গোপনাঙ্গের গোপনকথা

 


গোপনাঙ্গের গোপনকথা

ভারতীয় নারীর যৌনাঙ্গ কোন কালেই সুরক্ষিত ছিল না। আজও নাই। বিবাহ নামক একটি প্রথার মাধ্যমে সেই যৌনাঙ্গ ভোগের অধিকার কোন একজন পুরুষের হাতে সমর্পণ করার প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই ভারতীয় নারী আর পাঁচ জন পুরুষের যৌন লালসার শিকার হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করে থাকে। ঘরে বাইরে এই ভাবেই ভারতীয় নারী তার নারী সত্তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে নিয়ে চলেছে। একে ভারতীয় ঐতিহ্য বলে অভিহিত করা যেতে পারে। যে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার ভারতীয় উপমহাদেশের সকল দেশ ও সমাজে বর্তমান। কথায় বলে চোখ বুঁজে থাকলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। তাই ভারতীয় নারীর অরক্ষিত যৌনাঙ্গের এই বাস্তবতার কথা আমরা স্বীকার করি বা নাই করি। তাতে সত্যের রকম ফের ঘটে না কোনভাবেই। ভারতীয় উপমহাদেশের দেশ ও জাতি সমূহের ভিতরে নারীর অবস্থান তাঁর যৌনাঙ্গের পরিস্থির উপরেই নির্ভর করে। এই যে একটা ঐতিহ্য, এই ঐতিহ্যের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ধর্ষণের সংস্কৃতি। আপামর ভারতীয় পুরুষের চিন্তায় নারীর মূল্য নারীর যৌনাঙ্গের সীমানায়। ঘরে বাইরে এই এক মহাসত্যের সাথে বাস করতে হয় নারীকে। একটি গোটা সমাজ। যখন এই একটি মাত্র জানলা দিয়ে নারীর দিকে দৃষ্টি মেলে তাকায়। তখন সেই সমাজের প্রকৃত স্বরূপ বেআব্রু হয়ে পড়তে বাধ্য। সময়ে অসময়ে। তাই নারীর টিকে থাকার লড়াইটা ঘরে বাইরে সর্বত্রই একই গতে বাঁধা।

ধর্ষণ তাই ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ স্বরূপ। সামান্য আইন করে একে বন্ধ করা সম্ভব নয়। যৌনাঙ্গের সীমানার বাইরে নারীর কোন মূল্যই স্বীকৃত নয় যে সমাজে। সেই সমাজে ধর্ষণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই ভারতীয় পুরুষের বেড়ে ওঠা। সে ঘরে আপন স্ত্রী’র সাথে যৌন সংসর্গের দাম্পত্য জীবনযাপনই হোক আর পরকীয়ার শারীরীক সম্পর্কের পথেই হোক। শিশ্নযোনির ঘনিষ্ঠ মিলনমুহুর্তের দাম্পত্যনৃত্যও পুরুষের স্বাধিকারবোধের দ্বারাই সংঘটিত হয়ে থাকে। নারীর ভুমিকা সেখানে তার যৌনাঙ্গের সীমানার বাইরে নয়। এই সত্যটুকু অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে, ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্ষণজনিত মহারোগের উৎসমূলে পৌঁছানো যাবে না। সমগ্র পুরুষজাতির মনস্তত্বের ছবিটা মূলত এক ও অভিন্ন। নারীভোগ্যা ভারতবর্ষ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে ধর্মগুরু। শিল্পপতি থেকে শুরু করে প্রশাসক। এবং দুর্বৃত্ত থেকে শুরু করে মাস্তান মাফিয়া। পুরুষ মনের রসায়নটাই উত্থিত শিশ্নের দুর্বিনীত অধিকার বোধজাত লালসাকেন্দ্রিক শারীরবৃত্তীয় এক প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়াকে শোভন সুন্দর অর্থ বিত্ত বাড়ি গাড়ি ডিগ্রী পেশা ইত্যাদি দিয়ে ঢেকে রাখাকেই আমরা সভ্যতা বলে গর্ববোধ করে থাকি।

এই’যে নারীর যৌনাঙ্গের উপরে শিশ্নের আধিপত্যের মনোবৃত্তি। এই আধিপত্যবাদ ভারতীয় ঐতিহ্যেরই উত্তরাধিকার। ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গস্বরূপ। দাম্পত্য সম্পর্কের সীমা থেকে শুরু করে সমাজের সকল স্তরে এই আধিপত্যবাদের বিস্তার। শিল্পসংস্কৃতির জগত। পেশার জগত। রাজনীতির জগত। ধর্মীয় সংকীর্ণতার জগত। শিল্পবাণিজ্যের জগত। যেখানেই নারীর ছায়াপাত। সেখানেই এই আধিপত্যবাদ ছড়ি ঘুরিয়ে চলেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরেই। দেশের সাধারণ জনমানসে এর প্রভাব মারাত্মক। কি করম মারাত্মক, সেটা বোঝা যায় সিনেমা থিয়েটারে নারীর সম্মানহানীর দৃশ্য রচনায়। এই দৃশ্যগুলি রাখা হয় অধিকতর টিকিট বিক্রয়ের স্বার্থে। সিনেমায় একটি ধর্ষণের দৃশ্য থাকলে পুরুষ দর্শক মাত্রেই সেটি উপভোগ করতে থাকে। এই মানসিক উপভোগের তলায় জায়মান থাকে সেই শিশ্নের আধিপত্যবাদের প্রবৃত্তি। সেই প্রবৃত্তিই সময় ও সুযোগের সাহায্য পেলে পোশাক খুলে ফেলতে দেরি করে না। করে না বলেই প্রতি পনেরো মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হতে থাকে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।

ভারতবর্ষের সংস্কৃতির সাথে ধর্ষণ এমনই ওতোপ্রতো ভাবে জড়িয়ে রয়েছে যে এই দুইটিকে আলাদা করা আজ অসম্ভব। আর অসম্ভব বলেই ভারতবর্ষের ধর্ম ও রাজনীতিতে ধর্মগুরু আর রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে তাদের পাণ্ডা ও চ্যালাচামুণ্ডার হাতে নারী নিগ্রহের ঘটনা একেবারেই নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনা। সকলেই জানে ধর্মগুরু আর রাজনীতিবিদ মানেই একাধিক নারীসঙ্গের ইতিহাস। মানুষ এই বিষয়টিকে এমনই স্বাভাবিক ভাবে ধরে নিয়েছে যে, কেউই আর এতে অবাক হয় না। নারীরা তো নয়ই। সমাজের উপর ধর্মগুরু ও রাজনীতিবিদদের প্রভাব সর্বাত্মক ও মারাত্মক। তাই তাদের হাতে নারী নিগ্রহের ঘটনা যখন সামাজিক পরিসরে নিত্যনৈমিত্তিক সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, জনমানসে তার ছাপ তো পরবেই। পরতে বাধ্য। সেই ধর্মগুরু বা রাজনীতিবিদরা যখন ধর্ষণ কিংবা খুনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েও মামলা চলাকালীন সময়েও সংসদীয় নির্বাচনে দাঁড়ান। এবং ব্যক্তিগত গোষ্ঠীগত কিংবা দলগত প্রভাব খাটিয়ে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়যুক্ত হন, তখন সাতখুন মাফ। তাঁরাই গলায় জয়মাল্য গলিয়ে জনগণের দিকে হাত নাড়তে নাড়তে আইনসভার সদস্য হয়ে আইন পাশ করার অধিকার অর্জন করে ফেলেন। এটাও ভারতীয় সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতিতেই বিগত ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে বিভিন্ন ফৌজদারী মামলায় ধর্ষণ খুন ডাকাতি রাহাজানি ইত্যাদি অপরাধে অভিযুক্ত ৪২% সাংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে ভারতবর্ষের লোকসভা আলো করে বসে রয়েছেন। এবং তার ভিতরে শাসক দলেরই ১১৬ জন সাংসদ বর্তমান। বিগত এক বছরে আইনসভায় পাশ হওয়া যাবতীয় আইনে এই ১১৬ জনের সহমত রয়েছে। বা বলা ভালো এঁদেরই মতামতের উপরে ভিত্তি করে বিগত এক বছরে যাবতীয় আইন পাশ হয়ে গিয়েছে এই ভারতীয় গণতন্ত্রে। একটা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিকাঠামোয় নানাবিধ ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্তরাই যখন আইন পাশ করার অধিকার ও ক্ষমতা অর্জন করে, তখন তার প্রভাব সমাজের উপরে মারাত্মক ও সর্বাত্মক হয়ে পড়তে বাধ্য। জনগণ যদি সেই দিকে না তাকিয়ে সমাজে ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ায় অরণ্যে রোদন শুরু করে দেয়। তবে তো এইসব ধর্মগুরু ও রাজনীতিবিদদের পোয়াবারোর সময়।

এক এক দিন এক একটি মেয়ে ধর্ষিত হয়ে মৃত্যু বরণ করবে। আর আমাদের মতো জনসাধারণ জাস্টিস ফর অমুক বলে নিশ্চিন্ত গৃহের আরামে বসে সোশ্যালসাইটের সান্ধ্য জলসায় প্রতিবাদের ঝড় তুলবে। সেই আমরাই কিন্তু পরিপূর্ণ সজ্ঞানে এই বিগত লোকসভাতেই ৪২% অভিযুক্তদেরকে নির্বাচনে জয়যুক্ত করে আইনসভায় পাঠিয়েছি। তার আগের লোকসভায় যে সংখ্যাটি ছিল ৩৫%। অর্থাৎ প্রতিটি লোকসভা নির্বাচনে নানাবিধ অপরাধে অভিযুক্তদের সংখ্যা প্রায় পাঁচ থেকে দশ শতাংশের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। এতো গেল শুধু লোকসভার পরিসংখ্যাণ। এর সাথে সকল বিধানসভার চিত্র যোগ করলে আর এক মহাভারতের সৃষ্টি হয়ে যাবে।  একটি গণতান্ত্রিক দেশের শাসন ক্ষমতায় এই ভাবে অপরাধ জগতের মানুষজনের সংখ্যা বাড়তে থাকলে, জাস্টিস ফর অমুক বলা আর আকাশের দিকে মুখ করে থুথু ছিটানো যে একই কথা। সেই সাধারণ জ্ঞানটুকু কি আমাদের আর হবে কোনদিন? মনে হয় না।

ফলে ভারতবর্ষের পথেঘাটে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের মতো চরমতম জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হতেই থাকবে। বস্তুত দেশে প্রতিদিন ধর্ষণের মত যত অপরাধ সংঘঠিত হয়। তত অপরাধের বিচার করার মতো আইনী পরিকাঠামও এই দেশে নাই। ফলে নারীকে তাঁর নারীজন্মের ঋণ শোধ করতেই হবে তাঁর যৌনাঙ্গের সীমানা দিয়েই। সেখানেই তাঁর অস্তিত্বের বাঁচা মরা নির্ভরশীল। কেননা আমরা এক দিকে জাস্টিস ফর অমুক বলে গলা ফাটাবো। আর এক দিকে একের পর এক নির্বাচনে জেনে বুঝে অপরাধীদের আইনসভাগুলিতে আইন পাশ করতে পাঠাবো। এই যে দ্বিচারীতা। এই দ্বিচারীতার পর্ব যতদিন চলতে থাকবে। ততদিন অন্তত ভারতবর্ষের নারীর জন্য জাস্টিস আদায় সম্ভবই নয়।

নারীর যৌনাঙ্গের উপরে শিশ্নের আধিপত্যবাদের পীঠস্থান এই ভারতবর্ষে গণধর্ষণ তাই দেশীয় সংস্কৃতিরই একটি অঙ্গস্বরূপ। এই অঙ্গকে বাদ দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির স্বরূপ চেনা সম্ভব নয়। এখন নারীকেই ঠিক করতে হবে। নারী কি আবহমান কাল ধরে চলে আসা শিশ্নের আধিপত্যবাদকে এই ভাবেই নত মস্তকে মেনে নিয়ে জীবনধারণের লড়াই চালিয়ে নিয়ে যাবে। না কি শিশ্নের এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে বিশ্বের ইতিহাসে অভুতপূর্ব এক সমাজবদলের বিপ্লব সংঘঠিত করার চেষ্টা করবে। যে সমাজে শিশ্নের আধিপত্যবাদ শেষ হবে। যে সমাজে নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। খাতায় কলমে নয়। প্রতিটি গৃহ থেকে সমাজের পরতে পরতে। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের অলিন্দে অলিন্দে। সেই সমাজ বিপ্লবের আশা একমাত্র তখনই করা যেতে পারে, যখন আমরা ঠিক করে নিতে পারবো। না কোন অপরাধে অভিযুক্ত কাউকেই আর আইনসভায় নির্বাচিত করে পাঠাবো না। পাঠালে সেই অপরাধ আমার আপনার সকলের। সেই অপরাধের বৃত্ত থেকে নিজেদের মুক্ত করতে আদৌ চাই কি আমরা? যারা জাস্টিস ফর অমুক আর জাস্টিস ফর তমুক বলে গলা ফাটিয়ে মধ্যরাতে, বিয়ে করা নারীর উপর উঠে পড়ি পৌরুষের অধিকার ফলিয়ে। আর যারা আপন যৌনাঙ্গের সীমানায় আত্মসমর্পণ করাকেই নারীত্ব বলে জেনে এসেছেন এতকাল।

১লা অক্টোবর’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত