ট্রেনের চাকা বন্ধ কেন

 


ট্রেনের চাকা বন্ধ কেন


ট্রেন বন্ধ করে রেখে লকডাউন তুলে দিয়ে তিন বাসের যাত্রীকে এক বাসে ঠাসাঠাসি করে উঠতে যারা বাধ্য করে। তারা যদি জনদরদী সরকার হয় তবে খুবই মুশকিলের কথা। তারা যদি করোনা সংক্রমণ রোধে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখে। তবে হয় তারা অজ্ঞ নয় তারা ঘোর মিথ্যাবাদী। ট্রেন বন্ধ রাখার সাথে করোনা সংক্রমণ রোধের যদি কোন রকম সংযোগ সূত্র থাকতো। তবে কোন বাসেই ভিড় হতে দিত না সরকার। হয় সমস্ত পরিবহন ব্যবস্থাই বন্ধ করে রাখতো। আর নয়তো লকডাউন জারি রাখতো সারা দেশে জুড়েই। কিন্তু সরকার তার কোনটাই করেনি। ফলে ট্রেন বন্ধ করে রাখার একটিই উদ্দেশ্য থাকতে পারে। আর সেটি হলো ভারতীয় রেলকে নাম মাত্র মূল্যে দেশী বিদেশী কোম্পানি’র কাছে বিক্রয় করে দেওয়া। সরকার লকডাউনের সময় থেকে ট্রেন বন্ধ করে রেখে যে যে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করেছে এবং করছে। তাতে দেওয়াল লিখন সুস্পষ্ট। ভারতীয় রেলের সম্পত্তি সরকারী মদতে বেহাত হয়ে যেতে আর দেরি নাই। ভারতবর্ষে সরকারী রেল পরিসেবা সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার সাথে সরাসরি যুক্ত। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে বেসরকারী কোম্পানীগুলি যাতে রেলের সম্পত্তিকে ব্যবহার করে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের জন্য সাধারণ জনতাকে শোষণ করতে পারে, দেশের সরকারের এখন লক্ষ্য, ক্ষমতায় থাকতে থাকতে সেই ব্যবস্থাই পাকা করে দিয়ে যাওয়া।


আশ্চর্য্যের বিষয় সরকার বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলিও এই বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছে। সরকারের ফন্দির বিরুদ্ধে মানুষের স্বার্থ রক্ষায় তারা ট্রেন বন্ধের বিষয়টিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের বিষয় করে তুলছে না। তার একটি কারণ এই হতে পারে, বর্তমান সরকার এই ময়লা কাজটা করে দিয়ে গেলে, পরবর্তীতে সেই কাজের ননী মাখনের ভাগ পেতে তাদেরও অসুবিধা হবে না। জনগণকে ধোঁকা দিতেও সুবিধে হবে এই বলে যে, নোংরা কাজটির সাথে তারা জড়িত ছিল না।


বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই বাজারে একটি কথা চালু করে দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় রেল সম্পূর্ণ ভর্তুকিতে চলছে। আয়ের থেকে ব্যয় অনেক বেশি। এবং এই ভর্তুকি টানতে টানতে সরকার পরিকাঠামো উন্নয়েনর দিকে নজর দিতে পারছে না। ভারতবর্ষে দুর্নীতি নতুন কোন কথা নয়। সচেতন নাগরিক মাত্রেই জানেন দশকের পর দশক জুড়ে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির সংযোগ ও চুরি সংঘটিত হয় ভারতের মিলিটারিতে। জনগণের করের টাকার বেশির ভাগটিই কিছু ক্ষমতাশীল মানুষের পকেট ভারী করে। এবং এই চুরির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানেই নাকি ভারতীয় রেল। সারা দেশের বিনা টিকিটের যাত্রীদের কারণে ভারতীয় রেলের যে ক্ষতি হয়, রেলের সম্পত্তি চুরির কারণে ক্ষতি তার কয়েক হাজার গুন বেশি। সেই চুরি আটকাতে পারলেই অনেকের ধারণা রেলের লাইন সোনা দিয়ে মুড়ে দেওয়া যেত। যাক বা না যাক, ভারতীয় রেল যে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতো। সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক শিবিরই থাকুক। ভারতীয় রেলে চুরির পরিমান প্রতিবছর ব্যাপক হারে বাড়তেই থাকে। যাত্রী ভাড়া ও পণ্যমাশুল বাড়িয়ে তার কিছুটা পূরণের চেষ্টা করা হয় মাত্র। বাকিটা সাধারণ জনতার করের টাকায় ভর্তুকি দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু সেই ভর্তুকি দিলেও সেটার সুবিধাও সাধারণ জনতাই পেয়ে আসছে এতদিন। দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকা নির্ভরশীল ভারতীয় রেলের উপরেই। ফলে এক দিক দিয়ে মানুষের করের টাকায় ভর্তুকি দিলেও, রেলকে ঘিরে সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকারও সুরাহা হয়ে আসছে। এমনটাই চলছে বছরের পর বছর। অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক শিবিরগুলি ভারতীয় রেলের চুরি বন্ধের কোন রকম ব্যবস্থাই গ্রহণ করে না। কারণ সেই চুরির একটা অংশ তাদের দলীয় ফাণ্ডে ঢোকে। এবং সংশ্লিষ্ট কেষ্টবিষ্টুরা সেই অংশ থেকে নিজেদের চৌদ্দ পুরুষের আখের গুছিয়ে নেয়। এটাই ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঐতিহ্য। ফলে সরকারে থাকুক আর নাই থাকুক। কোন রাজনৈতিক দলই এই চমৎকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন সংগঠিত করে না। আজকে সরকারে না থাকলেও। একদিন সরকারে পৌঁছিয়ে গেলে ভারতীয় রেলের সংঘটিত চুরির ভাগ ঠিকই পাওয়া যাবে। একটি দেশে রাষ্ট্র ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে সরকারী মদতেই যদি জাতীয় সম্পত্তির চুরি সংঘটিত হয়ে চলতে থাকে দশকের পর দশক জুড়ে, তাহলে সাধারণ জনতার আর করার কিছুই থাকে না।


সময় কখনোই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। বর্তমান সরকারে থাকা রাজনৈতিক শিবির এই চুরিতেও সন্তুষ্ট নয়। তাই আরও বড়ো চুড়ির পরিকল্পনার নকশা প্রস্তুত করা হচ্ছিল ধাপে ধাপে। কিন্তু করোনার কারণে এদের কাছে একটা সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত হলো। লকডাউনের নামে দেশব্যাপী গোটা রেল সিস্টেম স্তব্ধ করে দিয়ে পূর্ব পরিকল্পনাকে আরও দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা ষড়যন্ত্র তৈরী হয়ে গেল। এই যে লকডাউন উঠে গেলেও ভারতীয় রেল স্বাভাবিক ছন্দে কাজ শুরু করছে না। অধিকাংশ রুটেই ট্রেন চলাচল বন্ধ। এটাই হলো নতুন সেই ষড়যন্ত্রের প্রথম ধাপ। দেশের মানুষকে প্রতিদিনের জীবনে ট্রেনকে বাদ দিয়ে চলার একটা অভ্যাসে রপ্ত করানোর পর্ব চলছে এখন। করোনা না আসলে, এই ভাবে দিনের পর দিন  ট্রেন বন্ধ রাখতে গেলে, সারা দেশ ক্ষোভে ফেটে পড়তো। জনতার ক্ষোভের আগুন প্রশমিত করা যেত না প্রশাসনিক শক্তি প্রদর্শন করেও। কিন্তু এখন এমন একটা সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত যে, সেটিকে ঠিক মতো কাজে লাগাতে পারলেই কেল্লাফতে। সরকারী রেলর বেসরকারী করণ হবেই। আজ হোক বা কাল। এখন বেসরকারী মালিকানায় সেই সেই রুটেই ট্রেন চলবে। যে যে রুটে মুনাফা বেশি লোটা যাবে। অন্যান্য রুট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই যে এক একটি রেলরুট বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা। সেটি করোনা না এলো আদৌ সহজ হতো না। যে রুটই বন্ধ করা হতো। সেই রুটেই আগুন জ্বলে উঠতো। জনতার ক্ষোভের আঁচে রাজনৈতিক পালাবদলও ঘটে যেতে পারতো। কথায় বলে মানুষ অভ্যাসের দাস। একটা চালু রুটে ট্রেনে চলাচল করা মানুষ দুম করে তাদের অভ্যাস বদলিয়ে ফেলতে চাইবে না। কিন্তু করোনা আসায় এই লকডাউনকে হাতিয়ার করে সরকার মানুষের সেই অভ্যাসেই তালাচাবি লাগিয়ে দিল। এখন মাসের পর মাস ট্রেন বন্ধ থাকায়, রুট বন্ধ থাকার নতুন অভ্যাসেই অভ্যস্থ হয়ে যাচ্ছে মানুষ। ফলে বেসরকারী মালিকানায় যে যে রুটে আর কখনোই ট্রেন চলবে না নতুন করে, সেই সেই রুটে ট্রেন চালানোর দাবি কিন্তু আর ততটা জোরালো হবে না। মানুষ ট্রেন বন্ধ থাকার অভ্যাসকে একবার রপ্ত করে নিলে, বিকল্প পথের সন্ধানে মনযোগ দেবে সকলের আগে। ফলে বন্ধরুটে জন বিক্ষো‌ভ দেখা দিলেও প্রশাসনিক তৎপরতায় তাকে দমন করা অনেক সহজ হয়ে যাবে। তাই লকডাউনের মতো এমন একটি তুরুপের তাস হাতে পেয়ে বর্তমান সরকার যে তার পূর্ণ সদব্যবহার করতে উঠে পড়ে নামবে। সে তো বলাই বাহুল্য। দেশজুড়ে লকডাউন উঠে গেলেও দেশজুড়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ার এটাই আসল কারণ। করোনা শুধু যে একটা মিথ্যা অজুহাত তাই নয়। করোনা একটা দুরন্ত হাতিয়ার। সরকারী সম্পত্তি বেচে দেওয়ার ষড়যন্ত্রকারী সরকারের হাতে।


ভারতবর্ষের মতো একটি দেশ। যেখানে নব্বই শতাংশ সম্পদের মালিক দুইজন। আর বাকি দশ শতাংশ সম্পদের ভাগ নিয়ে লড়াই প্রতিযোগিতা বাকি আটানব্বই শতাংশ দেশবাসীর ভিতরে। সেখানে ভারতীয় রেলের বেসরকারীকরণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার উপরে প্রবল প্রভাব ফেলবে। এটা রোধ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, গোটা দেশের প্রতিটি প্রান্তের সাথে একমাত্র সংযোগরক্ষাকারী এই ভারতীয় রেল ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থার সুযোগ ভিখারি থেকে শুরু করে দরিদ্র সীমার নীচে বসবাসকারী মানুষজন পর্য্যন্ত নিতে পারতো। এবং এই নিতে পারাই তাদের অন্যতম অধিকার হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে জীবন জীবিকার প্রশ্নে। যতই লকডাউন আর করোনাকে হাতিয়ার করে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া হোক না কেন। যতই ‌এই সুযোগে মানুষকে বিনা ট্রেনে অভ্যস্থ করে তোলার চেষ্টা হোক না কেন। এই অধিকার হারিয়ে ফেলা সাধারণ জনতা যে খুব সহজে মৌনভাবে মেনে নেবে। না। অতটা আশা করা বাড়াবাড়ি হবে। এখন দেখার সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হয় কিনা। না হলে জীবন জীবিকার অধিকার হারানো কোটি কোটি মানুষ কিভাবে এই ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় অগ্রসর হয়। সেটাই এখন দেখার।


৩১শে অক্টোবর ‘২০২০


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত