যেমন কর্ম তেমন ফল

 

মৃত্যুভয় হচ্ছে? অক্সিজেনের অভার চিন্তায় ফেলেছে? মাস্কছাড়া মুখ দেখলেই আতঙ্ক লাগছে? শ্মশানের ছবি দেখতে ভালো লাগছে? চিতার আগুন? দাউ দাউ করে জ্বলছে তো জ্বলছেই তাই না? ভ্যাকসিন নিয়েছেন? তাও আতঙ্ক কাটছে না? আবার লকডাউন হলে ভালো? সত্যিই খুব চিন্তায় রয়েছে সকলে। আর থাকবে নাই বা কেন? গণ্ডগোলের শুরু তো সেই ২০১৪। ব্যাংক একাউন্টে পনেরো লাখ করে টাকা ঢুকে যাবে। এমনই চিতার লকলকে আগুনের লেলিহান শিখার মতো পনেরো লাখের লকলকে লোভে সরকার নির্বাচন করেছিলেন আর সকলের মতো আপনিও। বছরে দুই কোটি করে সরকারী চাকরি। হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের অমোঘ ডাক। রামমন্দির গড়া হবে। কি উৎসাহ কি উদ্দীপনা। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ হবে। উত্তেজনায় রক্ত গরম। ফৌজদারী মামলায় বিচারাধীন অভিযুক্ত সাংসাদ বিধায়ক পুরসভার কাউন্সিলর পঞ্চায়েত সদস্য সকলের বিচার হবে, কি দারুণ প্রতিশ্রুতি। সে কি রণহুঙ্কার! পেট্রল ডিজেল রান্নার গ্যাসের দাম কমে যাবে। রাম রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। দুর্নীতি মুক্ত ভারত। কালোটাকার কারবারীরা জেলে ঢুকবে। জাল টাকার কারবার বন্ধ হবে। জঙ্গি হামলার দিন শেষ হবে। বাজারে গেলে দ্রব্যমূল্যের ছ্যাঁকা খেতে হবে না। বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত প্রথম সারিতে উঠে আসবে। সব কা সাথ। সব কা বিকাশ।


ফলে আর সকলের মতো আপনার মন থেকেও মুছে গেল গুজরাট দাঙ্গার স্মৃতি। সেই সব বীভৎসতম অমানুষিক নৃশংসতার ছবিগুলো বেমালুম আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। গুজরাট মডেলের বানানো ফানুশে চড়ে আপনার সেকি হাসি হাসি মুখ। এবার সারা দেশকে গুজরাট মডলের কাণ্ডারীদের হাতে তুলে দিতে আপনিও দুই বার ভাবলেন না। কংগ্রেস শূন্য ভারতের ডাক যে আসলেই বিরোধী শূন্য গণতন্ত্রের নকশা, না না। অতটা সূক্ষ্ম চিন্তাধারার মানুষ হলে তো দেশের আর চিন্তাই ছিল না। ওদিকে গা ছম ছম গোধরা কাণ্ড যে আসলে ভারতে ঘটা সবচেয়ে নৃসংসতম ষড়যন্ত্র, হিটলারের জার্মানীর পার্লামেন্ট পোড়ানোর মতোই। সে তত্ব আপনিই বা বিশ্বাস করবেন কেন? আপনি ততক্ষণে পনেরো লাখের লোভে দিশেহারা। আপনি ততক্ষণে হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের স্বপ্নে মশগুল। আপনি তখন গুজরাট মডেলের ফানুশে চড়ে বসে পড়েছেন। না। আর আপনার কোন উপায় ছিল না। জয়শ্রীরাম বলে গুজরাট দাঙ্গার রূপকারদের হাতে ভারতবর্ষকে তুলে দেওয়া ছাড়া। তারপর নোট বাতিলের রাতে, আপনিও কয় ফোঁটা চোখের জল ফেললেন। দশ লাখের স্যুট পড়া চা ওয়ালার কথার টোপে। এরপর জিএসটি। বিরোধী দলের সাংসদ বিধায়ক কিনে কিনে সরকার পরিবর্তন। নির্বাচনে হেরেও সরকার গঠনের সংস্কৃতি। পুলওয়ামার শহীদদের স্মরণে ২০১৪ সালের ভুলের পুনারাবৃত্তি করতে আপনার একটুও হাত কাঁপলো না। পনেরো লাখের ঢপ। বছরে দুই কোটি চাকরির বদলে সরকারী সংস্থার দরজা বন্ধ হতে থাকা। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিও আপনাকে টলাতে পারলো না। আপনি মোটেও অবাক হলেন না। যখন দেখলেন দাগী অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যাও যখন বিপুল ভাবে বেড়ে গেল ২০১৯’র নির্বাচনে। উল্টে সব রেকর্ড ভঙ্গ করে বাকিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আপনি রেকর্ড সংখ্যক দাগী অভিযুক্ত সাংসদ নির্বাচন করে আইন সভায় পাঠিয়ে দিলেন। যারা কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন জোগালো। আহা, আপনার সেদিন কি আনন্দ। পটকা ফাটানো। আতসবাজি পোড়ানো, ঢাকঢোল বাজানোর ছবি দেখতে দেখতে আপনিও ভাবতে থাকলেন। এবার কাশ্মীরীরা জব্দ! অবরুদ্ধ কাশ্মীরের মানুষের কষ্ট আপনাকে একদমই বিচলিত করলো না। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নগ্নচিত্রে আপনি বরং আহ্লাদিত হলেন। সত্যিই বুকের পাটা আছে। কংগ্রেসীরা সত্তর বছরেও যা করতে পারে নি। করে তো দেখালো! আর তারপরই রাম মন্দিরের সেই ঐতিহাসিক রায়। রায় দিলো সুপ্রীম কোর্ট। কৃতিত্ব জমা পড়লো ছাপ্পান্নো ইঞ্চীতে গিয়ে। ঐতিহাসিক ঘটনা। পরপর সিএএ’র আইনও পাশ হয়ে গেল। এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের বিরোধীতায় আপনিও সামিল হলেন। আপনার সমর্থন দিল্লীর দাঙ্গার আগুনকে আরও বেশি লকলক করে তুলল। দিল্লীর সেই সব রক্ত হিম করা ছবি দেখেও, না আপনার চোখ সজল হয়ে ওঠেনি। দাঙ্গার লেলিহান শিখা দেখেও শিহরিত হন নি একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতোন। সেই লেলিহান শিখা আজ তাই দেখতে হচ্ছে আত্মীয় পরিজনের চিতার আগুনে। না সেদিন এতসব আশঙ্কা করতে পারেন নি। ফলে গত বছর লকডাউনে পরিয়ায়ী শ্রমিকদের হাজার হাজার মাইল পথ হাঁটার মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিও আপনাকে বিচলিত করে নি। তাই না? আর করবেই বা কেন? আপনি তখন নিজামুদ্দীনের তবলীগই জামাতের জমায়েত নিয়ে মিডিয়ার তৈরী প্রচারকাহিনী মুখস্থ করতে ব্যস্ত। সেই সব মিথ্যে গালগল্প বাকিদেরকেও পাখি পড়া করে মুখস্থ করাতে ব্যস্ত। নাগরিক কর্তব্য পালনে আপনি তখন খাঁটি দেশপ্রেমী। দেশপ্রেমের সেই সিলেবাসেই আপনি চলমান কৃষক আন্দোলনকে পাকিস্তানী চক্রান্ত চীনা ষড়যন্ত্র আর ফোড়েদের বিদ্রোহ বলে বিশ্বাস করে নিলেন। ফলে আপনিও চলমান কৃষক আন্দোলনের বিপক্ষে সরকারের সমর্থনে বাঁধা গৎ আউড়িয়ে গেলেন।


এই যে একের পর এক সরকারী সংস্থাগুলোকে জলের দরে তুলে দেওয়া হচ্ছে কয়েকজন গুজরাটি ব্যবসায়ীর হাতে, যার ফলে কাজ হারাচ্ছেন কোটি কোটি মানুষ। তাদের চোখের জল আপনাকে স্পর্শই বা করবে কি করে? আপনাকে আত্মনির্ভর ভারতের সিলেবাসে দীক্ষা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। যে ভারতে পকৌরা ভাজাই আত্মনির্ভরতার প্রতীক। যে ভারতে জয়শ্রীরাম ধ্বনিই আত্মনির্ভরতার স্লোগান। যে ভারতে ভারত মাতা কি জয় না বললে আত্মনির্ভরতার গাড়িতে ওঠার ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। ফলত আত্মনির্ভরতার সিলেবাস মুখস্থ করে আপনিও নিশ্চিন্তে পশ্চিমবঙ্গের ভার ডবল ইঞ্জিনের সরকারের হাতে তুলে দিতে সদ্য সমাপ্ত হওয়া সহিংস ভোটে ইভিএমে আঙুল টিপলেন। ফলে আজকে যখন অক্সিজেনের সংকট তৈরী করে ভ্যাকসিন বাণিজ্যের রাজনীতি হচ্ছে। তখন অক্সিজেনের অভাবে এই মৃতদেহের মিছিল দেখে চমকালে চলবে? অক্সিজেনের এই অভাব আপনাকেও যদি গ্রাস করতে এগিয়ে আসে, চিন্তা কি? আপনি তো আত্মনির্ভর ভারত গড়তেই উপযুক্ত সরকার গড়ে দিয়ে গেলেন। এবং পশ্চিমবঙ্গকেও সেই আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে দিয়ে গেলেন। এবারের সদ্য সমাপ্ত ভোটে। এই অক্সিজেন সংকট সৃষ্টিকারীদের সমর্থনে একটা গোটা দশক আপনার ভোট কার্যকর থেকেছে। তার ফল আজ ভারতবর্ষকে তো টের পেতেই হবে। হবে না? জীবনে ফাঁকি দেওয়া অতই সহজ? অন্যের ঘরে আগুন লাগলে যারা আলোর রোশনাই দেখে বিমোহিত হয়। নিজের ঘরে আগুন লাগলে, সেই আগুন নেভানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা তাদের হাতে থাকে না আর। থাকতে পারে না। হ্যাঁ আজ অক্সিজেনের অভাব বোধ করলে, জানবেন আপনার দশাও ঠিক সেই রকমই। অন্য কিছু নয়। অন্য কিছু হওয়ারও কথা ছিল না। কারণ সেই উপায়ও আপনি রাখেন নি। ঠিক কৃষি আইন বিরোধী আন্দোলনরত কৃষকদের মতোনই। যে শক্তিকে তারা বিশ্বাস করে ক্ষমতায় বসিয়ে ছিল। সেই শক্তিই আজ কৃষকদের পথে বসিয়ে দিয়েছে। যে শক্তিকে বিশ্বাস করে আপনি নিশ্চিন্তে বসেছিলেন। অক্সিজেনের দরকারে হাত বাড়ালেই মিলে যাবে। সেই শক্তিই আজ দেশ জুড়ো কৃত্রিম অক্সিজেন সঙ্কট তৈরী করে করোনার ভয়াবহতা বাড়িয়ে তুলছে। শুধুমাত্র ভ্যাকসিন বাণিজ্যের মুনাফা বৃদ্ধির স্বার্থে। কিন্তু হলে হবে কি? আপনি তো আর সেই সত্যের দিকে তাকাবেন না। আপনি ভারত মাতা কি জয় বলে দেশপ্রেমী হয়েছেন। আপনি জয়শ্রীরামের স্লোগানে গগন ফাটিয়ে উল্লাস করেছেন আর একটার পর একটা অন্যায়ের অবিচারের দেশদ্রোহের বিশ্বাসঘাতকতার সমর্থন করে গিয়েছেন। মানুষের চোখের জল আপনাকে স্পর্শ করে নি। তাই কে বলতে পারে দেশব্যাপি এই গণচিতার আঁচ কাল কিংবা পরশু আপনাকেও স্পর্শ করবে না? হিন্দী হিন্দু হিন্দুস্তানের এক দেশ এক ধর্ম এক ভাষার ডাক কেমন অসামান্য ভাবে সফল আজ। তাকিয়ে দেখুন। সারা দেশ জুড়ে এক আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ছে ভারত। পুড়ছে মানুষ। পুড়ছে সময়। না এত আগুনেও অন্ধবিশ্বাস কিন্তু পোড়ে না। অন্ধ বিশ্বাস পোড়াতে প্রয়োজন সৎ ও সঠিক শিক্ষার আলো। যে আলো প্রায় অবরুদ্ধ আজ। যে আলোর কোন প্রয়োজনই অনুভব করেন নি আপনি। আপনার মতোই আরো অনেকে। কোটিতে কোটিতে। আগামী ২রা মে তারই এক ঝলক নমুনা দেখার আসায় উল্লসিত কোটি কোটি মুখ অপেক্ষায় রয়েছে ব্যগ্রভাবে। তাই এক দেশ এক ধর্ম এক ভাষা এক অক্সিজেনের অভাব এক চিতা এক আগুন। সব কা সাথ সব কা বিকাশ। চিতার লেলিহান শিখায়।


৩০শে এপ্রিল’ ২০২১

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত