লজ্জায় মাথা কাটা যায় না যাদের

 

লজ্জায় মাথা কাটা যায় না যাদের

পোড়া কপাল পোড়া কপাল। না হলে হাজার হাজার হোক আর শত শত হোক। গত এগারো বছরে দুনম্বরী পথে কতজনের কতরকমের সরকারী চাকরি হয়ে গিয়েছে এই রাজ্যে। অথচ কপাল পুড়লো কিনা মন্ত্রীকন্যার। মন্ত্রীত্বের অধিকারেও রক্ষা হলো না কন্যার অসৎ উপায়ে পাওয়া চাকরিটি। জানি, অনেকেই আনন্দ করছেন। অনেকেই মনে করছেন, এই জন্যেই বলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। না, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে না। ওটাকে অনেক মেহনত ও কসরত করে এবং বিপুল অর্থ ব্যায় করে নাড়াতে হয়। সেই ক্ষমতা অধিকাংশেরই থাকে না। কদাচিৎ দুই একজন সেই ক্ষমতার হদিস পেয়ে গেলে। তখনই ধর্মের কল নড়ে চড়ে ওঠে। ধর্মের কলের এই নড়ে চড়ে ওঠা। নেহাৎই বিরল ঘটনা। অন্তত ভারতবর্ষ নামক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে। তাই মন্ত্রীকন্যার কপাল পুড়লো বলেই যে বাকি বঞ্চিতদের কপাল খুলে যাবে। নাহ, এতটা আশা করার কোন কারণ নেই। কারণ ভারতবর্ষের আইন আদালত এবং বিচার ব্যবস্থার পরিকাঠামো। এবং বিচারের ণত্ব এবং ষত্ব। ফলে সম্পূ্র্ণ অসৎ উপায়ে রাজ্য সরকারের একাধিক চাকরি বাগিয়ে নিয়ে করে কম্মে খেতে থাকা বাকিদের এখনই ভয় পাওয়ার কিছু নেই।


কথায় বলে লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়া। এই প্রবাদ বাক্যটি সকলের জন্য নয়। বিশেষ করে অসৎ চরিত্রের মানুষদের জন্য তো নয়ই। কারণ তারা জানেন আইনকে কেমন করে আইনের পথে চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়। এই কারণেই তাদেরকে হকে নকে বলতে শোনা যায়, ‘আইন আইনের পথে চলবে’। আইনের এই আইনের পথে চলার জন্যেই বিচারপতি লোধাকে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছিল। ফলে আইনের এই আইনের পথে চলা খুব একটা ভরসা যোগানোর মতো কথা নয় তাঁদের কাছে। যাঁরা অন্যায়ের শিকার হন। আবার আইনের এই আইনের পথে চলার উপরেই ভরসা করে রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কেষ্ট এবং বিষ্টুরা নিশ্চিন্তে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন। যাবতীয় অসৎ কাজ করে। অষ্টপ্রহর দুর্নীতির ভিতরে ডুবে থেকে। না, তাতে তাদের লজ্জায় মাথা কাটা যায় না। যায় যে না। সেটা আমরা দুই বেলা দেখতে পাচ্ছি। বিশেষ করে বিগত এগারো বছরের পরিবর্তনের সংস্কৃতিতে। সারদা মামলায় যাদের নাম উঠেছে। তাদের ভোটের ভাগে তাতেও কম কিছু পড়েনি। সমাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে তারা দিব্যি বুক চিতিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গলায় জনসমর্থনের জয়মাল্য দুলিয়ে। টিভির পর্দা জুড়ে যাদেরকে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতে দেখা গেল নারদা কাণ্ডে। তাদের সম্বন্ধেও এই একই কথা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের সামনেও তাদের কাউকে লজ্জায় মাথা নত করতে দেখা যায়নি। আর যাবেই বা কেন। জনগণের ভোটে বার বার নির্বাচিত হয়ে আসলে, একটি কথাই প্রমাণ হয়। সমস্ত রকমের দুর্নীতি করাটিই এই সময়ের নীতিগত সংস্কৃতি।


এবং নীতিগত সংস্কৃতির এই রীতিই বিগত এগারো বছরে রাজ্য রাজনীতির শেষ কথা। ফলে মন্ত্রীকন্যা অসৎ উপায়ে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেবেন। এ আর নতুন কথা কি? একজন মানুষ মন্ত্রী হওয়ার জন্য এত কাঠখড় পুড়িয়ে মেহনত করতেই বা যাবেন কেন? যদি না তিনি দুর্নীতি করার অধিকার পান? দুর্নীতি করার এই অধিকার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয় রয়েছে বলেই। মানুষ ভোটে দাঁড়ায়। গণতন্ত্রে দুর্নীতি করার অধিকার ও সুযোগ না থাকলে। ভোটে দাঁড়ানোর মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিলের বিষয় হতো। মন্ত্রীও হবো। অথচ অসৎ উপায়ে নিজের সন্তানদের দাঁড় করিয়ে দিয়ে যাবো না। এতো আর ‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’র যুগ নয়। ফলে একজন পিতা তার পিতৃকর্তব্যের দায়িত্বে নিজ কন্যাকে অসৎ উপায়ে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেবেন। এ আর বেশি কথা কি? এই নিয়ে এত হইচই করারই বা কি আছে? তাই আইনের হাতে ধরা পড়লেও লজ্জার কিছু নাই। ধরা না পড়লেও সেটা লজ্জার বিষয় নয়। বরং অত্যন্ত গর্বের বিষয়। দুর্নীতি করেও আইনকে আইনের পথে ঠেলে দিয়ে আইনের হাতকে খর্ব করে রাখা। সে’কি কম গর্বের বিষয়? এই গর্বই ভারতবর্ষের রাজনীতির চালিকা শক্তি। আমাদের রাজ্যই বা সেই গর্বের থেকে পিছিয়ে থাকবে কেন? বিগত এগারো বছরে এই বিষয়ে রাজ্যের উন্নয়ন সত্যিই চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার মতো। মন্ত্রীকন্যা সেই ধারারই অন্যতম শরিক মাত্র। তাই সত্যিই তো। চাকরি চলে যাক। প্রাপ্ত বেতন ফেরত দিতে হোক। কিন্তু তাতে লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার কথ নয়। যাবেও না। বরং বুক ঠুকে বলা যেতে পারে। একবার শাসকদলের হলে ভোটে দাঁড়িয়ে পড়লে। নারদা কাণ্ডের ঘুষখোরদের মতোই বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে আইনসভার সদস্য হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। কারণ একটাই। মানুষ এখন উন্নয়নের পক্ষে। আর সেই মানুষই শেষ কথা বলে।


ফলে দেখতে হবে মানুষ কোন পক্ষে। যারা অসৎ আর দুর্নীতিপরায়ণ। তারা কিন্তু রাজ্যবাসীর পালস্ খুব ভালে করেই জানেন। আর জানেন বলেই রাজ্য জুড়ে দুর্নীতির এই এক শক্ত এবং পোক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। মানুষ কিন্তু এই নেটওয়ার্কের পক্ষে। পক্ষে বলেই সম্পূর্ণ সাদা খাতা জমা দিয়েও চাকরির পরীক্ষার হল থেকে বুক চিতিয়ে বেড়িয়ে আসছে, ‘চাকরিটা আমি পেয়ে যাবো বেলা শুনছো’ গুন গুন করতে করতে। ঘুষ আর ঘুষির ব্যবহারেই যদি কেল্লাফতে হয়ে যায়। তবে মেধা অর্জনের মেহনতে মাথা ঘামাতে যায় কোন বেকুবে? এবং মেধাহীন এই এক প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাত ধরে রাজ্যের উন্নয়নের পথ বাঁধানোর কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। না, যদি কেউ মনে করে থাকেন। কোন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারলেই উন্নয়নের এই মহা সড়ক থেকে গোটা রাজ্যকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে। তাহলে মস্ত বড়ো ভুল হয়ে যাবে।


আসলে বিশ্বজুড়েই দেশে দেশে এই এক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নীল নকশা ছড়িয়ে রয়েছে। যেখানে গণতন্ত্র আর দুর্নীতি পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলতে থাকবে। ভারতবর্ষও তার ব্যতিক্রম নয়। পশ্চিমবঙ্গও তার বাইরে নয়। ফলে জীবনে করে কম্মে খেতে গেলে গণতন্ত্রের এই ণত্ব এবং ষত্বকেই শেষ কথা ধরে নিয়ে পথে নামতে হবে। লজ্জায় বরং মাথা কাটা যাবে তাঁদের। যাঁরা এই পথে হাঁটতে অক্ষম। এই যুগ। এই সময়। তাঁদের জন্য নয়। আমাদের রাজ্যের উন্নয়নের কাণ্ডারীরা এই মহাসত্যটুকু অনেক আগেই স্পষ্ট বুঝে গিয়েছিলেন। নন্দীগ্রামের সেই চটি পুলিশ থেকে নারদা কাণ্ডের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা অব্দি। ফলে, মন্ত্রী এবং মন্ত্রীকন্যা কারুরই লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে না। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে না। আমাদেরও। আমরা যারা দুর্নীতির কারবারিদের বার বার শাসন ক্ষমতায় নির্বাচিত করে আসছি। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে না তাঁদেরও। যাঁরা ‘পরিবর্তন চাই’ হোর্ডিংয়ে মাথা গলিয়ে দিয়েছিলেন একদিন। দুই একজন বাদে, বাকিরা আজও মাথা উঁচু করে মুখে আঙুল দিয়ে দিদিমনির ক্লাস করে যাচ্ছেন। পরম নিশ্চিন্তে। আমার সন্তান সন্ততি থাক দুধে ভাতে। কথায় বলে পাগলেও নিজের ভালো বোঝে। আর এঁরা তো সব মহান বুদ্ধিজীবী!


ফলে বুদ্ধি যাঁদের যত কম। তাঁরাই মাঝে মধ্যে হঠাৎ করে ধর্মের কল নড়েচড়ে উঠলে, কোলাহল শুরু করে দেয় বেশি করে। সেই কোলাহলে যে যত বেশি বড়ো বেকুব। সে তত বেশি আশান্বিত হয়ে ওঠে। সুদিন ঐ আসলো বলে। একবার শুধু বুথে গিয়ে নিজের ভোটটা নিজে ঠিকমতো দিতে পারলেই হলো! না, এই সময় এই যুগ এবং দুনিয়া ব্যাপী গণতন্ত্রের ফাঁদ পাতা এই শতকে দিন বদলের গল্পটা বুথে বুথে শুরু হওয়ার অবস্থায় আর নেই। সেই গল্পটা লিখতে হলে শুরু করতে হবে একেবারে শূন্য থেকে। নাহ! বিধানসভার শূন্য থেকে নয়। রোগের সিমটমের চিকিৎসায় সুরাহা নেই। যতক্ষণ না রোগের কারণে গিয়ে পৌঁছানো যাচ্ছে। রোগের সেই কারণকে স্কয়ার ওয়ান ধরে নিয়ে যদি কেউ শুরু করতে চেষ্টা করে। তবে সেই শূন্য থেকে শুরু করলে। হয়তো আগামী শতকে বিশ্বব্যাপী মানুষ কোন একটি সঠিক উত্তরের সন্ধান পেলেও পেতে পারে। ততদিন মন্ত্রী কেন! মন্ত্রীকন্যা, ভোটার এবং বুদ্ধিজীবী, কারুরই লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার কথা নয়। যাবেও না।

২১শে মে’ ২০২২

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত