জন্ম যদি তব ইংরেজি সাহিত্যের আঁতুরঘরে

 

 

জন্ম যদি তব ইংরেজি সাহিত্যের আঁতুরঘরে


আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জন্ম ইংরেজি সাহিত্যের আঁতুর ঘরে। কথাটা শুনতে প্রথমে খারাপ লাগলেও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে যারা নাড়াচাড়া করেন তারা আরও ভালে জানবেন। পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীন বাংলার সূর্য অস্তমিত হওয়ার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্যের বাঁক বদলের সূচনা। একটা সমগ্র জাতির জীবন ও জীবিকা, শিল্প ও সাহিত্য। ইতিহাস ও সংস্কৃতির অভিমুখ পাল্টিয়ে গেল প্রায় দুই শতকের সময়সীমায়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, বাংলার সমাজজীবন অন্ধকার যুগ পার হয়ে সাগর পারের ব্রিটিশের শাসনেই আলোকিত আধুনিক পর্বে পৌঁছিয়ে ছিল। তার জন্য তারা সর্বতো ভাবেই ব্রিটিশ জাতির কাছে নিজেদের চিরঋণী মনে করেন। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস। ব্রিটিশরা না এলে বাংলা আজও অন্ধকার যুগেই পড়ে থাকতো। বাঙালি আজও অশিক্ষিত রয়ে যেত। বাংলার সমাজ জীবন নানাবিধ কুংসংস্কারের জালে জড়িয়ে প্রায় জড়ভরত হয়ে থাকতো। তাই বাঙালি মাত্রেই ব্রিটিশ জাতির কাছে চিরঋণী হয়ে থাকা উচিত। তাদের এই বদ্ধমূল ধারণার সূত্র ধরে বলা যেতেই পারে, সেই কথাই যদি শেষ সত্য হয়। তবে আমাদের সকলের আগে ঋণ স্বীকার করতে হয় মহামতী মীরজাফরের কাছে। যাঁরা ব্রিটিশ বন্দনা না করে জল স্পর্শ করেন না। তাঁদের অন্তত মীরজাফরের কাছে চির কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। এই ব্যক্তিটি পাশে না দাঁড়ালে সাগর পারের ব্রিটিশের সাধ্য কি ছিল বাংলার স্বাধীনতার সূ্র্য অস্তমিত করে দেওয়ার? এক দিকে আধুনিক বাংলার কারিগর হিসাবে ব্রিটিশের বন্দনা করবো। আর অন্যদিকে পলাশীর প্রান্তরে ব্রিটিশেকে বিজয়ী করার অভিযোগে মীরজাফরের মুণ্ডপাত করবো। না, এটি সম্পূর্ণ দ্বিচারিতা। দুর্ভাগ্যক্রমে অধিকাংশ ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালিই এই দ্বিচারিতাটুকু করে থাকেন। অম্লান বদনে।


ব্রিটিশের কাছে স্বাধীনতা বিসর্জন না দিলে কি হতো। আজকে সেকথা হিসাব করে বিশেষ লাভ নাই। কিন্তু কোন স্বাধীন জাতিই ভাবতে পারে না, বিদেশী জাতির পায়ে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন না দিলে জাতির উন্নতি অসম্ভব। কিন্তু আমরা ঠিক সেটাই মনে করি। আমরা বাঙালিরা তাই আজও ব্রিটিশ আমেরিকানদের এত বড়ো অন্ধ ভক্ত। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, এই ব্রিটিশরা সেদিন আমাদের স্বাধীনতা হরণ না করলে, আজও আমরা অশিক্ষিত পাড়াগেঁয়ে ভুত হয়ে পড়ে থাকতাম। এবং ঠিক এই কারণেই আজকের দিনেও ইংরেজি ভাষা না জানা বাঙালিকে আমরা অশিক্ষিত গেঁও ভুত বলেই মনে করি। এবং তাদের স্বগোত্র বলে মনেও করি না নিজেদেরকে। সেখানেই আমাদের আত্মশ্লাঘা জায়মান থাকে। সচেতন ভাবে তাদের থেকে গা ছোঁয়াছুঁয়ি বাঁচিয়ে নিজেদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে সযত্নে রক্ষা করে থাকি। এই ভাবেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষায় আলোকিত মানুষ হয়ে উঠি আমরা। বংশ পরম্পরায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম। হিন্দু মুসলমানের সাম্প্রদায়িক বিভাজন ছাড়াও বাংলায় বাঙালির আরও দুটি সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে। একটি সম্প্রদায় হলো ইংরেজি জানা শিক্ষিত সম্প্রদায়। অন্যটি ইংরেজি না জানা অশিক্ষিত সম্প্রদায়। এই যে ইংরেজি জানা ও না জানার হাত ধরে একটি সমগ্র জাতির ভিতর দুইটি সম্প্রদায়ের জন্ম। এই ঘটনার সূত্রপাত সেই পলাশীর প্রান্তরের বিশ্বাসঘাতকতার হাত ধরেই।


হ্যাঁ। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জন্ম কিন্তু এই ইংরেজি জানা বাঙালি সম্প্রদায়ের হাত ধরেই ঘটেছিল। আজও বাংলা সাহিত্য সেই একই সম্প্রদায়ের হাতে এগিয়ে চলেছে। ফলে খাঁটি বাংলা সাহিত্যের মৃত্যু হয়ে গিয়েছে সেই পলাশীর প্রান্তরেই। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, এই ইংরেজি জানা বাঙালি সম্প্রদায়ের আত্মবিকাশের ইতিহাসও বটে। আধুনিক বাংলা সাহিত্য মূলত ইংরেজি সহ ইউরোপীয় সাহিত্যের নকল নবিশি চর্চা। সেই চর্চার ইতিহাস প্রায় আড়াইশো বছরের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারীই আমরা। সেই ইতিহাসকেই আমরা বাংলার ঐতিহ্য বলে চালিয়ে নিয়ে এসেছি। ঐতিহ্য তো বটেই। শক্তিশালী বিদেশী জাতির কাছে বশ্যতা স্বীকারের ঐতিহ্য আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি। দক্ষিণ ভারতের সেন রাজাদের কাছে বাঙলার স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়ে যে সংস্কৃতির সূত্রপাত। এই যে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বিদেশী সংস্কৃতির জৌলুসের কাছে মাথা নত করা। এটিই আমাদের ক্রমাগত আধুনিক করে রাখে সময়ের সাথে্ কালের সাথে যুগের সাথে। আমার সত্যই জানা নাই। বিশ্বে এমন নজীর অন্য কোন জাতির জীবনে আর আছে কিনা?


বাংলার এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেই বাংলার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশ ও অগ্রগতি। এবং বিশেষত আধুনিক বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাই বিপুল ভাবেই ইংল্যাণ্ড তথা ইউরোপীয় সংস্কৃতির কাছে ঋণগ্রস্ত। এই যে ইংরেজি জানা বাঙালি সম্প্রদায়। তারাই মুলত ইউরোপীয় ঘরানার নকল নবিশি করে পুষ্ট করে তুলেছে আধুনিক বাংলার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির দিগন্তকে। ফলে আজকের বঙ্গসংস্কৃতি আসলেই ইউরোপীয় সংস্কৃতির নকল নবিশি মাত্র। একটা গোটা জাতির শিক্ষিত সম্প্রদায়ের হাতে সম্পূর্ণ নকল নবিশি সাহিত্য সংস্কৃতি শিল্পের বিকাশ এই বাংলায় ছাড়া বিশ্বে আর কোথাও ঘটছে কিনা জানা নাই। তবে এই ঘটনা যে সত্যই অভিনব। সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। এখন এই নকল নবিশি সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে দেশজ শিকড়ের সংযোগ কতটুকু। আর কতখানি নিরালম্ব এই নকল নবিশি সাংস্কৃতিক চর্চা। সেটি অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের গবেষণার বিষয়।


কিন্তু আমাদের স্বীকার করতে দ্বিধা নাই। বাংলা সাহিত্যের জন্ম কিন্তু সেই ইংরেজি সাহিত্যের আঁতুর ঘরেই। হ্যাঁ হেম মধু বঙ্কিম নবীন থেকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ শরতচন্দ্র নজরুল জীবনানন্দ তারাশঙ্কর বিভূতি মানিক সকলেরই জন্ম ইংরেজি সাহিত্যের আঁতুর ঘরেই। সকলেই জীবন ও জগৎকে পর্যবেক্ষণ করেছেন সেই ইউরোপীয় দৃষ্টিকোণের নকল নবিশি করেই। স্বভাবতঃই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি তাঁদের জগৎ নিরীক্ষণ বিশ্ববীক্ষা সবই অসম্পূর্ণ? না, এক কথায় তার কোন উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন নতুন ভাবে স্বচ্ছ দৃষ্টিকোন থেকে বাংলা সাহিত্যের এই আধুনিক কালের উপরে নিরন্তর গবেষণ করা। সে কাজ সাহিত্যের বিশেষজ্ঞদের। আমরা কেবল প্রশ্নের সামনে দাঁড় কারাতে পারি নিজেদেরকে। আমাদের প্রিয়তম এই সকল সাহিত্য মহারথীদের সাহিত্য সাধনা এই নকল নবিশি ঘরণার সাথে দেশজ ঐতিহ্যের মেলবন্ধন করতে সক্ষম হয়েছিল কিনা,  পাশ্চাত্যের দীক্ষা ও প্রাচ্যের আত্মার সাথে সমন্বয় করতে সক্ষম হয়েছিল কিনা। সেটি গভীরতর গবেষণার বিষয়। গবেষণার বিষয় এটিও, বিদেশী একটি ভাষার উপরে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চায় কতটুকু নিজস্বতা রক্ষা করা সম্ভব সেই বিষয়টিও। আমাদেরকে বুঝতে হবে। আজকের এই একবিংশ শতকের তৃতীয় দশকের গোড়ায় দাঁড়িয়ে আমাদের যে বাংলা সাহিত্যের চর্চা। সেই সাহিত্যচর্চাও আরও বেশি করে ইংরেজি ভাষার উপরে নির্ভরশীলতার ভিতের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। যিনি ইংরেজি ভাষাটিই জানেন না। তিনি কি বাংলা সাহিত্যচর্চায় ব্যাপৃত? ইংরেজি না জানা কোন সাহিত্যিকের সাহিত্য কি আমাদের বাংলায় বিশেষ কোন প্রভাব ফেলতে পেরেছে? এই সমসাময়িক সময়ে? আমরা জানি এই প্রশ্নটিই সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। বস্তুত ইংরেজি না জানা, ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যের সাথে অপরিচিত কোন বাঙালি এই সময়ে বাংলা সাহিত্যচর্চায় ব্যপৃত, এমন কথাটি কল্পনা করাও দুরূহ। ফলে আমাদের ভিতর আজও যারা বাংলা সাহিত্যের দিগন্তে নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তারাও ঘুরপাক খাচ্ছেন তাদের ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যবোধের চারপাশেই। এই বাংলার মাটি জল হাওয়া। বাংলার দুই হাজার বছরের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে তাদের সংযোগসুত্র আছে কি আদৌ? নাকি আমরা ধরেই নিয়েছি। সেই সংযোগসূত্রের কোন প্রাসঙ্গিকতাই নাই আর। আমরা হয়তো মনে করছি, আজকের বাংলা সাহিত্যচর্চাকে আন্তর্জাতিক মানের অভিমুখে পৌঁছিয়ে দিতে সেই সংযোগসূত্রের কোন প্রয়োজনই নাই। বরং আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে সেই সংযোগ‌সূত্রই হয়ে উঠতে পারে মস্ত বড়ো এক প্রতিবন্ধক। এমনটাই কি বিশ্বাস করি না আমি আপনি?


বলা যেতে পারে আমাদের এই বিশ্বাসের ভিতের উপরেই হয়তো আজকের বাংলা সাহিত্যচর্চার দিগন্ত দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফলে আরও বেশি করে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের কাছে ঋণ জমে যাচ্ছে আমাদের। যত বেশি ঋণ জমছে। তত বেশি করে নকল নবিশি করে চলেছি আমরা। ইংরেজি সাহিত্যের আঁতুরঘরে জন্ম নেওয়া এই বাংলা সাহিত্য তাই এক নিরালম্ব শিকড়হীন অস্তিত্বের ভিতর দিয়েই পরাশ্রয়ী পরজীবী লতাগুল্মের মতো বেড়ে উঠছে। যার নিজস্ব কোন সুদৃঢ় কাণ্ড নাই। হয়তো ঠিক এই কারণেই বিশ্বে সাহিত্যে আজও বাংলা সাহিত্যের কোন প্রভাব পড়ে নি। আজও আবিশ্ব সাহিত্যপ্রেমী মানুষের কাছে বাংলা সাহিত্য বস্তুত সম্পূর্ণ অপরিচিত। বিশ্ব জুড়ে দেশ বিদেশের সাহিত্য নিয়ে নিরন্তর চর্চার দিগন্তে আজও প্রবেশ করতে পারে নি আমাদের এই ইংরেজি সাহিত্যের আঁতুরঘরে জন্ম নেওয়া বাংলা সাহিত্য। হয়তো টিক এই কারণেই উন্নত বিশ্বের সাহিত্যে বাংলা সাহিত্য এত কম অনুদিত। এত কম প্রচারিত। কারণ তার হয়তো দেওয়ার মতো কো‌ন নিজস্বতা গড়ে ওঠে নি আজও। সে ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যের যে নকল নবিশি কর্মে ডুবে রয়েছে, তাতে বিশ্বের সাহিত্যসভায় দেওয়ার মতো কোন রসদই সেই সৃষ্টি করতে পারে নি আজও। তাই বিশ্ব সাহিত্যে আজও বাংলাসাহিত্য অনালোচিত রয়ে গিয়েছে। এই পরিণতি নিশ্চয়ই কাম্য ছিল না বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম এই বাংলা ভাষার সাহিত্যের। এই পরিণতি ঘটছে আমাদেরই শিক্ষার অভাবে। আমাদেরই অন্ধভক্তিতে। আমাদেরই অজ্ঞানতায়। আমাদের সার্বিক পরাধীন মানসিকতার পরনির্ভরতায়।


৩০শে অক্টোবর ‘২০২০


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত