ঘর সাজানো শো-পিস


ঘর সাজানো শো-পিস

না সেই দিন আর নাই। বাংলা সাহিত্যের অমূল্যরতন হাতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাওয়ার সংস্কৃতি বেশ কয়েক দশক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। কেউ যদি সেই সংস্কৃতি রক্ষায় প্রয়াসীও হন। সমাজে উপহাসের পাত্র হওয়ার সম্ভাবনা ষোলআনা। ঠিক তেমনই আমাদের ড্রযিংরুমের সজ্জাতেও পরিবর্তনের ছাপ লেগেছে। দিনে দিনে দেওয়াল আলমারি থেকে শুরু করে শোকেস। এমনকি বুককেসেও গ্রন্থসম্ভারের ভার কমতে কমতে অনেক শিক্ষিত সজ্জন গৃহেই প্রায় নাই হয়ে গিয়েছে। সেই জায়গায় স্থান জুড়ে বসেছে নানার ধরণের শো-পিস। স্বল্পমূল্যের শো-পিস থেকে বহুমূল্যের শো-পিসে ঝলমল করে উঠেছে আমাদের ড্রয়িংরুম। চারদেওয়ালে মনীষীদের প্রতিকৃতির জায়গা জুড়েও এখন শো-পিসের ছড়াছড়ি। অনেক সংসারেই এই শো-পিস কেনা ও সংগ্রহ করা রীতিমত নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনটাই দেখতে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে আমাদের একুশ শতকের আধুনিক চোখ। ফলে কারুর গৃহে বা ফ্ল্যাটে অন্যরকম সজ্জা দেখলে আমরা একটু চমকে উঠি বইকি। না, সে অবকাশ খুব একটা বেশি হওয়ার উপায় নাই যদিও। সামাজিক প্রবণতা সকলকে এমন একটি অভিমুখে টেনে নিয়ে চলেছে যে, ঘরে ঘরে গৃহসজ্জায় এখন শো-পিসের কদর আকাশ ছোঁয়া। অবশ্য তার ভিতরেও এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা সাহিত্যের অমূল্যরতনকেই শো-পিস হিসাবে গৃহসজ্জায় কাজে লাগিয়ে থাকেন। তাঁরা চিরকালই ছিলেন। আজও আছেন। দেওয়ালের রঙের সাথে সামঞ্জস্য করে বই কেনার মতো মানুষও কিছু আছেন নিশ্চয়। তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে। বইকে গৃহসজ্জার কাজে শো-পিস হিসাবে ব্যবহার করার থেকে বাড়ির ত্রিসীমানায় বই না ঢুকতে দেওয়া বরং অনেক সুন্দর। অনেক শ্রেয়। অনেকেই জানেন। নানান শিল্পীর চিত্রকলা বা তার ছবিকেও অনেকে শো-পিস হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন। গৃহের সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে তুলতে। সৌন্দর্য্য সচেতনতা খুব ভালো গুণ একটি। মানুষ নিজের ঘর কে কিভাবে সাজাবে, সে তার একান্ত নিজস্ব বিষয়। সেখানে বাইরে থেকে নাক গলানো কোন কাজের কথা নয়। নিজের মতো ঘর সাজানোর অধিকার ব্যক্তির মৌলিক অধিকার।

সেই মৌলিক অধিকারে কে কিভাবে ঘর সাজাচ্ছেন। তার ভিতর দিয়ে আমাদের সময় ও সমাজের একটা চালচিত্র উঠে আসে। আমাদের অধিকার থাকতে পারে শুধু সেই চালচিত্র পর্যবেক্ষণে মাত্র। আমাদের আগ্রহ হতে পারে, সেই পর্যবেক্ষণের ভিতর দিয়ে পরিবর্তিত সময় ও সমাজবাস্তবতার বিশ্লেষণে। তার বেশি কিছু নয়। আমরা কাউকে নির্দেশ দিতে পারি না। কে কিভাবে ঘর সাজাবে। আমরা কারুর সমালোচনাও করতে পারি না। কে কিভাবে তার ঘর সাজিয়েছে বলে। ব্যক্তিগত রুচি নয়। আমাদের আগ্রহ এই সময়ের সামাজিক রুচির গতিপ্রকৃতি নিয়েই। আরও একটি কথা স্মরণে রাখতে হবে আমাদেরকে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক শ্রেণী বিভাজিত আমাদের সমাজের চালচিত্রও নানান ধরণের। তাই আমরা আলোচনার সুবিধার্থে কেবল মাত্র মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত অর্থনৈতিক শ্রেণীর সমাজের কথাই বলতে প্রয়াসী। বিগত কয়েক দশকে সেই শ্রেণীর সমাজের ভিতর রুচির একটা বড়ো ধরণের পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে।

একটা সময় ছিল। বাড়িতে নতুন বউ আসলেই, সেই সূত্রে নিমন্ত্রিত আত্মীয় পরিজন বন্ধবান্ধবের হাত ধরে অনেক নতুন বই’তেও বাড়ি ভরে উঠতো। তার আনন্দ ও মৌতাতই ছিল ভিন্ন রকমের। এই যুগে আমাদের আনন্দের রকমফেরে ঘটে গিয়েছে অনেকটা বদল। আগে মধ্যবিত্তের ঘরে বৈঠকখানায় বই রাখার একটা চল ছিল। চল ছিল না, জীবন যাপনের পক্ষে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় শো-পিস কিনে জমিয়ে বা সাজিয়ে রাখার। কিন্তু সময় থেমে থাকে না। সময় বদলাতে থাকে। আগে অনেক ঘরেই নিয়মিত বই পড়ার নেশা আছে এমন মানুষের খুব একটা অভাব ছিল না। কিন্তু আমাদের জীবনে টিভি আসার পর থেকেই সেই ধারাটা দিনে দিনে হারিয়ে যেতে থাকলো। আমরা অবসরে বই নয়, টিভির রিমোটে হাত দিয়েই ব্যস্ত রাখলাম নিজেদের অনেক বেশি। আর এখন তো আনলিমিটেড ডেটার যুগ। লিমিটেড সময় তাই বই পড়ে আর নষ্ট করতে চায় না অধিকাংশ মানুষজনই।

ফলে আমাদের ঘরে বইয়ের ঠাঁই হয়েছে পুরোনো আসবাবের মতোই অযত্নে অবহেলায়। আর সেই জায়গায় যত্ন সহকারে যত রকমের অপ্রয়জনীয় শো-পিসে সেজে উঠেছে আমাদের পিসফুল গৃহ। সজ্জায় আড়ম্বরে। একটু খেয়াল করে দেখলেই দেখবো। এই শে-পিসগুলির খুব একটা ইণ্ডিভিজ্যুয়াল ভ্যালু নাই তেমন। সামগ্রিক ভাবে গৃহ সজ্জার সমগ্রী হিসাবেই তাদের মূল্য। সেই সজ্জার বাইরে তাদের আর কোন বিশেষ উৎকর্ষতাও নাই বিশেষ। এবং আমরা নির্দিষ্ট করে কোন শো-পিসের প্রতি যে খুব একটা নজর দিই, তাও নয়। অবশ্যই আমাদের জীবন যাপনের জন্য এই শো-পিসগুলির আলাদা কোন প্রয়োজনীয়তাও থাকে না। তবু সম্পূর্ণ অদরকারী হলেও সৌন্দর্য্যের নিরিখে এগুলির দামও যথেষ্ঠই বেশি হয়ে থাকে অনেক ক্ষেত্রেই। সেই অতিরিক্ত মুল্য দিয়েও সেগুলি সংগ্রহ করতে আমাদের পকেটে টান পড়ে না অনেকেরই। বরং মনের ভিতর আনন্দজনিত একটা তৃপ্তি হতে থাকে। অমুকের ঘর থেকে এবার আমাদের ঘরই বেশি ঝলমল করে উঠবে ভেবে। ফলে মনের অজান্তেই হোক আর সজ্ঞানেই হোক। এই অদরকারী শো-পিস সংগ্রহের ভিতরে একটা অলিখিত ও অদৃশ্য প্রতিযোগিতারও ব্যপার থাকে। তাই আমাদের অধিকাংশের ঘরই এখন শো-পিসের শৌখিন সৌন্দর্য্যের আড়ত হয়ে উঠেছে।

আমরা মানুষ হিসাবে ব্যক্তি জীবনে এই এক শো-পিস সংস্কৃতির জন্ম দিয়ে ফেলেছি ঘরে ঘরে। না, শুধু ঘরে ঘরেই নয়। এই শো-পিস সংস্কৃতি আমাদের সমাজকেও নিয়ন্ত্রণ করছে আজকে। ঘরে ঘরে শো-পিস সংস্কৃতি, ঘর সংসারের অন্য কোন কাজেই আসে না। সংসারের উৎকর্ষ সাধন কিংবা সমৃদ্ধির বিষয়ে এর কোন ভুমিকাই থাকে না। শুধু মাকাল ফলের মতোন আমাদের চোখ জুড়িয়ে রাখে কেবল। ঠিক তেমনই দেখা যায়, আমাদের সমাজে বুদ্ধিজীবীদের ভুমিকা। এক একজন বুদ্ধিজীবী এক এক বিষয়ে দিকপাল। সমাজের লাইমলাইটে থাকার জন্য এক এক পথে এগিয়ে নিজেদের একটা হিল্লে করে নেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদ্যাবুদ্ধির জ‌োরে। অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতার অলিন্দের সাথে নিজেকে সংলগ্ন রাখতে সঠিক রাজনৈতিক শিবির সঠিক সময় নির্বাচন করার দক্ষতায়। সমাজের কেষ্টবিষ্টু সেজে এনারা এমন একটি পরিবেশের সৃষ্টি করে থাকেন। যে মনে হয়, এনারাই আমাদের সমাজের কাণ্ডারী। আমরা আমাদের সমাজের উৎকর্ষতা ও সমৃদ্ধির বিচার করতে বসে যাই, এই বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা, খ্যাতি প্রতিপত্তি ও জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতেই। আমরা বিশ্বাস করি এবং গর্ব অনুভব করি, সমাজের বুদ্ধিজীবীদের জনপ্রিয়তার জৌলুসই আমাদের সামাজিক অর্জন। ঠিক যেমন গৃহ সজ্জার শো-পিস দিয়ে গৃহকর্তার রুচি ও সৌন্দর্য্য বোধের পরিমাপ করি আমরা। ঠিক তেমনই আমাদের সমাজের খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীদের দিয়েই আমরা আমাদের সমাজের সমৃদ্ধি ও অর্জন পরিমাপ করতে বসে যাই। আমরা ভাবি আমাদের সমাজ কত প্রাগ্রসর। কত আধুনিক। কত শিক্ষিত। কত উন্নত। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের আমরা যতটা প্রাগ্রসর, আধুনিক, শিক্ষিত ও উন্নত মনে করি। ঠিক সেই মাপে। কিন্তু আসলেই গৃহ সজ্জায় ব্যবহৃত শো-পিস যেমন আমাদের ঘর সংসারের আসল চিত্র নয়। ঠিক সেই রকমই, আমাদের সমাজের প্রকৃত চিত্র হাতে গোনা কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর খ্যাতির জৌলুসেও নয়। গোটা সমাজ এক দিকে। আর আখের গোছানো বুদ্ধিজীবী শ্রেণী আর এক দিকে। সমাজ ও স্বাজাতির উন্নতির জন্য এই শ্রেণীর সাধনা ও অবদান প্রায় শূন্যের কোঠায়। না হলে এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর জীবন যাপনের মানের থেকে শত যোজন দূরবর্তী হতো না আমাদের সামাজের প্রকৃত অবস্থান। ফলে এনাদের দিকে তাকিয়ে কেউ যদি বাংলার সমাজজীবনের প্রকৃত চালচিত্রের ধারণা করে নেন। তবে বাস্তবের সাথে গরমিল হবে ষোলআনাই।

কিন্তু কেন এমন হয়। কেন এমন হলো? তার অনেক কারণ বর্তমান নিশ্চয়। সমাজতাত্বিকদের গবেষণার বিষয় সেসব। তবুও প্রধানত একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাতের সময় এসেছে এখন। একেবারেই সাধারণ বুদ্ধির চৌহদ্দীতেই। আমাদের সংসারের আসল সৌন্দর্য্য নিশ্চয় কতগুলি অদরকারী অপ্রয়োজনীয় শো-পিসের ভিতরে নয়। আমাদের সৌন্দর্য্যের আসল প্রকাশ আমাদের ড্রয়িংরুমে নয়। আমাদের প্রকৃত সৌন্দর্য্য আমাদের মানবিক আচরণে। মানুষের সাথে মানুষের প্রতি মুহুর্ত্তের ব্যবহারে। আমাদের সাধ ও সাধনায়। আমাদের কাজ ও অর্জনে। আমাদের বিবেক ও আদর্শে। সেখানে যদি সুন্দর না হতে পারি। যদি আপন সৌন্দর্য্য ধরে রাখতে না পারি। তবে ড্রয়িংরুমের শো-পিসের মতো আবর্জনা আর হয় না। বস্তুত আমরা সেই আবর্জনার ভিতরেই নিজেদের ব্যর্থতাগুলিকে ধামাচাপা দিয়ে সুসভ্য শোভনসুন্দর সেজে থাকার ভান করি মাত্র।

সংসারের মতোই আমাদের সমাজেও ঠিক তেমনই। সমাজে কতজন খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় জৌলুস ছড়াচ্ছেন। তাই দিয়ে সমাজের সৌন্দর্য্য উৎকর্ষতা বৃদ্ধি হয় না। সম্ভব নয়। সমাজের অভ্যন্তরে যদি সৌন্দর্য্য ও উৎকর্ষতার ভিত মজবুত না হয়ে ওঠে, তবে কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে সামনের আসনে বসিয়ে রেখেও পিছিয়ে পড়া সমাজের বেআব্রু বেখাপ্পা রূপ ঢাকা দেওয়া যায় না। ঢাকা দেওয়ার ভান করা যায় মাত্র। বাঙালি হিসাবে আমরা যেটা করে থাকি। এবং করে থাকার সাধনায় নিবেদিত প্রাণ। আমাদের সমাজের শো-পিস এই বুদ্ধিজীবীরা সমাজের কোন কাজে আসেন না। সমাজের কোন উপকারে থাকেন না। থাকার শক্তি ও উৎকর্ষতা এনাদের নাই। সমাজ এনাদের কাছে কোনভাবে ঋণীও নয়। শুধু শো-পিসের মতো বিদেশীদের কাছে মেকবিলিভ বাংলার নকলচিত্র প্রদর্শনীর কাজে এনারা যশস্বী মাত্র। আমাদের ঘর সংসারের মতোই আমাদের সমাজ। কিছু শো-পিসের আড়ালে নিজের আসল রূপকে ঢাকা দিয়ে রাখা মাত্র।

৪ই সেপটেম্বর’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত