হিজাবে আগুন

 


হিজাবে আগুন

 

মাহশা আমিনি। বছর বাইশের তরুনী। উত্তর পশ্চিম ইরানের শহর, সাকিজের কুর্দিশ বাসিন্দা। কুর্দ একটি জাতি গোষ্ঠী। যাদের নিজেদের কোন দেশ নেই। প্রধানত তুর্কি ইরাক সিরিয়া ইরানের অংশ জুড়ে এদের বাস। গত ১৩ই সেপটেম্বর মাহশা তেহেরানের মরালিটি পুলিশের হাতে বন্দি হয়। অভিযোগ, ঠিক মতো করে হিজাব না পরার মতো দণ্ডনীয় অপরাধ করায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এবং পুলিশ কাস্টডিতেই শারীরীক নিগ্রহের শিকার হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তিনদিন কোমায় থেকে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনা এইটুকুই। সামান্য হিজাব ঠিক মতো করে পরা না পরা নিয়ে একটি মেয়ের জীবন চলে গেল অকালে। এই ঘটনায় গোটা ইরান উত্তাল হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে বাধ্যতামূলক ভাবে হিজাব পরার বিরুদ্ধে পথে নেমে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছে। শহরে শহরে পথে পথে আগুন জ্বেলে হিজাব পোড়ানো হচ্ছে। ইরানী তরুণীরা মাথার চুল কেটে ফেলে দিচ্ছে। বোরখা খুলে ফেলে দিয়ে পোাশাক নিয়ে ধর্মীয় বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করছে। খবরে প্রকাশ এই আন্দোলনের ফলে জনতা পুলিশের খণ্ডযুদ্ধে এখন অব্দি তিরিশের বেশি কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকারী হিসাবে যেটি সতেরো।

 

ইরান থেকে ফিরে আসা যাক ভারতে। গত ডিসেম্বরে কর্ণাটকের কিছু কলেজে হিজাব পরে ক্লাসে ঢোকা বন্ধ করার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন কলেজের ছাত্রীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করে। তাদের দাবি ছিল। হিজাব ইউনিফর্মের অংশ নয়। হিজাব তাদের সংস্কৃতির সাথে জড়িত। তাই হিজাব এবং বোরখা পরে ক্লাস করতে দিতে হবে। বিজেপি শাসিত কর্ণাটকে এই নিয়ে জোর তরজা শুরু করে দেয় হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলি। তারা হিন্দু ছাত্রছাত্রীদেরকে দিয়ে হিজাব নিষিদ্ধ করার আন্দোলন শুরু করে দেয়। ফলে গোটা বিষয়টি আর হিজাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি রাজনৈতিক রঙ পেয়ে যায়। বিশেষ করে পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের প্রক্কালে। হিন্দু মুসলিম মেরুকরণের রাজনীতি থেকেই কর্ণাটকের কয়েকটি কলেজে হিজাব নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। যার রাজনৈতিক ফলাফল পরবর্তী নির্বাচনী ফলাফলেও ফলবতী হয়েছিল।

 

এবারে যাওয়া যাক বাংলাদেশে। সেখানে গত দুই এক দশকে হিজাব পরার বিষয়টি একটি ফ্যাশনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। বিষয়টির সাথে অবশ্যই ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ইসলামী মৌলবাদী চেতনার একটা সংযোগ রয়েছে। যেটি আবার পরিচালিত হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে। আর এইসব যোগাযোগের হাত ধরে বিশেষ করে নবীন প্রজন্মের কাছে গারমেন্ট ব্যাবসায়ীরা হিজাবকে ফ্যাশন সমগ্রী হিসাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ফলস্বরূপ বাংলাদেশ হিজাব এখন খুবই জনপ্রিয়। অথচ বাঙালি মুসলিম নারীদের কাছে হিজাব পরার বিষয়টি একান্তই বিদেশী একটি সংস্কৃতি। ধর্মের নামে রাজনীতির স্বার্থে সেটিকে বর্তমানে বাংলাদেশে সমাজিক সংস্কৃতি বানিয়ে তোলা হয়েছে। অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। বাংলায় আবহমান কাল ধরে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের রমণীদের ভিতরেই অল্প বিস্তর মাথায় ঘোমটা দেওয়ার প্রচলন ছিল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে। মাথায় ঘোমটা দেওয়ার ভঙ্গি দুই সম্প্রদায়ের ভিতরে ভিন্ন থাকলেও। শাড়ির আঁচল দিয়েই সেই কাজটি সম্পন্ন হয়ে যেতো। তার জন্য বাড়তি কাপড়ের দরকার হতো না কোন কালেই। বাড়তি কাপড়ের দরকার দেখা দিয়েছে প্রধানত হাল আমলেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে বিশ্বজুড়ে গ্লোবালাইজেশনের যুগেই। যখন ধর্ম আর মৌলবাদ। ব্যাবসা আর রাজনীতি। টেররিজম আর ‘ওয়ার অন টেররিজম’।  প্রতিটি বিষয়ই পরস্পর পরস্পরের সাথে জড়িয়ে একটি চক্রব্যূহ তৈরী করে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের উপরে সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণকে কায়েম করতে। ঠিক যে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতেই ইদানিং ফ্রান্সে হিজাব পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

 

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে হিজাব পরা আর না পরা। বিষয়টি নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারের বিষয় নেই আর। অনেকেই তর্ক করতে পারেন। এই বিষয়টি কোন কালেই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা কিংবা মৌলিক অধিকারের বিষয় ছিল না। এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ধর্ম আর রাজনীতির বিষয়। ঠিক কথা। কিন্তু সেটি কি শুধুই হিজাবেই সীমাবদ্ধ? ছিল এবং আছে? নিশ্চয় নয়। বাড়ির সদ্য বাল্যবিধবা হওয়া মেয়েটি কবে নির্জলা উপবাস করবে আর কোন নিয়মে কি কি খাদ্য খেতে পারবে আর পারবে না। সারদিন কত হাত শাদা থানে নিজের কতখানি শরীর ঢেকে রাখবে কে বা কারা ঠিক করে দিতো সেই সব? আমাদের এই সোনার বাংলায়? ফলে এটা ঠিক। একটি মেয়ে কোন পোশাক পরবে। আর কোন কোন পোশাক পরতে পারবে না। সেই স্বাধীনতা এবং অধিকার সেই মেয়েটির হাতে কোনদিনই ছিল না। অতীত ইতিহাসের কথা বলতে গিয়ে প্রায়শই আমরা বলে থাকি। অতীতের অন্ধকার যুগ পেরিয়ে এসেছি আমরা। সত্যিই কি তাই?

 

সত্যিই কি অতীতের অন্ধকার যুগ পেরিয়ে এসেছি আমরা? জানি। অনেকেই বলে উঠবেন। নারী শিক্ষার বিকাশের কথা। নারীর ক্ষমতায়নের কথা। নারীর অর্থোপার্জনের সুযোগ এবং সুবিধে বৃদ্ধির কথা। ইত্যাদি ইত্যাদি। নারীর মৌলিক অধিকারগুলির আইনি স্বীকৃতি লাভের কথা। না, কোন কথাই ভুল নয়। এবং শুনতেও বেশ সুন্দর। কিন্তু সব কথার গোড়ার কথা নারীমনের স্বাধীন ইচ্ছের কথা। কয়জন নারী সেই কথা প্রাণখুলে বলার সুযোগ এবং সুবিধে পেয়েছে? কিংবা পাচ্ছে এখনো? একজন নারীই জানে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ কতটা মেপে মেপে ফেলতে হয়। প্রতিটি কাজের পিছনে সামাজিক অনুমোদনের বিষয়গুলি কতখানি গুরুত্ব দিয়ে হিসাব করে নিতে হয় প্রাথমিক ভাবে। তারপর তো নারী স্বাধীনতা। অর্থাৎ যে সমাজ নারীকে যখন যতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছে বা দেবে। একজন নারী খুব বেশি হলে তখন ততটুকুই স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে যদি না তার ঘরের মানুষ প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। এই যে নারী স্বাধীনতার বৃত্ত। এই বৃত্ত ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশেও যেমন। ভারত বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো অনুন্নত দেশেও তেমন। ইরানের মতো মৌলবাদী রাষ্ট্রেও ঠিক একই রকম। এই অব্দি পড়ে থাকলে আপনিও হয়তো অনেকেরই মতো রে রে করে উঠতে পারেন। সেকি কথা? ফ্রান্সের মতো উন্নত এবং তথাকথিত মত প্রকাশের স্বাধীনতার পীঠস্থানের সাথে ইরানের মতো মৌলবাদী রাষ্ট্রকে এক আসনে বসানো? কিংবা ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশের সাথে পাকিস্তানের মতো একটি পিছিয়ে থাকা অন্ধকার যুগের দেশের তুলনা?

 

না, তুলনার কথাও হচ্ছে না। খেয়াল করে দেখতে হবে। ফ্রান্সের মতো তথাকথিত উন্নত দেশে যখন হিজাব নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন কিন্তু সেটি আসলেই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ। নারীর মৌলিক অধিকারের উপরে রাষ্ট্রীয় হস্তখেপ। আবার এর উল্টো পিঠে, ইরানে হিজাব বোরখা বাধ্যতামূলক করাও ঠিক একই রকম ভাবে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ। নারীর মৌলিক অধিকারের উপরে রাষ্ট্রীয় হস্তখেপ। কর্ণাটকের যে ছাত্রীরা হিজাব পরে ক্লাস করার অধিকারের দাবিতে সরব হয়। আর ইরানের নারীরা যখন হিজাব পুড়িয়ে হিজাব না পরার অধিকার রক্ষায় সরব হয়। দুটি ক্ষেত্রেই নারীর অবস্থান কিন্তু একই জায়গায়। সে কি পরবে আর কি পরবে না। সেটি ঠিক করার অধিকারটুকুই তাকে দেওয়া হচ্ছে না। ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে তার কাছ থেকেই। এবং ঐতিহাসিক ভাবেই সেই উন্নত ফ্রান্স। মত প্রকাশের স্বাধীনতার তথাকথিত পীঠস্থান! সেখানেও একজন নারীর হিজাব পরার মৌলিক অধিকারটুকুই কেড়ে নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। না, সেই নিয়ে আবিশ্ব অবশ্য কোন কোলাহল শোনা যায়নি। শোনা যায়নি, কারণ। পাশ্চাত্য মিডিয়া যে পক্ষের নিয়ন্ত্রাণাধীন। সেই পক্ষ হিজাবের বিরুদ্ধে। সোজা হিসাব। আর ঠিক সেই কারণেই ইরানের হিজাব পোড়ানো আন্দোলন নিয়ে কোলাহল তো হবেই। এখন অনেকেই ইরানের হিজাব বিরোধী আন্দোলনে মারা যাওয়া সাঁইত্রিশ জনের জীবনের মূল্যের কথা তুলে ধরে বর্তমান কোলাহলের স্বপক্ষে যুক্তি সাজাতে চাইবেন। কিন্তু তাঁদেরকেই যদি প্রশ্ন করা যায়। প্রতিবছর ইজরায়েলী রকেট হানায় যে হাজার হাজার প্যালেস্টাইনীরা মারা যায়। তাঁদের মৃত্যু নিয়ে এমন কোলাহল হয় না কেন? না, সে কথার জবাবদিহির দায় তো আমাদের নাই। সকলেই তখন হাত ধুয়ে নিতে ব্যস্ত। আসল বিষয়টি একটি আন্দোলনে কয়জন মারা গেলেন। সেটি নয়। বিষয়টি আন্দোলনের কারণ নিয়ে। কেন আন্দোলন? আন্দোলন হিজাব পরা কিংবা না পরা নিয়ে নয়। কর্ণাটকের ছাত্রীরা হিজাব পরার অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছিলো। ইরানের নারীরা হিজাব না পরার অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছে। হিজাব এখানে মূল বিষয়ই নয়। মূল বিষয়। নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকার। সেই স্বাধীনতা এবং অধিকার তাঁর পোশাক নির্বাচন থেকে পেশা নির্বাচন। জীবনযাপনের ধরণ নির্বাচন থেকে জীবনসাথী নির্বাচন। স্বপ্ন সাধ সাধনার চর্চা থেকে স্বঅভিভাবকত্বের চর্চা। প্রতিটি বিষয়জুড়ে পরিব্যাপ্ত। আর সেই পরিব্যপ্তিতে ফ্রান্স হোক কিংবা ইরান। ভারত হোক কিংবা বাংলাদেশ। বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কোন অধিকারই কারুর থাকার কথা নয়। আমি জানি না। কয়জন মানুষ এই সত্যভুমিতে দাঁড়িয়ে সমগ্র বিষয়গুলি বিচার করার হিম্মত রাখেন। সত্যিই আমার জানা নেই।

 

ধর্মীয় অনুশাসন থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক বিধিনিষেধ। পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে শুরু করে সমাজিক সংস্কৃতি। সাংবিধানিক রীতিনীতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আইনকানুন। সবকিছুই পুরুষতন্ত্র নির্মিত। এবং পরিচালিত। সেখানে নারীর কোন স্থানই নেই। কোন কালেই ছিল না। কোন কালেই নেই। ফলে দেশে দেশে। সমাজে সমাজে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে। এই পুরুষতন্ত্রই ধর্ম থেকে সম্প্রদায়। পরিবার থেকে সমাজ। সংবিধান থেকে রাষ্ট্র। নারীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার এবং ভোগ করার লক্ষ্যেই তার উপরে যাবতীয় বিধিনিষেধ আরোপ করে এসেছে। এবং দেশে দেশে। পরিবারে পরিবারে। সমাজে সমাজে। কালে কালে। নারী যখন যতটুকু স্বাধীনতা লাভ করেছে। নারী যতটুকু অধিকার লাভ করেছে। সবটাই সেই পুরুষতন্ত্রেরই বদান্যতায়। মনে রাখতে হবে বদান্যতাও স্বার্থেরই আর এক পিঠ। ফলে আজকের নারী স্বাধীনতাকে নারীর লড়াই করে প্রাপ্ত অর্জন বলে মনে করা এবং বিশ্বাস করার ভিতরে যে শান্তি। সেটি মুর্খের শান্তি। না, নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারগুলির কোনটিই নারীর নিয়ন্ত্রণে নেই আজকেও। বিশ্বের কোন দেশেই নেই। থাকলে আর যাই হোক ব্যক্তিস্বাধীনতার তথাকথিত পীঠস্থান। সেই ফ্রান্সেই হিজাব নিষিদ্ধ করা হতো না কোনভাবেই। উল্টে হিজাব পরার অধিকার এবং হিজাব না পরার অধিকার রক্ষার আইন প্রণয়ন করা হতো। সেটিই ছিল নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষার একমাত্র মাপকাঠি।

 

না, ঠিক এই ভাবে। এই দিক দিয়ে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা। নারীর মৌলিক অধিকারের বিষয়টি বা বিষয়গুলি আমরা প্রায় কেউই বিচার করে দেখি না। তার একটি বড়ো কারণ রয়েছে। নারী এবং পুরুষ। প্রায় সকলেই সেই একই পুরুষতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একটি সমাজিক পদার্থে পরিণত হয়। ফলে, কী নারী। কী পুরুষ। দেখার দৃষ্টিভঙ্গির ভিতরে বিশেষ কোন পার্থক্য থাকে না। এই যে এক সমাজিক পদার্থে পরিণত হয়ে যাওয়া। এটাই মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড়ো আভিশাপ। আমরা যতটা না সমাজিক জীব। তার থেকে অনেক বেশি সামজিক পদার্থ। ফলে আমাদের নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র দেখার দৃষ্টি গড়ে ওঠে না। স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন চেতনার বিকাশ হয় না। আমরা সেটাই দেখি। স্থান কাল পাত্র ভেদে। আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আমাদের সাম্প্রদায়িক চরিত্র। আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধান যতটুকু দেখার অনুমোদন দেয়। এবং যেভাবে দেখার অনুমোদন দেয়। পারিবারে পারিবারে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে। সমাজে সামজে। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে। দেখার এবং ভাবনার ধরণের ভিতরে যত পার্থক্যই থাক। সেটি ভঙ্গিমার পার্থক্য। চরিত্রের পার্থক্য নয়। গোটাটাই বিশ্বজুড়ে এবং কালপ্রবাহ জুড়ে নিয়ন্ত্রীত হচ্ছে সেই এক পুরুষতন্ত্রের হাতে। ফলে হিজাব নিষিদ্ধ করা। হিজাব বাধ্যতামূলক করা। একই অপরাধের দুই মুখ। অপরাধটা নারীকে পুরুষতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন করে রেখে দেওয়ার। হিজাব পরতে চাওয়া। হিজাব না পরতে চেয়ে হিজাব পোড়ানো। একই আন্দোলনের দুই ভিন্ন চিত্র মাত্র। আন্দোলনটা নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের।

 

নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা। নারীর মৌলিক অধিকারগুলি। রক্ষার লড়াইটা কিন্তু নারীরকেই করতে হবে। সেই লড়াই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই। পুরুষতন্ত্রকে শিরোধার্য্য করে নিলে। কোনদিনও সেই লড়াই শুরু করা যাবে না। এবং লড়াই শুরু করতে হবে ঘরের ভিতর থেকেই। এই লড়াইটা একজন মায়ের পক্ষে সবচেয়ে জরুরী। নারীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের ভিতরে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বীজমন্ত্রকে অঙ্কুরিত করা দরকার সকলের আগে। স্থান কাল পাত্র ভেদে তার ধরণ ভিন্ন হতেই পারে। হবেও। কিন্তু চরিত্রটা হবে এক এবং অভিন্ন। নিজের ছেলে এবং মেয়ের চেতনায় পুরুষতন্ত্রের ইতিহাস সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা গড়ে দেওয়া দরকার। দরকার সেই চেতনার বিকাশে ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারের ধারণাগুলিকেও সবল করে তোলা। এই একটি কাজ যদি ঘরে ঘরে মায়েরা সংঘটিত করতে শুরু করে। তার একটা সর্বাত্মক ফল সমাজের বুকে আছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। না, দুই এক প্রজন্মে হয়তো কোন কিছুই বদলাবে না। সমাজ বিবর্তন অত্যন্ত ধীর গতিতে সম্পন্ন হয়। কিন্তু হবে একদিন। লক্ষ্য যদি অবিচল থাকে। বিষয়টি শুধুমাত্র নারীর পোশাক নিয়ে নয়। পোশাক একটি বড়ো বিষয়। সন্দেহ নাই। নিজের ইচ্ছেয় নিজের মনের মতো পোশাক ব্যবহার করতে না পারা কো‌ন ছোটখাটো বিষয় নয়। কিংবা নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে অপছন্দের পোশাক ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়া অত্যন্ত জঘন্য বিষয় সন্দেহ নাই। কিন্তু আমরা পূর্বেই দেখিয়েছি। মূল বিষয়টি আসলে, নিজের ইচ্ছেমত চলার অধিকার। থাকা এবং না থাকা। নিজের মনের মতো করে নিজেকে সাজিয়ে তোলার অধিকার। কেউ যদি হিজাবেই নিজের সৌন্দর্য্য নিজে অনুভাব করতে চায়। তবে সেটাই তার মৌলিক অধিকার। ঠিক, কেউ যদি বিকিনিতেই নিজের সৈন্দর্য্যের অনুভবে পুলকিত আনন্দে মেতে উঠতে চায়। তবে সেটাই তার অধিকার। সমুদ্রস্নানে কে শাড়ি পরে ঢেউয়ের সাথে নাচবে। আর কে বিকিনি পরে নাচবে। সেটা ঠিক করার অধিকার তার নিজের। অন্য কারুর নয়। হ্যাঁ এটা ঠিক সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে অতিরিক্ত পোশাকে ছেলেখেলা করতে গেলে জীবনটাই চলে যেতে পারে। ঠিক যেমন মরুভুমির দেশে উন্মুক্ত হাত পা নিয়ে চলাফেরা করতে গেলে মুশকিল রয়েছে। ফলে একজন নারী কোন পরিবেশে, কোন জলবায়ুতে কোন পোশাক পরিধান করবে। তার সাথে আত্মরক্ষার বিষয়টিও জড়িয়ে থাকে। আর থাকে বলেই। এক এক ভুখণ্ডে মানুষের পোশাক পরিচ্ছদ সেই সেই ভুখণ্ডের জলবায়ুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার দরকার। সেই সামঞ্জস্য ঠিক করার ভারও নারীর উপরেই থাক না। এমনতো নয়। নারী তার ভালোমন্দের বিচার করতে অপারগ।

 

আর এক শ্রেণীর মানুষ রয়েছেন। নারীর শ্লীলতা নিয়ে যাদের মাথাব্যথা বেশি। কোন পোশাকে বাড়ির মেয়েদের শ্লীলতা রক্ষা হবে। আর কোন পোশাকে শ্লীলতা রক্ষা হবে না। সেটি বিচার করার দায়ও তারা সেই পুরুষতন্ত্রের উপরে ছেড়ে দিয়ে রেখেছেন। সেই তন্ত্রই স্থান কাল পাত্র ভেদে ঠিক করে চলেছে, কোন কালে কোন সমাজে কোন কোন পোশাক নারীর জন্য শ্লীল। আর কোন কোন পোশাক অশ্লীল। এবং ঠিক করার এই ঠিকাদারির কোন শেষ নেই। তাই মেয়েদের জামার মাপ আর হাতার কাট নিয়ে তাদের চিন্তারও শেষ নেই। আগ্রহেরও অভাব নেই। নজরদারীতেও ক্লান্তি নেই। খরবদারী করতে পেলে তো কথাই নেই। দলবেঁধে সে কি উল্লাস। সেকি উৎসাহ। এবং এই শ্রেণীর মানুষরাই ধর্ষণের কারণ খোঁজেন মেয়েদের জামার মাপে আর হাতার কাটে। তারা ধর্ষকের বিকৃত রুচি ও অপরাধ মনস্কতার ভিতরে ধর্ষণের কারণ দেখতে পান না। এঁরাই কিন্তু আবার মেয়েদের পোশাক পরিচ্ছদের শ্লীলতার দিকটির দেখাশোনা করে থাকেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে। এবং অক্লান্ত উৎসাহে। একটু তলিয়ে দেখলে দেখতে পাওয়া যায়। এই শ্রেণীর মানুষরাও ধর্ষক। এঁরা ধর্ষণ করেন নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতাকে। এঁরা ধর্ষণ করেন নারীর মৌলিক অধিকারগুলিকে। নারীর শরীরকে ধর্ষণ করেন যত মানুষ। তার থেকে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারগুলিকে ধর্ষণ করে চলেছেন। পরিবার থেকে সমাজে। সম্প্রদায় থেকে সংবিধানে। ঠিক এই ধর্ষকরাই ফ্রান্সে বসে ঠিক করে দেন। হিজাব পরা যাবে না। যার জন্য আইন তৈরী করে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়। এঁরাই আবার ইরানে বসে ঠিক করেন হিজাব পরতেই হবে। যে কারণে আইন তৈরী করে হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। ঠিক যাঁদেরকে দেখা যায় ভারত পাকিস্তান আফগানিস্তান বাংলাদেশ। সর্বত্র। যাঁরা তসলিমা নাসরিনের মাথার দাম নির্ধারণ করে তাঁকে দেশছাড়া করেন। আবার যাঁরা সেই তসলিমার কলমকেই ব্যবহার করে রাজনৈতিক মাইলেজ আদায় করতে আদাজল খেয়ে উঠে পড়ে লাগেন দেশে দেশে। এইভাবেই পুরুষতন্ত্রের হাতে ধর্ষিত হতে থাকে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে মৌলিক অধিকারগুলি। নারীর মন থেকে তার শরীর। কোনকিছুই পুরুষতন্ত্রের ধর্ষণের এক্তিয়ার থেকে বাদ যায় না।

 

২৩শে সেপটেম্বর’ ২০২২

© শ্রীশুভ্র