গণধর্ষণের কবলে

 

গণধর্ষণের কবলে

 ধরুন আপনার কন্যাকে আপনার চোখের সামনে অপহরণ করা হলো। আপনি কিছুই করতে পারলেন না। আইনরক্ষকদের নাগাল পেলেন না। কন্যাকে ধর্ষণ করা হলো। কন্যার জিহ্বা কেটে নেওয়া হলো। কন্যার হাত পা ভেঙ্গে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙ্গে টুকরো করে দেওয়া হলো। রাষ্ট্রের আইনরক্ষক বাহিনী আপনার মেয়েকে মাত্র চারজন ধর্ষকের হাত থেকে বাঁচাতে পারলো না। কন্যা হাসপাতালে ভর্তি হলো। আপনি থানায় গেলেন। পুলিশ এফ আই আর নিতে অস্বীকার করলো। এই অব্দি সবই স্বাভাবিক ছিল। কারণ আপনি ভাগ্যদোষে ভারতীয় নাগরিক। এবং যদি মনীষা বাল্মিকীর অভিভাবকের মতো গোবলয়ের দলিত জনজাতির একজন হতেন। তবে তো কথাই ছিল না। আপনার ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকারই নাই। এটাই ভারতবর্ষ ২০২০।

এবার ভাবুন। আপনার ধর্ষিতা কন্যা পনেরো দিন জীবন মৃত্যুর নাগোরদোলায় দুলতে দুলতে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানলো। পুলিশ আপনাকে আপনার বাড়িতে আটকিয়ে রেখে আপনার কন্যার গায়ে পেট্রোল ঢেলে কন্যার মৃতদেহ পুড়িয়ে দিল। এবং সেই চিত্র আপনি দেখলেন টিভির পর্দায়। এবং আপনি শাস্ত্র মেনে কন্যার সৎকার করতে পারলেন না। আপনি জানতেও পারলেন না। কন্যার মৃত্যুর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট। আপনি দাবি করতে পারলেন না ফরেনসিক তদন্তের। এবং আপনি বাস করছেন ভারতবর্ষে। ২০২০ সালে। হাতে দামী স্মর্টফোনে হাতের মুঠোয় পৃথিবী। বিশ্বের নানা প্রান্তে মুহুর্তেই পারি দিতে পারছেন সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে। অথচ বাড়িতে আটক থেকে মাত্র কয় হাত দূরে কন্যার জলন্ত মৃতদেহের কাছে গিয়ে পৌঁছাতে পারলেন না। কারণ আপনি বাস করছেন স্বচ্ছ ভারতে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সংবাদ মাধ্যম আপনার কাছে পৌঁছাতে গেল। আপনি চাইলেন আপনার মর্মান্তিক কষ্ট ও ন্যায় বিচারের দাবি নিয়ে মিডিয়ার কাছে বক্তব্য রাখতে। নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের কঠোরতম শাস্তির আশায়। কিন্তু বাদ সাধল সেই রাজ্য সরকার। যে রাজ্যে আপনার বসবাস চৌদ্দ পুরুষের। পুলিশ ঘিরে রাখলো আপনার বাড়ি। আপনার পাড়া কিংবা মহল্লা। মাছি গলার উপায় নাই। কেড়ে নেওয়া হলো আপনার এবং আপনার পরিবারের সকলের হাতের স্মার্ট ফোন। বহির্বিশ্বের সাথে তিন চারদিন সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গৃহবন্দী হয়ে রইলেন আপনি। কারণ আপনার অপরাধ, আপনার কন্যার মৃত্যু হয়েছে গণধর্ষণে। আর এদিকে টিভিতে দেখতে পাচ্ছেন, পুলিশ সংবাদ মাধ্যমের কাছে বাইট দিচ্ছে। আপনার কন্যাকে ধর্ষণ করাই হয় নি। শুধু জিহ্বা কেটে নিয়ে হাড়গোড় ভাঙা হয়েছে মাত্র। অর্থাৎ কন্যা আপনার প্রায় ফুলের ঘায়ে মূর্চ্ছা গিয়েছে আর কি।

আপনি টিভির পর্দায় দেখতে পাচ্ছেন, অবশ্য আপনার কেবল কানেকশন যদি পুলিশ ততক্ষণে কেটে না দিয়ে থাকে; দেশের বিরোধী রাজনৈতিক শিবির হামলে পড়ার চেষ্টা করছে আপনার কাছে পৌঁছে সমবেদনা জানাবার জন্য। যাতে পরবর্তী নির্বাচনে পায়ের তলায় হারানো জমি কিছুটা হলেও উদ্ধার করা যায়। আর শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক শিবিরের নির্দেশে বিশাল পুলিশ বাহিনী বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সুযোগসন্ধানী রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ঢুকতেই দিচ্ছে না আপনার পাড়ায়। এবং সেই পুলিশ বাহিনী, যে বাহিনীর টিকিরও দেখা মেলে না। পথে ঘাটে গণধর্ষণ ঠেকাতে। সেই বাহিনী, যে বাহিনী দিন কয়েক আগেই আপনার কাছ থেকে আপনার কন্যার ধর্ষেণর ঘটনার এফ আই আর নিতে আস্বীকার করেছে। আপনার উপরে চাপ আসছে। জেলা পুলিশ সুপার কিংবা জেলা শাসকের কাছ থেকে। গণ ধর্ষণের অভিযোগ প্রত্যাহার করার। আপনাকে বলা হচ্ছে, মিডিয়া রোজ রোজ ক্যামেরা নিয়ে আপনার ধারে কাছে পড়ে থাকবে না। আপনাকে থাকতে হবে পুলিশ ও রাজ্য প্রশাসনের ক্ষমতার বৃত্তেই। আপনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন। কন্যা তো গিয়েছেই। এবার বাকি পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকই হয়তো মুশকিল হয়ে যাবে।

আপনি জানতে পারছেন। গোটা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্য প্রচুর চাপ আসছে রাজ্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহল থেকে। আপনি জানতে পারছেন কোন মিডিয়াকে আপনার ধারে কাছে ঘেঁসতে দেওয়া হচ্ছে না। আপনি বুঝতে পারছেন, প্রশাসন আপনাকে দিয়ে প্রায় অলিখিত মুচলেকায় স্বীকার করিয়ে নিতে চাইবে, প্রশাসনের নির্দেশ মতোই আপনাকে চলতে হবে। বলতে হবে প্রশাসনের নির্দেশমত শিখিয়ে পড়িয়ে দেওয়া কথা। চব্বিশ ঘন্টা সদ্যজাত কন্যার শোক ভুলে মাথার উপরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের সরকারী প্রশাসনিক চাপ আপনি কতটা সামলাতে পারবেন আপনি নিজেই কি জানেন? না, সরকারী ক্ষমতার অলিন্দে আপনার কোন জানাশোনা সোর্স নাই। আপনি বুঝতে পারছেন যুযুদ্ধমান রাজনৈতিক শিবিরের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির মাঝখানেও পড়ে যেতে পারেন। সেই অবস্থা থেকে বাাঁচার একটিই পথ। রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় নির্বাচিত রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসনের আধিকারীরদের নির্দেশ মতো মুখে কুলুপ এঁটে তোতাপাখির মতো কয়টি কথা মুখস্থ আউরিয়ে যাওয়া। তাতে আপনার সদ্যমৃত পরোলকগত কন্যার সদগতি হোক না হোক, আপনি ও আপনার পরিবারের অবশিষ্ট জীবিত সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি কম হবে। অন্তত হবে বলেই আশা করতে পারেন আপনি। দরকারে বলতে হবে কন্যার ধর্ষণ আপনার চোখের সামনে ঘটেনি বলে কাউকে দোষী বলে চিহ্নিত করতে আপারগ আপনি। দরকারে আগের দেওয়া বয়ান বদলিয়ে যাবতীয় অভিযোগ প্রত্যাহারও করে নিতে হতে পারে আপনাকে। আপনি জানেন এবং হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন আপনি বাঁচলে বাপের নাম কেন বলা হয়।

শুধু আপনি বুঝতে পারছেন না। ভাবতেও পারছেন না। রাজ্য প্রশাসনের নির্দেশে কেন একটি গণধর্ষণের ঘটনাকে চেপে যাওয়ার অছিলায় আপনাকে পরিবার শুদ্ধ গৃহবন্দী করে প্রায় পাড়া শুদ্ধ সবাইকে অবরুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে দিন কয়েক। আপনি বুঝতেও পারছেন না, এইভাবে সংবাদমাধ্যমকে আপনার কাছে পৌঁছাতে না দিয়ে আপনাকে গৃহবন্দী করে রাখার খবরকে কেন দেশশুদ্ধ ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রচারের সুবন্দোবস্ত করা হচ্ছে। গণধর্ষণ ভারতবর্ষের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। সেই নিয়ে আমরা কেউই প্রতিদিন মাথা ঘামাই না। ঘামালে আর নিত্যদিনের কাজ কর্ম করে খেতে হতো না। সকলেই মনে করি আমার বাড়ির মেয়েরা সুরক্ষিত নিরাপদে থাকলেই কেল্লাফতে। সোশ্যাল সাইটের সান্ধ্য জলসায়, গণধর্ষণ বরং হাতে গরম একটি আইটেম। নিজের বক্তব্য মেলে ধরবার জন্য। কিন্তু সেই একটি গণধর্ষণ নিয়ে মৃত ধর্ষিতার বাড়ি পরপর কয়দিন বিশাল পুলিশ বাহিনী দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার অভুতপূর্ব কারণটা কিছুতেই আপনি খুঁজে পাচ্ছেন না।

না আপনি খুঁজে পাবেন না। আপনি গোটা খেলাটির একটি বোড়েতে পরিণত হয়ে গিয়েছেন নিজের অজান্তে। আপনি টেরও পাননি আপনার কন্যার গণধর্ষণের তিথির সাথে ভারতবর্ষের ভবিষ্যত জড়িয়ে গিয়েছে। আপনি বুঝবেন কি করে, সদ্য পাশ হওয়া নতুন কৃষিনীতির বিরুদ্ধে সারা দেশব্যাপী কৃষক আন্দোলনের খবরকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়ার কত বড়ো সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে ঐ চারটি ছেলে। যারা আপনার কন্যার উপরে যৌন নির্যাতন চালিয়েছিল। আপনি কি এই সময় হিসাব করতে বসবেন, আঠাশ বছর ধরে চলা বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলার রায়ের খবরকেও এই গণধর্ষণের ঘটনার সুযোগ নিয়ে কেমন আড়ালে ঠেলে দেওয়া হলো? আপনিও জানেন। আপনার বুকের দগদগে ক্ষত জ্বলতেই থাকবে বাকি জীবন। এবং নতুন কোন একটি ঘটনাকে খবরের তুরুপের তাস করে অন্য অনেকগুলি বিষয়কে মানুষের নজরের আড়ালে সরিয়ে দেওয়া হবে। এই যে বৃহত্তর জনমানসে কোন ঘটনাগুলি হইচই করবে। আর কোন ঘটনাগুলি জনমানসের নজর এড়িয়ে যাবে। সেই বিষয়গুলি পরিচালিত হয় রাজনীতির নিয়মেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। এটাই ভারতবর্ষ ২০২০।

জানি আপনার বাড়ির কন্যারা মহিলারা আজও নিরাপদে রয়েছেন। এতসব ভাবার কোন দরকার নাই আপনার। জানি আপনি নিশ্চিত, আপনার রাজ্যে এইসব হবে না হয়তো। কারণ আপনার রাজ্যের শাসনভার অন্য কোন রাজনৈতিক শিবিরের হাতে। কিংবা আপনি হয়তো বিশ্বাসই করেন আপনার রাজ্যে পালাবদলের প্রয়োজন রয়েছে। আপনি নিশ্চয় আশা করেন কেন্দ্রে ও রাজ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতা একই রাজনৈতিক শিবিরের হাতে থাকলে রাজ্যের প্রকৃত উন্নতি হবে। জানি আপনি হয়তো ভুলে গিয়েছেন স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম তিন দশক আপনার রাজ্যেরও সেই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কিংবা আপনার জন্মই হয়তো তার অনেক পরে। ইতিহাসের অত পুরানো নথীপত্র ঘাঁটার সময় নাই আপনার। আপনার দশা হতেই প্রায় ফুটন্ত কড়াই থেকে উনানে ঝাঁপ দেওয়ার মতো। পালাবদলের স্বপ্নে তা দিতেই হয়তো এখন অধিকতর ব্যস্ত আপনি।

কিন্ত উত্তরপ্রদেশের এই ঘটনা নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিতে চলেছে। চলেছে বিশেষ একটি দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজনৈতিক শিবিরের হাত ধরে। গণতন্ত্রের অর্থ যেখানে মুচলেকা দিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারকে বিসর্জন দেওয়ার ভিতরেই। এখন আপনাকে ভাবতে হবে। আপনি কি আপনার রাজ্যেও এই সংস্কৃতিকে এমনই দোর্দণ্ড প্রতাপে নিয়ে আসতে চান? অবশ্যই আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার আছে বইকি সেই রকম একটা কিছু চাইবার। কিন্তু দেখতে হবে, পারবেন তো তারপর এমনভাবেই মুচলেকা দিয়ে নিজের সকল গণতান্ত্রিক অধিকারকে বিসর্জন দিতে। নির্বাচনে মনোমতো রাজনৈতিক শক্তির জয়োল্লাসে উন্মত্ত নৃত্য করতে করতে? হাতে কিন্তু বেশি সময় নাই আর চিন্তা করার মতো।

৩রা অক্টোবর’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তঁক সংরক্ষিত