অনাথবৎ
আর এই যে সব গুণীজন দেখি। তারা, তার সব
বাক্যহার। এইরকম এক একটা কাল আসে পৃথিবীতে। যখন এইসব গুণীজনেরা সব চুপ করে থাকে। আর
যে অত্যাচারিত হয় সে হয়েই যায়, হয়েই যায়, হয়েই যায়। নাথবতী অনাথবৎ নাটকের এই বিখ্যাত
সংলাপটি সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে নেটিজেনদের দৌলতে। নাট্যব্যক্তিত্ব শাঁওলী মিত্রের জীবনাবসানে।
বর্তমান ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতে। কাঁটাতারে খণ্ডবিখণ্ড বাংলার দুই পারের আর্থ-সামাজিক
রাজনীতির প্রেক্ষিতে। শাঁওলীর উচ্চারিত সংলাপটি অন্তিম সত্য। অন্তিম সত্য এই কারণেই
যে, সেইসব গুণীজনেরা আজ মূক ও বধীর সেজে শাসকের প্রসাদভোগী জীবনযাপনে অভ্যস্থ ও ব্যস্ত।
হাতে তাঁদের রকমারি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার পেলেই তো আর হয় না।
সেই পুরস্কারের দায়িত্বও পালন করতে হয়। আমাদের চারপাশ জুড়ে তাই গুণীজনদেরকে সেই দায়িত্ব
পালন করতেই দেখা যায় এবং যাচ্ছে। নিজ দায়িত্বে অবিচল এইসকল গুণীজনেরা শাসকের প্রতি
নৈতিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন। যাহা করিবেন। যাহা বলিবেন। সকলই শাসকের স্বার্থে।
শাসকের নির্দেশে। প্রয়োজনে শাসকের কথায় দুইবেলা ডন বৈঠক দিতেও পিছুপা হইবেন না। ফলে
শাঁওলীর উচ্চারিত সংলাপে ঠিক যেকথাটি বলা হয়েছিল মহাভারতের প্রেক্ষিতে। সেই কথটিই আজ
আমাদের জীবনের সর্বস্তরে সার্বিক সত্য হয়ে ফলবতী হয়ে উঠছে। আর নাথবতী অনাথবতের মতোনই
ভারতীয় উপমহাদেশের একেবারে সাধারণ জনতা অত্যাচারিত হয়েই চলেছে। হয়েই চলেছে। সে জনতার
ঠিকানা পাকিস্তানই হোক আর ভারত। কিংবা বাংলাদেশ। না, সেই জনতার ঠিকানা আবিশ্বই ছড়ানো।
আফ্রিকা থেকে এশিয়া। এমনকি ইউরোপ থেকে আমেরিকা।
শাঁওলীর কন্ঠে উচ্চারিত এই সংলাপটির ভিতরে
তিনটি পক্ষের অস্তিত্ব দেখা যায়। এক পক্ষে যাঁরা অত্যাচার চালিয়ে যায়। এক পক্ষে যারা
অত্যাচারিত হয়েই যেতে থাকে। আর এক পক্ষে তাঁরাই অবস্থান করেন। যাঁরা নিজেরা অত্যাচারী
না হলেও। অত্যাচারীদের প্রসাদভোগী হিসাবে ক্লাইম্যাক্সের সময়ে নিশ্চুপ দর্শকের ভুমিকা
পালন করেন নিপুণ ভাবে। আমাদের আলোচনা এই তৃতীয় পক্ষকে নিয়েই। যাকে বলা যেতে পারে, যে
জন আছে মাঝখানে। এনাদের উৎপত্তির ইতিহাস, মানবসমাজে সেই ইতিহাসের ধারাবাহিক ক্রমবিবর্তন
বিষয়ে গবেষণা ঐতিহাসিক এবং সমাজবিদদের বিষয়। আমারা সাধারণ বুদ্ধি নিয়ে চলাচল করি। আমাদের
আলোচনাও তাই অতি সাধারণ মাপের ভিতরেই সীমাবদ্ধ থাকুক। এখন এই যে, ‘যে জন আছে মাঝখানে’
ধরণের প্রজাতিটি। এনারা যে সব রকম পরিস্থিতিতেই নিরব দর্শকের ভুমিকা পালন করেন। আদৌ
কিন্ত তা নয়। এনারা ঠিক তখনই নিশ্চুপ হয়ে যান,
যখন চরমতম অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সময়। যখন সরাসরি অন্যায়ের প্রতিরোধে এগিয়ে
আসার দরকার। ঠিক তখনই এনারা না দেখার ভান করতে শুরু করেন। না বোঝার ভান করতে শুরু করেন।
না জানার ভান করতে শুরু করেন। বাকি সময়ে এনাদের দেখা যায় শাসকের তল্পি বহন করতে। এনাদের
দেখা যায়, শাসকের পিঠচাপড়ানি খেতে। এনাদের দেখা যায় শাসকের স্বার্থ পূরণে নিবেদিত প্রাণ
ভক্তের মতো জনতার ভিতরে বিভ্রান্তি ছড়াতে। এনাদের দেখা যায় শাসকের মহিমা কীর্তন করে
জনতাকে বোকা ও বেকুব বানিয়ে রাখার সরকারী বেসরকারী প্রকল্পে কাজ করে যেতে। তখন এনাদের
মুখে কথার খই ফোটে। তার যেমন ধার। তেমনি ওজোন। শুনেই পিলে চমকে উঠতে চায়। এনাদের কথায়
ভরসা করার লাইনে বিশ্বাস করার মতো জনতার ভিড় বাড়তেই থাকে। আর সেই ভিড় বাড়ানোর দক্ষতা
অনুসারেই এনাদের কপাল খুলে যেতে থাকে সরকারী বেসরকারী উপঢৌকনে।
না না। আমরা কারুর নাম উল্লেখ করে মানহানির
মামলার খপ্পরে পড়তে চাই না। আমরা কারুর নাম ধরে ধরে ব্যক্তিগত মুখোশগুলিকে খুলে দিতেও
চাই না। সে দায়িত্ব পাঠকের নিজস্ব। বিষয়টি সম্পূর্ণই পাঠকের মৌলিক অধিকারের। কারণ অনেকেই
থাকতে পারেন। যাঁরা এখন ‘যে জন আছে মাঝখানে’র বৃত্তে গিয়ে দাঁড়াতে চান। লাইম-লাইটের
আলোর প্রত্যশায় যাঁরা এখন কুচো সর্দার ছোট সর্দারদের পায়ে তেল ঢালছেন। ক্ষমতার অলিন্দের
সদর দরজা খোলানোর অভিপ্রায়। একবার যদি রাজসভায় সভাসদের একটি চেয়ার বাগিয়ে নেওয়া যায়।
তারপর তো চেয়ার মোছার দায়িত্ব। কপালে থাকলে সভাকবির কাজটিও জুটিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
ফলে নাম ধরে ধরে রোল কল করার দায় ও দায়িত্বে আমরা নেই। আমরা শুধু এনাদের মুখগুলি দেখতে
পাই। শাসকবন্দনার রুটিনে। আমরা এনাদের অমৃতবাণী ও লেখনী শুনতে ও পড়তে পাই জনতাকে বিভ্রান্ত
করার কর্তব্য পালনের দায়িত্বে। কিন্তু ঠিক যখন সারদা কেলেঙ্কারিতে শতাধিক মানুষকে আত্মহত্যা
করতে হয়। এনাদের মুখ ও মুখোশ কোনটির’ই আর হদিশ পাওয়া যায় না। দিল্লীর রাজপথে শত শত
কৃষক যখন এক বছর ধরে শহীদ হচ্ছিল। তখনও এই গুণীজনদের নাগাল পাওয়া যায়নি। ভারতবর্ষের
মানচিত্র জুড়ে কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিক যখন মাইলের পর মাইল চটি পায়ে খালি পায়ে বৌ
ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়ি ফিরছিল তখন এনারা লকডাউনের গুরুত্ব প্রচারে ঢাক ও ঢোল বাজাতেই
ব্যস্ত ছিলেন বেশি। সরকারী খরচে বাঁধা মঞ্চ থেকে যখন জনতার চোখে ধুলো ছড়ানো চলতে থাকে।
আর বশংবদ প্রচারযন্ত্র যখন ফেকনিউজ প্রচারকে মহামারীর মতোন সংক্রমক করে তোলে। তখনও
এনারা স্পিকটি নট থাকেন। থাকতে ভালোবাসেন। এবং এনাদের গুণেরও কোন পরিসীমা নাই। এনারা
জানেন। কখন কোথায় পাল্টি খেতে হয়। হবে। এবং কিভাবে। না পাল্টি খেয়ে এনারা অত্যাচারিতদের
পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন না। পাল্টি খাবেন এনারা ভোটের হাওয়া বুঝে। বুঝতে না পারলে। ফলাফল
দেখে। এক শাসকের কোল ছেড়ে আর এক শাসকের কোলে বসে দোল খেতে শুরু করবেন। এই পাল্টি খাওয়ার
একটি বেশ ভালো স্লোগান তৈরী হয়েছিল এই শতকের প্রথমদিকেই। ‘পরিবর্তন চাই’ বলে। এখন এই
পরিবর্তন চাই বললেই তো আর হবে না। পরিবর্তন চাই বললে তার একটা দায়িত্বও বর্তিয়ে যায়।
এক শাসককে টেনে নামিয়ে অন্য শাসককে ঠেলে ক্ষমতায় বসাতে গেলে অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও
অত্যাচারিতদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর মক শো করতে হয়। এবং সেই মক শো’য়ে যাঁরা যত বেশি পারদর্শী।
তাঁরাই পরিবর্তনের ফসল তত বেশি ঘরে তুলে ফেলতে পারেন। বঙ্গবিভীষণদের কপালে ঠিক তখনই
বঙ্গভুষণ রত্নও জুটে যায়।
অত্যাচারিতদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। আর পাশে
দাঁড়ানোর মক শো’য়ে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়। এনারা যদি সত্যি করেই অত্যাচারের চরম সময়
অত্যাচারিতদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে চাইতেন। তাহলে এক অত্যাচারীকে ছেড়ে আর এক অত্যাচারীর
শিবিরে নাম লিখিয়ে আসতেন না। এই যে কোন না কোন এক অত্যাচারীর গুড বুকে নিজের নাম তুলে
ফেলা। এটাই গুণীজনদের বিশেষ গুণ। এবং এই গুণের পারদর্শীতার কদর করতেই অত্যাচারী শাসকবর্গ
এনাদের জন্য সদর দেউড়িতে সবসময় গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো অভর্থ্যনার নহবত বসিয়ে রাখে। ফলে
প্রবল একটা হাতছানি তো থাকেই। তবে সবসময় যে শুধ হাতছানিই থাকবে তারও কোন অর্থ নাই।
বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে সিবিআই থেকে ইডি। সেবি থেকে সোশ্যাল স্যাংশান। ইত্যাদি মেশিনারীর
সচল হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও থাকে বইকি ক্ষেত্র বিশেষে। যে রুগীর যা দাওয়াই। তখন অবশ্য চাচা
আপন প্রাণ বাঁচা। সেই ধরণের রুগীদের তখন আর করার কিছুই থাকে না। শাসকের ঢোলে কাঠি দেওয়া
ছাড়া। ফলে তখন দ্রৌপদীরই বস্ত্রহরণ পর্ব চলতে থাকুক। আর দেশের নাগরিকদের জন্য ডিটেনশন
ক্যাম্প নির্মাণ চলতে থাকুক। এইসব গুণীজনেরা তখন একেবারে স্পিকটি নট। সুবোধ ছাত্রের
মতো ঠোঁটে আঙুল দিয়ে নীলডাউন শাসকের দরবারে। সেই সব মূহুর্তে যাঁরা নিজ মস্তিষ্ক লকডাউন
মোডে রেখে দিতে পারেন। তারা নিশ্চিন্ত।
ফলে যে অত্যাচারিত হয়। সে হয়েই যেতে থাকে। হয়েই যেতে থাকে। এটাই সভ্যতার ধর্ম। যে সভ্যতার আধুনিক পাঠ সকলের প্রথমে উন্মোচিত হয়েছিল, ব্যাসদেবের মহাভারতে। তারপর কত গঙ্গা ভল্গা মিসিসিপি রাইন দিয়ে কত জল গড়ালো। দুটি বিশ্বযুদ্ধ পারি দিয়েও ভিয়েতনাম আফগানিস্তান ইরাক লিবিয়া সিরিয়া প্যালেস্টাইন হতেই থাকে হতেই থাকে। লাতিন আমেরিকা আফ্রিকা হতেই থাকে হতেই থাকে। গুণীজনেরা টিভির পর্দা আলো করে সান্ধ্য আসরে তল্পিবহন করতে বসে পড়েন। যার যে খুঁটিতে ঠিকানা। সেই খুঁটি পিছনে রেখে। সেখানে আমাদের রাজ্যে সারদা হবে। আসামে বাঙালির জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প হবে। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি’র হুমকি দেওয়া হবে দুই তিন কোটি বাঙালির উদ্দেশে। রাজ্যে সরকারী কর্মসংস্থানের বিলোপ হবে। মানুষকে ভাতা পাওয়ার সরকারী লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে। কেন্দ্র থেকে দেশের সম্পত্তির হরির লুঠ দেওয়া হবে। চার ঘন্টার নোটিশে কোটি কোটি শ্রমিককে হাজার মাইল করে হাঁটানো হবে। ভ্যাকসিন বাণিজ্যের স্বার্থে অক্সিজেনের হাহাকার তৈরী হবে। এসব, সবকিছুই মামুলি বিষয়। গুণীজনদেরকে এক এক শিবিরের গুডবুকে বেঁধে রেখেই এইসব চলতেই থাকবে। চলতেই থাকবে। চলতেই থাকবে। আর শিবিরায়নের এই যুগপর্বে ক্ষমতার চাটনি চাটতে গুণীজনেরা বাক্যহারা নিরব দর্শকের মতোই দেশ ও দশের ধর্ষণ প্রত্যক্ষ করতেই থাকে। করতেই থাকে। করতেই থাকে নিশ্চুপে। নিরবে। নিরবচ্ছিন্ন ভাবে। ওদিকে অনাথবৎ হয়ে পড়েই থাকে, থাকবে সাধারণ মানুষের ভাগ্য।
১৭ই জানুয়ারী’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

