি করে? মনের মধ্যে কতরকম ব্লকের জটিল বিন্যাস। পারিবারিক ঐতিহ্যের তকমায় ক্যানসারের মতো ছেয়ে রয়েছে। আজও সমাজটা ব্রাহ্মণ কায়েস্থ বৈদ্য শুদ্রে বিভক্ত। এবং পারস্পরিক সংযোগের পথে সুদৃঢ় সংস্কারের অটল ব্লক বসিয়ে রেখেছি আমরা। তারই নিত্যদিনের পরিচয় পাওয়া যায় পূর্বে উল্লিখিত পাত্র চাই পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনগুলিতে। না তাতে বাঙালির শিক্ষাদীক্ষায় লজ্জার ছায়াপাত হয় না কোনদিন। কথায় কথায় আজকে আমরা পাশ্চাত্যের ভাষা, পোশাক আশাক আদব কায়দা’র নকল করাকে আধুনিকতা ও প্রাগ্রসরতা বলে বিশ্বাস করে থাকি। কিন্তু তাদের সমাজের মূল শক্তি যেখানে, সেই জাতপাতের উর্ধে উঠে সমাজিক পরিচয়ে সকলের সমান অগ্রাধিকার ও সম্মান, সেই সত্যকে কখনোই অনুসরণ করার চেষ্টা করি না কিন্ত। পাশ্চাত্য সমাজে কাউকে একঘরে করে রাখার সংস্কৃতি কল্পনাও করা যায় না। অথচ আমরা মনে মনে দুইবেলা কতজনকেই যে একঘরে করে রাখার কল্পনা করি তার ঠিক নাই। এই যে মানসিকতার প্রভেদ। এই প্রভেদেই ঠিক হয়ে যায়, কোন কোন জাতি উন্নত। আর কোন কোন জাতি অনুন্নত।
বাঙালির মতো অনুন্নত জাতি বিশ্বে কি খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে? সারা বিশ্বে আর কোন জাতি এক ভাষা এক ভুখণ্ড এক লোকাচার হওয়া সত্তেও সাম্প্রদায়িকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে জাতিগত পরিচয়ের উর্ধে স্থান দিয়েছে? পারস্পরিক বিদ্বেষ ও হিংসার চর্চার ভিতর দিয়ে পরস্পর বিদেশী সেজে বসে আছে দশকের পর দশক? নিজেদেরকে হিন্দু ও মুসলিম সাজিয়ে সমাজটাকেও দুই ভাগে ব্লক করে রেখেছে পরস্পর থেকে? আর ক্রমাগত আমরা ওরা তত্বের ভিতর দিয়ে পরস্পরকে অসম্মানিত করার জন্য সাম্প্রদায়িক এই ব্লককেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে প্রচার করে চলেছে? আছে নাকি, এমন কোন জাতি? বাঙালি ছাড়া। দক্ষিণ ভারতের জাতিসমূহের ভিতরেও হিন্দু মুসলিম সামাজিক বিভাজন আছে ঠিকই। কিন্তু তাই বলে তো তামিলনাড়ু কেরল কর্ণাটক সাম্প্রদায়িক বিন্যাসে বিভক্ত হয়ে আলাদা আলাদা হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়ের দেশ হয়ে যায় নি? এমন কি উত্তরভারতের হিন্দীভাষী গোবলয়! সেখানেও তো হিন্দু ও মুসলিম সমাজ রয়েছে। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দেশে টুকরো টুকরো করে ফেলেনি তো নিজেদের? অথচ আমরা বাঙালি। সগর্বে বাংলার বুক চিরে কাঁটাতার বসিয়ে নিজেদেরকেই পরস্পর থেকে কেমন ব্লক করে রেখে দিয়েছি? এবং সেই ব্লক করার সংস্কারকেই বাঙালির সংস্কৃতি হিসাবে গড়ে তুলেছি দশকের পর দশক জুড়ে। বিশ্ববাসীর কাছে এই হলো আমাদের আসল পরিচয়।
সেই পরিচয়ই বাঙালির ফেসবুক চর্চার দিগন্তে প্রতিফলিত হয় নিত্যদিন। নতুন কোন পরিচয় নয়। এই সংস্কৃতি বাঙালিয় মজ্জাগত। অস্তিত্বের শিকড়। জাতিগত ক্যানসার। তাই কাউকে ব্লক করার জন্য মাউস নিশপিশ করলেই একবার মুখ আয়নায় নিজ জাতির আসল স্বরূপটুকু দেখে নেওয়াই বরং সততার পরিচয় হয়ে থাকতে পারে। সান্ত্বনা হিসাবে।
১৯শে সেপটেম্বর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

