গোড়ায় গণ্ডগোল
শরীর না মন? দুইজন মানুষের মিলনের ভিত
কোনটি? এই প্রশ্ন চিরকালীন। এই নিয়ে বিতর্কেরও কোন শেষ নেই। এর কোন শেষ উত্তর আজও পাওয়া
যায়নি। কথায় বলে নানা মুনির নানা মত। কিন্তু শুধুই কি শরীর আর মন? আমাদের ব্যক্তিগত
ইগো, যাকে আমরা অহং বলতে পারি। তারও কি কোন ভুমিকা নেই দুইজন মানুষের মিলনের ক্ষেত্রে?
সাধারণ ভাবে মনের মিলের সূত্র ধরে পারস্পরিক ব্যক্তিগত ইগো বা অহং পরিতৃপ্ত হলেই দুইজন
মানুষ শারীরীক মিলনের প্রত্যাশী হয়ে ওঠে। আবার মনের মিল হলেই যে দুইজন স্বতন্ত্র মানুষের
শরীরের মিল হবে। এমন কোন নিশ্চয়তাও নেই। আমাদের সংস্কৃতিতে ধরেই নেওয়া হয়, মনের মিল
হলেই শরীর এবং অহং এই দুইয়ের মিল হয়ে যাবে। ফলে আমরা মনের মিলের উপরেই নির্ভর করতে
চেষ্টা করি। সেই মিলের উপরে দাঁড়িয়ে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আমাদের শরীর এবং অহংকে চালিত
করতে থাকে। সেই বিশ্বাস থেকেই আমরা পারস্পরিক শরীর এবং অহং এর সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়াসে
অগ্রসর হতে থাকি। এই প্রয়াসকেই আমরা দাম্পত্য ভালোবাসা বলে ধরে নিতে চাই। আর আমাদের
প্রথম ভুলটি হয় ঠিক এইখানেই।
আমাদের মন শরীর এবং অহং। প্রতিটিরই স্বতন্ত্র
সত্তা বিদ্যমান। এই শাশ্বত সত্যটুকু আমাদের খেয়াল থাকে না অধিকাংশ সময়েই। একজন মানুষের
সাথে মনের মিল হলেই যে সেই বিশেষ মানুষটির সাথে আমাদের শরীর এবং অহং এরও মিল হয়ে যাবে।
এর কোন রকম নিশ্চয়তা নেই। থাকার কথাও নয়। অথচ আমরা ধরেই নিই। মনের মিল হওয়া মানেই শরীর
ও অহং পারস্পরিক মিলনের ভিতর দিয়ে একটি ঐকতান গড়ে তুলবে। তুলতেই পারে। আবার নাও তুলতে
পারে। তুলতে না পারা অস্বাভাবিক নয় আদৌ। এই বোধটুকুর অভাব থেকেই আমাদের ভালোবাসাজাত
অধিকাংশ সমস্যার উৎপত্তি। ফলে আমাদের ‘মনের মিলের’ উপরে এই অতিরিক্ত এবং সর্বাত্মক
নির্ভরতা আমাদের অন্ধ করে রাখে। আমরা আমাদের শরীর এবং অহং’এর নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র
চাহিদাগুলি সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকি না। যে কথাটি আমরা প্রয়াশই ব্যবহার করে থাকি।
‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’। আমাদরে এই শরীর আর অহং সম্বন্ধেও আমরা সেটিই করে থাকি। মনের
মিলের উপরে সর্বাত্মক এবং মারাত্মক অন্ধবিশ্বাসে। আমরা বুঝতেই চাই না। মনের মিল হওয়া
মানেই শরীরের মিল হয়ে যাওয়ার কোন নিশ্চয়তা নয়। শরীর আর মন দুইটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তা।
তাদের চাওয়া এবং পাওয়া । আশা এবং আকাঙ্খা। অনুভব এবং সুখ। তৃপ্তি এবং আনন্দ। সবকিছুই
ভিন্ন। এই ভিন্নতা সম্বন্ধে আমাদের অধিকাংশ মানুষের ভিতরেই স্পষ্ট কোন ধারণা এবং জ্ঞান
থাকে না। মিলনের অভিজ্ঞতা ছাড়া স্পস্ট জ্ঞান না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটা ধারণা
থাকার খুব প্রয়োজন।
দুইজন মানুষের দাম্পত্য সম্পর্কে নানবিধ
কারণেই ফাটল ধরতে পারে। সেই ফাটলগুলি মেরামত করা অনেক সহজ হয়ে যায় তখনই। যখন দুইজন
মানুষের শরীর মন আর অহং-এর ভিতরে একটি ঐকতান সৃস্টি হয়ে থাকে। কিন্তু সেই ঐকতান যে
সম্পর্কে অনুপস্থিত। সেই সম্পর্কের ভিতরে অতি সামান্য ফাটলও দিনে দিনে বৃহৎ আকার ধারণ
করতে পারে। যার শেষ পরিণতি বিবাহবিচ্ছেদে। আর সবকিছু বাদ দিলেও। দুটি মানুষের ভিতরে
যতদিন শারীরীক মিলনের তৃপ্তি সজীব এবং প্রাণবন্ত থাকে। দেখা যাবে, মনের এবং অহং এর
সম্পূর্ণ ঐকতান না থাকলেও সেই দুইজন মানুষ পরস্পরকে ছেড়ে থাকতে পারছে না। এর একটাই
কারণ। আমাদের জীবনে পারস্পরিক প্রেম ভালোবাসার ক্ষেত্রে শরীরের অস্তিত্ব এমনই অমোঘ।
আমরা বুদ্ধি দিয়ে যুক্তি দিয়ে সংস্কার দিয়ে তাকে গৌণ করে রেখে দিতে চাইলেও। সেই শরীরই
কিন্তু শেষ কথা বলে থাকে। আর, দুইজন মানুষের ভিতরে শারীরীক মিলনজাত পরিতৃপ্তি উধাও
হয়ে গেলে। তাদের মনের মিল যতই থাকুক না কেন। সেই সম্পর্কের ভিত ততটা সুদৃঢ় থাকে না
আর। থাকার কথাও নয়।
আমাদের প্রাথমিক সমস্যার শুরু হয়। আমরা
ধরেই নিই। শরীরের বিষয়টির সাথে লালসার একটি সরাসরি সম্বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিনের সংবাদ
চিত্রে সেই ছবিই ধরা পড়ে। আবার আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক উত্তরাধিকারের ঐতিহ্যে
যে সংস্কারের ভিতরে আমদের বসবাস। বড়ো হয়ে ওঠা। সেই সংস্কার আমাদের চেতনাকে এমন ভাবেই
অসাড় করে রেখে দেয়। যার ফলে শরীর এবং শারীরীক মিলনের বিষয়টিকে আমরা লালসার লেন্সের
ভিতর দিয়েই দেখতে অভ্যস্থ হয়ে যাই। ফলে আমাদের প্রেম ভালোবাসার চর্চায় আমরা মনকে এত
বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। শরীরকে আড়ালে রাখার উদ্দেশেই। শুধুমাত্র শরীরের সাথে লালসার
চেতনাকে ভুল করে জড়িয়ে ফেলে, আমরা এই এক গোঁজামিলে অভ্যস্থ হয়ে উঠি। আমরা বুঝতেই পারি
না। মনের মতোই শুধু নয়। আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের শরীরের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব।
সেই অস্তিত্বের নিজস্ব একটা ভাষা রয়েছে্। আমারা আমাদের মনের ভাষাকে জানি। বুঝি। অনুভব
করতে পারি। কিন্তু শরীরের যে স্বতন্ত্র একটি ভাষা রয়েছে। সেটিকে আমরা স্বীকার করতে
ভয় পাই। সেই ভাষাকে আমরা আমাদের মনের অনুগামী করে তোলার প্রয়াসে প্রাণপাত করতে থাকি।
আমাদের সংস্কার। পারিবারিক ঐতিহ্য। আমাদের শিক্ষা এবং সামাজিক সংস্কৃতির গণ্ডীতে। আর
ঠিক এইখানেই আমাদের ভুল হয়ে যায় গোড়াতেই। যাকে বলে গোড়ায় গণ্ডগোল।
অধিকাংশ বৈবাহিক সম্পর্কই এই গোড়ায় গণ্ডগোলের
ভিতের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের দাম্পত্যের অসুখের উত্তপ্তি সেই গণ্ডগোল থেকেই। অনেক
সময় যার শেষ পরিণতি ঘটে থাকে বিবাহবিচ্ছেদে। কিন্তু দুইজন মানুষ যতক্ষণ পারস্পরিক শরীরের
ভাষায় আলাপ চালিয়ে যেতে পারে। এবং সেই আলাপের ভিতর দিয়ে যতক্ষণ তাঁদের নিজেদের শরীর
পরিতৃপ্তিতে ভরপুর থাকে। ততক্ষণ তাঁদের সম্পর্কের ভিতরে ফাটল ধরার সম্ভাবনা প্রায় থাকেই
না। এমন কোন বিবাহবিচ্ছিন্ন দম্পতির দেখা পাওয়া সম্ভব নয়। যাঁদের শরীর পরস্পরের শরীরে
পরিতৃপ্ত। কিন্তু মনের যাবতীয় মিল থাকা সত্বেও অনেক সময়ে শরীরের মিল না থাকায় দাম্পত্যে
ফাটল দেখা দিতেই পারে। একই চেতনার শরিক হয়েও বিবাহবিচ্ছেদের অভিমুখে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।
যদি দুটি শরীরের ভাষায় মিল না থাকে। এই প্রাথমিক সত্য স্বীকারে অপারগ আমরা প্রায় সবাই।
আমাদের সংস্কার শরীরকে এতটাই গৌন করে রেখে দেয়। আর মনকে এত বেশি মুখ্য করে তুলে ধরে
যে, আমরা বুঝতেই পারি না। আমরা আসলে ঠকাতে থাকি নিজেকেই।
দুইজন মানুষের পারস্পরিক মিলনের ক্ষেত্রে
শরীর মন এবং অহং এর যে গুরুত্ব রয়েছে। শরীর তার একেবারে প্রাথমিক ভিত। আমাদের মন আর
অহং এর অস্তিত্ব আমাদের শরীরের ভিতের উপরেই দাঁড়িয়ে থাকে। সেই শরীরই কিন্তু শেষ কথা
বলে। আমরা স্বীকার করি আর নাই করি। শেষমেশ আমাদের পরিণতি ঠিক করে দেয় সেই শরীরই। শরীর
যতক্ষণ পরিতৃপ্ত। ততক্ষণই আমাদের দাম্পত্য সম্পর্ক মজবুত থাকে। আর শরীরের পরিতৃপ্তির
ভাঁড়ারে অভাব শুরু হলেই দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত আলগা হতে শুরু করে। সেই আলগা ভিতে বাইরের
ঝড় দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ধরাতেই পারে। সময় এবং সুযোগ পেলে।
আমাদের যাবতীয় সংস্কার আমদের এমনই এক অন্ধবিশ্বাসের গারদে আটকিয়ে রাখে। আমরা সোজা সত্যটুকুকে সহজ ভাবে নিতে পারি না। পারিবারিক সামাজিক এবং উত্তারাধিকার সূত্রে পাওয়া ঐতিহ্যের সংস্কারগুলি আমাদেরকে চোখ খুলে তকাতে বাধা দিতে থাকে নিরন্তর। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়। আমরা সেই বাধাটুকু টেরই পাই না অধিকাংশ সময়ে। আর যদি কখনো সখনো পাইও। বুঝতে পারি না বিষয়টা আসলে কি। নানাবিধ সিমটম দেখতে পাই শুধু। আসল অসুখ বা গণ্ডগোলের হদিশ পাই না। যে কারণে তখন আমাদের আচার আচরণে নানাবিধ অসঙ্গতি দেখা দিতে থাকে। পারস্পরিক সেই অসঙ্গতিগুলিকেই আমরা একে অপরের দোষ বলে ধরতে শুরু করে দিই। আর অসহিষ্ণু হয়ে উঠি। ভিত আলগা হতে শুরু করে দাম্পত্যের গভীরে।
২৯শে মে’ ২০২২
কপিরাইট
শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

