১৯শে এপ্রিলের শপথ!

 

শুরু হয়ে গেল ভোটযুদ্ধ। লোকসভা নির্বাচন ২০২৪। প্রথম পর্বে মোট ১০২টি লোকসভা আসনে ১‍৬২৫ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হওয়ার কথা আজ। এই ১৬২৫ জন প্রার্থীর ভিতরে ১৬১৮ জন প্রার্থীর ঠিকুজিকুলুজি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য তুলে নিয়ে এসেছে এসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্ম(এডিআর)। তাদের বিশ্লেষণ থেকে উঠে এসেছে অত্যন্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। মোট ১৬১৮ জন প্রার্থীর ভিতরে  স্বঘোষিত বয়ানেই ২৫২ জন প্রার্থী(১৬%) নানাবিধ ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। যদিও তাদের ভিতরে ১৬১ জন প্রার্থী(১০%) গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। এডিআর অবশ্য এই সব তথ্য তুলে নিয়ে এসেছে নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত তথ্যভাণ্ডার থেকে। প্রদত্ত তথ্যসমূহ অনুসারে এই গুরুতর ফৌজদারী অপরাধের ভিতরে রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, ধর্ষণ, অপহরণের মতো নৃশংস অপরাধ সমূহও। রয়েছে পাঁচ বা ততধিক বৎসরের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রয়েছে জামিন অযোগ্য অপরাধ। রয়েছে ইলেক্ট‌োরাল অফেন্স বা নির্বাচনী উৎকচ দেওয়া নেওয়ার মতো অপরাধ। খুনের চেষ্টার মতো অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৯ জন। নারী ঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৭ জন। আর সরাসরি মানুষ খুনের অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা ৭ জন। এর ভিতরে ১৪ জন এমন প্রার্থীও রয়েছেন। যাঁরা ইতিমধ্যেই কনভিক্টেড।

 

স্মরণে রাখতে হবে। যাবতীয় এইসব পরিসংখ্যান কিন্তু শুধুমাত্র আজকে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনী আসনে দাঁড়ানো প্রার্থীদেরকে নিয়েই। এখন দলগত ছবি’র দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে বিজেপির মোট প্রার্থীর ৩৬% ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। আর গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৮%। এখন দেখা যাক জাতীয় কংগ্রেসের ছবিটা ঠিক কি রকম। জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থীদের মধ্যে ৩৪% প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে ফৌজদারী অপরাধের অভিযোগ। আর ১৪% প্রার্থী গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। এবার আসা যাক রাজ্যের শাসকদল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের পরিসংখ্যানে। তৃণমূলের দাঁড়ানো মোট প্রার্থীর ৪০%ই ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। যাঁদের ভিতরে ২০% প্রার্থী গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। এই ছবিতে একটি কাকতালীয় মিল লক্ষ্য করার মতোন। বিজেপি ও তৃণমূল। এই দুটি দলেরই ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত মোট প্রার্থীর অর্ধেকই গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। কিন্তু সিপিআই, সিপিআইএম? অনেকেই মনে করতে পারেন। কমিউনিস্ট পার্টির হিসেব নিকেশ হয়তো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। আজকের ১০২টি লোকসভা আসনে সিপিআই’এর ৬ জন প্রার্থীর ভিতরে ২ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের মামলা ঝুলছে। শতাংশের হিসাবে ৩৩%। আর সিপিআইএম’র মোট প্রার্থী ৫ জন। যাঁদের ভিতরে ৩ জনের বিরুদ্ধে রয়েছে ফৌজদারী অপরাধের মামলা। আর তার ভিতরে ২জনই গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত।

 

আরও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ভিতরেও কমবেশি এই ধরণের চিত্র বর্তমান। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এই রাজ্যের নির্বাচনী লড়াইতে নেই।

 

আজকের নির্বাচনী আসনগুলির ভিতরে দেখা যাচ্ছে মোট ১০২টি লোকসভা আসনের ভিতরে ৪২টি অর্থাৎ ৪১% আসনকেই রেড এলার্ট আসন বলে ধরা হচ্ছে। অনেকেরই মনে হতে পারে, রেড এলার্ট কেন? রেড এলার্ট কারণ। সেই সব লোকসভা আসনগুলিকেই রেড এলার্ট আসনের তালিকায় রাখা হচ্ছে। যে যে আসনে তিন বা তিনের বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীই ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। অর্থাৎ এই ৪১ শতাংশ লোকসভা আসনেই একজন ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। বিগত লোকসভা নির্বাচনে ৪৩% নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই নানবিধ ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত ছিলেন। ফলে এটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। বিগত লোকসভা নির্বাচনের মতোই এবারের লোকসভা নির্বাচনেও ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত বিপুল সংখ্যক জনপ্রতিনিধির জয়ী হওয়া সুনিশ্চিত। আমরা জানি না সেই সংখ্যাটি এবারে ৪৩% অতিক্রম করে লোকসভার অর্ধেকের বেশি আসনই দখল করে নেবে কিনা!

 

আজকের নির্বাচনে আমাদের রাজ্যে যাঁরা লড়ছেন। তাঁদের ভিতরে ৩৭ জন প্রার্থীর স্বঘোষিত দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে ৫ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের মামলা ঝুলছে। শতাংশের হিসাবে ১৪%। আর ৪ জনের বিরুদ্ধে ঝুলছে গুরুতর ফৌজদারী অপরাধের মামলা। শতাংশের হিসাবে ১১%।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ফৌজদারী অপরাধের সাথে জড়িত এবং সেই বিষয়ে অভিযুক্ত হেভিওয়েটরা একটা বিপুল সংখ্যায় অংশ নিতে শুরু করে দিয়েছে। ফলে আইনসভায় দেশের হয়ে আইন তৈরী করতে যাঁরা যাচ্ছেন। তাঁদের ভিতরে (গত লোকসভার হিসাবে যেটি ছিল ৪৩%) প্রায় অর্ধেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে আইনভঙ্গের অভিযোগ। এই দেশের গণতন্ত্রের এটাই হয়তো সবচেয়ে চমকপ্রদ মহিমা। আইনভঙ্গকারীদের হাতেই দেশের আইন তৈরীর গুরুদায়িত্ব তুলে দিচ্ছেন দেশের নাগরিকরা।

 

এখন প্রশ্ন হলো। নাগরিকরা কি সত্যিই সম্পূর্ণ জেনে বুঝেই অপরাধ জগতের মানুষ কিংবা অপরাধ জগতের মানুষ বলে অভিযুক্তদের হাতে এই গুরু দায়িত্ব তুলে দিতে বদ্ধপরিকর? না’কি অধিকাংশ নাগরিকের কাছেই সেই তথ্যটুকুও নেই। তাঁর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আদৌ সৎ না অসৎ? আদৌ ধোয়া তুলসীপাতা না দাগী অপরাধী? আদৌ নিষ্কলঙ্ক না’কি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত? নাগরিকরা যদি জেনে বুঝেই ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্তদের হাতেই দেশের শাসন ভার তুলে দিতে চান। তবে সেটিও ভয়াবহ অবস্থা। যে কোন জাতি এবং দেশের নাগরিক এমন ভয়াবহ মানসিকতার হলে। সেটি বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো আশ্চর্যের বিষয় হবে। সন্দেহ নাই। তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, হয় কিনা সন্দেহ। তাহলে আমাদের হাতে আর একটি সম্ভাবনাই পড়ে রইল। অর্থাৎ অধিকাংশ ভোটার বা নাগরিকরা জানেনই না হয়তো। তাঁদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির আসল স্বরূপ। লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীদের সম্বন্ধে নির্দিষ্ট তথ্য জানার দায়িত্ব নাগরিকেরও রয়েছে যেমন। সেই তথ্য নাগরিকের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও ঠিক তেমনই রাষ্ট্রেরও রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কিন্তু রাষ্ট্রের হয়ে সেই কাজ করছেন। না করলে এডিআর এত সব তথ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের হাতের কাছে এগিয়ে দিতে পারতো না। কিন্তু একা এডিআরের কতটুকু ক্ষমতা? খবরের কাগজ এবং টিভির সংবাদ। এই দুইটি মাধ্যমই আপামর নাগরিকের কাছে গিয়ে পৌঁছায় সবচেয়ে সহজে। কিন্তু সেখানে নাগরিকরা আসল তথ্যগুলির কতটুকু জানতে পারেন? ভোট দেওয়ার লাইনে গিয়ে দাঁড়ানোর আগে নির্বাচনী প্রার্থীদের বিষয়ে বিশদ তথ্য জানা খুব জরুরী। সে বিষয়ে আশা করি কোন বিতর্ক নাই। কিন্তু কিভাবে সম্ভব। প্রতিটি ভোটারের কাছে প্রকৃত তথ্য ঠিক সময়ে ঠিকমত পৌঁছিয়ে দেওয়া?

 

এবং সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। এইভাবে এই পথে এগিয়ে চলতে থাকলে। অর্থ প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতার জোরে একদিন আণ্ডারওয়ার্ল্ডের ডনেরাই কিন্তু ভারত শাসন করতে শুরু করে দেবে। সেই দিনটি কি আমরাই এগিয়ে নিয়ে আসছি না? একটা দেশের লোকসভার অর্ধেক আসনই যদি ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্তদের হাতে চলে যায়। তবে সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা দেবে কে? দেশের আইন আদালতের পক্ষে কি সেই পরিস্থিতিতে নাগরিকের আইনী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে? দেশের শাসনযন্ত্রই যদি অপরাধ জগতের হেভিওয়েটদের হাতে চলে যায়। তবে অপরাধ জগতের আলাদা কোন অস্তিত্ব আর থাকবে কি?

 

আজকে লোকসভা নির্বাচন ২০২৪ এর প্রথম দিনে এই সকল প্রশ্নগুলির উত্তর কিন্তু প্রত্যেক নাগরিককেই খুঁজতে হবে। শুধুমাত্র ভোটের লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর অন্ধ বিশ্বাসের উপরে নির্ভর করে। ধোঁকাবাজদের কথায় ভুলে। ভণ্ড দেশসেবকদের ছলনায় ভুলে তাদের নির্দেশিত বোতাম টিপে দিলাম। আর নাগরিক দায়িত্ব পালন করা সম্পূর্ণ হয়ে গেল বলে মনে করে যাঁরা তৃপ্তি পান। তাঁরা কিন্তু সম্পূর্ণ নিজেদের অজান্তেই নিজেদের এবং সেই সাথে বাকি সকলের অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। ফলে ভোট তো দেবেনই। কিন্তু কেন দেবেন। কোন কোন দাবিতে দেবেন। সেটিও যেমন গুরুত্বপূ্র্ণ বিষয়। ততধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু। ঠিক কাকে ভোট দিচ্ছেন! তাঁকে কতটুকু চেনেন আপনি। নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীকে ভালো করে জানাও আমাদের নাগরিক দায়িত্বের ভিতরে পড়ে। সেই দায়িত্ব ঠিকমত পালন করতে না পারলে। আমাদের প্রদত্ত ভোটেই আমাদের কপাল পুড়তে বেশি দেরি হবে না। গণতন্ত্রের সুবিধা নিয়েই গণতন্ত্র বিরোধী অপরাধতান্ত্রিক শক্তি দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেবে।

 

©শ্রীশুভ্র ১৯শে এপ্রিল ২০২৪