দাম বাড়লে
ক্ষতি কি?
পুতিন যে হিটলার। এই বিষয়ে আর কোন
বিতর্ক নাই। বিশ্ব যে পুতিনের জীবদ্দশায় নিরাপদ নয়। এটাও আমরা বুঝে গিয়েছি। ফলে পুতিনের
মাথায় বোমা ফেলতে না পারলে কি হবে। পুতিনের ধোপা নাপিত তো বন্ধ করে দেওয়া গিয়েছে। হাতে
না মারতে পারলে। ভাতে মারো। বাংলার প্রবাদ বাক্যে মার্কিন-ন্যাটো বাহিনী সমাধান সূত্র
খুঁজে পেয়েছে। মার্কিন জনগণের কাছে বর্তমান বিশ্ব প্রধান জো বাইডেন সরাসরি বক্তব্য
রেখেছেন। কোন লুকোচুরি নেই। সকলেই জানেন। পুতিনের ধোপা নাপিত বন্ধের চোটে বিশ্বজুড়ে
সাধারণ মানুষের আয় কমবে। আর ব্যায় বৃদ্ধি পাবে। সাধারণ মানুষ যারা রাশিয়া বা ইউক্রেনে
নেই। সাধারণ মানুষ। যারা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন না। সাধারণ মানুষ। যারা কোথাও যুদ্ধ
শুরু করে না। তাদের উপরেই কিন্তু পুতিনের ধোপা নাপিত বন্ধের প্রভাব সবচেয়ে মারাত্ম
ভাবে পড়বে। এই বিষয়ে হয়ত অনেকের মনেই সংশয় থাকতে পারে। কোথায় রাশিয়া। আর কোথায় আমরা।
রাশিয়ার উপরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় আমাদের ক্ষতি কি? সর্বনাশ যা হওয়ার। হবে রাশিয়ানদের।
জাতটা তো আর সুবিধের নয়। রক্তের ভিতরে কমিউনিজমের বিষ রয়ে গিয়েছে এখনো। ওদের টাইট দেওয়ার
দরকার ছিল আরও অনেক আগে থেকেই। সেই তাঁদের মনের ভুল ভাঙতেই বিশ্ব প্রধান জো বাইডেন
আগেই জানিয়ে দিচ্ছেন। এবারে সকলের উপরেই রাশিয়ার ধোপা নাপিত বন্ধ করার চোট এসে পড়বে।
তিনি বলছেন। এই চোটটুকু আমাদের সহ্য তো করতেই হবে। এবং কেন করতে হবে? তিনি সেটিও বলে
দিয়েছেন। করতে হবে গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত ও মজবুত রাখার লক্ষ্যেই।
বেশ, আমরাও নিশ্চিন্ত। আরে বিশ্বজুড়ে
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষিত রাখার একমাত্র ঠিকাদার যখন বলেছেন। তখন এই কষ্টটা তো
মেনে নিতেই হবে। না নিলে কিসের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। মানুষের উপরে গণতন্ত্র সত্য।
সেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে কোথায় দুর্ভিক্ষ লাগবে, কোথায় মানুষ না খেতে পেয়ে মারা
যাবে। এসব ভাবলে চলবে নাকি? রাশিয়া ইউক্রেনে মার্কিনশক্তির প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রে আঘাত
হেনেছে। এই অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। ইউক্রেনে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটাই
এখন বিশ্ববাসীর প্রধান কর্তব্য। কি করে সম্ভব হবে সেই কাজ? বিশ্ব প্রধান সেটাই আমাদের
জানিয়ে দিয়েছেন। অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করে রাশিয়াকে বিদ্ধস্ত করে দিতে হবে। তবেই রাশিয়া
ইউক্রেন থেকে পালিয়ে যাবে মিউমিউ করতে করতে। আর সেই ফাঁকে বিশ্ব প্রধানের নেতৃত্বে
ইউক্রেনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে সেই গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্র রক্ষায় মানুষের প্রাণও অতি
তুচ্ছ বিষয়। মানুষের উপরে গণতন্ত্র সত্য।
গণতন্ত্র রক্ষায় অর্থনৈতিক যুদ্ধের
প্রথম ধাপে, রাশিয়ার উপরে চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ইতিমধ্যেই বিশ্বের তেলের
বাজারে আগুন লেগে গিয়েছে। তেলের দাম যত বৃদ্ধি পাবে। তত বেশি করে সাধারণ মানুষকে চড়া
দামে তেল কিনতে হবে। তত বেশি করে সেই চড়া মূল্যের মুনাফা ঘরে তুলে নিতে পারবে তেল কোম্পানিগুলি
ও সেগুলির মালিকরা। না বিশ্বজুড়ে তেল কম্পানির মালিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। হাতে গোনা
যায়। ফলে আবিশ্ব, মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা টাকার একটা বড়ো অংশ হঠাৎ করে কয়েকজন
ওয়েল ব্যারনের পকেটে ঢুকে যাবে। পুতিনের ধোপা নাপিত বন্ধ না করলে এই অতিরিক্ত মুনাফা
কিন্তু এক লহমায় বিশেষ কয়েকজনের পকেটে ঢুকতো না। না না, তাই বলে চিন্তার কিছু নাই।
এনারাই বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মূল স্পন্সর। সকলেই জানেন। স্পন্সর না খুঁজে
পেলে আজকাল দুর্গাপুজোও করা যায় না। নির্বাচনে দাঁড়ানো যায় না। যে কোন কাজ তখনই সফল
হয়। যখন পাশে কেউ থাকে স্পন্সর করার জন্য। ফলে ইউক্রেনে গণতন্ত্র পুণঃপ্রতিষ্ঠার জন্য
তেলের বাজারে আগুন লাগানোর অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল বইকি।
না, শুধু তেলই তো নয়। জার্মানরা
এবার কয়েক দশকের শীত ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। ফলে রাশিয়ার কাছ থেকে শস্তায় গ্যাস আমদানি
বন্ধ করে অতিরিক্ত চড়া মূল্য গ্যাস আমদানীর পরিকল্পনা নিয়েছে। এই গ্যাস আমদানির একটা
বড়ো শতাংশের বরাত পাবে অবশ্য বিশ্ব প্রধানের সুপুত্র। হান্টার বাইডেন। ইউক্রেন থেকে
এমনিতেই গত আট বছরে যিনি সোজাপথে বাঁকা পথে বিপুল মুনাফা ঘরে তুলে নিয়ে ফুলে এবং ফেঁপে
ঢোল হয়েছেন। তাঁর বহুদিনের সাধ ছিল। জার্মানিতে গ্যাস রপ্তানীর বাজারটা দখল করার। কিন্তু
রাশিয়ার সাথে প্রতিযোগিতায় তিনি পেরে উঠছিলেন না কিছুতেই। এখন জার্মানরা রাশিয়াকে বাতিল
করে দেওয়ায় বাইডেন পুত্রের কপাল খুলে যেতে আর দেরি কি? তার জন্যে জার্মানির অভ্যন্তরে
যে মুদ্রাস্ফীতি তৈরী হবে। তাতে মেড ইন জার্মান প্রডাক্টের মূল্যস্তরও বিপুল বৃদ্ধি
পাবে। সেই সুযোগে আমরা যারা বিশ্বজুড়ে মেড ইন জার্মান প্রোডাক্টের ভক্ত ও তার উপরে
নির্ভরশীল। তাদেরকে অতিরিক্ত ব্যায়ে জার্মান থেকে জিনিসপত্র আমদানি করতে হবে। শুধু
জার্মানই নয়। জার্মানি অতিরিক্ত চড়া মূল্য গ্যাস আমদানি করা মানে। বাকি ইউরোপকেও সেই
একই কাজ করতে হবে। তার প্রভাবে ইউরোপে প্রস্তুত সকল দ্রব্যের উপরেই তার প্রভাব পড়বে
বইকি। সাথে তেলের বাজারে আগুন লাগার বিষয়টা যোগ করতে হবে। ফলে জিনিসপত্র আমদানি করতে
এবার অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। এই অতিরিক্ত অর্থ গিয়ে জমা হতে থাকবে শিল্পপতিদের
ঘরে। এবং বিশেষ করে তেল গ্যাস বাণিজ্যের সাথে যারা জড়িত। ফলে রাশিয়ার ধোপানাপিত বন্ধে
ইউরোপ ও আমেরিকার শিল্পপতিদের ঘরে ঘরে মহোৎসব লেগে গিয়েছে। তারা এখন ব্যস্ত এই অতিরিক্ত
মুনাফার হিসেব নিকেশ করতে।
আমাদের দেশের শিল্পপতিরাও বঞ্চিত
হবেন না। তারাও নতুন পথ খুঁজে পাবেন। আরও বেশি করে ফুলে এবং ফেঁপে ওঠার। আজ শেষ হচ্ছে
উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন। মধ্যরাত থেকেই হয়তো বৃদ্ধি পাবে পেট্রোল ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের
মূল্য। ইউক্রেনে যু্দ্ধ না লাগলেও বৃদ্ধি পেত। পুতিনের ধোপা নাপিত বন্ধ না হলেও বৃদ্ধি
পেত। কিন্তু একটু আধটু চক্ষুলজ্জার বালাই থাকতো আর কি। কিন্তু বিশ্ব প্রধান যখন বলেই
দিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র রক্ষায় এইটুকু কষ্ট তো আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তখন
তো আর চক্ষু লজ্জার বালাই রাখলে চলবে না। রাত পোহালেই আমরা টের পাবো। কত ধানে কত চাল।
সামনেই জিএসটি কাউন্সিলের বৈঠক। শোনা যাচ্ছে ন্যূনতম কর পাঁচ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে
আট শতাংশ কিংবা তারও বেশি ধার্য্য করা হতে পারে। প্রতিটি জিনিসপত্র অগ্নিমুল্যের হয়ে
উঠবে। ব্যায় বৃদ্ধি পাবে বিপুল ভাবে। ফলে, সকলেরই আয় কমবে এবার। অবশ্য যারা কাটমানি
ঘুষমানি তোলামানি চুরিমানি ইত্যাদি পেশার সাথে যুক্ত তাদের কথা ভিন্ন। তারা তাদের রেট
বৃদ্ধি করে নেবেন। আর যারা স্বাধীন পেশায় যুক্ত। ডাক্তার উকিল ইঞ্জিনীয়র কনসাল্টেন্ট
প্রভৃতি। তাঁদেরও চিন্তার কিছু নেই। কনসাল্টেশন ফী বৃদ্ধি করে পুষিয়ে নিতে পারবেন।
চিন্তা শুধু বাকিদের। তাদের জন্যই তো পুতিনকে হিটলার বানানো হয়েছে। তাদের জন্যেই তো
ছাপ্পান্নো ইঞ্চির নতুন ভারত গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের জন্যেই তো বড়োদাদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঠিকা নিয়ে রেখে দিয়েছে। তাদের জন্যেই তো অযোধ্যায় রামমন্দির
নির্মাণ হচ্ছে। তাদের জন্যেই তো যাবতীয় উন্নয়ন। যে উন্নয়নের রঙ এক এক দেশে এক এক রকম।
তাদের জন্যেই এবার বয়কট রাশিয়া। তাদের জন্যেই বিশ্ব প্রধান আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। গণতন্ত্র
সুরক্ষিত রাখতে এই আত্মত্যাগটুকু মেনে নিতেই হবে।
না, তাই বলে কাল থেকেই আবার বেয়াড়া কৃষকদের মতোন রাজপথ অবরোধ করে বসে পড়লে চলবে না। দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবিতে সরব হলে চলবে না। সরকার বিরোধী স্লোগান দিলে চলবে না। মনে রাখতে হবে। যা হচ্ছে। তা সবই হচ্ছে ঐ একটা লোকের জন্য। সাদ্দাম নাই। লাদেন নাই। একজন কে তো চাই। আমরা সেই একজনকে এবারে পেয়ে গিয়েছি ফেব্রুয়ারীর শেষ সপ্তাহে। তাই গোটা বিশ্বের বিপদ এখন পুতিন। ওটাকে সরিয়ে দিতে হবে। ওটাকে জব্দ করতে হবে। গণতন্ত্র সুরক্ষিত করতে হবে। ততদিন ব্যায় বৃদ্ধির আঁচে জীবন ওষ্ঠাগত হলেও ক্ষতি নাই। সাধারণ মানুষের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করা অর্থ বিশ্বজুড়ে ধনকুবেরদের পকেটে মিছিল করে ঢুকতে থাকলেও ক্ষতি নাই। মানুষের জীবন যুদ্ধ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠলেও ক্ষতি নাই। মানুষ অনাহারে মরলেও ক্ষতি নাই। আর আমাদের দেশে তো আরোই মজা। সরকার অতিরিক্ত রাজস্ব তুলতে মাঠে নেমে পড়বে। সেই অতিরিক্ত রাজস্ব থেকেই ভারতীয় ধনকুবেরদের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ মকুব করে দেবে। ভারতীয় ধনকুবেররা বিশ্ব ধনকুবেরদের লিস্টে ক্রমেই উপরের দিকে উঠতে থাকবে। আর সেই গর্বে, হ্যাঁ আমাদেরও ছাতি ফুলতে ফুলতে ছাপ্পান্নো ইঞ্চি হয়ে উঠবে প্রতিদিন।
৭ই মার্চ’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র
কর্তৃক সংরক্ষিত
