গণতন্ত্র ও অপরাধতন্ত্র

 

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফরমস (এডিআর) এবং ওয়েস্টবেঙ্গল ইলেকশন ওয়াচ নামের দুটি সংস্থার যৌথ সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে একুশের নির্বাচনে ২৯৪টি আসনে ভোটযুদ্ধে সামিল হওয়া দুই হাজার একশ তিরিশ জন প্রার্থীর ভিতরে পাঁচশ আঠাশ জনের বিরুদ্ধে খুন ধর্ষণ নারী নির্যাতন সহ নানাবিধ গুরুতর অপরাধের মামলা ঝুলে রয়েছে। এই সকল প্রার্থীদের ভিতরে চার জনের বিরুদ্ধে চলছে ধর্ষণের মামলা। একশ তেরো জনের বিরুদ্ধে চলছে নারী নির্যাতনের মামলা। ঊনচল্লিশ জনের বিরুদ্ধে চলছে খুনের মামলা। যাঁরা এই তথ্য সরবরাহ করেছেন, তাঁরা মূলত মনোনয়নপত্রের সাথে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা পর্যালচনা করে এই সমীক্ষা চালিয়েছেন। এবং সেই সমীক্ষার ভিত্তিতেই এমন ভয়াবহ সব তথ্য উঠে এসেছে। গুরুতর অপরাধের অভিযোগে ফৌজদারী মামলা চলা এই সকল রাজনৈতিক নেতানেত্রী বিধায়ক সাংসদ মন্ত্রী প্রার্থীদের তালিকায় সকলের আগে প্রথম স্থানে রয়েছে সোনার বাংলা গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিজেপি। তাদের দুইশো তিরানব্বই জন প্রার্থীর ভিতরে একশো আটষট্টি জনই ফৌজদারী মামলার আসামী। অবশ্যই এই একশো আটষট্টি জনও “আর নয় অন্যায়” স্লোগান শুনিয়ে গুজরাট ও উত্তরপ্রদেশ মডেলের সোনার বাংলা গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই মানুষকে ভোট দিতে প্ররোচিত করেছেন। এবং তাদের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ফৌজদারী মামলার আসামীদেরকেই বিপুল ভোটে বিজয়ী করার ডাক দিয়েছেন। দিয়েছেন একেবারে প্রকাশ্য জনসভায়। দিয়েছেন কোটি কোটি টাকার রোড শো করে। এবং মনে রাখতে হবে দিয়েছেন ভারতীয় সংবিধান অনুসারে। দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনে নিজেদের কৃতকর্মের হলফনামা দাখিল করেই। না, এতে কোন লুকোছাপা নেই। গোপনীয়তারও কোন বিষয় নেই।


তারও একটা কারণ রয়েছে। ভারতীয় সংবিধান অনুসারে যতক্ষণ না কোন অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হচ্ছে, এবং আদলত কর্তৃক তার শাস্তিবিধান হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি অপরাধী নন, অভিযুক্ত মাত্র। এবং সংবিধান গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদেরও নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার ও তার ভোটাধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছে। কিন্তু একজন সরকারী কর্মী কোন অপরাধে অভিযুক্ত হলে সাথে সাথেই তাঁর চাকরী থেকে তাঁকে সাসপেণ্ড করে দেওয়া হয়। যতক্ষণ না তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছেন, ততক্ষণ তিনি কর্মক্ষেত্রে পুনর্বহাল হতে পারেন না এবং প্রতি মাসের মাসিক বেতন ও অন্যান্য সকল সুযোগসুবিধে থেকে বঞ্চিত হন। অথচ গুরতর অপরাধে অভিযুক্ত ফৌজদারী মামলার একজন আসামী রাজনৈতিক প্রার্থী হিসাবে প্রকাশ্য জনসভায় মানুষের কাছে ভোট চাইতে পারেন সাংবিধানিক অধিকারেই। এবং সেই ভোটে জিতে সাংসদ বিধায়ক মন্ত্রী হয়ে গেলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিংবা সরাসরি সরকারী প্রভাব খাটিয়ে তার বিরুদ্ধে চলা মামলাকেই প্রভাবিত করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করে নিতে পারেন। রাজনৈতিক ক্ষমতায় ভারতীয় সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখানো এমনই সহজ কাজ। এমনকি মামলা চলা কালীন সময়ে বছরের পর বছর একজন নির্বাচিত বিধায়ক কিংবা সাংসদ হিসাবে সবরকমের সরকারী সুযোগ সুবিধে বেতন পেনশন ইত্যাদি সবকিছু পাওয়ার অধিকারী থাকেন।


একুশের নির্বাচনে ফৌজদারী মামলার আসামী প্রার্থীদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দশ বছর ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল। তাদের দুইশ নব্বই জন প্রার্থীর ভিতরে একশো আঠারো জনের বিরুদ্ধেই নানবিধ গুরুতর অপরাধের অভিযোগে চলছে ফৌজদারী মামলা। একথা নির্ধিয়ায় বলে দেওয়া যায়, একুশের নির্বাচনে পালা বদল হলেই এই একশো আঠারো জনের অধিকাংশই নির্বাচিত সরকারের দলে ভিড়ে যাবেন। সরকারী ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে মামলাধীন অভিযোগগুলি থেকে রেহাই পেতে। এটাই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যেটি বিগত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গেও প্রবল হয়ে উঠেছে। ফলে এই দুই দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিতরে বিশেষ কোন ফারাক নেই। আর নেই বলেই দুই দলের ভিতর নেতানেত্রীর আদান প্রদান, যাওয়া আসা এত ঘনঘন ঘটে থাকে।


কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ফৌজদারী মামলার আসামী প্রার্থীদের এই তালিকায় চৌত্রিশ বছর রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা সিপিএমের মাত্র একশ ঊনচল্লিশ জন প্রার্থীর একাশি জনই নানবিধ ফৌজদারী মামলার আসামী। এটা কিন্তু বিশেষ করে অবাক করে দেওয়ার মতো তথ্য। এবং মনে রাখতে হবে বিগত এক দশক তারা ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতা হারিয়েও তারা এমন বিপুল সংখ্যক আসামী প্রার্থীদের খুঁজে পেল কি করে? আর তাদেরকেই নির্বাচনে দলের প্রার্থীও করতে হলো কোন বাধ্যবাধকতায়? সিপিএমের মতো তথাকথিত আদর্শবাদী রাজনীতির স্লোগান দেওয়া দলেরই যদি এই হাল হয়, তবে বিজেপি এবং তৃণমূলের তো কথাই নেই। পিছিয়ে নেই শতাব্দী প্রাচীন প্রায় অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলা কংগ্রেসও। একুশের নির্বাচনে দাঁড়ানো তাদের বিরানব্বই জন প্রার্থীর ভিতর পঁয়ত্রিশ জনই নানবিধ অপরাধের ফৌজদারী মামলার আসামী।


ফলে দেখা যাচ্ছে ২৯৪টি বিধানসভা আসনের রাজ্য নির্বাচনে এই পাঁচশ আঠাশ জন বিচারাধীন আসামীও জনগণের সেবায় উদগ্রীব হয়ে জনসেবার তাগিদে মানুষের কাছে ভোট প্রার্থীর বেশে পৌঁছিয়ে গিয়েছেন। এবং মানুষ তাদের কথা শুনেছে মনযোগ দিয়েই। এখন দেখার আগামী ২রা মে এই পাঁচশ আঠাশ জনের ভিতরে কতজন রাজ্য বিধানসভায় মাননীয় বিধায়ক হিসাবে নির্বাচিত হন। তাঁরা কত শতাংশ জনগণের ভোট অধিকার করতে পারেন। এবং এই পাঁচশ আঠাশ জন ফৈজদারী আসামী প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটশতাংশ কততে গিয়ে দাঁড়ায়। তাদেরকে ঠিক কতজন ভোটার ভোট দেবেন, সেই সর্বমোট ভোটসংখ্যাটিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বুঝতে হবে সেই সম সংখ্যক জনগণ এই সকল ফৌজদারী আসামীদের সরাসরি সমর্থক। একথা বললে চলবে না, একজন ভোটার তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকায় কোন প্রার্থী সাধু আর কোন প্রার্থী অসাধু সেকথা না জেনেই প্রার্থী নির্বাচন করছেন। এবং যদি দেখাও যায়, ভোটারের পক্ষে সবসময় প্রার্থীর বিষয়ে বিশদ তথ্য জানা সম্ভব নয়, তাহলে প্রমাণ হবে ভারতবর্ষের নির্বাচন পদ্ধতির ভিতরেই রয়ে গিয়েছে মস্ত বড়ো গলদ। যেখানে ভোটারকেই অন্ধকারে রেখে প্রার্থীকে জিতিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে নির্বাচনের পর নির্বাচনে। এই পদ্ধতি আর যাই হোক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হতে পারে না। আর ভোটার যদি জেনে বুঝেই ফৌজদারী আসামী প্রার্থিকে ভোট দিতে থাকে, তবে স্বীকার করতেই হবে ভারতের সমাজ ও রাজনীতি গভীরভাবেই পক্ষাঘাত গ্রস্ত। যেখানে দুর্নীতির শুরু একজন ভোটারের হাত থেকেই।


পরিস্থিতি যেদিকে যে অভিমুখে এগিয়ে চলেছে, তাতে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট। ফৌজদারী বিচারাধীন প্রার্থীর সংখ্যা প্রতিটি নির্বাচনে পূর্ববর্তী নির্বাচন থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এবার ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত প্রার্থীদের সংখ্যা বেড়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মোট ১৯৬০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩৫৪ জন (১৮ শতাংশ) হলফনামায় জানিয়েছিলেন যে, তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এবারে গতবারের এই আঠারো শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পঁচিশ শতাংশ। ওদিকে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচিত সাংসদদের ভিতরে চুয়াল্লিশ শতাংশই ছিল নানবিধ ফৌজদারী মামলার আসামী। যার ভিতরে সরকার গঠনকারী বিজেপির একশো ষোল জন সাংসদ বর্তমান। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের পঁয়ত্রিশ শতাংশই ফৌজদারী মামলার অভিযুক্ত আসামী। ফলে বিগত দুইটি লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী ফৌজদারী মামালার আসামীদের শতকরা হার ৩৫ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়ে গিয়েছে ৪৪। আর এবারের একুশের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে মোট প্রার্থীদের ২৫ শতাংশই ফৌজদারী মামলার আসামী। লক্ষ্য রাখতে হবে লোকসভার হিসেব কিন্তু নির্বাচনে নির্বাচিত বিজয়ী প্রার্থিদের। আর আমাদের আজকের আলোচনা একুশের নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীদের নিয়ে। ফলে দুটির মাত্রা কিন্তু এক নয়। নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষন করলেই লোকসভা ও বিধানসভার ভিতরে তুলনামূলক অবস্থানটা স্পষ্ট হবে। তবে দুইয়ের ভিতর সংখ্যাতত্বের ফারাক যে বিস্তর হবে। সেটা সাধারণ বুদ্ধিতেই বুঝতে পারা যায়। কিন্তু ফারাক যাই হোক না কেন রাজ্য বিধানসভার রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে ভারতের লোকসভাকেই অন্ধচিত্তে অনুসরণ করছে। সেটি কিন্তু সুস্পষ্ট।


গণতন্ত্র নির্বাচন আর রাজনীতির এই চক্রব্যূহ মানুষের কোন উপকারে লাগবে। দেশ ও জাতির কোন উন্নতি সাধনে সক্ষম হবে। সেকথা নিয়ে জনগণের কোন মাথাব্যাথা নেই। মাথাব্যাথা নেই বলেই প্রতটি নির্বাচনে ফৌজদারী মামলার বিচারাধীন আসামীর সংখ্যার গ্রাফ ক্রমাগত উর্ধমূখী। জনগণ যেদিন এই নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করবে। সেইদিন প্রকৃত লড়াই শুরু হবে। আর ততদিন জনগনকে রাজনীতির অফিম খাইয়ে বেঁহুশ করে রাখার রাজনীতিই, ক্ষমতার বাঁশি বাজিয়ে যেতে থাকবে।

 

২৬শে এপ্রিল’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত