পুতুল নাচের ইতিকথা
আমাদের জীবনে প্রত্যেকেরই কোন না কোন একটি লক্ষ্য থাকে। সময়ের সাথে অভিজ্ঞতার সাথে সেটি পরিবর্তিতও হতে পারে। হয়ও। আসলে এই লক্ষ্যের ভিতর দিয়েই আমরা আমাদের নিজের কোন না কোন একটি পরিচয়কেই সকলের সামনে তুলে ধরতে চাই। এমন নয়, যে সেই পরিচয়টিই আমাদের সমগ্র পরিচয় বা আসল পরিচয়। সামাজিক পরিসরে নিজের প্রয়োজন রুচি ও পছন্দের মতো নিজস্ব একটি পরিচয় গড়ে তোলা ও সেই পরিচয়টিকে সমাজিক পরিসরে তুলে ধরার ভিতর দিয়েই আমাদের জীবনের লক্ষ্য পুরণের ব্যবস্থা করি আমরা। এটি করতে গিয়ে অধিকাংশ সময়েই হয়তো আমাদের খেয়াল থাকে না, আমাদের স্বকল্পিত এই পরিচয়ের খোলসের ভিতরেই আমারা বন্দী হয়ে উঠতে থাকি। দিনে দিনে। যে আমি ঠিক আমি নই। সেই আমির খোলসে আমার আমি আটকিয়ে পড়তে থাকে দিনে দিনে। সাধারণত দেখা যায়, যে মানুষ সামাজিক ক্ষেত্রে যত বেশি সফল, তার জীবনেই এই ট্র্যাজেডি তত বেশি সত্য হয়ে ওঠে।
এখন এই যে আমার জীবন সাধনায় গড়ে তোলা সামাজিক আমি। আর আমার ব্যক্তিত্বের অভ্যন্তরে নিজস্ব আমি। এই দুই আমির সাথে আমাদের দেখা সাক্ষাৎ খুব কমই হয়। এতই কম হয় যে, আমাদের খেয়াল থাকে না কোন আমিটি আসল আমি। আসল আমিটিকে আমরা হারিয়ে ফেলতে থাকি দিনে দিনে। অর্থ যশ প্রতিপত্তি খ্যাতি’র বৃত্তে আমার সামাজিক পরিচয়ের খোলসে তৈরী হয়ে ওঠা আমিটিকেই একসময় আমার আমি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে দিই। আর একবার সেই বিশ্বাস মজবুত হয়ে গেলেই, আমরা সভয়ে থাকি। পাছে সমাজিক আমির খোলস থেকে বৃন্তচ্যুত না হয়ে পড়ি। তাই আমাদের সচেতন প্রয়াস থাকে এই সামাজিক আমির খোলসটিকে মজবুত করে রাখা। সেই লক্ষ্যকেই পাখির চোখ করায়, আমাদের একান্ত নিজস্ব আমি’র সাথে আমাদের আর দেখা সাক্ষাৎ হয় না সহজে।
এইভাবে ঘরে বাইরে জীবনের সাফল্যের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে যে আমির সৃষ্টি হয়ে ওঠে, সেই আমিকেই আমার আসল পরিচয় বলে ভুল হতে শুরু হয় দিনে দিনে। ঘরে বাইরে নিজের সেই স্বকল্পিত এবং স্বনির্মিত এক আমির স্ট্যাচুকেই আমরা বহন করতে থাকি প্রতিদিনের কর্ম ব্যস্ততায়। আমাদের চার পাশের মানুষ জন, আত্মীয় স্বজন পরিবার পরিজন। সকলের কাছেই সেই স্বনির্মিত আমিই হয়ে দাঁড়ায় আমার আসল পরিচয়। হারিয়ে যায় আসল আমির একান্ত আমিত্ব।
কিন্তু জীবন বড়ো কঠিন ঠাঁই। সব কিছুই যে মাখনের ভিতরে ছুরি চালানোর মতো মসৃণ হবে, তা নয়। হয়ও না। আমির এই আবরণের ভিতর থেকে মাঝে মধ্যেই উঁকি দিতে থাকে আমার নিজস্ব আমি। যে আমি আমার একান্ত সত্তা। সেই উঁকিঝুঁকি দেওয়া আমিকে দেখে ফেললেই চারপাশের মানুষ ভুল বুঝতে শুরু করে দেয়। খুবই স্বাভাবিক। যে আমির সাথে তারা পরিচিত নয়। হঠাৎ হঠাৎ সেই আমির দেখা পেলে তাদের পক্ষে হকচকিয়ে যাওয়াই কি স্বাভাবিক নয়? আবার শুধু কি তারাই হকচকিয়ে যায়? আমিও কি চমকে উঠি না? উঠি বই কি। উঠি বলেই ভিতরে ভিতরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। দুই আমির পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ভিতরে ক্রমাগত পেণ্ডুলামের মতো দুলতে থাকে আমাদের অস্তিত্ব। সেও এক মানসিক যন্ত্রণা।
সেই মানসিক যন্ত্রণার কবলে পড়লে তখন এক দিশাহারা অবস্থা। বন্ধুবান্ধব শুভান্যুধ্যায়ীদের সাথে দূরত্ব বাড়তে পারে। দূরত্ব বাড়তে পারে আত্মীয় পরিজনদের সাথেও। ঠিক এইখানেই এই কারণেই মাঝে মধ্যে নিজের সাথে নিজের দেখা সাক্ষাতের পর্বটা জারি রাখা বিশেষ জরুরী। রাখলে, রাখতে পারলে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। কিন্তু কি করে সম্ভব নিজের সাথে নিজের দেখা হওয়া?
সত্যই বড়ো কঠিন এ প্রশ্ন। কোন সর্বজনীন উত্তরও কি সম্ভব। বলা কঠিন। আমাদের নিত্যদিনের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা কিংবা দুটির ভিতর দিয়েই আমাদের অনুধাবনের চেষ্টা করা দরকার, এই সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা আমাদের তৈরী করা আমির আবরণকে যতই প্রভাবিত করুক না কেন। আমাদের নিজস্ব একান্ত আমিকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পারছে। বা আদৌ পারছে কিনা? প্রাথমিক ভাবে এইটি একটা সহজ পথ হতে পারে। এই অনুসন্ধানের ভিতর দিয়ে কিছুটা এগোতে পারলে, আমরা হয়তো উপলব্ধি করতে পারব, আমাদের নিত্যদিনের সাফল্য ব্যর্থতার উপর নির্ভর করে না আমার নিজস্ব একান্ত আমির গড়ে ওঠা বা অস্তিত্ব। এই সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা আমাদের স্বকল্পিত ও স্বনির্মিত সামাজিক কিংবা পেশাগত আমিকে পুতুল নাচের মতো নাচাতে পারলেও, আমার একান্ত আমিকে স্পর্শও করতে পারে না। অর্থাৎ ব্যক্তি জীবনের সাফল্য ব্যর্থতা দিয়ে যে আমির বিচার হতে পারে। সেই আমি আমাদের স্বনির্মিত আমি। আমাদের সামাজিক আমি। কিন্তু ব্যক্তি জীবনের সাফল্য ব্যর্থতা দিয়ে আমাদের নিজস্ব একান্ত ব্যক্তিসত্তার যে আমি, তার কোন বিচার চলে না। কোন বিচারই সেইখানে পৌঁছাতে পারে না।
প্রতিদিনের কাজের ভিতর দিয়েই হয়তো চেষ্টা করলে সেই একান্ত নিজস্ব আমিরও হদিশ পাওয়া সম্ভব। যদি আমরা গীতায় বলা সেই বাণীকে অনুসরণ করে এগোতে পারি। অর্থাৎ কর্মেই আমার অধিকার। ফলে নয়। আমাদের প্রতিটি কর্ম ও সাধনায় অমরা যদি ফলের আশা না করে কর্মটুকুর দিকেই সকল আগ্রহকে চালিত করতে পারি। তাহলে হয়ত সম্ভব। তাহলে হয়তো এই নাম যশ খ্যাতি কীর্তির আড়ালে প্রায় ধামাচাপা পড়ে যাওয়া আমার নিজস্ব একান্ত আমিটুকুর সাথে নিয়মিত সংযোগের একটা পথ খুললেও খুলতে পারে। খুলবে কি খুলবে না, সেটি নির্ভর করবে এক একজনের ব্যক্তিত্বের উপরে। সকলের ব্যক্তিত্ব সমান নয় নিশ্চয়। যার যেমন ব্যক্তিত্ব। তার ক্ষেত্রে তেমন ভাবেই ঘটতে পারে দুই আমির ভিতরে সরাসরি সংযোগের এই ঘটনা। যদি ঘটে।
যদি ঘটে। ঘটানো সম্ভব হয় তবে সম্ভব আমির স্বনির্মিত আবরণের সাথে নিজস্ব একান্ত আমির সামঞ্জস্য সাধন। যাঁর জীবনে এই সামঞ্জস্য সাধন যত সত্য তাঁর জীবন তত সুন্দর ভাবে গড়ে ওঠে। উঠবে। ওঠা উচিৎ। ব্যক্তি জীবনের অর্থ যশ খ্যাতি প্রতিপত্তি স্বীকৃতি’র প্রতি অনন্ত লোভই আমাদেরকে অন্ধ ও অবশ করে রেখে দেয়। সামাজিক ভাবে আপন অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অর্থ যশ খ্যাতি প্রতিপত্তি স্বীকৃতির প্রয়োজন রয়েছে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই সবের পিছনে আমাদের অনন্ত লোভই আমাদেরকে দিশাহারা করে দেয়। আর দেয় বলেই, আমরা স্বনির্মিত আমিকেই আমার একান্ত আমি বলে ভুল করতে শুরু করে দিই এক সময়ে পৌঁছিয়ে। আর পুতুলের মতো নাচতে শুরু করে দিই, সেই স্বনির্মিত আমির খোলসে। সেই ভুলই আমদের জীবনে ট্র্যাজেডির জন্মদাতা। কর্মফলের প্রতি এই দুর্বার লোভই আমাদেরকে আমাদের নিজস্ব একান্ত আমি’র থেকে দূরে সরিয়ে নিতে থাকে ধীরে ধীরে। তখন দেখা যায়, বহু দিন চলে গিয়েছে। দেখা হয় নি আর নিজের সাথে নিজেরই।
২২শে জুলাই’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক
সংরক্ষিত

