ওরা স্লোগান দিচ্ছিল ‘থ্রেট কালচারের
গালে গালে জুতো মারো তালে তালে। ওরা ওদের পাঁচ দফা দাবির সর্বশেষ দফা হিসাবে রাজ্যের
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিকে এই থ্রেট কালচারের নেটওয়ার্কের কবল থেকে সরাতে চাইছে।
আর জি কর কাণ্ডের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য
এই অবস্থা থেকে মুক্তি অর্জন। সাধারণ জনগণ আর জি কর মেডিকেলে ঘটে যাওয়া ৯ই আগস্টের
নৃশংসতম ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সরব হয়েছে ১৪ই আগস্টের ‘রাত দখল’-এর রাত
থেকেই। জুনিয়র চিকিৎসকদের কর্মবিরতি সহ চলমান আন্দোলনে রাজ্যবাসী দিনে দিনে একাত্ম
হয়ে উঠেছে। তার একটা বড়ো কারণ, মানুষের কাছে রাজ্যের সর্বত্র এই সকল মেডিকেল কলেজগুলিতে
গড়ে ওঠা অপরাধচক্র এবং সেই চক্রের থ্রেট কালচারের ভয়াবহ পরিস্থিতি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর
হয়ে উঠছে দিনে দিনে। মানুষ এখন অনেকটাই জেনে গিয়েছে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিতে এক
ভয়ানক অপরাধতন্ত্র কায়েম হয়েছে। যারা যারা এই অপরাধতন্ত্রের কারবারি, তারা তাদের এই
অপরাধচক্র চালিয়ে আসতে পারছে শুধুমাত্র দুইটি কারণের জন্যেই। তারই একটি কারণ এই থ্রেট
কালচার। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলির সর্বস্তরেই শিক্ষার্থী থেকে চিকিৎসক, জুনিয়র থেকে
সিনিয়র, নার্স থেকে কর্মচারী সকলেই সন্ত্রস্ত। সমগ্র পরিকাঠামো জুড়েই একটা সন্ত্রাসের
রাজত্ব চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বছরের পর বছর। শিক্ষাবর্ষের পর শিক্ষাবর্ষ। এই যে
একটি সন্ত্রাসের রাজত্ব। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই যেভাবেই হোক কন্ঠরোধের ব্যবস্থা
করা হবে। যার অন্তিম পর্যায় হত্যা। যার চুড়ান্ত পরিণতি আর জি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের
ভয়াবহ এই মৃত্যু।
এই অপরাধচক্রের কাজ মূলত দুইটি ধারায়
এগিয়ে চলেছে। একটি সর্বস্তরে দুর্নীতি। সরকারি অর্থের ব্যাপক নয়ছয়। ডাক্তারি না শিখে
উত্তরপত্র কিনে নিয়ে পরীক্ষার হলে টুকে টুকে পাশ করা থেকে শুরু করে পরীক্ষককে ম্যানেজ
করে চিকিৎসক হয়ে যাওয়াও যেখানে হয়তো বিচিত্র নয়। চিকিৎসার সরঞ্জাম হাপিশ করে দেওয়া
থেকে শুরু করে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ ক্রয়, জাল ওষুধের কারবার, বেওয়ারিশ লাশ পাচার। কি
আছে আর কি নেই। আর একটি ধারা হলো সরাসরি তোলাবাজি। আর এই তোলাবাজির সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার
হচ্ছে ডাক্তারি পড়ুয়া থেকে জুনিয়র চিকিৎসক। এবং তোলাবাজির রেট শুনলে আরও আশ্চর্য হয়ে
যেতে হয়। সেই রেট নাকি লাখের নীচে কোন কথাই বলে না। পরীক্ষায় সঠিক নম্বর পাওয়া থেকে
মেডিকেল প্রফেশনের রেজিস্ট্রেশন পাওয়া অব্দি। আর জি কর কাণ্ড, রাজ্যের মেডিকেল কলেজগুলিতে
জাঁকিয়ে বসা এই অপরাধচক্রের বাস্তব চিত্রটাই কিছুটা হলেও বেআব্রু করে দিয়েছে। মানুষ
দুই আর দুইয়ে মিলিয়ে নিতে পারছে। যদিও অপরাধতন্ত্রের ব্যাপ্তি ও গভীরতা আমাদের কাছে
এখনো অপরিমেয়। আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরা ঠিক যে যে দাবিতে তাদের এই আন্দোলনকে এই
পর্যায়ে তুলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে, মানুষ আজকে বুঝতে পারছে, সেই সেই দাবিগুলির প্রত্যেকটি
কতটা যৌক্তিক এবং অমোঘ। ঠিক এই কারণেই ‘রাত দখল’ করা জনসাধারণ, আর জি করের নির্যাতিতা
নিহত জুনিয়র চিকিৎসকের হত্যাকাণ্ড এবং ধর্ষণের সঠিক বিচারের দাবির সাথেই জুনিয়র চিকিৎসকদের
এই বৃহত্তর আন্দোলনেরও পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অনেকেই বুঝতে পারছেন, নিহত চিকিৎসকের হত্যাকারীদের
শাস্তি হলেই শুধু হবে না। গোটা অপরাধতন্ত্রটিকে বিনাশ করতে হবে। আর সেই কারণেই পৌঁছাতে
হবে অপরাধচক্রের এই চক্রব্যূহের একেবারে গভীরে। চক্রের প্রতিটি পাণ্ডাকে নির্দিষ্ট
ভাবে শানাক্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এবং সঠিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে
কঠিনতম শাস্তি সুনিশ্চিত করতে হবে। একমাত্র তাহলেই অন্তত সামনের বেশ কিছু সময় অব্দি
রাজ্যের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিকে অপরাধতন্ত্রের কবল থেকে মুক্ত করে রাখা সম্ভব
হবে।
রাজ্যের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিতে
এই অপরাধতন্ত্রের কায়েম হয়ে থাকার পিছনে থ্রেট কালচার যেমন একটি কারণ। ঠিক তেমনই রাজ্যের
স্বাস্থ্যভবনে তৈরী হয়ে ওঠা ঘুঘুর বাসা এই অপরাধতন্ত্রের বাস্তবায়নের আর একটি কারণ।
বস্তুত স্বাস্থ্যভবনের ঘুঘুর বাসাই কলেজে কলেজে হাসপাতালে হাসপাতালে গড়ে ওঠা অপরাধচক্রের
আসল প্রাণ ভোমরা। স্বাস্থ্যভবনের অবস্থা যদি এইরকম অস্বাস্থ্যকর না হতো, তাহলে রাজ্যব্যাপী
এই অপরাধচক্রের বাড়বাড়ন্ত হয় না। কর্মবিরতিতে থাকা আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরা অত্যন্ত
সঠিক কারণেই তাই স্বাস্থ্যভবন সাফাই অভিযানে নেমেছেন। তারা এই সাফাই অভিযানে আদৌ সফল
হবেন কিনা, হলেও কতখানি হবেন, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু তাদের অভিযানের লক্ষ্য যে অভ্রান্ত,
সেটা রাজ্যবাসীও অনুধাবন করতে পারছে। জুনিয়র চিকিৎসকদের দাবি ছিল স্বাস্থ্যভবনের তিনজন
শীর্ষ কর্তার পদত্যাগের। তাদের ভিতরে মাত্র দুইজনকে অন্যত্র দায়িত্ব দিয়ে সরানো হয়েছে।
কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার ছিল। তাদেরকে অন্যত্র বদলি করে দেওয়ার
ভিতরে আর যাই থাক, প্রশাসনের সুশাসনের কোন নিদর্শন নাই। ফলে সেই প্রশাসনের উপরে নির্ভর
করে স্বাস্থ্যভবনের ভিতরে বাসা বাঁধা রোগের নিরাময় যে হওয়ার নয়, সেটা বলাই বাহুল্য।
এরই সাথে এই বিষয়টিও বুঝতে হবে। একটা গোটা ব্যবস্থায় যখন পচন ধরে। তখন সেই ব্যবস্থার
দুই একটা নাটবল্টু টাইট দিলেই গোটা ব্যবস্থাটিকে পাল্টিয়ে দেওয়াও যায় না। তার অভ্যন্তরীন
রোগও নির্মূল করা যায় না। এর জন্য চাই আমূল সংস্কার। দুঃখের বিষয় বর্তমান প্রশাসনের
দিকে তাকালে সেই বিষয়ে কোনরকম আশা করার উপায়ও থাকে না।
প্রশাসন যেটা করতে পারে। সোজা কথায়
তাকেই বলা হয় ধামাচাপা দেওয়া। ৯ই আগস্ট থেকেই প্রশাসন ঠিক সেই কাজটিই করে আসছে। যদিও
সেই কার্যেও প্রশাসনের দক্ষতার অভাবই ফুটে উঠেছে। না হলে জল এতদূর গড়ায় না। জল যতদূরই
গড়াক না কেন। প্রশাসনের সেই একটাই গোঁ। যেভাবে হোক, যেমন করেই হোক, যতটা পরিমাণেই হোক
না কেন। ধামাচাপা দিয়ে গোটা বিষয়টা এমন ভাবেই সমালাতে হবে, যাতে জনতাও ঠাণ্ডা হয় আর
গদিও না টলে যায়। এই যখন অবস্থা, তখন রাজ্যের স্বাস্থ্যক্ষেত্র দুর্নীতি মুক্ত হবে,
যে অপরাধতন্ত্র গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাভিশ্বাস উঠিয়ে দিয়েছে সেই অপরাধতন্ত্রের
অবসান হবে আর অপরাধচক্রকে বিচারের সমানে দাঁড় করিয়ে উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা যাবে,
এতটাও আশা করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতেও রাজি নয় জনসাধরণের
একটা বড়ো অংশই। সেই কারণেই তারা প্রতিদিনই বিচারের দাবিতে জঞ্জাল সাফাইয়ের দাবিতে যার
যতটুকু সাধ্য, রাজপথ কাঁপাচ্ছেন। জনতা যতক্ষণ রাজপথের দখল নিয়ে থাকবে। ততক্ষণই আশা।
দোষীরা সাজা পাবে। অপরাধচক্র ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে। অপরাধতন্ত্রের অবসান হবে। ঠিক এই
কারণেই জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন আজ আর শুধুই জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনে দাঁড়িয়ে
নেই। এই আন্দোলন জনগণের আন্দোলন হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক পক্ষগুলি সেই কারণেই আরও, ঘোলাজলে
মাছ ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দফা এক দাবি একের নামাবলি গলায় দুলিয়ে জনতার বন্ধু সাজার মরিয়া
চেষ্টা করছে। আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরাও ঠিক এই কারণেই তাদের এই আন্দোলনকে এখন অব্দি
স্বার্থান্বেষী কোন রাজনৈতিক শিবিরকে হাইজ্যাক করতে দেননি। সিঙ্গুরের কৃষকদের জমিরক্ষার
আন্দোলনের হাইজ্যাক হয়ে যাওয়ার মতো। তারা সদা জাগ্রত থেকে সজাগ রয়েছেন পাছে বেহুলার
বাসরঘরের মতো দশা না হয়ে যায়। আর ঠিক এইখানেই রাজ্যবাসীরও সদা সতর্ক থাকা দরকার। তাদের
এই রাজপথের দখল নেওয়ার বিষয়টাও যেন রাজনীতির চক্রব্যূহে বেদখল না হয়ে যায়। শাসক আসে
শাসক যায়। কিন্তু সিস্টেম একই রয়ে যেতে পারে। যদি না জনগণ সজাগ থাকে। আজকে যারা এই
অপরাধতন্ত্র চালাতে এমন জবরদস্ত একটা অপরাধচক্রকে টিকিয়ে রেখেছে, তারা শাসন ক্ষমতা
থেকে চলে গেলেই যে নতুন শাসকগোষ্ঠী এই একই অপরাধতন্ত্রের সুযোগ নিতে সেই একই অপরাধচক্রের
দখল নেবে না, তার কিন্তু কোনরকম নিশ্চয়তা নাই। প্রতিটি রাজ্যবাসীকে, বিশেষ করে যারা
আজ রাত দখলের পথে রাজপথে পা মেলাচ্ছেন। তাদেরকে এই একটি বিষয়ে খুব সুস্পষ্ট ভাবেই অবহিত
থাকতে হবে। নাহলে সেই পুরানো মদ নতুন বোতলে! শুধু লেবেলটাই মাত্র বদলিয়ে যাবে। অপরাধচক্রের
চক্রব্যূহতেই আটকিয়ে থেকে যেতে হবে। অপরাধতন্ত্রের মালিক বদলিয়ে যাবে শুধু। অন্তত ঘরে
ঘরে আপন সন্তানসন্ততির ভবিষ্যৎ ভেবে মানুষকেই তাই আজ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবেই সঠিক একটা
অবস্থান নিতে হবে। সজ্ঞানে এবং অভিজ্ঞতার উপরে নির্ভর করে। সামনের পথ যতটাই জটিল। ততটাই
পিচ্ছিল। যেকোন চক্রব্যূহ থেকে মুক্তির পথ কঠিন। শুধুমাত্র আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরাই
নয়। রাজ্যের মানুষকেও এই বিষয়টুকু মাথায় রাখতে হবে। না হলে শেষ অব্দি জিতে যাবে সেই
অপরাধচক্রই। স্থায়ী হয়ে রয়ে যাবে গোটা অপরাধতন্ত্রই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আটকিয়ে রয়ে যাবে
সেই এক চক্রব্যূহেই।
শ্রীশুভ্র ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৪
