ভ্যাকসিন না বিভীষিকা!

 

 

ভ্যাকসিন না বিভীষিকা!

জনপ্রিয় ক্রিকেটার শেন ওয়ার্নের হঠাৎ মৃত্যুর পিছনে কি কোন রহস্য রয়েছে? সত্যিই কি তাঁর হার্টে জন্মগত কোন সমস্যা ছিল? যেমনটা বলা হচ্ছে এখন? এমনটা নয়, হৃদরোগে হঠাৎ করে মানুষের মৃত্যু হয় না। এমন নয় এই প্রথম কোন জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদের অকাল মৃত্যু ঘটলো। এমনও নয় শেন ওয়ার্ন ছাড়া গত এক বছরে হৃদরোগে কেউ মারা যাননি। ফলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে শেন ওয়ার্নের হঠাৎ মৃত্যু, খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। কিন্তু গত একবছর ধরে বিশ্বজুড়ে এইরকম হঠাৎ করে অকাল মৃত্যুর ঘটনা একটু যেন উদ্বেগজনক ভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা যদি নিজেদের পরিচিত বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনদের বৃত্তের দিকে নজর দিই একটু। দেখতে পাবো এইরকম হঠাৎ অকাল মৃত্যুর ঘটনা গত এক বছরের ভিতরে একটু যেন বেড়ে গিয়েছে। স্বভাবতই অনেকের মনে হতেই পারে। তাতো হবেই। গোটা বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাসের হাতে বন্দী। বিশ্বজুড়ে এর ভিতরেই ষাট লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়ে গিয়েছে গত ছাব্বিশ মাসে। অর্থাৎ এই হঠাৎ করে মৃত্যুর ঘটনার পিছনে করোনার একটা হাত রয়েছে। তবে সৌভাগ্যের কথা মানুষের নিরন্তর প্রয়াসে, আমরা করোনা মোকাবিলায় ভ্যাকসিন হাতে পেয়ে গিয়েছি। যদিও, ২০১৯ সাল অব্দি আমরা জানতাম। ভাইরাস প্রতিরোধী কোন ভ্যাকসিন তৈরী করতে কম করে পাঁচ, ছয় থেকে দশ, এগারো বছর সময় লেগে যায়। কিন্তু সেই ধারণা থেকে সম্প্রতি আমাদের মুক্তি ঘটছে। আমরা চোখের সামনে দেখতে পেলাম। মাত্র আঠারো মাসের ভিতরেই করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়ে গেল। বিশ্বজুড়ে জনগণের করের টাকায় কোটি কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরী হয়ে গেল। আরও ডোজ পরপর তৈরী হতে থাকবে। সময়ে সময়ে আমাদের তা দেওয়া হবে। দেশে দেশে সরকার বিনামূল্যে জনতার দেহে সেই ভ্যাকসিন বিতরণ করতে থাকবে। ফলে পকেটের কাঁচা পয়সা না খসায়, আমরাও খুশি। সরকারের জনদরদী ভাবমূর্তিতে। তবে, অনেকেই আমরা জানি না, ভারতবর্ষে এখন অব্দি যে দেড়কোটি ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে মানুষের দেহে। তার প্রত্যেকটি ডোজই কিন্তু দেওয়া হয়েছে পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে। সরকারী পরিভাষায় ‘অন ট্রায়াল বেসিস’। ফলে এই ভাইরাস প্রদানের পরে মানুষের ভিতরে কোন শারীরীক ক্ষতি হলে সরকার বা ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থা কিন্তু আইনত দায়ী থাকবে না। তা নাই থাকুক। আগে তো ভ্যাকসিন নিয়ে বাঁচি। তারপর ক্ষতি হলে দেখা যাবে। কথায় বলে আপনি বাঁচলে বাপের নাম। ফলে তুমুল করোনা সংক্রমণের ভিতরেই হাজার হাজার মানুষ পরস্স্পর গুঁতোগুঁতি করতে করতে ভাইরাসের লাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকলাম আমরা। কেউ একটা কেউ দুটি ডোজ নিয়ে নিশ্চিন্তের সেল্ফি পোস্ট করতে থাকলাম দুইবেলা।


করোনা সংক্রমণের দৈনিক মৃত্যুর হারের হ্রাসবৃদ্ধির সংবাদ ফলাও করে দেখানো হলো আমাদের। কিন্তু আমরা জানতে পারলাম না। একটা কিংবা দুইটি ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়ার পরেও দৈনিক কতজন করোনায় সংক্রমিত হতে থাকলো্। জানতে পারলাম না। তাদের ভিতরে দৈনিক কতজনের মৃত্যু হতে থাকলো। সেই সংবাদ বা সেই বিষয় নিয়ে সান্ধ্যটিভির করোনা বিশেষজ্ঞদের কোন আলোচনা করতে দেখাও গেল না। তবে মাঝে মধ্যেই আমাদের অনেকের মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠতে থাকলো। অমুক করোনায় সংক্রমিত। কেউ একটা ডোজ নিয়ে। কেউ দুইটি ডোজ নিয়ে। সেই ভ্যাকসিন। জনদরদী সরকার যা বিনামূল্যে সরবরাহ করে চলেছে। এবং সেই মোবাইলের রিংটোনের বাজনায় তার ভিতরে কারুর কারুর মৃত্যুর সংবাদও পেতে হলো। যাদের ভিতরে অনেকেই এক কিংবা দুই ডোজ ভ্যাকসিনধারী। ফলে টিভি কিংবা খবরের কাগজে না হোক। নিজেদের মোবাইলের রিংটোনে মাঝেমধ্যেই মৃত্যুর খবর আসতে থাকলো অনেকেরই। খবরে যেমন বোঝানো হয়েছে। আমরাও তেমনই বুঝে নিয়েছি। তাই চিন্তার কোন কারণ ঘটেনি আমাদের। কোটি কোটি মানুষ ভ্যাকসিন নিয়েছে। কিন্তু তারপরেও করোনা হয়ে মৃত্যু ঘটছে তো হাতে গোনা দুই একজনেরই। আমরা তো জানি, তেমনটাই হওয়ার কথা। সান্ধ্যটিভির করোনা বিশেষজ্ঞরা আমাদের আগেভাগেই এমনটা হওয়ার কথা জানিয়ে দিয়ে রেখে ছিলেন। ফলে আমরাও আর বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখার অবসর পাইনি। দরকারও বোধ করিনি।


আমরা দরকার বোধ করিনি ঠিকই। কিন্তু সেই যারা আমাদের সভ্য করেছে। শিক্ষিত করে তুলেছে। আধুনিক বিশ্বের উপযুক্ত করে তুলেছে। এবং ইংরেজিতে পণ্ডিত করে তুলেছে। সেই ইউনাইটেড কিংডমের, হেল্থ সিকিউরিটি এজেন্সি কিন্তু তলায় তলায় তাদের কাজটা ঠিকই করে গিয়েছে। না, পাশ্চাত্য মিডিয়ার ঢাক আর ঢোল দুইবেলা আমাদের কাছে সেই সংবাদ প্রচারিত করেনি। করার কথাও নয়। এখন পুতিনের মুণ্ডুপাত করার সময়। আমরাও সেই কাজে ব্যস্ত। ব্রিটেনের হেল্থ সিকিউরিটি এজেন্সির প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্যে বেশ কিছু চমকপ্রদ বিষয় পরিস্কার হয়ে উঠেছে। এজেন্সি তাদের সাম্প্রতিক সমীক্ষার যে ফলাফল প্রকশিত করেছে তাতে জানা যাচ্ছে, এই বছরের জানুয়ারীর ২৪ তারিখ থেকে গত মাসের ২০ তারিখ পর্য্যন্ত সময় সীমায় গ্রেট ব্রিটিনে করোনা সংক্রমণে যতজনের মৃত্যু হয়েছে। তার ভিতরে বেশিরভাগ মানুষই কিন্তু ভ্যাকসিনেটেড। মোট মৃত্যুর ভিতরে ভ্যাকসিনেটেড মানুষের মৃত্যু ঘটেছে ৮৯ শতাংশ। ফলে বাকি মাত্র ১১ শতাংশ মৃত্যুর ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনের কোন ভুমিকা নেই। অর্থাৎ এই চার সপ্তাহে ব্রিটেনে মাত্র ১১ শতাংশ নন ভ্যাকসিনেটেড মানুষের করোনা সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে। এই সমীক্ষায় একটি বিষয় পরিস্কার। করোনা সংক্রমণে ভ্যাকসিনের একটা বড়ো ভুমিকা রয়ে যাচ্ছে। তার থেকেও বড়ো বিষয়। করোনা সংক্রমণে মৃত্যুর ঘটনার পিছনেও সেই ভ্যাকসিনের ভুমিকা অত্যন্ত সক্রিয়।


ব্রিটেনের এই হেল্থ সিকিউরিটি এজেন্সির সমীক্ষার আরও একটু ভিতরে ঢোকা যাক বরং। ঐ একই চার সপ্তাহের সময় সীমায় ব্রিটেনে যাঁরা এক ডোজও ভ্যাকসিন নেননি, তাঁদের ভিতরে ৪,০৪,০৩০ জন মানুষ করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। এক ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া মানুষের ভিতরে করোনা সংক্রমিত হয়েছেন ১,০৯,৮০৩ তিনজন। দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া ব্রিটেনবাসীর ভিতরে ২,২৪,৫০৫ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। লক্ষ্য করার বিষয়, ভ্যাকসিন না নেওয়া মানুষের থেকে ১ ডোজ এবং ২ ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া মানুষ কিন্তু সংখ্যার বিচারে কম সংক্রমিত হয়েছেন। ঠিক যেমনটা সান্ধ্যটিভির আসরে আমাদের জানানো হয়ে থাকে। ভ্যাকসিন নিলে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কম। আর না নিলে সেই ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। হেল্থ সিকিউরিটি এজেন্সির সমীক্ষার পরবর্তী ধাপে আমরা জানতে পারছি আরও এক চমকপ্রদ তথ্য। এই সমীক্ষার কালপর্বের চার সপ্তাহে গ্রেট ব্রিটিনের তিন ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া মানুষের ভিতরে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৭,৫২,১২৬ জন। জানি না কারুর চক্ষু চড়কগাছ হলো কিনা। কিন্তু সমীক্ষার এই ফলাফল কোন কনস্পিরেসি থিওরিস্টদের দেওয়া নয়। তাহলে যো‌গ বিয়োগ গুন ভাগ করে আসল চিত্রটা যা দাঁড়ালো। সেটি হলো এই। এই বছরের ২৪শে জানুয়ারী থেকে ২০শে ফেব্রুয়ারী’র সময় সীমার চার সপ্তাহে গ্রেট ব্রিটেনে করোনায় আক্রান্ত মানুষদের ভিতরে ভ্যাকসিন নেওয়া মানুষের সংখ্যা ১০,৮৬,৪৩৪ জন।  আর ভ্যাকসিন না নেওয়া মানুষের সংখ্যা ৪,০৪,০৩০ জন। শতাংশের বিচারে ৭৩ শতাংশ করোনা আক্রান্তই ভ্যাকসিনেটেড। আর মাত্র ২৭ শতাংশ করোনা আক্রান্ত নন ভ্যাকসিনেটেড।


করোনা সংক্রমণের একটা ছবি পাওয়া গেল। এবার দেখা যাক। একই সময় সীমায় গ্রেট ব্রিটেনে করোনা সংক্রমণ নিয়ে কতজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হেল্থ সিকিউরিটি এজেন্সির দেওয়া তথ্যে জানা যাচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি করোনা সংক্রমিত রোগীর ভিতরে ২৩৪১ জন কোন ভ্যাকসিন না নিয়েই অসুস্থ হয়েছেন, এবং হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হয়েছেন। এক ডোজ ভ্যাকসিন নিয়ে যাঁরা করোনায় সংক্রমিত হয়েছিলেন। তাঁদের ভিতরে ৪৬৩ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। আর দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া করোনা সংক্রমিতদের ভিতরে ১৪৯০ জনকে হাসপাতালের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে তিন ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েও করোনায় সংক্রমিত হয়ে মোট ৪৯৩৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। অর্থাৎ ২৪শে জানুয়ারী থেকে ২০শে ফেব্রুয়ারীর ভিতরে চার সপ্তাহে গ্রেট ব্রিটেনে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া করোনা রোগীদের ভিতরে ৬৮৮৯ জনই ছিলেন ভ্যাকসিনেটেড। আর মাত্র ২৩৪১ ছিলেন পুরোপুরি নন ভ্যাকসিনেটেড।


সব শেষে এই সময় পর্বে ব্রিটেনে করোনা সংক্রমণে মৃত্যুর ছবিটি ঠিক কিরকম। একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। যাঁরা এক ডোজও ভ্যাকসিন নেননি। অথচ করোনা সংক্রমিত হয়েছিলেন সেই ৪ লক্ষ ৪ হাজার ৩০ জনের ভিতরে মাত্র ৫৫৯ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এক ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া সংক্রমিত মানুষের ভিতরে ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া রোগীর ভিতরে ১০৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এবং তিন ডোজ ভ্যাকসিন নেওয়া রোগীর ভিতরে মৃত্যু হয়ে গিয়েছে ৩১২০ জনের। অর্থাৎ ভ্যাকসিন নেওয়া করোনা রোগীর ভিতরে এই চার সপ্তাহে মারা গিয়েছেন ৪,৩০২ জন। আর ভ্যাকসিন না নেওয়া রোগীর ভিতরে মারা গিয়েছেন ৫৫৯ জন। শতাংশের হিসাব পূর্বেই দেওয়া হয়েছিল। ২৪শে জানুয়ারী থেকে ২০শে ফেব্রুয়ারীর ভিতরে ব্রিটেনে, চার সপ্তাহে করোনায় মৃতদের ভিতরে ৮৯ শতাংশই ভ্যাকসিনেটেড মানুষ। মাত্র ১১ শতাংশ মৃত নন ভ্যালসিনেটেড। হিসেবটি এক ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে আমাদের। বিশ্বের বাকি ২২৬টি দেশের এই একই সময় পর্বের সঠিক হিসেব এর সাথে যোগ করতে পারলে। আমরা করোনার ভয়াবহতা এবং ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার প্রকৃত ছবিটা জানতে পারতাম। এবং দেখতে পেতাম ভ্যাকসিনের ভয়াবহতার গোটা ছবিটাও। ঠিক যে ছবিটি আমাদের চোখ থেকে আড়াল করে রাখার খেলা চলছে প্রতিদিন। আর আমরাও সেই খেলায় অংশ নিয়ে হাততালি দিচ্ছি। যে যেখানে রয়েছি। বিশ্বাসে রক্ষা করে ভ্যাকসিন বলে দাঁড়িয়ে রয়েছি লাইনে। যে লাইনের অভিমুখ শশ্মান থেকে গোরস্থানে।

১২ই মার্চ’ ২০২২

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত