ভারতবর্ষ ২০২০
হ্যাঁ এটাই ভারতবর্ষ ২০২০। প্রশাসন ধর্ষিতার মৃতদেহ হাসপাতাল থেকে লুকিয়ে নিয়ে এসে জ্বালানী তেল ঢেলে পুড়িয়ে দিল। ধর্ষিতার পরিবারকে শাস্ত্রবিধি মতে দাহ করতে দিল না। গোটা পরিবারকে বাড়িতে আটকিয়ে রেখে গভীর রাতের অন্ধকারে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে অপকর্মটি সারা হলো। জানা গেল না, ধর্ষিতার সঠিক পোস্টমর্টেম করা হয়েছে কিনা। শোনা যাচ্ছে মৃতের পরিবার থেকে পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট দেখতে চাইলে, প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের তরফ থেকে ব্যাঙ্গোক্তি নিক্ষেপ করা হয়, ইংরেজি জানে কিনা যে রিপোর্ট দেখবে, এই কথা বলে। মৃতের ফরেনসিক তদন্ত করা হয়েছে কিনা আদৌ, কেউ জানে না। সম্ভবত হয়নি। সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। বিধিমতো ধর্ষিতার পরিবারের হাতে ধর্ষিতার মৃতদেহ তুলে দেওয়া হলো না কেন? খবরে প্রকাশ, প্রশাসনিক তৎপরতায়, হাসপাতাল থেকে ধর্ষিতার মৃতদেহ নিয়ে পুলিশ রওনা দেয় বাড়ির লোকের চোখের আড়াল দিয়ে। প্রশ্ন উঠছে এই লুকোচুরি কেন? কেন সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের সামনে নিরুত্তর থাকে পুলিশের আধিকারিকরা। গভীর রাতে সকলের আড়ালে ধর্ষিতার মৃতদেহ পোড়ানোর সময় সংবাদমাধ্যমকে অকুস্থলে যেতে বাধা দেওয়া হয়। এবং তারপর দিনকয়েকের যে নাটক প্রত্যক্ষ করলো ভারতবাসী, সেটি ভারতের মতো একটি চরম দুর্নীতিযুক্ত দেশেও অভিনব।
ধর্ষকদেরকে নয়, ধর্ষিতার পরিবারকেই নিগৃহীত হয়ে অবরুদ্ধ থাকতে হলো গৃহবন্দী হয়ে। বিশাল পুলিশবাহিনী দিয়ে উত্তরপ্রদেশ সরকার ধর্ষিতার গ্রামকে যেভাবে কয়েকদিন অবরুদ্ধ করে রাখলো, সেটি বিশ্বের ইতিহাসেও নজীরবিহীন ঘটনা। এবং সব কিছুই ঘটল যোগীর রামরাজত্বে। এই সেই রাজ্য যেখানে মসজিদ ভাঙার বিচারে বেকসুর খালাস পায় সকল অভিযুক্তরা। এই সেই রাজ্যে, যেখানে রামমন্দির নির্মাণ, দেশ নির্মাণের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সেই রাজ্য, যেখানে মুহুর্মুহু ধর্ষিত হয় নারী। এই সেই রাজ্য যেখানে, যেখানে সেখানে পিটিয়ে মারা হয় সংখ্যালঘুদের। এবং এই সেই রাজ্য, যেখানে দলিত শ্রেণী মানুষদের জীবন কাটে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের মতো। ধর্ষিতা মনীষা বাল্মিকী সেই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। প্রথম শ্রেণীর ঠাকুরদের হাতে ধর্ষিতা হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লো অকালে। এবং ভারতবর্ষে জাতপাতের রাজনীতির স্বর্গই হলো উত্তরপ্রদেশ।
বিশ্বের ইতিহাসে ধর্ষকদের সমর্থনে মিছিল হাঁটার মানুষ খুব কম পাওয়া যাবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মতোন রাজ্যে ধর্ষকদের সমর্থনে মিছিল ডাকলে মানুষের অভাব হয় না কখনো। হাতরসের ঘটনাতেও হলো না। সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ধর্ষকদের সমর্থনে বিশাল মিছিল ধর্ষিতা মনীষা বাল্মিকীর বাড়ির সামনে দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতির এই ঘটনা, একবিংশ শতকের ভারতবর্ষের মুখ পুড়িয়েছে সুন্দর ভাবেই। এখন গোটা দেশ জুড়ে নির্ভয়া কাণ্ডের সাথে মনীষা বাল্মিকীর ধর্ষণ ও মৃত্যুর তুলনা হচ্ছে। আরও বেশি করে হচ্ছে, কারণ নির্ভয়া কাণ্ডে, ধর্ষিতার কন্যাহারা পিতামাতার পক্ষ নিয়ে মামলা লড়েছিলেন যিনি, তিনিই এই ঘটনাতেও ধর্ষিতা ও খুন হওয়া মনীষা বাল্মিকীর পরিবারের হয়েই মামলা লড়তে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু সেই তাঁকেই উত্তরপ্রদেশের পুলিশ ও প্রশাসন প্রথম দিন ধর্ষিতার গ্রামেই ঢুকতে দেয় নি। নির্ভয়া কাণ্ডের সাথে এই ঘটনার মূল পার্থক্য একটি জায়গাতেই। সেটি হলো দলিত বনাম উচ্চবর্ণের বিভেদ জনিত জাতপাতের রাজনীতি। ফলে সেই রাজনীতির ফাঁদ কেটে দলিত কন্যা ন্যায় বিচার পাবে কিনা আশা করা শক্ত। ইতিমধ্যেই রাজ্যের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ধর্ষকদের বাঁচানোর জন্য রাজনীতির ঘুঁটি সাজানো শুরু হয়ে গিয়েছে। এবং ধর্ষিতার মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে সরকারী প্রশাসনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডই স্পষ্ট ইঙ্গিত করছে, প্রশাসনিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ লোপাটের পাকা বন্দোবস্ত করা হয়েছে। ফলে প্রমাণের অভাবে ধর্ষকদের বেকসুর খালাস করিয়ে নিয়ে আসা মনে হয় খুব কঠিন হবে না, উত্তরপ্রদেশের সরকারের পক্ষে। এখানেই উত্তরপ্রদেশের জাতপাতের রাজনীতির মুখ্য ভুমিকা। এবং দলিত শ্রেণীর উপরে দমন পীড়নের আবহমান ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।
বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে বর্ণ হিন্দুত্ববাদের যে উন্মুক্ত দাপট দেখা যাচ্ছে, এবং তার পিছনে যে বিপুল জনসমর্থন বর্তমান, তাতে এই বর্ণ হিন্দুত্ববাদকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেও উত্তরপ্রদেশে কোন দলের পক্ষে রাজনীতি পরিচালিত করা সম্ভব নয়। ফলে দলিত কন্যার ন্যায় বিচারের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি কতদূর অব্দি এগোতে চাইবে, সন্দেহ রয়েছে। উত্তরপ্রদেশের সরকার ঠিক এই সুযোগটাই নিতে চাইছে। এবং ধর্ষণের প্রমাণ লোপাটের বিষয়ে প্রশাসনিক তৎপরতার যে অভিযোগ উঠে আসছে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের পক্ষ থেকে, সেই অভিযোগ সত্যি হলে তার আসল কারণ এইখানেই। ক্ষমতাসীন সরকার জানে এই ঘটনায় তারা যদি উচ্চবর্ণের ধর্ষকদের আইনের আওতা থেকে রক্ষা করতে পারে, তাহলে বর্ণহিন্দুত্বাবাদী রাজনীতিতে তারা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হবে। মনীষা বাল্মিকী ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ধর্ষকদের আড়াল করা উত্তরপ্রদেশের সরকারের কাছে এই কারণেই এতটা গুরুত্বপূর্ণ্।
ভারতবর্ষের বর্তমান সময়ের এই বর্ণহিন্দুত্ববাদী আধিপত্যের সাথে সরাসরি মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে নাৎসী জার্মানীর নাৎসীবাদের। সেখানে লক্ষ্য ছিল ইহুদী ও কমিউনিস্ট নিধন। আবার বিগত আট দশক জুড়ে ইজরায়েলী ইহুদীবাদ ঠিক একই ভাবে প্যালেস্টাইনের মুসলিমদের নিধন ও নিপীড়ণ চালিয়ে যাচ্ছে মার্কীণ মদতে। অর্থাৎ যখানেই জাতপাত কিংবা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার আধিপত্য, সেখানে সংখ্যাগুরুদের আধিপত্যবাদের শিকার হতে হয় সংখ্যালঘুদের। ভারতবর্ষে দলিতদের উপরে উচ্চবর্ণের নিপীড়ণ নতুন কোন ঘটনা নয়। শত শত বছর ধরে চলে আসা একটি ঐতিহ্য। কিন্তু বর্ণহিন্দুদের দেশব্যাপী হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার এমন উদগ্র প্রয়াস বছর ছয় সাতের ঘটনা। সেই প্রয়াসে তাদের আসল লক্ষ্য ভারতবর্ষে বর্ণহিন্দুরাই প্রথম শ্রেণীর নাগরিকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকবে। এবং তারা থাকবে আইনের উর্দ্ধে। বাকি যারা, আর্থাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সহ দলিতবর্গের জনজাতিরা থাকবে তাদের পায়ের তলায়।
এখন বিশেষ একটি রাজনৈতিক শিবিরের এই মতাদর্শ অধিকাংশ বর্ণহিন্দুত্ববাদীদের কাছেই রামরাজত্ব স্থাপনের নামান্তর। বিশেষ করে যারা জাতপাতের সংস্কৃতির পাঁকে তলিয়ে রয়েছে। এবং যারা যেকোন প্রকারের আধিপত্যবাদের হাত ধরে ক্ষমতা অর্জনের জন্য লালায়িত, তারাও এই বর্ণহিন্দুত্ববাদের একনিষ্ঠ সমর্থক। সেই সাথে নরম হিন্দুত্ববাদীরাও দিনে দিনে এই চরমপন্থীদের পতাকার তলায় জড়ো হচ্ছেন। কারণ তারা বর্ণহিন্দুত্ববাদীদের সুচতুর প্রচারে স্বাধীন বিচারশক্তি বিসর্জন দিয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, ভারতীয় হিন্দুরাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হাতে সংকটে রয়েছে। এখন গোবলয়ের রাজনীতির এই রকম পরিস্থিতিতে কোন রাজনৈতিক দলই সরাসরি এই বর্ণহিন্দুত্ববাদী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারছে না। সাধারণ বর্ণহিন্দুদের ভোট হারাবার ভয়ে। ঠিক এই ফাঁকটাই তুরুপের তাস হয়ে উঠছে গোবলয়ের বর্ণহিন্দুত্ববাদী আধিপত্য কায়েম পন্থীদের। এবং এই শক্তিই গোবলয়ের এই বর্ণহিন্দুত্ববাদকে পশ্চিমবঙ্গ অব্দি সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ২০২১-এর রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনকে মাথায় রেখে।
ফলে একথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথাও নয়। মনীষা বাল্মিকী ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এই বর্ণহিন্দুত্বের আধিপত্যবাদীই নির্ণায়ক ভুমিকা হয়ে উঠতে চলেছে। সেই কারণেই দোষীদের চরম শাস্তির দাবিতে আজ যারা পথে নেমেছেন, তারা নতুন কোন ঘটনা হাতে পেয়ে গেলেই এই দাবি নিয়ে কতদূর অগ্রসর হতে রাজি হবেন সন্দেহ আছে। ভোটের অংকের বাইরে পা রাখার ক্ষমতা ও সাহস কোন রাজনৈতিক শিবিরেরই নাই। লক্ষ্য ও প্রয়োজনও নাই। সব শিবিরেরই মতাদর্শ ভোটের অংক কষে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভ। আর সেখানে সংখ্যাগুরু মানসিকতার গতিপ্রকৃতির বিপরীতে অগ্রসর হয়ে কোন রাজনৈতিক দলই নিজের কবর নিজে খুঁড়তে যাবে না।
ফলে হাতরসের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড
শুধু মাত্র একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, নির্ভয়া কাণ্ডের সাথে
এই ঘটনার মূলগত পার্থক্যের বিষয়টিও। সেই কারণেই রাতারাতি গভীর রাতের অন্ধকারে প্রশাসনিক
তৎপরতায় বিশাল পুলিশ বাহিনী দিয়ে গ্রাম অবরুদ্ধ করে রেখে নির্যাতিতার পরিবারকে গৃহে
আটকিয়ে রেখে জ্বালানী তেল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হলো বাকি সব প্রয়োজনীয় প্রমাণ ইত্যাদি।
ভারতবর্ষের বিচারের দীর্ঘসূত্রীতার ঐতিহ্য মেনে একদিন এই ঘটনা আরও পাঁচটি ধর্ষণ ও খুনের
ঘটনার মতোই প্রচারের আলোর আড়ালে চলে যাবে। বুকে সন্তান হারানোর দগদগে ক্ষত নিয়ে বর্ণহিন্দুত্ববাদের
পায়ের তলায় পিষ্ট হতে পড়ে থাকবে নির্যাতিতার গোটা পরিবার। এটাই ভারতবর্ষ ২০২০।
৫ই অক্টোবর’ ২০২০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

