রবীন্দ্রনাথ ও মৌলিক সৃষ্টি

 

 

রবীন্দ্রনাথ ও মৌলিক সৃষ্টি


আমাদের এত গর্বের যে রবীন্দ্রসাহিত্য। যে সাহিত্য আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছিয়ে দিয়ে গিয়েছে এবং পরবর্তী বাংলা সাহিত্যকে পুষ্টি জুগিয়ে চলেছে নিরন্তর এবং দুর্বার গতিতে। সেই রবীন্দ্রসাহিত্য কি মৌলিকত্বের দাবি করতে পারে? রবীন্দ্রসাহিত্য কি আদৌ মৌলিক সাহিত্য? অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ যা দিয়ে গেলেন। তার কোন পূর্বসুরী ছিল না? একেবারেই আনকোরা নতুন এমন এক সাহিত্য, যা সাহিত্যবিশ্বে রবীন্দ্রনাথই প্রথম নিয়ে আসলেন? জানি না এমন আনকোরা প্রশ্নের সম্মুখীন কজন হয়েছেন। যতদূর সম্ভব, রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে এমনই স্পর্শকাতর একটি বিষয় যে, এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চাইবেন না হয়তো অনেকেই। কিন্তু একটু মনযোগ দিয়ে রবীন্দ্রসাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ করলে আমাদের হয়তো অবাকই হতে হতো। অবাক হতে হবে দুই দিক দিয়েই। একদিক দিয়ে আমরা দেখতে পাবো রবীন্দ্রসাহিত্যে মৌলিকতার ধারণাটি খুব একটা শক্তপোক্ত কিছু না। অনেকটাই কল্পনা মিশ্রিত অন্ধভক্তিজাত। অবাক হতে হবে দ্বিতীয় যে দিকটি দিয়ে, সেটি হলো রবীন্দ্রনাথ প্রায় অবিশ্বাস্যভাবেই একার হাতে পূর্ববর্তী ভরতীয় সাহিত্যধারার সাথে ইউরোপীয় সাহিত্যধারার এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করে উপহার দিয়ে গিয়েছেন আমাদের। তাঁর অনন্য সাহিত্যকীর্তির মধ্যে দিয়ে। জন্ম নিয়েছে আধুনিক নাগরিক বাংলা সাহিত্যধারা।


রবীন্দ্রনাথের যে অনন্যকীর্তির জন্য নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি। সেই গীতাঞ্জলি কাব্যকে কোনভাবেই কোনদিক দিয়েই মৌলিক কোন সাহিত্যকীর্তি বলার উপায় রাখেন নি কবি। আমাদের মনে রাখতে হবে পিতার হাত ধরে কবি, বালক বয়সেই পরিচিত হয়েছিলেন উপনিষদের সাথে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বিশেষ করে তাঁর এই সন্তানটিকে উপনিষদের গূঢ় তত্বের সাম্রাজ্যে নিজের হাতে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে এক দিকে ঠাকুর বাড়ীর পরিবেশ অন্য দিকে পিতার হাত ধরে সরাসরি উপনিষদের জগতের ভিতর দিয়ে বড়ো হয়ে ওঠার একটি চমৎকার সুযোগ পেয়েছিলেন আমাদের কবি। হ্যাঁ এটাও ঠিক তারই পাশাপাশি পাশ্চাত্য সাহিত্য ও দর্শনের সাথেও একই সাথে পরিচিত হচ্ছিলেন কিশোর রবীন্দ্রনাথ। ফলে প্রথম থেকেই তাঁর মনের গঠনে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের একটা সমন্বয় গড়ে ওঠার অবকাশও পেয়েছিল। সেই রবীন্দ্রনাথ যখন গীতাঞ্জলি পর্বের কবিতাগুলি সৃষ্টি করে চলেছিলেন। তখন তাঁর ভিতরে প্রাচ্যের দর্শন ও পাশ্চাত্যের সাহিত্য প্রকরণের একটা অপূর্ব মিলনখেলা জায়মান হয়ে উঠছিল। সেই মিলন খেলারই অপরূপ সৃষ্টি কবির গীতাঞ্জলি পর্বের কবিতাগুলি। যেগুলি আরও বিস্তৃত হয়ে গীতালি ও গীতিমাল্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই পর্বে কবির আধ্যাত্ম চেতনায় উপনিষদের সত্য তাঁর সৃষ্টিকর্মে পাশ্চাত্য কাব্যধারার প্রকরণের ভিতরে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেখা দিচ্ছিল। অর্থাৎ এই গীতাঞ্জলি পর্বের সাহিত্যকীর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে উপনিষদের সত্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত হয়েই। কিন্তু তার অপরূপ প্রকাশ ঘটেছে ভিক্টোরীয় কাব্যধারার প্রকরণকে আত্মস্থ করেই। এবং এইভাবেই কবি তাঁর কাব্যধারায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভিতর যে সমন্বয় সাধন করে নিয়েছিলেন। তাকে আমরা নাম দিতে পারি রাবীন্দ্রিক। লক্ষ্য করার বিষয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী ইউরোপীয় সমাজ বাস্তবতায় কবির যে জনপ্রিয়তা ছিল, তার মূলে ছিল এই সমন্বয় সাধনই। সেই সময়ের ইউরোপীয় মানস গীতাঞ্জলিতে এক অভুতপূর্ব ঔপনিষদিক সত্যে বিভোর হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছিল গীতাঞ্জলির ভিক্টোরীয় ঘরানার প্রকাশভঙ্গিতেই। ফলে ইউরোপের কাব্যপ্রেমী সাহিত্যপ্রেমীরা খুব সহজেই কবির কাব্যধারার মধ্যে দিয়ে ঔপনিষদিক সত্যের স্পর্শলাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। পাশ্চাত্যে গীতাঞ্জলির জনপ্রিয়তার মূল কারণ এইখানেই নিহিত। কবির কাব্য সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছিল জার্মানে। তারপর স্পেন ও রাশিয়ায়। ইংল্যাণ্ডে তাঁর কাব্য যতটা জনপ্রিয় হতে পারতো ততটা না হওয়ার একটাই কারণ, কবি যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পদানত দেশর সন্তান ছিলেন। সেই বিষয়টা ব্রিটিশ পাঠকের অবচেতন থেকে দূর হওয়ার কথাও ছিল না। হয়ও নি। কিন্তু ইউরোপের অন্যান্য দেশের সাহিত্যপ্রেমীদের মননে সেই প্রতিবন্ধকতা ছিল না। থাকার কথাও নয়।


আমাদের সামান্য এই আলোচনায় একটা বিষয় কিছুটা পরিস্কার হলো নিশ্চয়। যে অনন্য কীর্তির জন্য কবির নোবেল লাভ। সেই গীতাঞ্জলিই কবির মৌলিক কোন সাহিত্যকীর্তি নয়। উপনিষদের সত্যকে কবি নতুন যুগের সুরের ভেলায় ভাসিয়ে পাশ্চাত্য সাহিত্যধারার প্রকরণের মাধ্যমে পরিবেশন করেছেন মাত্র। তাঁর অনন্যকীর্তি এইখানেই যে, গোটা কাজটির ভিতর দিয়ে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শন ও সাহিত্যধারার যে সমন্বয় সাধন করলেন। সেটি কিন্তু রাবীন্দ্রিক। অর্থাৎ একান্তই তাঁর নিজস্ব। যদিও আমরা স্মরণের রাখবো নিশ্চয়, কবির এই কীর্তির অনেক আগেই মাইকেল মধুসূদনও কবির মতো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমন্বয় সাধনের কাজ করে গিয়েছিলেন। তাঁর মতো করে। আমরা পেয়েছিলাম বাংলা সাহিত্যে নতুন এক ওজস্বিতা।


বাংলার বাউল সম্প্রদায়ের এক অংশের দাবি, কবি লালন শাহ’র থেকেই গীতাঞ্জলির সারাৎসার আত্মস্থ করেছিলেন। তার একটা কারণ রয়েছে। ঔপনিষদিক যে সত্য গীতাঞ্জলির প্রাণসত্তা। সেই একই সত্তা বাংলার বাউল সম্প্রদায়ের পরম্পরার ভিতর দিয়ে লালন শাহে এসে পরিণত সত্তায় বিকশিত হয়ে উঠেছে। ফলে লালন আর গীতাঞ্জলি সমান্তরাল প্রবাহের মতো বয়ে চলছে। কিন্তু এখানেই শেষ কথা নয়। কবির নির্দেশে আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন মধ্য যুগের সাধক কবি দাদূ’র উপরে গবেষণা শুরু করেন। এবং কবিরই উৎসাহে দাদুর উপরে তিনি যে গবেষণা গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। সেই গ্রন্থ পাঠ করলে অবাক বিস্ময়ে পুলকিত হয়ে ওঠা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। গীতাঞ্জলির রবীন্দ্রনাথ ও দাদূকে পরস্পর সহদোর বলে মনে হতে থাকে। গীতাঞ্জলির আরাধ্য দেবতা ও দাদূর আরাধ্য দেবতা কখন যে একাকার হয়ে পরস্পরের ভিতর লীন হয়ে যায়, নিবিষ্ট পাঠকের পক্ষেও খেয়াল রাখা মুশকিল। ক্ষিতিমোহনের বিখ্যাত বইটি পাঠ করার সৌভাগ্য যাঁদের হয়েছে তাঁরা সহমত হবেন আশা করি। অবাক করার মতো বিষয় হলো। এক গীতাঞ্জলিতেই উপনিষদএর সত্য, বাংলার বাউলধারা এবং মধ্যযুগের কবি দাদূর দোঁহা সব কিছুর সারাৎসার নিহিত হয়ে আছে যেন। এবং সেখানেও আশ্চর্য এক সমন্বয়। আসলেই আমাদের কবি ছিলেন সমন্বয়ের শ্রেষ্ঠ সাধক। তাঁর আজীবন জীবন সাধনায় তিনি সভ্যতার যা কিছু শ্রেষ্ঠ, তার বিভিন্ন ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের ভিতর এক সমন্বয়ের সূত্র গ্রথিত করে দিয়ে গিয়েছেন যেন। এই সমন্বয় সাধনাই রবীন্দ্রনাথের সব থেকে বড়ো পরিচয় বলে মনে হয়।


তাই সমন্বয়ের সাধক আমাদের রবীন্দ্রনাথ হয়তো মৌলিক সৃষ্টির দিকে এগোন নি। কিন্তু তার থেকেও অনেক বড়ো কাজেই আজীবন ব্যয় করে গিয়েছেন তিনি। অনেকেই নিশ্চয় মনে করছেন। কবির গীতাঞ্জলি সমগ্র রবীন্দ্রসৃষ্টির একটি অংশ মাত্র। তাই সেই গীতাঞ্জলি পর্বের রবীন্দ্রনাথ দিয়ে সমগ্র রবীন্দ্রনাথের বিচার হতে পারে না। অবশ্যই পারে না। কবি বার বার কিভাবে নিজেকে ভেঙে আবার নতুন করে নিজেকে গড়ে নিয়েছেন। তার ইতিহাস তাঁর সমগ্র সাহিত্যকীর্তিতেই শুধু নয়। তাঁর গোটা জীবনের ইতিহাসেই স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ রয়ে গিয়েছে। সেই নানা রবীন্দ্রনাথের একখানি মালায় অজস্র মনিমাণিক্য জুড়েই আমরা দেখতে পাবো এই সমন্বয়ের লীলা। এখন আমাদের রবীন্দ্রনাথ কি সত্যি করেই মৌলিক কোন সাহিত্যকীর্তি উপহার দিয়ে যান নি আমাদের? সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞের অভিমত দিতে পারেন একমাত্র রবীন্দ্র গবেষকরাই। আমরা বরং আরও নিবিড় ভাবে নিবিষ্ট চিত্তে নতুন করে কবির সাহিত্যকর্মে ডুব দিতে পারি। অন্তত চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জের মতো আমরাও তো খোঁজ করতে শুরু করতে পারি। দেখাই যাক না। সত্যই কোথায় কবির’র মৌলিকত্ব। আর ক‌োথায় তাঁর সমন্বয় সাধনা।


এবং তখনই হয়তো আমরা মেলাতে পারব। ডারউইনের মতো, ফ্রয়েডের মতো, মার্কসের মতো, ঋষি অরবিন্দের মতো, ডি এইচ লরেন্সের মতো আমাদের রবীন্দ্রনাথও কি মৌলিক কোন দর্শন, সাহিত্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, মতবাদ, সৃষ্টি করে গিয়েছেন? কবি নিজে যদিও বার বার জানিয়ে গিয়েছেন আমাদের, তিনি দার্শনিক নন। তিনি কবি। তাই কোন মৌলিক দর্শন সৃষ্টি করার দায় তাঁর ছিল না নিশ্চয়। ছিল না রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোন মৌলিক তত্ব খাড়া করার দায়ও। কিন্তু সাহিত্য ক্ষেত্র? সেখানেও কি সম্পূর্ণ মৌলিক সৃষ্টির কোন দায় ছিল না আমাদের প্রিয় কবির? অন্তত রবীন্দ্র অনুরাগী ভক্তবৃন্দরা কি বলেন? এই প্রসঙ্গে স্মরণে আসতে পারে, বিখ্যাত রাশিয়ান সাহিত্যিক আলেকজাণ্ডার পুশকিন সম্বন্ধে বলা হয়, পুশকিন পূর্ববর্তী রাশিয়ান সাহিত্যের সকল ধারা উপধারা এক পুশকিনেই এসে মিশেছে। আর পুশকিন পরবর্তী রাশিয়ান সাহিত্যের সকল ধারা উপধারা সেই পুশকিন থেকেই প্রবাহিত হয়েছে। আমাদের প্রাণের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধেও ঠিক একই কথা বলা যায়। বাংলাসাহিত্যে কবির সঠিক অবস্থান নির্ণয়ের বিষয়ে। আর তখনই কি মনে হয় না, রবীন্দ্রসাহিত্য কতটা মৌলিক কি মৌলিক নয়, সেই প্রশ্ন তখন আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ থাকে না?


৩০শে অক্টোবর ‘২০২০


কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত