কেউ কেউ বলছেন এতদিন রাজনৈতিক দলগুলির মিছিল মানুষ খুঁজতো। দলের নেতা নেত্রীদের নিজ দায়িত্বে মিছিলে পতকাবাহী ভিড় বাড়াতে হতো। এখন মানুষ মিছিল খুঁজে নিচ্ছে। কোন দলের নেতা নেত্রীদের চাপ নেই। পতাকা বহনের দায় নেই। মিছিলে হাঁটার হুকুম নেই। মিছিলে না গেলে ক্ষতির আশংকা নেই। তবু মানুষ যে যেখান থেকে পারছে। যে যেমন ভাবে পারছে। মিছিল খুঁজে নিচ্ছে। মিছিল তৈরী করে ফেলছে। রাজনৈতিক মুখ নেই। জনসেবার মুখোশ নেই। ধান্দাবাজির স্টান্ট নেই। শক্তি প্রদর্শনের আস্ফালন নেই। মিছিল আছে। মানুষ আছে। প্রতিবাদ আছে। আর আছে একটাই লক্ষ্য। একটি মেয়ের নৃশংস পরিণতির উপযুক্ত বিচার। অপরাধীদের কঠিনতম শাস্তির দাবিতে। অপরাধচক্রকে প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে রক্ষা করার বিরুদ্ধে জনতার সম্মিলিত গর্জনে।
খুব স্বাভাবিক ভাবেই
সরকার পক্ষ থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন শাসকদলের কাছে এ এক বড়ো অশনিসংকেত। এমনকি প্রধান
বিরোধী দলের কাছেও এই ঘটনা আতঙ্কজনক। আজ যারা বিরোধী। কাল তারাই যখন ক্ষমতার গদির দখল
নেবেন। স্বভাবতঃই তারাও তখন এইরকম স্বতঃস্ফূর্ত এবং রাজনীতি নিরপেক্ষ স্বাধীন জন বিক্ষোভের
সম্মূখীন হতে চাইবেন না। কোন রাজনৈতিক শিবিরই জনতার স্বাধীন কন্ঠস্বরকে মান্যতা দিতে
রাজি নয়। রাজনীতির সোজা কথাই হলো, জনতাকে পতাকা আর প্রতীকে এক একটি দলীয় খোঁয়াড়ে বেঁধে
রাখা। তার বাইরে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাধীন গর্জনকে প্রতিটি রাজনৈতিক শিবিরই ভয়
পায়। জনতা যদি রাজনৈতিক শিবিরগুলিকে ডিঙিয়ে নিজেদের গরজে নিজেদের দাবি নিয়ে রাজপথের
দখল নিয়ে নেয়, তখন রাজনৈতিক শিবিরগুলির কাজ কারবারে গণেশ উল্টানোর দশা হবে। ফলত আর
জি কর কাণ্ডে এই রাজ্যের শাসক এবং বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলি ভিতরে ভিতরে এখনই আতঙ্কিত।
উপরের মুখভঙ্গিমার নকশা যার যেমনই হোক না কেন। রাজনৈতিক বচনের ভাষা যেমনই থাকুক না
কেন। তারা কিন্তু আসলেই শঙ্কিত। যে জনতা তাদের খোঁয়াড়ের নিয়ম কানুন মেনে দলীয় লাইনে
জাবর কাটার বদলে, নিজেদের লাইনে নিজেদের স্লোগান নিজেরাই বেঁধে নিচ্ছে। সেই জনতাকে
আবার বুথে বুথে নিজেদের প্রতীকে টিপ ছাপ দেওয়ানো খুব একটা সহজ কাজ নাও হতে পারে।
যদিও মিছিল খুঁজে নিয়ে
পথে নামা জনতা এখন এতসব কিছুই ভাবছে না। লক্ষ্য তাদের স্থির। দাবি তাদের একটাই। বিচার
চাই। স্লোগান তাই সেই প্রথম দিন থেকেই, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। এক দিন নয়। দুই দিন নয়।
আর জি কর কণ্ডের বিয়াল্লিশতম দিনেও কলকাতা সহ রাজ্যের নানান প্রান্তে মিছিল চলছেই।
বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মিছিল। বিভিন্ন বয়সের মানুষের মিছিল। বিভিন্ন বিশ্বাস ও মতাদর্শের
মানুষের মিছিল। নির্দিষ্ট একটি অভিমুখে। ন্যায় বিচারের দাবিতে। কালিংপঙ থেকে কাকদ্বীপ।
দীঘা থেকে দার্জিলিং। বীরভুম থেকে বনগাঁ। ঝাড়গ্রাম থেকে আলিপুরদুয়ার। বাঁকুড়া থেলে
বালুরঘাট। বিচার চাই। ন্যায় বিচার। কারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় এই ন্যায় বিচার পওয়া সহজ
কথা নয়। অর্থ ক্ষমতা এবং বাহুবল যার প্রধান অন্তরায়। মানুষ জানে আইনের ক্ষমতা সীমিত।
রাজনৈতিক ক্ষমতা আইনকে নিজেদের স্বার্থে চালিত করে। শুধুমাত্র আইনের উপরে ভরসা করে
বসে থাকলে। আজ আর মানুষকে পথে নামতে হতো না। পথে না নামলে। পথে না থাকলে। পথে দাঁড়িয়ে
নিজেদের দাবির গর্জনকে আসমুদ্র হিমাচল ছড়িয়ে দিতে না পারলে। স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক
শক্তিগুলির হাত থেকে আইনকে বাঁচানো সম্ভব নয়। আর আইনকেই বাঁচাতে না পারলে, কিসের জাস্টিস।
কার কাছ থেকে জাস্টিস। কার হাত ধরে জাস্টিস। মানুষ জানে আইনের হাতকে শক্ত করে ধরতে
না পারলে এই জাস্টিস পাওয়া সম্ভব নয়। আর আইনের হাতকে শক্ত করে ধরতে হলে। আগে আইনকে
রাজনৈতিক ক্ষমতার অক্ষ থেকে মুক্ত করতে হবে। রাজপথে নামা, রাজপথের দখল নেওয়া মানুষের
কাছে এই সত্যটুকু আজ পরিস্কার। পরিস্কার বলেই মানুষ এই রাজপথের দখল ছাড়তে রাজি নয়।
অন্তত যতদিন সেই জাস্টিস সুনিশ্চিত না হচ্ছে।
এখন আর জি করের নির্যাতিতা
জুনিয়র চিকিৎসকের হত্যাকারী নির্যাতনকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারলেই কি সেই কাম্য
জাস্টিস পাওয়া যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরও নিশ্চিত ভাবেই প্রত্যেকের কাছে এক নয়। সংখ্যার
বিচারে হয়তো বেশিরভাগ মানুষই এককথায় তেমনই বলবেন। নির্যাতনকারী হত্যাকারীদের উপযুক্ত
শস্তি দেওয়ার ভিতর দিয়েই এই জাস্টিস নিশ্চিত হবে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখতে চাইলে বোঝা
যাবে, জাস্টিস আদৌ এমন সরলরৈখিক সমাধানের মতো কোন বিষয় নয়। জাস্টিসেরও অনেকগুলি স্তর
থাকে। অধিকাংশ মানুষ যতটুকুতে সন্তুষ্ট হবেন। সেটুকু একেবারেই প্রাথমিক স্তর। কারণ,
যে বা যারা আর জি করের ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তার মূল মোটিভ কিন্তু একটি মেয়েকে তাঁর ইচ্ছার
বিরুদ্ধে বলপূর্বক যৌন সঙ্গম করতে বাধ্য করাও নয়। কিংবা একটি ধর্ষণের ঘটনায় ধরা পড়ে
যাওয়া থেকে বাঁচতে ধর্ষিতাকে খুন করার মতো ঘটনাও নয়। অনুমান করা যায়, এই ঘটনার মূল
মোটিভকে আড়াল করার জন্যেই ধর্ষণের এঙ্গেলটুকু রচিত হয়েছিল। যাতে এটিকে সাধারণ একটি
ধর্ষণজনিত খুনের ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। আর সেই ফাঁকে নির্যাতন ও খুনের আসল কারণগুলি
ধামাচাপা পড়ে যায়। যদিও ঘটনাক্রমে বিশেষত জুনিয়র চিকিৎসকদের রুখে দাঁড়ানোর জন্য দিনে
দিনে আর জি করে ঘটে চলা একের পর এক নানবিধ অপকর্ম দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হয়ে চলেছে। যার
ফলে এতদিনে অনেকের কাছেই এটা পরিস্কার, নির্যাতিত চিকিৎসকের হত্যার পিছনে গভীর এবং
ব্যাপক দুর্নীতির জাল বিস্তৃত। সেই দুর্নীতির জাল, জাল ওষুধের কারবার থেকে মেয়াদ উত্তীর্ণ
ওষুধের কারবারই হোক। কিংবা মর্গ থেকে বেওয়ারিশ লাশ পাচারের রমরমা ব্যবসাই হোক। পড়ুয়াদের
কাছ থেকে ছলে বলে কৌশলে তোলাবাজির অর্থ আদায়ই হোক কিংবা জাল চিকিৎসক তৈরীর দীর্ঘমেয়াদি
কার্যক্রমই হোক। সরকারি অর্থের নয়ছয়ই হোক কিংবা যেনতেন প্রকারে প্রতিবাদীদের মুখ বন্ধ
করে দেওয়াই হোক। আর জি করে যে দুর্নীতির জাল বিস্তৃত ছিল। যদি সেই দুর্নীতিরই বলি হতে
হয় নির্যাতিতা জুনিয়র চিকিৎসককে। তাহলে সেই দুর্নীতির সকল পাণ্ডা এবং মাথাগুলির উপযুক্ত
শাস্তি বিধানই শুধু নয়। সেই দুর্নীতি শিকড়সমতে উপড়িয়ে ফেলতে না পারলে আসলেই কোন জাস্টিস
পাওয়া সম্ভব নয়।
যে দুর্নীতির একটা অন্যতম
ভরকেন্দ্র আর জি কর। সেই দুর্নীতির ভরকেন্দ্র একাধিক সরকারি মেডিকেল কলেজগুলিও। যার
মাথার উপরে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। সেই স্বাস্থ্য দপ্তরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে
এই রকম ব্যাপক এবং সুগভীর একটা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক, বছরের পর বছর চালিয়ে নিয়ে যাওয়া
সম্ভবপর নয়। কোনভাবেই নয়। ফলে যে ভয়াবহ দুর্নীতির খপ্পরে পড়েই খুন হতে হলো আর জি করের
নির্যাতিতা চিকিৎসককে। সেই ভয়ঙ্কর দুর্নীতিকে গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিকাঠামো
থেকে সমূলে উচ্ছেদ করতে না পারলে, আসলেই কোন জাস্টিস পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ‘উই ওয়ান্ট
জাস্টিস’-এর আন্দোলনের সাফল্য এত সহজেই অর্জন করাও সম্ভবপর নয়। একটা রাজ্যের সরকারি
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্পূর্ণ সিস্টেম যেখানে ভয়াবহ দুর্নীতির করাল গ্রাসে, সেখানে
একজন মৃতার কয়েকজন খুনিকে ফাঁসিকাঠে ঝোলালেও জাস্টিস অধরাই রয়ে যাবে। জাস্টিসের দাবিতে
রাজপথের দখল নেওয়া জনশক্তিকে তাই এখনো বহু পথ অতিক্রম করতে হবে। বহুদিন লড়াই জারি রাখতে
হবে। এবং বহু কঠিন থেকে কঠিনতম বাধা অতিক্রম করতে হবে। প্রকৃত জাস্টিস ছিনিয়ে আনতে
গেলে। সে একদিন দুইদিন বিয়াল্লিশ দিনের বিষয় নয়।
এখন এই বিষয়টিও আমাদের
পরিস্কার বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। দুর্নীতির একটা প্রায় নিঃশ্ছিদ্র পরিকাঠামো যখন গড়ে ওঠে।
দুর্নীতির চক্রে যখন শত শত কোটি কিংবা হাজার কোটি টাকার হাত বদল হতে থাকে। সেই বিশাল
বন্দোবস্তকে সমূলে বিনাশ করা আদৌ কোন সহজ কথা নয়। শুধুমাত্র আইন দিয়ে সেটা সম্ভব নয়।
যদি না রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। এখন ক্ষমতার গদি থেকে এক পক্ষকে নামিয়ে দিলেই আর এক
পক্ষকে বসাতেই হয়। কিন্তু ক্ষমতার বিশেষত্বই হলো, যে পক্ষই ক্ষমতার গদিতে গিয়ে বসুক
না কেন। কম বেশি যে কোন রকম দুর্নীতির পরিকাঠামোকে ধরে রাখাই শাসকপক্ষের প্রধান লক্ষ্য
হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ একটা চলমান দুর্নীতির মধু খাওয়ার লোভই বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক শিবিরের
ভোট রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই কারণেই শাসক আসে শাসক যায়। কিন্তু দুর্নীতির
জয়ধ্বজা উড়তেই থাকে। মুশকিল হলো গণতন্ত্রে জনগণের নিজস্ব কোন শিবির না থাকা। কখনো
যদি সেই নিজস্ব জনশিবির গড়েও ওঠে, রাজনৈতিক পক্ষগুলিই সেই শিবিরকে বকলমে হাইজ্যাক করে
নিতে উঠে পড়ে লেগে যায়। এবং এক একটা গণ আন্দোলনকে সিঁড়ি করেই ক্ষমতার গদিতে গিয়ে বসেই
দুর্নীতির সেই মধুচক্রের স্বাদ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই যে একটা ভয়াবহ চক্র। দেশের
আইন কোনভাবেই এর নাগাল পায় না। পায় না বলেই দুর্নীতির দুই একটি নাটবল্টুকে আইনের আওতায়
নিয়ে এসেই আইন তার কর্তব্য সমাপন করে ফেলে। আবার পরবর্তী খুন ধর্ষণ রাহাজানির কেস নিয়ে
ব্যস্ত হয়ে যায়। ওদিকে দুর্নীতির নেটওয়ার্ক হাত বদল হতে থাকে মাত্র। আইনের সত্যিকারের
দৌড় এই অব্দিই। ঠিক এই কারণেই আইনকে পুরোপুরি ফলপ্রসু করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার।
তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রসঙ্গে সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঠিক বাস্তবায়ন সর্বত্তম
জরুরী একটি বিষয়। সেই লড়াই যতক্ষণ না সফল হচ্ছে। যতক্ষণ না বাস্তবায়িত হচ্ছে। ততক্ষণ
জাস্টিস কিন্তু অধরাই রয়ে যাবে। সে যতই আমরা জাস্টিসের জন্য পথ হাঁটি না কেন।
কপিরাইট শ্রীশুভ্র ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৪
