শিক্ষকদিবসের গুরুত্ব




শিক্ষকদিবসের গুরুত্ব!

আজ শিক্ষক দিবস। ভারতবর্ষে। অনেকেই নিজ নিজ শিক্ষকের কথা স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ অর্পণ করছেন ফেসবুকের ওয়াল জুড়ে। শিক্ষার্থী তার শিক্ষককে শ্রদ্ধা জানাবে। এমনটাই তো স্বাভাবিক। শোভন সুন্দর। শিক্ষাই আমাদের এই শিক্ষায় পৌঁছিয়ে দেয়। যিনি বা যাঁরা তোমায় শিক্ষিত করে তুললেন। যাঁদের সাহায্য নিয়ে তুমি আজ সমাজে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত। আজ তাঁদের কাছে ঋণ স্বীকারের দিন। সেই ঋণ স্বীকারের সশ্রদ্ধ স্মরণে আজ প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতিরোমন্থনেরও দিন।

কিন্তু আজ যদি প্রশ্ন করা যায়, আমাদের জীবনে ভালো শিক্ষক কারা? কাদের অবদানে আমরা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হই? আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে উন্নতির কারণে কোন কোন শিক্ষকের কাছে ঋণী থাকি আমরা প্রধানত? এই প্রশ্নের আরও একটু গভীরে গেলে, প্রশ্নটা আসলে হওয়া উচিত। একজন অভিভাবকের কাছে ভালো শিক্ষক কে? কোন শিক্ষকের কাছে আপন সন্তানকে এগিয়ে দিতে চান একজন অভিভাবক? আমাদের ঘরে বাইরে এই প্রশ্নের উত্তর প্রায় সকলেই একবাক্য জানেন। অন্তত যাঁরাই অভিভাবক। এই দেশে সন্তানকে ভালো স্কুলে দিলেই হয় না। ভালো শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট কোচিংয়ে পাঠাতেও হয়। কি স্কুল কি প্রাইভেট কোচিং। অভিভাবকের কাছে তিনিই ভালো শিক্ষক। যিনি তাঁর ছাত্রছাত্রীকে পরীক্ষার খাতায় অধিকতর নম্বর তোলার মতো করে উপযুক্ত করে তোলেন। তুলতে পারেন। যাঁর কাছে পড়লে। পড়তে গেলে ছেলে মেয়েরা সর্বচ্চো নম্বর তুলতে পারে পরীক্ষার খাতায়। একজন অভিভাক তাই আপন সন্তানের জন্য সেই শিক্ষকেরই খোঁজ করেন। যিনি আসন্ন পরীক্ষায় ১০টি সাম্ভব্য প্রশ্নের সাজেশন তৈরী করে দিলে তার ভিতরে কম বেশি আট নয়টি প্রশ্ন কমন পাওয়া যাবে পরীক্ষার দিনে। অভিভাবকদের আশা থাকে সাম্ভব্য প্রশ্নগুলির জন্য সর্বোচ্চ নম্বর তোলার উদ্দেশে শিক্ষক এমন সুন্দর নোট তৈরী করে দেবেন, যে নোট মুখস্থ করে পরীক্ষার্থী সহপাঠীদের থেকে বেশি নম্বর পেয়ে পরের ক্লাসে উত্তীর্ণ হবে। একজন অভিভাবক আপন সন্তানের জন্য ঠিক এমনই শিক্ষকের খোঁজ করেন। সেই স্কুলেই সন্তানকে ভর্তি করার চেষ্টা করেন। যে স্কুলে এমন ধরণের শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। যে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবছর দারণ ফল করে। এই দারুণ ফলের একটাই মাপকাঠি। পরীক্ষায় একশোতে একশো পাওয়া। নিদেন পক্ষে নব্বই শতাংশের বেশি নম্বর তুলতে পারা। যে যে স্কুলে পড়লে ছাত্রছাত্রীরা অধিকসংখ্যায় অধিকতর নম্বর তোলে, অভিভাবকদের লাইন সেই সেই স্কুলেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। প্রাইভেট কোচিংয়ের জন্য শিক্ষকের খোঁজ করলেও অভিভাবকদের দৃষ্টিতে ভালো শিক্ষকের মাপকাঠি একটাই। সর্বোচ্চ নম্বর তোলা নিশ্চিত করা। যে শিক্ষকের দেওয়া সাজেশন যত বেশি কমন আসে পরীক্ষায়। অভিভাকরা সন্তানকে নিয়ে সেই শিক্ষকের কাছেই ছোটেন তত বেশি। শিক্ষার্থীর কাজ শুধু একটাই। শিক্ষকের দেওয়া সাজেশন অনুযায়ী শিক্ষকের তৈরী করে দেওয়া নোট মুখস্থ করে ফেলা নির্ভুল ভাবে। এবং নির্ভুল ভাবেই সেই নোট পরীক্ষার খাতায় কপি করে দিয়ে আসা। যে ছাত্র কিংবা ছাত্রী সেই কপি যত নির্ভুল ভাবে করতে পারবে। তার বরাতেই পরবর্তী শিক্ষা অর্জনের ছাড়পত্র তত দ্রুত মিলবে। তাই পরীক্ষার খাতায় এই নির্ভুল ভাবে কপি করার কায়দা রপ্ত করিয়ে দেওয়াও একজন ভালো শিক্ষকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত। অভিভাবকদের হাত ধরে শিক্ষার্থীরাও তাদের শিক্ষকের কাছে এটাই প্রত্যাশা করে থাকে।

এবং এই ভাবেই শিক্ষকের দেওয়া সাজেশন অনুসারে শিক্ষকের তৈরী করে দেওয়া নোট মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় প্রায় জেরক্স মেশিনের মতো কপি করে দিয়ে আসতে পারাই আবার একটি মেধাবী ছাত্র কিংবা ছাত্রীর কাছে প্রত্যাশিত। এই প্রত্যাশা শুধু অভিভাবকদেরই নয়। এই প্রত্যাশা শিক্ষকদেরও। এটাই আমাদের দেশের শিক্ষার সুস্থ পদ্ধতি বলে গণ্য করা হয়ে থাকে। আমাদের সমাজ এই শিক্ষা ব্যবস্থাকেই মান্যতা দিয়ে চলেছে। এবং রাষ্ট্র সেই ব্যবস্থাকেই ধরে রেখেছে। ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই শিক্ষাব্যবস্থার সুবিধা হলো পুরো সিলেবাস না পড়লেও চলবে। বই খুলে কষ্ট করে পড়ারও দরকার হয় না। এবং সবচেয়ে সুবিধার হলো। হোমিওপ্যাথির পুড়িয়া খাওয়ার মতোন, নোট মুখস্থ করে নাও। ফর্মুলা মুখস্থ করে নাও। শিক্ষকের কাছ থেকে বিশেষ কয়েকটি শর্টকাট মেথড রপ্ত করে নাও। পাঠ্য বিষয়টা নিয়ে এর বেশি আর কোন ভাবনা চিন্তা করার দরকার হবে না। বছর বছর পরীক্ষার খাতায় নম্বরের বন্যা বইবে বর্ষাকালে ডিভিসি’র জল ছাড়ার মতো। এবং সিলেবাসের বাইরে উঁকিঝুঁকি দেওয়ার ঝুঁকিও নিতে হবে না। অভিভাবক খুশি। শিক্ষার্থী খুশি। খুশি শিক্ষক। এবং নিশ্চিন্ত রাষ্ট্র।

একজন শিক্ষক শিক্ষার এই পরিকাঠামোর একজন একক মাত্র। এই যে সঠিক সাজেশন দিতে পারা। ভালো ভালো নোট তৈরী করে শিক্ষার্থীদের দিয়ে মুখস্থ করিয়ে নেওয়া। এবং শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ নম্বর তোলার রেসের ঘোড়ায় পরিণত করতে পারা। সাফল্যের সাথে। সেখানেই একজন শিক্ষকের সাফল্য। অভিভাবকের চোখে। শিক্ষা ব্যবস্থার চোখে। শিক্ষার্থীর চোখে। এবং শিক্ষকেরও চোখে। নোট মুখস্থ করা ফর্মুলা মুখস্থ করা শর্টকাট মেথড রপ্ত করা সর্বোচ্চ নম্বর তোলা শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে সফল হলেই সেই শিক্ষকের কাছেই ঋণ স্বীকার করবে। সেটাই প্রত্যাশিত। আজ সেই ঋণ স্বীকারের দিন। আজ সেই শিক্ষককেই সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করার দিন। যাঁর পরিচালনায় যাঁর নির্দেশে পরের পর পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়েছিল। যে নম্বর প্রাপ্তির রাজপথ ধরে এগোতে এগোতে পরবর্তীকালে কর্ম জীবনের সদর দরজা হাট করে খুলতে পারা যায়। খুলতে পারা গিয়েছিল। যার জোরে আজ সমাজে সসম্মানে মানুষ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। পেরেছে। তাই সেই শিক্ষককে আজ আমাদের স্মরণ করার দিন।

আগেই বলেছি একজন শিক্ষক আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একক। সেই ব্যবস্থাকে বাইপাস করে শিক্ষার্থীদের মানুষ করে তোলার পথ বার করার স্বাধীনতা কোন শিক্ষককেই দেওয় হয় না। রাষ্ট্র দেয় না। শিক্ষা ব্যবস্থা দেয় না। সমাজ দেয় না। অভিভাবকও দেয় না। যদি তেমন কোন শিক্ষকের খোঁজও পাওয়া যায়। যিনি মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা দেন। পরীক্ষায় কোন কোন প্রশ্ন কমন আসবে তার সাজেশন দেন না। যিনি পাঠ্য বিষয়ের সাথে শিক্ষার্থীকে পরিচিত করে তোলেন। নোট মুখস্থ করান না। যিনি সিলেবাসের বাইরেও জগৎ ও জীবনের সাথে শিক্ষার্থীর পরিচয় ঘটিয়ে দেখান কোনখানে ও কিভাবে পাঠ্য বিষয়ের সাথে জীবনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সংযোগসূত্র। কিন্তু সর্বোচ্চ নম্বর তোলার কায়দা শেখান না। যিনি শিক্ষার্থীর মগজের দখল নেন না। কিন্তু সেই মগজকে স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার পথটা সুপ্রশস্ত করে তোলেন। যিনি শিক্ষার্থীকে সহপাঠীর সাথে নম্বর তোলার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দেন না। শিক্ষার্থীকে সহপাঠীর সাথে সহযোগিতার সংস্কৃতিতে উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। যিনি ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা ব্যবস্থার রোবট না বানিয়ে দেশ ও জাতির মানবসম্পদ হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। সেইরকম একজন শিক্ষকের কাছে আপন সন্তানকে শিক্ষিত করতে পাঠানোর মতো অভিভাবক খুঁজে পাওয়া যাবে কি আদৌ?

আমাদের সমাজের আসল অসুখটা ঠিক এইখানেই। না, অভিভাবক হিসাবে আমরা কখনোই সেইরকম কোন শিক্ষক বা শিক্ষা ব্যবস্থার খোঁজ পেলেও, সেখানে আপন সন্তানকে পাঠাবো না মানুষ হয়ে ওঠার জন্য। আমাদের লক্ষ্য সন্তানকে মানুষ করে তোলা নয়। সন্তানকে অধিকতর রোজগেরে করে তোলা। তাই একটু মেধাবী ছেলে মেয়েদের বাপ মা হলেই স্বপ্ন দেখা শুরু হয়ে যায়, ডাক্তার ইঞ্জিনীয়র কিংবা বর্তমানে আইটি প্রফেশনাল হিসাবে গড়ে তোলার। সমাজের সেবার জন্য। দেশের উন্নতির জন্য। সভ্যতার বিকাশের জন্য আমরা কে‌উ সন্তানকে লেখাপড়া শেখাই না। তাই কাল যদি জানা যায়, সরকারী চাকুরীতে ঘাস কাটা রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার পেশায় ডাক্তার ইঞ্জিনীয়র কিংবা আইটি প্রফেশানালদের থেকেও বেশি রোজগারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে, অনেক অভিভাবকই সন্তানের জন্য সেই পেশাকেই স্বপ্নের বিষয়বস্তু করে তুলবেন। আমাদের সমাজের এই হলো আসল চিত্র। আমাদের অভিভাবকদের মানসিকতার প্রকৃত মানচিত্র এটাই। আর সেই চিত্রেই ঠিক হয় কোন শিক্ষক শ্রেষ্ঠ।

সমাজবাস্তবতায় শিক্ষকতার পেশায় এই যে একটা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি, এখানেই আমাদের দেশের সকল অসুখের আসল ভাইরাস লুকিয়ে রয়েছে। পরীক্ষার খাতায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তিকেই একটা সমাজ যখন সুস্থ শিক্ষার গোড়ার কথা বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এবং সমাজের শিক্ষককূল যখন সেই বিশ্বাসকেই মান্যতা দিতে উঠে পড়ে লাগে। আর অভিভাবকবৃন্দ যখন সেই শিক্ষককূলের হাতেই নিশ্চিন্তে আপন সন্তানসন্ততিকে তুলে দিতে ছোটেন। তখন সেই সমাজে সেই দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ণের ধারা কোন পথে চলতে থাকবে। সেই বিষয়ে আর বিতর্কের অবকাশ থাকে না কোন। সেই ধারাতেই শিক্ষিত হয়ে উঠি আমরা। সেই ধারাতেই এগিয়ে চলেছি আমরা। সেই ধারাতেই ক্রমাগত সহ নাগরিককে ল্যাং মেরে নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার দক্ষতায় শান দিতে থাকি আমরা। তারপর শিক্ষক দিবসে এসে। যিনি বা যাঁরা, অভিভাবকরূপে, শিক্ষক শিক্ষিকা রূপে, আমদেরকে এই পথে পৌঁছাতে অগ্রগণ্য ভুমিকা নিয়ে থাকেন। তাঁদের উদ্দেশেই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি আমরা আজ। আমাদের সশ্রদ্ধ ঋণ তাঁদের কাছেই। আমরা তাঁদেরকেই স্মরণ করতে বিশেষ একটি দিবসকে বেছে নিয়ে পালন করি শিক্ষকদিবস।

৫ই সেপটেম্বর’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত