অনশন বৃত্তে আটকা পড়ে আন্দোলন?

 

আসল যুদ্ধটা থ্রেট সিণ্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরাসরি জুনিয়র চিকিৎসকদের। সিনিয়র চিকিৎসকরা সরাসরি যুদ্ধে না নামলেও সাথে রয়েছেন। পিছন থেকে ব্যাকআপ দেওয়ার জন্য। এদিকে থ্রেট সিণ্ডিকেটের সাথে এক শ্রেণীর সিনিয়র এবং জুনিয়র চিকিৎসকেরাও জড়িত। যাদের মাথার উপের প্রশাসনের বরাভয়। তারাই বর্তমানে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। আর জি করের নির্যাতিতা নিহত জুনিয়র চিকিৎসক তরুণীকে, সেই নিয়ন্ত্রণ মানতে না চাওয়ার কারণেই খুন হতে হয়। বুদ্ধিমানের মতো তিনিও যদি থ্রেট সিণ্ডিকেটের নিয়ম কানুন মেনে সেই সিণ্ডিকেটেরই একজন হয়ে যেতে চাইতেন। হয়তো কেন, নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। তাঁকে এমন নির্মম ভাবে জীবন দিতে হতো না। এমনকি সি্ডিকেটের একজন না হলেও সিণ্ডিকেটের কথায় ওঠবোস করতে থাকলেই প্রাণরক্ষা হতো তাঁর। ঠিক যেভাবে শত শত চিকিৎসক আত্মরক্ষা করে চলছিলেন ৯ই আগস্ট অব্দি। কিন্তু নির্যাতিতার নৃশংস পরিণতি বাকিদের সকল ধৈর্য্য এবং সহিষ্ণুতার বাঁধ ভেঙ্গে দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন। এইভাবে মুখবুজে থ্রেট সিণ্ডিকেটের হুকুমনামা মেনে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে থাকলে কারুরই জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। আর সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁরা এবারে ঘুরে দাঁড়াতেই চাইছেন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষের তখন একটাই কাজ করার থাকে। ফোঁস করে ওঠা। ছোবল মারার বিষয়টা অনেক পরের। কিন্তু ফোঁস করতেও না পারলে আর যে নিস্তার নেই। আর জি কর কাণ্ড রাজ্যের আপামর জুনিয়র চিকিৎসকদের সেই শিক্ষাটুকুই দিয়ে গেল। শুধু জুনিয়রদেরই নয়। সিনিয়রদেরও বটে। সেই কারণেই সিনিয়ররা এখন পর্য্যন্ত সর্বতোভাবেই জুনিয়রদের পিছনে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁরাও বুঝতে পেরেছে, নাউ অর নেভার। যে শিরদাঁড়া নিয়ে জুনিয়ররা প্রতিবাদের প্রতিরোধের মিছিলে পথে নেমেছেন। ৯ই আগস্ট অব্দি তাঁদেরকেও সেই শিরদাঁড়া গেটে ঝুলিয়ে রেখেই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হতো। না হলে কি হতে পারতো। নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গিয়েছেন আর জি করের নির্যাতিতা তরুণী চিকিৎসক। তাঁর মৃত্যুই বাকিদের সম্বিত ফিরিয়ে দিয়েছে। সেই করাণেই তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সেই থ্রেট সিণ্ডিকেটকেই রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে শিকড় সমেত উপড়িয়ে ফেলার লক্ষ্যে। তাঁদের এই আমরণ অনশনের পথে যাওয়ার কারণও ঠিক সেটাই। অনেকটা গান্ধীবাদী ‘ডু অর ডাই’ মিশনের মতোন।


এখন মুশকিল হচ্ছে। রাজ্যের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিতে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে একটি সিণ্ডিকেট রাজত্ব গড়ে উঠেছে। তার সাথে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন জড়িত। তার সাথে প্রশাসনের হর্তা কর্তা বিধাতা থেকে রাজনীতির বিভিন্ন নাটবল্টু শক্ত করে বাঁধা। এমন একটা প্রায় নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা হটাৎ করে জুনিয়র চিকিৎসকদের আমরণ অনশনে ভেঙ্গে পড়বে। এমন অস্বাভাবিক ঘটনা তো ঘটতে পারে না। কিংবা এই থ্রেট সিণ্ডিকেটের যাঁরা মাথা। আমরণ অনশনের লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে দেখতে হঠাৎ করে চণ্ডাশোক থেকে অশোক হওয়ার মতো কোন জাদুবলে তাঁদের স্বভাব কিংবা প্রকৃতি বদলিয়ে যাবে। এমনটাও আশা করা অন্যায়। এগুলির কোনটিই হবে না। বরং কি করে জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনকে লাইনচ্যুত করে দেওয়া যায়। সেই অপচেষ্টাতেই সেই মাথাদের মস্তিষ্ক যে ক্রিয়াশীল থাকবে, সেটা চোখবুঁজেই বলে দেওয়া যায়। এবং রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় থেকে কেন্দ্রের শাসক গোষ্ঠীর সাথে রাজনৈতিক রফাসূত্রে পৌঁছিয়ে কি করে সেই থ্রেট সিণ্ডিকেটকে এখনো বাঁচিয়ে রাখা যায়। সেটাই যে থ্রেট সিণ্ডিকেটের পাখির চোখ হবে। সেটা অনুধাবন করা এমন কিছু শক্ত কাজ নয়।


ফলে খুব কম বুদ্ধিতেও এটা বোঝা সম্ভব। জুনিয়র চিকিৎসকদের এই আন্দোলনকে একই সাথে দুইটি পক্ষের সম্মিলিত প্রতিরোধের সাথে লড়াই করতে হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন জনগণ যখন জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তখন জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন সফল হবেই। কারণ জনতার রায়ের উপরে আর কোন কথা থাকে না। কিন্তু জনতাকে চিরকালই রাজনীতির কলাকৌশলে বিভ্রান্ত করা সহজ। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন থেকে জনতাকে বিচ্ছিন্ন করা রাজীনীতিতে খুব একটা কঠিন কাজও নয়। এই কারণেই জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনকে খুব কঠিন একটা লড়াইয়ের সামনে পড়তে হচ্ছে। এবং দিনে দিনে লড়াই আরও কঠিন থেকে কঠিনতর হবে, তাঁদের আন্দোলন যদি মাঝপথেই দুর্বল না হয়ে যায়। সব রকম দিক থেকে সব রকম ভাবেই চেষ্টা করা হচ্ছে, এই আন্দোলন যাতে দিকভ্রান্ত হয়ে মাঝপথেই বেসামাল হয়ে কার্যত মুখ খুবড়ে পড়ে। যদিও ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের দিক থেকে আন্দোলনের দশ দফা দাবির কিছু কিছু দাবি পুরণের জন্য ধীর পদক্ষেপে হলেও সরকারী স্তরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নিহত তরুণীর ন্যায় বিচারের দাবিটি ছাড়া অন্যতম মূল যে দাবি, চলমান থ্রেট সিণ্ডিকেটের হাতে ভবিষ্যতে যাতে এইভাবে আর কারুর প্রাণ না যায়, সেই দাবির বিষয়েই রাজ্য সরকার কার্যত মুখে কুলুপ এঁটে বসে রয়েছে। আর সেখানেই আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররাও আটকিয়ে গিয়েছেন। তাঁরা বারংবার সেই দাবি পুরণের নির্দিষ্ট সময়সীমা জানতে চাইছেন সরকারের কাছে থেকে। জানতে চাইছেন সরকার কি ভাবে এই থ্রেট সিণ্ডিকেটের শিকড় উপড়াবে এবং তার পদ্ধতিগত পদক্ষেপগুলি কি কি নেওয়া হবে। কিভাবে নেওয়া হবে। সেই সকল অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি নিয়েই তাঁরা হত্যে দিয়ে বসে রয়েছেন আমরণ অনশন মঞ্চে।। এবং থ্রেট সিণ্ডিকেট বিনাশে জুনিয়র চিকিৎসকরা যে কয়টি পদক্ষেপ সরকারকে নিতে অনুরোধ করেছেন। সেই পদক্ষেপগুলি নিতে সরকার কিছুতেই রাজিই বা হচ্ছে না কেন। সেটাই আন্দোলনরত চিকিৎসকদের প্রশ্ন। না, সরকার এখনও এই বিষয়ে কোন সদুত্তর দিতে রাজি নয়। রাজি নয় বলেই সরকারের তরফ থেকে যতখানি সম্ভব অসংবেদনশীল হওয়া সম্ভব। সরকার ততখানি কঠিন অবস্থান নিয়ে বসে রয়েছে। ফলে আমরণ অনশন প্রায় এক পক্ষকাল অতিবাহিত হওয়ার পরেও এখনো কোন সমাধান সূত্র দেখা যাচ্ছে না। এদিকে একের পর এক জুনিয়র চিকিৎসকের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েই চলেছে। যার ফলে একাধিক জুনিয়র চিকিৎসককে অনশনস্থল থেকে বিভিন্ন হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্ত্তি করতে হয়েছে। সরকার সম্ভবত বুঝে গিয়েছে, অনশনকারীদের ভিতরে কেউই আমরণ অনশন চালিয়ে যেতে পারবে না। স্বাস্থ্যের অবনতি হলেই তাদেরকে যখন হাসপাতালে ভর্ত্তি করে সারিয়ে তোলা যাচ্ছে, তখন সরকারের এই অনশন নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারই বা কি? খুব স্বাভাবিক ভাবেই আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকেরাও এই জায়গায় পৌঁছিয়ে দিশা হারিয়ে ফেলার মতোন অবস্থায়। কারণ চোখের সামনে তাঁরা কাউকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তেও দিতে পারবেন না। আর সরকারও সেটা বুঝে গিয়ে নিজেদের অবস্থানে অনড় হয়ে বসে থাকবে। ফলে যে অনশনকেই আন্দোলনের তুরুপের তাস হিসাবে কাজে লাগাতে চেয়ে এই আমরণ অনশনের পথে আসা। সেই অনশনই এখন আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের আন্দোলনের অন্যতম দুর্বল জায়গা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেটা বুঝেই সরকার তার ঘুটি সাজিয়ে চলেছে।


আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকরা এই যে একটি চক্রব্যূহে আটকিয়ে পড়েছেন। এর থেকে তাঁরাও নিশ্চয় মুক্তির পথ খোঁজার চেষ্টায় রয়েছেন। সরকারকে চাপ দেওয়ার যে পথটা তাঁরা খুলতে চেয়েছেন। সেই পথটাই সরকারের চাপ হালকা করে দিচ্ছে। অন্তত এখন অব্দি। সরকার আশা করছে আন্দোলনকারী অনশনরত চিকিৎসকরাও আমরণ অনশন চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। এবং জনতাও অধৈর্য্য হয়ে দিনে দিনে আন্দোলনের পাশ থেকে সরে যেতে বাধ্য হবে। তখন সেই থ্রেট সিণ্ডিকেটের থ্রেট স্বরূপ জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনও বিফল হতে বাধ্য হবে। উল্টে সরকার তার প্রচারযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকারীদের দাবি মতো কত শতাংশ সিসিটিভি, কত শতাংশ রেস্ট রুম। কত শতাংশ শৌচালয় নির্মাণ করেছে আর কত সংখ্যায় পুলিশ মোতায়ন করে হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে তার ফিরিস্তি দিয়ে দিয়ে জনতাকে ম্যানেজ করতে থাকবে। আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরা এখন কোন পথে কিভাবে অগ্রসর হবেন। সেটা সময়ই বলবে। সাধারণ জনগন আরও কতদিন এই আন্দোলনের পাশে থাকবে। সেটা রাজনীতির কারবারীদের কূটকৌশলের সাফল্য ব্যর্থতার উপরে কতখানি নির্ভর করবে, আর জনতার জনশক্তির আবেগ এবং প্রত্যয়ের উপরে কতখানি নির্ভর করবে সেটাও সময়ই বলবে। আপাতত আন্দোলন একটা পর্যায়ে এসে যে আটকিয়ে পড়েছে। সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। এতে সবচেয়ে বেশি স্বস্তিতে কিন্তু সেই হাড়হিম করা থ্রেট সিণ্ডিকেটই। আপাতত ডুব সাঁতারে থেকেও তাদের ডুবে যাওয়ার আশু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আমরণ অনশনে বসেও আন্দোলনকারীরা নিজেদের শরীর নিয়ে যতটা না চিন্তিত। থ্রেট সিণ্ডিকেটের বর্তমান অবস্থান স্বভাবতই তাঁদের কপালে তার থেকেও বেশি চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। দিয়েছে সরকারের সৌজন্যেই। সেই কারণেই আন্দোলনকারীদের যাবতীয় অভিমান সেই সরকারের উপরেই। অভিমান জমতে জমতে ক্ষোভের আগুনে ক্রোধে পরিণত হয়ে গেলে সেটা যে সরকারের পক্ষেও সুবিধেজনক হবে না। সেই সোজা কথাটুকু সরকার আদৌ অনুধাবনের শক্তি রাখে কিনা। তার উত্তরও কিন্তু সেই সময়েরই হাতে।


কপিরাইট শ্রীশুভ্র ১৮ই অক্টোবর ২০২৪


৯ই আগস্টের বুমেরাং

 

উত্তরবঙ্গ লবি’র ব্রিগেডিয়ার থেকে ফুট সোলজার। এক একটা সব হাড়হিম করা নাম। যাদের নামে বাঘে গরুতে এক ঘাটের জল খায়। যাদের পাদোদক না জোগার করতে পারলে, রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলি থেকে চিকিৎসক হিসাবে ছাড়পত্র পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। যাদের হুকুমনামায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় দিন হয় রাত ঘনায়। আর সেই হুকুমনামায় যে বা যাঁরা লাইন দিয়ে চলতে রাজি নয়। তাঁদেরকেই দফায় দফায় তথাকথিত ‘আর জি কর করে দেওয়া’ হয়। এই আর জি কর করে দেওয়ার মানেই পরলোকের টিকিট কনফার্ম করে দেওয়া নয়। মেডিকেল প্রফেশনের প্রায় বারোটা বাজিয়ে দেওয়াও বোঝায়। স্বভাবতঃই কারই বা অত বুকের পাটা। ভারতবর্ষে ছাপান্ন ইঞ্চীর ছাতি তো আর গণ্ডায় গণ্ডায় নেই। ফলত এই তথাকথিত ‘আর জি কর করে দেওয়ার’ হাত থেকে আত্মরক্ষার্থে সিনিয়র থেকে শুরু করে জুনিয়র ডাক্তার, সকলেই প্রায় ‘কানে দিয়েছি তুলো আর পিঠে বেঁধেছি কুলো’ হয়ে কালতিপাতেই অভ্যস্থ।

 

ফলে চোখকান বুঁজে, মুখ বুঁজে হাসপাতালের জাল ওষুধের চক্র থেকে শুরু করে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধের কারবারই হোক কিংবা মর্গ থেকে বেওয়ারিশ লাশ পাচারই হোক। উত্তরপত্রের কালোবাজারির হাত ধরে গণটোকাটুকির ম্যাজিকে পরীক্ষায় বস্তা বস্তা নম্বর পাওয়াই হোক আর প্রতি বিষয়ে তোলাবাজির টাকা জোগানোর বিনিময়ে সোজা পথের কাজটাই বাঁকা পথে করতে বাধ্য করাই হোক। কোন কথা বলা যাবে না। কোন প্রতিবাদ করা যাবে না। থ্রেট সিণ্ডিকেটের শাসনকে নত মস্তকে ধারণ করে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিতে টিকে থাকতে হবে। যদি প্রাণে বাঁচতে হয়। এবং সেই হাড়হিম করা নামগুলির হুকুমনামায় দস্তখত করা থেকে শুরু করে বিনা বাক্যব্যয়ে অক্ষরে অক্ষরে হুকুমনামা অনুসারে চলতে হবে। সেটাই অলিখিত সংবিধান। সেটাই একমাত্র কার্যকরি আইন। সেই আইনের বাইরে পা দেওয়া আর নিজের পায়ে কুড়ুল মারা একই কথা।

 

গত ৯ই আগস্টের দিন থেকে আজ পর্য্যন্ত খবরে প্রকাশিত খবরগুলিকে ঠিকমত ট্যালি করতে পারলেই উপরের এই আতঙ্কজনক ছবিটা উদ্ধার করা কোন কঠিন কাজ নয়। নয় বলেই রাজ্যবাসীর এখনও যাঁরা সুস্থ্য চেতনার ক্ষমতা ও শক্তি ধরে রাখতে পেরেছেন, তাঁরা আর জি কর কাণ্ডের সঠিক বিচার চেয়ে গত প্রায় পঞ্চাশদিন রাজপথের দখল নিয়ে নিয়েছেন। কোন পতকা বা প্রতীকে নিজেদের স্বাধীন বিবেককে না মুড়িয়েই। সব মানুষই যে ঘাসে মুখ দিয়ে চলতে থাকবে। তাও আবার ভোটের পর ভোটে। তেমনটা আশা করা সহজ। কিন্তু বাস্তব অন্য রকম কথা বলছে। অন্তত ৯ই আগস্টের দিন থেকে। রাজনীতির রথী মহারথীরা যারা এইটি টের পেয়ে গিয়েছেন। তাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ স্পষ্টতই পরিদৃশ্যমান। যারা এখনো এটা মানেননি। তারা আছেন ক্ষমতার বাঁধানো লাইনেই। সে তাদের ভাষণ উপভাষন এবং সম্ভাষনেই মালুম হচ্ছে দিনে দিনে। তাদের কাছে মন্ত্র কিন্তু সেই একটাই। জোর যার মুলুক তার। রাজপথের দখল নেওয়া সাধারণ মানুষের বিবেকবোধ ঠিক সেই কারণেই দিনে দিনে শক্তিবৃদ্ধি করছে। আজ এখানে মিছিল। তো কাল ওখানে। পায়ে পায়ে স্বাধীন চিন্তা করার মতো শক্তিধর মাথার সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যত বৃদ্ধি পাচ্ছে ততই এক অংশের ভাষণ উপভাষণ আর সম্ভাষণের ঝাঁঝ চড়ছে।

 

ঠিক এই আবহেই এখন সময় হয়েছে। এই আর জি কর করে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে একটু গভীরে গিয়ে বিস্তৃত আলোচনার। আর জি করে ৮ই আগস্টের মধ্যরাত পার করে যে নারকীয় নৃশংস ঘটনাটি ঘটানো হয়। আমাদের বোঝা দরকার। সেই ঘটনার পিছনে সংঘটিত নৃশংসতার কারণটুকুই। একটি অপরাধচক্রের পক্ষে সবচেয়ে বড় ভয় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। সরকারি দপ্তরের পর দপ্তরে নিজেদের লোক বসিয়ে দিলেও সেই ভয় যায় না। কোনক্রমে একবার যদি কখনো ভিসুভিয়াসের লাভা লিক করতেও শুরু করে। দপ্তরে দপ্তরে নিজেদের লোক বসিয়ে দিয়েও পার পাওয়া সহজ নয় আদৌ। অন্তত একটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয়। অপরাধচক্রের পাণ্ডা মাত্রেই এই সরল সত্যটুকু জানে। সেই পাণ্ডারা যতই রথী থেকে মহারথী হন না কেন। ফলত, এইরকম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয়। তাঁদের হাতে একটাই তুরুপের তাস থাকে। আত্মরক্ষার। সেটাই হলো একটা সন্ত্রাসের আতঙ্ক ফেলে দেওয়া। সেই আতঙ্ক যতই ভয়াবহ এবং নৃশংস হবে। তাদের আত্মরক্ষার নিশ্চয়তার গ্যারান্টি ততই দৃঢ় এবং শক্তিশালী হবে। একটা নিশ্ছিদ্র আত্মরক্ষার বলয় তৈরী না করতে পারলে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোয় কোন অপরাধচক্র দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এবং সবচেয়ে বড়ো কথা ভোটের পর ভোট চালিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। যে কোন অপরাধচক্রের মাথা থেকে পাণ্ডা অব্দি, সেই সোজা সত্যটুকু বিলক্ষণ জানে। জানে বলেই তাদের চব্বিশ ঘন্টার লক্ষ্যই থাকে গড়ে তোলা থ্রেট সিণ্ডিকেটকে কোন প্রকার প্রতিরোধহীন ভাবে শক্তিশালী থেকে আরও শক্তিশালী করে তোলা।

 

ফলে এই বিষয়ে কোন সন্দেহই নাই যে, কখনো যদি কোন দিক থেকে কোন রকমের প্রতিরোধ গড়ে ওঠার ভয় তাদের ভিতরে একবার গ্রাস করে। তবে তারা চরমতম নৃশংসতার পথেই সেই প্রতিরোধকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে সচেষ্ট হবে। না হলে বাকিদের কাছে আলটিমেটাম দেওয়ার কাজ সহজ হবে না। এবং এই আলটিমেটামের বার্তা যত নৃশংস হবে। ততই তা বেশি করে কার্যকর এবং ফলপ্রসু হবে। আর জি করের তরুণী চিকিৎসকের নির্যাতন ও হত্যার চিত্রটা ঠিক সেই ফরমুলাতেই রচনা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। যে বা যাঁরা এই অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে ন্যূনতম মৃদুতম ভাবেও ট্যাঁ ফু করবে। তাদেরও পরিণতি এমনই ভয়াবহ হবে। এমনই নৃশংস হবে। এমনই মারাত্মক হবে। প্রতিবাদের কন্ঠস্বর বেজে ওঠার আগেই যদি সেই কন্ঠস্বরকে পুরোপুরি দাবিয়ে রাখা যায়। তবে অহেতুক একটা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো হাত গন্ধ করার কাজ করতে হয় না। অপরাধচক্রের মাথা থেকে পাণ্ডা অব্দি, প্রায় সকলের ভিতরেই এই বোধ ক্রিয়াশীল থাকে। থাকে বলেই তারা একটা নিঃশ্ছিদ্র সন্ত্রাসের বলয় গড়ে তোলে। ভয় ধরিয়েই যদি মানুষকে বশে রাখা যায়। তবে অহেতুক হাত নোংরা করতে হয় না। আর সেই কারণেই অপরাধচক্রের মনস্তত্ত্ব বলে যে, হাত যদি কোন কারণে নোংরা করতেই হয়। তবে এমন চূড়ান্ত ভাবেই নোংরা করো। যাতে পরবর্তী বহুদিন হাত পরিস্কার রাখা যায়।

 

ঠিক এই কারণেই ৯ই আগসস্টের সেমিনার রুমের নাটকটিকে অমন ভয়াবহ করেই রচনা করা হয়েছিল। যাতে করে আর কেউ বহুদিনের জন্য অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে গর্জন তোলা তো দূরের কথা সামান্যতমও ট্যাঁ ফু করতেও সাহস না পায়। সেই বার্তাটা সরাসরি বাকিদের চেতনার গভীরে স্থায়ী করে দেওয়ার লক্ষ্যেই আর জি করের চিকিৎসক তরুণীকে অমন নৃশংস ভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো চিকিৎসক তরুণীকে নৃশংসতম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। নাকি, হত্যার পর নৃশংতার ছবি আঁকা হয়েছিল। কারণ অমন পাশবিক ভাবে কাউকে হত্যা করা হলো। আর, আর জি করের মতোন একটা হাসপাতালে কাকপক্ষী টের পেল না। তেমনটা ঘটা কিন্তু খুবই সন্দেহজনক। হোক না যতই গভীর রাত। এখন একথাও সত্য। হত্যা হত্যাই। সেটি সবসময়েই নৃশংস। খুবই সত্য কথা। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন জাগে। যাকে হত্যা করাই মূল উদ্দেশ্য। তাকে সরাসরি হত্যা করে দিলেই তো সমস্যার সমাধান। সেখানে অমন নৃশংসতা ঘটানোর মতোন ঝুঁকি নেওয়ার দরকার কি ছিল? আর এখানেই লুকিয়ে থাকার কথা রহস্যের মূল চাবিকাঠির। তখনই তো অনুমান করা যায়। ‘সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙবে না’, এমন পথই যদি নেওয়া হয়ে থাকে?

 

পথ যেমনই নেওয়া হয়ে থাকুক না কেন। কার্যকারিতার লক্ষ্য এখন কিন্তু বুমেরাং হয়ে গিয়েছে। কথায় বলে, সব কিছুরই সীমা থাকে। অসীম কিছুই নয়। মহাকাল আর মহাশূন্য বাদ দিলে। প্রতিটি বিষয়েরই স্থিতিস্থাপকতার একটা নির্দিষ্ট সীমানা থাকে। সেটা যে কখন কি ভাবে কেটে যাবে। সেটা অনেক সময়েই আগাম অনুমান করা যায় না। বিশেষত লক্ষ্য যেখানে চুড়ান্ত ভাবেই নৃশংসতম। নৃশংসতার বার্তা গেঁথে দেওয়ার লক্ষ্যে স্থিতিস্থাপকতার সীমানাটা খেয়ালের বাইরে হিসাবের বাইরে চলে গিয়েছিল। গিয়েছিল বলেই যে নৃশংসতম চূড়ান্ত বার্তা দেওয়ার জন্য ৯ই আগস্টের নির্যাতন ও হত্যা। সেটাই প্রায় সাথে সাথেই বুমেরাং হয়ে অপরাধতন্ত্রকে এমন নিদারুণ ভাবে বেআব্রু করে দিয়েছে। কথায় বলে যেমন কর্ম তেমন ফল। না, এখানে অপরাধের সাথে জড়িত নাটবল্টুদের আইন মোতাবেক শাস্তিবিধানের কথা বলা হচ্ছে না। রাজনীতির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষাতিতম সমীকরণের উপরেই হত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। বলা হচ্ছে যে অপরাধচক্রকে নিরাপদে নিঃশ্ছিদ্র সুরক্ষার বলয়ে ধরে রাখার জন্যেই এই খুনের ভয়াবহতার ছবি রচনা করতে হয়েছিল। সেই অপরাধচক্রের নিঃশ্ছিদ্র সুরক্ষার বলয়টা ধ্বসে না গেলেও আজ সর্বসমক্ষে বেআব্রু হয়ে গিয়েছে। এটাই সেই যেমন কর্ম তেমন ফল। ঠিক এই বুমেরাংটিই ঘটে গিয়েছে আর জি কর কাণ্ডে।

 

মানুষের কাছে ছবিটা পরিস্কার হয়ে গিয়েছে। যে সত্যগুলি আর জি করের প্রায় সকলেই জানতো। জানতো রাজ্যের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পড়ুয়া থেকে জুনিয়র এবং সিনিয়র ডাক্তার থেকে নার্স এবং অন্যান্য কর্মীবৃন্দ। এবং জানলেও ভয়ে আতঙ্কে সন্ত্রস্ত হয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকতো। ঘটনার ভয়াবহতায় তাদের ঘোর গিয়েছে কেটে। তারা প্রায় সকলেই বুঝতে পেরে গিয়েছে। চুপ করে আতঙ্কের প্রহর কাটালেও জীবনের নিরাপত্তার কোন নিশ্চয়তা নেই। অপরাধচক্রের কালো হাত দিনে দিনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। দুর্দমনীয় থেকে নৃশংসতম হয়ে উঠছে। ফলে সন্ত্রস্তদের ধৈর্য্যের সকল বাঁধ গিয়েছে ভেঙে। এই সেই স্থিতিস্থাপকতা। যা একবার ছিঁড়ে গেলে অবস্থা আয়ত্বের বাইরে চলে যায়। আর জি কর কাণ্ড সেই আয়ত্বের বাইরে চলে যাওয়া একটি ঘটনা। অপরাধীদের সকল পরিকল্পনাই আসলে শেষমেশ তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। সেই প্রমাণ লোপাট করে সাধ্য কার?

 

তদন্ত কতদূর এগোবে। সে রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয়। কয়জন অপরাধী ধরা পড়বে সেও রাজনীতির ণত্ব এবং ষত্ব। আদৌ কোন অপরাধীকে ধরা হবে কি হবে না। হলে কাকে কাকে। এসবই ভোটতন্ত্রের হিসেব নিকেশের ব্যাপার। ধরা যাক কোন অপরাধীকেই ধরা হলো না। নাই হতে পারে। তাহলেই বা কি? জনশক্তির চোখের সামনে অন্ধকারের যে পর্দা খুলে গিয়েছে। নতুন করে সেই জনশক্তির চোখে ঠুলি পরানো খুব যে সহজ হবে, মনে হয় না। ফলে বুমেরাংএ এই অপরাধচক্র ঘায়েল যদি নাও হয়। আহত তো অতি অবশ্যই হতে হবে। হাসপাতালে হাসপাতালে মেডিকেল কলেজগুলিতে এই অপরাধতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে গেলে রাজনৈতিক শক্তির বেআব্রু প্রদর্শন করতে হবে। এখন দেখার, সদ্য জাগ্রত জনশক্তি রাজনৈতিক শক্তির সেই বেআব্র প্রদর্শনের বিরুদ্ধে কতদিন রাত দখল থেকে দিন দখল এবং রাজপথের দখল নিজেদের জিম্মায় ধরে রাখতে পারে। আসল লড়াই কিন্তু সেইখানেই। রাজনীতি যে জনশক্তিকে ফাঁকা মাঠ ছেড়ে দেবে। এমনটা ভাবার কোন কারণ নাই। ফলে যে যেভাবেই পথে নামুক না কেন। তাদের এই পথে নামা কিন্তু কোনদিক দিয়েই অরাজনৈতিক নয়। অরাজনৈতিক হওয়ার কোন পথই খোলা নেই। রাতের দখল নেওয়াই হোক। আর দিনের দখল নেওয়া। রাজপথের দখল নেওয়াই হোক আর লড়াইয়ের দখল নেওয়া। বিষয় এবং ঘটনা দুই রাজনৈতিক। কারণ আসল লড়াই সেই রাজনীতির বিরুদ্ধেই। যে রাজনীতি দিনের পর দিন রাতের পর রাত মাসের পর মাস বছরের পর বছর এমন সব অপরাধচক্রকে দুধ কলা দিয়ে পুষতে পুষতে একটা গোটা অপরাধতন্ত্রকেই জনশক্তির উপরে চাপিয়ে দেয়। জগদ্দল পাথরের মতোন। জনশক্তি সেই পাথরকে সরাতে সক্ষম হবে কিনা। সরালেও একটা জগদ্দল পাথরের জায়গায় আরও কোন একটা আরও বিশাল জগদ্দল পাথরের তলায় চাপা পড়তে হয় কিনা। সে সবই কিন্তু নির্ভর করবে। জনশক্তি এই রাজনৈতিক লড়াইটাকে কতদূর অব্দি টেনে নিয়ে যাওয়ার হিম্ম্মত রাখে। হিম্মতের উল্ল্যেখ করার কারণ, জনশক্তির শক্তির কোন অভাব নেই। কোনদিন থাকেও না। অভাব যেটা থাকে সেটা ঐ হিম্মতেরই। সেই অভাবটাই অপরাধতন্ত্র গড়ে ওঠার মূলে। সেই অভাবটাই অপরাধচক্রগুলির কাছে তুরুপের তাস। সেই তাসকেই তারা নিয়মিত খেলে যাওয়াটা প্রায় জলহাওয়ার মতো সহজ করে ফেলেছে। ফলে তারাও ঘড়ির টিকটিকে কান পেতে রয়েছে। এই জনগর্জন কত তাড়াতাড়ি জনমিউমিউতে নেমে আসে। না, এমনি এমনি তেমনটা হওয়ার কথাও নয়। তেমনটা ঘটানোই আসলে রাজনীতির সহজপাঠ।

 

কপিরাইট শ্রীশুভ্র ২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২৪


অধরা জাস্টিস

 

কেউ কেউ বলছেন এতদিন রাজনৈতিক দলগুলির মিছিল মানুষ খুঁজতো। দলের নেতা নেত্রীদের নিজ দায়িত্বে মিছিলে পতকাবাহী ভিড় বাড়াতে হতো। এখন মানুষ মিছিল খুঁজে নিচ্ছে। কোন দলের নেতা নেত্রীদের চাপ নেই। পতাকা বহনের দায় নেই। মিছিলে হাঁটার হুকুম নেই। মিছিলে না গেলে ক্ষতির আশংকা নেই। তবু মানুষ যে যেখান থেকে পারছে। যে যেমন ভাবে পারছে। মিছিল খুঁজে নিচ্ছে। মিছিল তৈরী করে ফেলছে। রাজনৈতিক মুখ নেই। জনসেবার মুখোশ নেই। ধান্দাবাজির স্টান্ট নেই। শক্তি প্রদর্শনের আস্ফালন নেই। মিছিল আছে। মানুষ আছে। প্রতিবাদ আছে। আর আছে একটাই লক্ষ্য। একটি মেয়ের নৃশংস পরিণতির উপযুক্ত বিচার। অপরাধীদের কঠিনতম শাস্তির দাবিতে। অপরাধচক্রকে প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে রক্ষা করার বিরুদ্ধে জনতার সম্মিলিত গর্জনে।


খুব স্বাভাবিক ভাবেই সরকার পক্ষ থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন শাসকদলের কাছে এ এক বড়ো অশনিসংকেত। এমনকি প্রধান বিরোধী দলের কাছেও এই ঘটনা আতঙ্কজনক। আজ যারা বিরোধী। কাল তারাই যখন ক্ষমতার গদির দখল নেবেন। স্বভাবতঃই তারাও তখন এইরকম স্বতঃস্ফূর্ত এবং রাজনীতি নিরপেক্ষ স্বাধীন জন বিক্ষোভের সম্মূখীন হতে চাইবেন না। কোন রাজনৈতিক শিবিরই জনতার স্বাধীন কন্ঠস্বরকে মান্যতা দিতে রাজি নয়। রাজনীতির সোজা কথাই হলো, জনতাকে পতাকা আর প্রতীকে এক একটি দলীয় খোঁয়াড়ে বেঁধে রাখা। তার বাইরে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বাধীন গর্জনকে প্রতিটি রাজনৈতিক শিবিরই ভয় পায়। জনতা যদি রাজনৈতিক শিবিরগুলিকে ডিঙিয়ে নিজেদের গরজে নিজেদের দাবি নিয়ে রাজপথের দখল নিয়ে নেয়, তখন রাজনৈতিক শিবিরগুলির কাজ কারবারে গণেশ উল্টানোর দশা হবে। ফলত আর জি কর কাণ্ডে এই রাজ্যের শাসক এবং বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলি ভিতরে ভিতরে এখনই আতঙ্কিত। উপরের মুখভঙ্গিমার নকশা যার যেমনই হোক না কেন। রাজনৈতিক বচনের ভাষা যেমনই থাকুক না কেন। তারা কিন্তু আসলেই শঙ্কিত। যে জনতা তাদের খোঁয়াড়ের নিয়ম কানুন মেনে দলীয় লাইনে জাবর কাটার বদলে, নিজেদের লাইনে নিজেদের স্লোগান নিজেরাই বেঁধে নিচ্ছে। সেই জনতাকে আবার বুথে বুথে নিজেদের প্রতীকে টিপ ছাপ দেওয়ানো খুব একটা সহজ কাজ নাও হতে পারে।


যদিও মিছিল খুঁজে নিয়ে পথে নামা জনতা এখন এতসব কিছুই ভাবছে না। লক্ষ্য তাদের স্থির। দাবি তাদের একটাই। বিচার চাই। স্লোগান তাই সেই প্রথম দিন থেকেই, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। এক দিন নয়। দুই দিন নয়। আর জি কর কণ্ডের বিয়াল্লিশতম দিনেও কলকাতা সহ রাজ্যের নানান প্রান্তে মিছিল চলছেই। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মিছিল। বিভিন্ন বয়সের মানুষের মিছিল। বিভিন্ন বিশ্বাস ও মতাদর্শের মানুষের মিছিল। নির্দিষ্ট একটি অভিমুখে। ন্যায় বিচারের দাবিতে। কালিংপঙ থেকে কাকদ্বীপ। দীঘা থেকে দার্জিলিং। বীরভুম থেকে বনগাঁ। ঝাড়গ্রাম থেকে আলিপুরদুয়ার। বাঁকুড়া থেলে বালুরঘাট। বিচার চাই। ন্যায় বিচার। কারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় এই ন্যায় বিচার পওয়া সহজ কথা নয়। অর্থ ক্ষমতা এবং বাহুবল যার প্রধান অন্তরায়। মানুষ জানে আইনের ক্ষমতা সীমিত। রাজনৈতিক ক্ষমতা আইনকে নিজেদের স্বার্থে চালিত করে। শুধুমাত্র আইনের উপরে ভরসা করে বসে থাকলে। আজ আর মানুষকে পথে নামতে হতো না। পথে না নামলে। পথে না থাকলে। পথে দাঁড়িয়ে নিজেদের দাবির গর্জনকে আসমুদ্র হিমাচল ছড়িয়ে দিতে না পারলে। স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক শক্তিগুলির হাত থেকে আইনকে বাঁচানো সম্ভব নয়। আর আইনকেই বাঁচাতে না পারলে, কিসের জাস্টিস। কার কাছ থেকে জাস্টিস। কার হাত ধরে জাস্টিস। মানুষ জানে আইনের হাতকে শক্ত করে ধরতে না পারলে এই জাস্টিস পাওয়া সম্ভব নয়। আর আইনের হাতকে শক্ত করে ধরতে হলে। আগে আইনকে রাজনৈতিক ক্ষমতার অক্ষ থেকে মুক্ত করতে হবে। রাজপথে নামা, রাজপথের দখল নেওয়া মানুষের কাছে এই সত্যটুকু আজ পরিস্কার। পরিস্কার বলেই মানুষ এই রাজপথের দখল ছাড়তে রাজি নয়। অন্তত যতদিন সেই জাস্টিস সুনিশ্চিত না হচ্ছে।


এখন আর জি করের নির্যাতিতা জুনিয়র চিকিৎসকের হত্যাকারী নির্যাতনকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারলেই কি সেই কাম্য জাস্টিস পাওয়া যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরও নিশ্চিত ভাবেই প্রত্যেকের কাছে এক নয়। সংখ্যার বিচারে হয়তো বেশিরভাগ মানুষই এককথায় তেমনই বলবেন। নির্যাতনকারী হত্যাকারীদের উপযুক্ত শস্তি দেওয়ার ভিতর দিয়েই এই জাস্টিস নিশ্চিত হবে। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখতে চাইলে বোঝা যাবে, জাস্টিস আদৌ এমন সরলরৈখিক সমাধানের মতো কোন বিষয় নয়। জাস্টিসেরও অনেকগুলি স্তর থাকে। অধিকাংশ মানুষ যতটুকুতে সন্তুষ্ট হবেন। সেটুকু একেবারেই প্রাথমিক স্তর। কারণ, যে বা যারা আর জি করের ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তার মূল মোটিভ কিন্তু একটি মেয়েকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপূর্বক যৌন সঙ্গম করতে বাধ্য করাও নয়। কিংবা একটি ধর্ষণের ঘটনায় ধরা পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে ধর্ষিতাকে খুন করার মতো ঘটনাও নয়। অনুমান করা যায়, এই ঘটনার মূল মোটিভকে আড়াল করার জন্যেই ধর্ষণের এঙ্গেলটুকু রচিত হয়েছিল। যাতে এটিকে সাধারণ একটি ধর্ষণজনিত খুনের ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। আর সেই ফাঁকে নির্যাতন ও খুনের আসল কারণগুলি ধামাচাপা পড়ে যায়। যদিও ঘটনাক্রমে বিশেষত জুনিয়র চিকিৎসকদের রুখে দাঁড়ানোর জন্য দিনে দিনে আর জি করে ঘটে চলা একের পর এক নানবিধ অপকর্ম দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হয়ে চলেছে। যার ফলে এতদিনে অনেকের কাছেই এটা পরিস্কার, নির্যাতিত চিকিৎসকের হত্যার পিছনে গভীর এবং ব্যাপক দুর্নীতির জাল বিস্তৃত। সেই দুর্নীতির জাল, জাল ওষুধের কারবার থেকে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধের কারবারই হোক। কিংবা মর্গ থেকে বেওয়ারিশ লাশ পাচারের রমরমা ব্যবসাই হোক। পড়ুয়াদের কাছ থেকে ছলে বলে কৌশলে তোলাবাজির অর্থ আদায়ই হোক কিংবা জাল চিকিৎসক তৈরীর দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমই হোক। সরকারি অর্থের নয়ছয়ই হোক কিংবা যেনতেন প্রকারে প্রতিবাদীদের মুখ বন্ধ করে দেওয়াই হোক। আর জি করে যে দুর্নীতির জাল বিস্তৃত ছিল। যদি সেই দুর্নীতিরই বলি হতে হয় নির্যাতিতা জুনিয়র চিকিৎসককে। তাহলে সেই দুর্নীতির সকল পাণ্ডা এবং মাথাগুলির উপযুক্ত শাস্তি বিধানই শুধু নয়। সেই দুর্নীতি শিকড়সমতে উপড়িয়ে ফেলতে না পারলে আসলেই কোন জাস্টিস পাওয়া সম্ভব নয়।


যে দুর্নীতির একটা অন্যতম ভরকেন্দ্র আর জি কর। সেই দুর্নীতির ভরকেন্দ্র একাধিক সরকারি মেডিকেল কলেজগুলিও। যার মাথার উপরে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর। সেই স্বাস্থ্য দপ্তরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এই রকম ব্যাপক এবং সুগভীর একটা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক, বছরের পর বছর চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয়। কোনভাবেই নয়। ফলে যে ভয়াবহ দুর্নীতির খপ্পরে পড়েই খুন হতে হলো আর জি করের নির্যাতিতা চিকিৎসককে। সেই ভয়ঙ্কর দুর্নীতিকে গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিকাঠামো থেকে সমূলে উচ্ছেদ করতে না পারলে, আসলেই কোন জাস্টিস পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’-এর আন্দোলনের সাফল্য এত সহজেই অর্জন করাও সম্ভবপর নয়। একটা রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্পূর্ণ সিস্টেম যেখানে ভয়াবহ দুর্নীতির করাল গ্রাসে, সেখানে একজন মৃতার কয়েকজন খুনিকে ফাঁসিকাঠে ঝোলালেও জাস্টিস অধরাই রয়ে যাবে। জাস্টিসের দাবিতে রাজপথের দখল নেওয়া জনশক্তিকে তাই এখনো বহু পথ অতিক্রম করতে হবে। বহুদিন লড়াই জারি রাখতে হবে। এবং বহু কঠিন থেকে কঠিনতম বাধা অতিক্রম করতে হবে। প্রকৃত জাস্টিস ছিনিয়ে আনতে গেলে। সে একদিন দুইদিন বিয়াল্লিশ দিনের বিষয় নয়।


এখন এই বিষয়টিও আমাদের পরিস্কার বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। দুর্নীতির একটা প্রায় নিঃশ্ছিদ্র পরিকাঠামো যখন গড়ে ওঠে। দুর্নীতির চক্রে যখন শত শত কোটি কিংবা হাজার কোটি টাকার হাত বদল হতে থাকে। সেই বিশাল বন্দোবস্তকে সমূলে বিনাশ করা আদৌ কোন সহজ কথা নয়। শুধুমাত্র আইন দিয়ে সেটা সম্ভব নয়। যদি না রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। এখন ক্ষমতার গদি থেকে এক পক্ষকে নামিয়ে দিলেই আর এক পক্ষকে বসাতেই হয়। কিন্তু ক্ষমতার বিশেষত্বই হলো, যে পক্ষই ক্ষমতার গদিতে গিয়ে বসুক না কেন। কম বেশি যে কোন রকম দুর্নীতির পরিকাঠামোকে ধরে রাখাই শাসকপক্ষের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ একটা চলমান দুর্নীতির মধু খাওয়ার লোভই বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক শিবিরের ভোট রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এই কারণেই শাসক আসে শাসক যায়। কিন্তু দুর্নীতির জয়ধ্বজা উড়তেই থাকে। মুশকিল হলো গণতন্ত্রে জনগণের নিজস্ব কোন শিবির না থাকা। কখন‌ো যদি সেই নিজস্ব জনশিবির গড়েও ওঠে, রাজনৈতিক পক্ষগুলিই সেই শিবিরকে বকলমে হাইজ্যাক করে নিতে উঠে পড়ে লেগে যায়। এবং এক একটা গণ আন্দোলনকে সিঁড়ি করেই ক্ষমতার গদিতে গিয়ে বসেই দুর্নীতির সেই মধুচক্রের স্বাদ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই যে একটা ভয়াবহ চক্র। দেশের আইন কোনভাবেই এর নাগাল পায় না। পায় না বলেই দুর্নীতির দুই একটি নাটবল্টুকে আইনের আওতায় নিয়ে এসেই আইন তার কর্তব্য সমাপন করে ফেলে। আবার পরবর্তী খুন ধর্ষণ রাহাজানির কেস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। ওদিকে দুর্নীতির নেটওয়ার্ক হাত বদল হতে থাকে মাত্র। আইনের সত্যিকারের দৌড় এই অব্দিই। ঠিক এই কারণেই আইনকে পুরোপুরি ফলপ্রসু করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রসঙ্গে সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছার সঠিক বাস্তবায়ন সর্বত্তম জরুরী একটি বিষয়। সেই লড়াই যতক্ষণ না সফল হচ্ছে। যতক্ষণ না বাস্তবায়িত হচ্ছে। ততক্ষণ জাস্টিস কিন্তু অধরাই রয়ে যাবে। সে যতই আমরা জাস্টিসের জন্য পথ হাঁটি না কেন।


কপিরাইট শ্রীশুভ্র ২১শে সেপ্টেম্বর ২০২৪

 


অপরাধচক্রের চক্রব্যূহে

 

ওরা স্লোগান দিচ্ছিল ‘থ্রেট কালচারের গালে গালে জুতো মারো তালে তালে। ওরা ওদের পাঁচ দফা দাবির সর্বশেষ দফা হিসাবে রাজ্যের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিকে এই থ্রেট কালচারের নেটওয়ার্কের কবল থেকে সরাতে চাইছে। আর জি কর কাণ্ডের প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠা জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য এই অবস্থা থেকে মুক্তি অর্জন। সাধারণ জনগণ আর জি কর মেডিকেলে ঘটে যাওয়া ৯ই আগস্টের নৃশংসতম ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সরব হয়েছে ১৪ই আগস্টের ‘রাত দখল’-এর রাত থেকেই। জুনিয়র চিকিৎসকদের কর্মবিরতি সহ চলমান আন্দোলনে রাজ্যবাসী দিনে দিনে একাত্ম হয়ে উঠেছে। তার একটা বড়ো কারণ, মানুষের কাছে রাজ্যের সর্বত্র এই সকল মেডিকেল কলেজগুলিতে গড়ে ওঠা অপরাধচক্র এবং সেই চক্রের থ্রেট কালচারের ভয়াবহ পরিস্থিতি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে দিনে দিনে। মানুষ এখন অনেকটাই জেনে গিয়েছে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিতে এক ভয়ানক অপরাধতন্ত্র কায়েম হয়েছে। যারা যারা এই অপরাধতন্ত্রের কারবারি, তারা তাদের এই অপরাধচক্র চালিয়ে আসতে পারছে শুধুমাত্র দুইটি কারণের জন্যেই। তারই একটি কারণ এই থ্রেট কালচার। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলির সর্বস্তরেই শিক্ষার্থী থেকে চিকিৎসক, জুনিয়র থেকে সিনিয়র, নার্স থেকে কর্মচারী সকলেই সন্ত্রস্ত। সমগ্র পরিকাঠামো জুড়েই একটা সন্ত্রাসের রাজত্ব চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বছরের পর বছর। শিক্ষাবর্ষের পর শিক্ষাবর্ষ। এই যে একটি সন্ত্রাসের রাজত্ব। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই যেভাবেই হোক কন্ঠরোধের ব্যবস্থা করা হবে। যার অন্তিম পর্যায় হত্যা। যার চুড়ান্ত পরিণতি আর জি করের নির্যাতিতা চিকিৎসকের ভয়াবহ এই মৃত্যু।


এই অপরাধচক্রের কাজ মূলত দুইটি ধারায় এগিয়ে চলেছে। একটি সর্বস্তরে দুর্নীতি। সরকারি অর্থের ব্যাপক নয়ছয়। ডাক্তারি না শিখে উত্তরপত্র কিনে নিয়ে পরীক্ষার হলে টুকে টুকে পাশ করা থেকে শুরু করে পরীক্ষককে ম্যানেজ করে চিকিৎসক হয়ে যাওয়াও যেখানে হয়তো বিচিত্র নয়। চিকিৎসার সরঞ্জাম হাপিশ করে দেওয়া থেকে শুরু করে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ ক্রয়, জাল ওষুধের কারবার, বেওয়ারিশ লাশ পাচার। কি আছে আর কি নেই। আর একটি ধারা হলো সরাসরি তোলাবাজি। আর এই তোলাবাজির সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার হচ্ছে ডাক্তারি পড়ুয়া থেকে জুনিয়র চিকিৎসক। এবং তোলাবাজির রেট শুনলে আরও আশ্চর্য হয়ে যেতে হয়। সেই রেট নাকি লাখের নীচে কোন কথাই বলে না। পরীক্ষায় সঠিক নম্বর পাওয়া থেকে মেডিকেল প্রফেশনের রেজিস্ট্রেশন পাওয়া অব্দি। আর জি কর কাণ্ড, রাজ্যের মেডিকেল কলেজগুলিতে জাঁকিয়ে বসা এই অপরাধচক্রের বাস্তব চিত্রটাই কিছুটা হলেও বেআব্রু করে দিয়েছে। মানুষ দুই আর দুইয়ে মিলিয়ে নিতে পারছে। যদিও অপরাধতন্ত্রের ব্যাপ্তি ও গভীরতা আমাদের কাছে এখনো অপরিমেয়। আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরা ঠিক যে যে দাবিতে তাদের এই আন্দোলনকে এই পর্যায়ে তুলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে, মানুষ আজকে বুঝতে পারছে, সেই সেই দাবিগুলির প্রত্যেকটি কতটা যৌক্তিক এবং অমোঘ। ঠিক এই কারণেই ‘রাত দখল’ করা জনসাধারণ, আর জি করের নির্যাতিতা নিহত জুনিয়র চিকিৎসকের হত্যাকাণ্ড এবং ধর্ষণের সঠিক বিচারের দাবির সাথেই জুনিয়র চিকিৎসকদের এই বৃহত্তর আন্দোলনেরও পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অনেকেই বুঝতে পারছেন, নিহত চিকিৎসকের হত্যাকারীদের শাস্তি হলেই শুধু হবে না। গোটা অপরাধতন্ত্রটিকে বিনাশ করতে হবে। আর সেই কারণেই পৌঁছাতে হবে অপরাধচক্রের এই চক্রব্যূহের একেবারে গভীরে। চক্রের প্রতিটি পাণ্ডাকে নির্দিষ্ট ভাবে শানাক্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এবং সঠিক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কঠিনতম শাস্তি সুনিশ্চিত করতে হবে। একমাত্র তাহলেই অন্তত সামনের বেশ কিছু সময় অব্দি রাজ্যের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিকে অপরাধতন্ত্রের কবল থেকে মুক্ত করে রাখা সম্ভব হবে।


রাজ্যের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলিতে এই অপরাধতন্ত্রের কায়েম হয়ে থাকার পিছনে থ্রেট কালচার যেমন একটি কারণ। ঠিক তেমনই রাজ্যের স্বাস্থ্যভবনে তৈরী হয়ে ওঠা ঘুঘুর বাসা এই অপরাধতন্ত্রের বাস্তবায়নের আর একটি কারণ। বস্তুত স্বাস্থ্যভবনের ঘুঘুর বাসাই কলেজে কলেজে হাসপাতালে হাসপাতালে গড়ে ওঠা অপরাধচক্রের আসল প্রাণ ভোমরা। স্বাস্থ্যভবনের অবস্থা যদি এইরকম অস্বাস্থ্যকর না হতো, তাহলে রাজ্যব্যাপী এই অপরাধচক্রের বাড়বাড়ন্ত হয় না। কর্মবিরতিতে থাকা আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরা অত্যন্ত সঠিক কারণেই তাই স্বাস্থ্যভবন সাফাই অভিযানে নেমেছেন। তারা এই সাফাই অভিযানে আদৌ সফল হবেন কিনা, হলেও কতখানি হবেন, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু তাদের অভিযানের লক্ষ্য যে অভ্রান্ত, সেটা রাজ্যবাসীও অনুধাবন করতে পারছে। জুনিয়র চিকিৎসকদের দাবি ছিল স্বাস্থ্যভবনের তিনজন শীর্ষ কর্তার পদত্যাগের। তাদের ভিতরে মাত্র দুইজনকে অন্যত্র দায়িত্ব দিয়ে সরানো হয়েছে। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার ছিল। তাদেরকে অন্যত্র বদলি করে দেওয়ার ভিতরে আর যাই থাক, প্রশাসনের সুশাসনের কোন নিদর্শন নাই। ফলে সেই প্রশাসনের উপরে নির্ভর করে স্বাস্থ্যভবনের ভিতরে বাসা বাঁধা রোগের নিরাময় যে হওয়ার নয়, সেটা বলাই বাহুল্য। এরই সাথে এই বিষয়টিও বুঝতে হবে। একটা গোটা ব্যবস্থায় যখন পচন ধরে। তখন সেই ব্যবস্থার দুই একটা নাটবল্টু টাইট দিলেই গোটা ব্যবস্থাটিকে পাল্টিয়ে দেওয়াও যায় না। তার অভ্যন্তরীন রোগও নির্মূল করা যায় না। এর জন্য চাই আমূল সংস্কার। দুঃখের বিষয় বর্তমান প্রশাসনের দিকে তাকালে সেই বিষয়ে কোনরকম আশা করার উপায়ও থাকে না।


প্রশাসন যেটা করতে পারে। সোজা কথায় তাকেই বলা হয় ধামাচাপা দেওয়া। ৯ই আগস্ট থেকেই প্রশাসন ঠিক সেই কাজটিই করে আসছে। যদিও সেই কার্যেও প্রশাসনের দক্ষতার অভাবই ফুটে উঠেছে। না হলে জল এতদূর গড়ায় না। জল যতদূরই গড়াক না কেন। প্রশাসনের সেই একটাই গোঁ। যেভাবে হোক, যেমন করেই হোক, যতটা পরিমাণেই হোক না কেন। ধামাচাপা দিয়ে গোটা বিষয়টা এমন ভাবেই সমালাতে হবে, যাতে জনতাও ঠাণ্ডা হয় আর গদিও না টলে যায়। এই যখন অবস্থা, তখন রাজ্যের স্বাস্থ্যক্ষেত্র দুর্নীতি মুক্ত হবে, যে অপরাধতন্ত্র গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাভিশ্বাস উঠিয়ে দিয়েছে সেই অপরাধতন্ত্রের অবসান হবে আর অপরাধচক্রকে বিচারের সমানে দাঁড় করিয়ে উপযুক্ত শাস্তি বিধান করা যাবে, এতটাও আশা করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতেও রাজি নয় জনসাধরণের একটা বড়ো অংশই। সেই কারণেই তারা প্রতিদিনই বিচারের দাবিতে জঞ্জাল সাফাইয়ের দাবিতে যার যতটুকু সাধ্য, রাজপথ কাঁপাচ্ছেন। জনতা যতক্ষণ রাজপথের দখল নিয়ে থাকবে। ততক্ষণই আশা। দোষীরা সাজা পাবে। অপরাধচক্র ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে। অপরাধতন্ত্রের অবসান হবে। ঠিক এই কারণেই জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন আজ আর শুধুই জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনে দাঁড়িয়ে নেই। এই আন্দোলন জনগণের আন্দোলন হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক পক্ষগুলি সেই কারণেই আরও, ঘোলাজলে মাছ ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দফা এক দাবি একের নামাবলি গলায় দুলিয়ে জনতার বন্ধু সাজার মরিয়া চেষ্টা করছে। আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরাও ঠিক এই কারণেই তাদের এই আন্দোলনকে এখন অব্দি স্বার্থান্বেষী কোন রাজনৈতিক শিবিরকে হাইজ্যাক করতে দেননি। সিঙ্গুরের কৃষকদের জমিরক্ষার আন্দোলনের হাইজ্যাক হয়ে যাওয়ার মতো। তারা সদা জাগ্রত থেকে সজাগ রয়েছেন পাছে বেহুলার বাসরঘরের মতো দশা না হয়ে যায়। আর ঠিক এইখানেই রাজ্যবাসীরও সদা সতর্ক থাকা দরকার। তাদের এই রাজপথের দখল নেওয়ার বিষয়টাও যেন রাজনীতির চক্রব্যূহে বেদখল না হয়ে যায়। শাসক আসে শাসক যায়। কিন্তু সিস্টেম একই রয়ে যেতে পারে। যদি না জনগণ সজাগ থাকে। আজকে যারা এই অপরাধতন্ত্র চালাতে এমন জবরদস্ত একটা অপরাধচক্রকে টিকিয়ে রেখেছে, তারা শাসন ক্ষমতা থেকে চলে গেলেই যে নতুন শাসকগোষ্ঠী এই একই অপরাধতন্ত্রের সুযোগ নিতে সেই একই অপরাধচক্রের দখল নেবে না, তার কিন্তু কোনরকম নিশ্চয়তা নাই। প্রতিটি রাজ্যবাসীকে, বিশেষ করে যারা আজ রাত দখলের পথে রাজপথে পা মেলাচ্ছেন। তাদেরকে এই একটি বিষয়ে খুব সুস্পষ্ট ভাবেই অবহিত থাকতে হবে। নাহলে সেই পুরানো মদ নতুন বোতলে! শুধু লেবেলটাই মাত্র বদলিয়ে যাবে। অপরাধচক্রের চক্রব্যূহতেই আটকিয়ে থেকে যেতে হবে। অপরাধতন্ত্রের মালিক বদলিয়ে যাবে শুধু। অন্তত ঘরে ঘরে আপন সন্তানসন্ততির ভবিষ্যৎ ভেবে মানুষকেই তাই আজ অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবেই সঠিক একটা অবস্থান নিতে হবে। সজ্ঞানে এবং অভিজ্ঞতার উপরে নির্ভর করে। সামনের পথ যতটাই জটিল। ততটাই পিচ্ছিল। যেকোন চক্রব্যূহ থেকে মুক্তির পথ কঠিন। শুধুমাত্র আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকরাই নয়। রাজ্যের মানুষকেও এই বিষয়টুকু মাথায় রাখতে হবে। না হলে শেষ অব্দি জিতে যাবে সেই অপরাধচক্রই। স্থায়ী হয়ে রয়ে যাবে গোটা অপরাধতন্ত্রই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আটকিয়ে রয়ে যাবে সেই এক চক্রব্যূহেই।

 

শ্রীশুভ্র ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৪


১৯শে এপ্রিলের শপথ!

 

শুরু হয়ে গেল ভোটযুদ্ধ। লোকসভা নির্বাচন ২০২৪। প্রথম পর্বে মোট ১০২টি লোকসভা আসনে ১‍৬২৫ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হওয়ার কথা আজ। এই ১৬২৫ জন প্রার্থীর ভিতরে ১৬১৮ জন প্রার্থীর ঠিকুজিকুলুজি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য তুলে নিয়ে এসেছে এসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্ম(এডিআর)। তাদের বিশ্লেষণ থেকে উঠে এসেছে অত্যন্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। মোট ১৬১৮ জন প্রার্থীর ভিতরে  স্বঘোষিত বয়ানেই ২৫২ জন প্রার্থী(১৬%) নানাবিধ ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। যদিও তাদের ভিতরে ১৬১ জন প্রার্থী(১০%) গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। এডিআর অবশ্য এই সব তথ্য তুলে নিয়ে এসেছে নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত তথ্যভাণ্ডার থেকে। প্রদত্ত তথ্যসমূহ অনুসারে এই গুরুতর ফৌজদারী অপরাধের ভিতরে রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, ধর্ষণ, অপহরণের মতো নৃশংস অপরাধ সমূহও। রয়েছে পাঁচ বা ততধিক বৎসরের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রয়েছে জামিন অযোগ্য অপরাধ। রয়েছে ইলেক্ট‌োরাল অফেন্স বা নির্বাচনী উৎকচ দেওয়া নেওয়ার মতো অপরাধ। খুনের চেষ্টার মতো অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৯ জন। নারী ঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৭ জন। আর সরাসরি মানুষ খুনের অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা ৭ জন। এর ভিতরে ১৪ জন এমন প্রার্থীও রয়েছেন। যাঁরা ইতিমধ্যেই কনভিক্টেড।

 

স্মরণে রাখতে হবে। যাবতীয় এইসব পরিসংখ্যান কিন্তু শুধুমাত্র আজকে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনী আসনে দাঁড়ানো প্রার্থীদেরকে নিয়েই। এখন দলগত ছবি’র দিকে নজর দিলে দেখা যাচ্ছে বিজেপির মোট প্রার্থীর ৩৬% ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। আর গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৮%। এখন দেখা যাক জাতীয় কংগ্রেসের ছবিটা ঠিক কি রকম। জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থীদের মধ্যে ৩৪% প্রার্থীর বিরুদ্ধে রয়েছে ফৌজদারী অপরাধের অভিযোগ। আর ১৪% প্রার্থী গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। এবার আসা যাক রাজ্যের শাসকদল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের পরিসংখ্যানে। তৃণমূলের দাঁড়ানো মোট প্রার্থীর ৪০%ই ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। যাঁদের ভিতরে ২০% প্রার্থী গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। এই ছবিতে একটি কাকতালীয় মিল লক্ষ্য করার মতোন। বিজেপি ও তৃণমূল। এই দুটি দলেরই ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত মোট প্রার্থীর অর্ধেকই গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। কিন্তু সিপিআই, সিপিআইএম? অনেকেই মনে করতে পারেন। কমিউনিস্ট পার্টির হিসেব নিকেশ হয়তো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। আজকের ১০২টি লোকসভা আসনে সিপিআই’এর ৬ জন প্রার্থীর ভিতরে ২ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের মামলা ঝুলছে। শতাংশের হিসাবে ৩৩%। আর সিপিআইএম’র মোট প্রার্থী ৫ জন। যাঁদের ভিতরে ৩ জনের বিরুদ্ধে রয়েছে ফৌজদারী অপরাধের মামলা। আর তার ভিতরে ২জনই গুরুতর ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত।

 

আরও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ভিতরেও কমবেশি এই ধরণের চিত্র বর্তমান। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এই রাজ্যের নির্বাচনী লড়াইতে নেই।

 

আজকের নির্বাচনী আসনগুলির ভিতরে দেখা যাচ্ছে মোট ১০২টি লোকসভা আসনের ভিতরে ৪২টি অর্থাৎ ৪১% আসনকেই রেড এলার্ট আসন বলে ধরা হচ্ছে। অনেকেরই মনে হতে পারে, রেড এলার্ট কেন? রেড এলার্ট কারণ। সেই সব লোকসভা আসনগুলিকেই রেড এলার্ট আসনের তালিকায় রাখা হচ্ছে। যে যে আসনে তিন বা তিনের বেশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীই ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। অর্থাৎ এই ৪১ শতাংশ লোকসভা আসনেই একজন ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। বিগত লোকসভা নির্বাচনে ৪৩% নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিই নানবিধ ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত ছিলেন। ফলে এটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। বিগত লোকসভা নির্বাচনের মতোই এবারের লোকসভা নির্বাচনেও ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত বিপুল সংখ্যক জনপ্রতিনিধির জয়ী হওয়া সুনিশ্চিত। আমরা জানি না সেই সংখ্যাটি এবারে ৪৩% অতিক্রম করে লোকসভার অর্ধেকের বেশি আসনই দখল করে নেবে কিনা!

 

আজকের নির্বাচনে আমাদের রাজ্যে যাঁরা লড়ছেন। তাঁদের ভিতরে ৩৭ জন প্রার্থীর স্বঘোষিত দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে ৫ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের মামলা ঝুলছে। শতাংশের হিসাবে ১৪%। আর ৪ জনের বিরুদ্ধে ঝুলছে গুরুতর ফৌজদারী অপরাধের মামলা। শতাংশের হিসাবে ১১%।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে ফৌজদারী অপরাধের সাথে জড়িত এবং সেই বিষয়ে অভিযুক্ত হেভিওয়েটরা একটা বিপুল সংখ্যায় অংশ নিতে শুরু করে দিয়েছে। ফলে আইনসভায় দেশের হয়ে আইন তৈরী করতে যাঁরা যাচ্ছেন। তাঁদের ভিতরে (গত লোকসভার হিসাবে যেটি ছিল ৪৩%) প্রায় অর্ধেকের বিরুদ্ধেই রয়েছে আইনভঙ্গের অভিযোগ। এই দেশের গণতন্ত্রের এটাই হয়তো সবচেয়ে চমকপ্রদ মহিমা। আইনভঙ্গকারীদের হাতেই দেশের আইন তৈরীর গুরুদায়িত্ব তুলে দিচ্ছেন দেশের নাগরিকরা।

 

এখন প্রশ্ন হলো। নাগরিকরা কি সত্যিই সম্পূর্ণ জেনে বুঝেই অপরাধ জগতের মানুষ কিংবা অপরাধ জগতের মানুষ বলে অভিযুক্তদের হাতে এই গুরু দায়িত্ব তুলে দিতে বদ্ধপরিকর? না’কি অধিকাংশ নাগরিকের কাছেই সেই তথ্যটুকুও নেই। তাঁর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আদৌ সৎ না অসৎ? আদৌ ধোয়া তুলসীপাতা না দাগী অপরাধী? আদৌ নিষ্কলঙ্ক না’কি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত? নাগরিকরা যদি জেনে বুঝেই ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্তদের হাতেই দেশের শাসন ভার তুলে দিতে চান। তবে সেটিও ভয়াবহ অবস্থা। যে কোন জাতি এবং দেশের নাগরিক এমন ভয়াবহ মানসিকতার হলে। সেটি বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো আশ্চর্যের বিষয় হবে। সন্দেহ নাই। তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, হয় কিনা সন্দেহ। তাহলে আমাদের হাতে আর একটি সম্ভাবনাই পড়ে রইল। অর্থাৎ অধিকাংশ ভোটার বা নাগরিকরা জানেনই না হয়তো। তাঁদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির আসল স্বরূপ। লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীদের সম্বন্ধে নির্দিষ্ট তথ্য জানার দায়িত্ব নাগরিকেরও রয়েছে যেমন। সেই তথ্য নাগরিকের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও ঠিক তেমনই রাষ্ট্রেরও রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কিন্তু রাষ্ট্রের হয়ে সেই কাজ করছেন। না করলে এডিআর এত সব তথ্য বিশ্লেষণ করে আমাদের হাতের কাছে এগিয়ে দিতে পারতো না। কিন্তু একা এডিআরের কতটুকু ক্ষমতা? খবরের কাগজ এবং টিভির সংবাদ। এই দুইটি মাধ্যমই আপামর নাগরিকের কাছে গিয়ে পৌঁছায় সবচেয়ে সহজে। কিন্তু সেখানে নাগরিকরা আসল তথ্যগুলির কতটুকু জানতে পারেন? ভোট দেওয়ার লাইনে গিয়ে দাঁড়ানোর আগে নির্বাচনী প্রার্থীদের বিষয়ে বিশদ তথ্য জানা খুব জরুরী। সে বিষয়ে আশা করি কোন বিতর্ক নাই। কিন্তু কিভাবে সম্ভব। প্রতিটি ভোটারের কাছে প্রকৃত তথ্য ঠিক সময়ে ঠিকমত পৌঁছিয়ে দেওয়া?

 

এবং সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন। এইভাবে এই পথে এগিয়ে চলতে থাকলে। অর্থ প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতার জোরে একদিন আণ্ডারওয়ার্ল্ডের ডনেরাই কিন্তু ভারত শাসন করতে শুরু করে দেবে। সেই দিনটি কি আমরাই এগিয়ে নিয়ে আসছি না? একটা দেশের লোকসভার অর্ধেক আসনই যদি ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্তদের হাতে চলে যায়। তবে সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা দেবে কে? দেশের আইন আদালতের পক্ষে কি সেই পরিস্থিতিতে নাগরিকের আইনী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে? দেশের শাসনযন্ত্রই যদি অপরাধ জগতের হেভিওয়েটদের হাতে চলে যায়। তবে অপরাধ জগতের আলাদা কোন অস্তিত্ব আর থাকবে কি?

 

আজকে লোকসভা নির্বাচন ২০২৪ এর প্রথম দিনে এই সকল প্রশ্নগুলির উত্তর কিন্তু প্রত্যেক নাগরিককেই খুঁজতে হবে। শুধুমাত্র ভোটের লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর অন্ধ বিশ্বাসের উপরে নির্ভর করে। ধোঁকাবাজদের কথায় ভুলে। ভণ্ড দেশসেবকদের ছলনায় ভুলে তাদের নির্দেশিত বোতাম টিপে দিলাম। আর নাগরিক দায়িত্ব পালন করা সম্পূর্ণ হয়ে গেল বলে মনে করে যাঁরা তৃপ্তি পান। তাঁরা কিন্তু সম্পূর্ণ নিজেদের অজান্তেই নিজেদের এবং সেই সাথে বাকি সকলের অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। ফলে ভোট তো দেবেনই। কিন্তু কেন দেবেন। কোন কোন দাবিতে দেবেন। সেটিও যেমন গুরুত্বপূ্র্ণ বিষয়। ততধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু। ঠিক কাকে ভোট দিচ্ছেন! তাঁকে কতটুকু চেনেন আপনি। নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রার্থীকে ভালো করে জানাও আমাদের নাগরিক দায়িত্বের ভিতরে পড়ে। সেই দায়িত্ব ঠিকমত পালন করতে না পারলে। আমাদের প্রদত্ত ভোটেই আমাদের কপাল পুড়তে বেশি দেরি হবে না। গণতন্ত্রের সুবিধা নিয়েই গণতন্ত্র বিরোধী অপরাধতান্ত্রিক শক্তি দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নেবে।

 

©শ্রীশুভ্র ১৯শে এপ্রিল ২০২৪

 


জন্মতিথিতে শ্রীঅরবিন্দ

 

“কারুর পক্ষেই আমার জীবনী লেখা সম্ভব নয় কারণ আমার জীবনী মানুষের দৃষ্টিগোচরেই অনুপস্থিত বক্তা শ্রী অরবিন্দ। শিষ্য দিলীপ কুমার রায়’কে একটি পত্রে তিনি এই কথা লিখে জানিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ শ্রী অরবিন্দের কথা কেন? আমাদের অনেকেরই স্মরণে থাকে না। এই পনেরোই আগস্টই অরবিন্দের জন্মতিথি। সংখ্যার হিসাবে অধিকাংশ বাঙালির কাছেই এই দিনটি শোকের। শুধুমাত্র মাতৃভাষাকে রক্ষার উদ্দেশে বিশ্বের একমাত্র স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশ বাংলাদেশের জাতির পিতার মৃত্যুদিন আজ। তাই এই দিনটি সেদেশে শোকদিবস। বাঙালির বাকি অংশের কাছে এই দিনটি ভারতের অন্যান্য জাতির মতোই আনন্দের একটি দিন। দিনটি পরাধীনতার থেকে মুক্তির দিন। দিনটি স্বাধীনতা দিবস। কাঁটাতারের উভয় প্রান্তের বাঙালির কাছেই তাই এই দিনটি দুইটি ভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে হিসাবে এই দিনটি আপামর সকল বাঙালিরই গর্বের দিন। অর্থাৎ বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান শ্রী অরবিন্দের জন্মদিন। সেই হিসেবে প্রায় কোন বাঙালিই এই দিনটি পালন করেন না। না, তার কার্যকারণ নিয়ে আজকের আলোচনা নয়। অনেকে এও বলতে পারেন। অরবিন্দ কি নিজেকেই কোনদিন বাঙালি বলে অনুভব করতে পেরেছিলেন? অনেকে এও বলতে পারেন। শ্রী অরবিন্দের মতো মহাপুরুষদের দেশ কাল জাতির পরিচয়ে বাঁধা সম্ভব নয়। সেই চেষ্টাও অবান্তর। স্বামী বিবেকানন্দ তো নিজ মুখেই বলে গিয়েছিলেন। তিনি নির্দিষ্ট কোন দেশের, জাতির বন্ধনে আবদ্ধ নন। কথাটা এক অর্থে ঠিকই। মহামানবরা যে দেশেই জন্মান। যে জাতিরই অংশ হন না কেন। তাঁরা সকল দেশের সকল জাতির। এবং সকল কালের। এখানেই তাঁদের মহত্ত।

 

দুঃখের বিষয়। এমনই মহত্তর একজন ব্যক্তি শ্রী অরবিন্দের জন্মতিথিটি বাঙালি হিসাবে আমরা প্রায় ভুলেই থাকি। একথাও সত্য, শ্রী অরবিন্দ তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই বাংলার ত্রিসীমানার বাইরেই কাটিয়ে গিয়েছেন। ফলে বাংলা ও বাঙালির সাথে তাঁর সম্পর্ক গভীর হওয়ার কোন রকম সুযোগ পায়নি। তিনি নিজে কতটুকু বাঙালি জাতিকে চিনেছিলেন। সেটা তত বড়ো কথা নয়। কারণ তাঁর সাধনা সকল মানবের মুক্তির জন্য। নির্দিষ্ট ভাবে কোন জাতির জন্য নয়। কিন্তু বাঙালি হিসাবে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। তাঁকে কিছুটা অন্তত চেনার চেষ্টা করার দরকার আছে বইকি। ব্যক্তি স্বার্থেই হোক আর সমষ্টির স্বার্থেই হোক। দুঃখের বিষয়, আমাদের অধিকাংশ বাঙালির কাছেই শ্রী অরবিন্দ, স্কুল পাঠ্য রচনা বইয়ের ভিতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়ে গিয়েছেন আজও। তার বাইরে তাঁকে চেনার বা জানার চেষ্টা কিন্তু আমরা বিশেষ করিনি। ফলে আমাদের কাছে তিনি প্রথমে ব্রিটিশ রাজের আমলা হওয়ার লক্ষ্যে স্বচেষ্ট হওয়া আরও পাঁচজন শিক্ষিত পরাধীন ভারতবাসীর মতোন একজন। পরে কলেজের একজন অধ্যাপক, অধ্যক্ষ। তাও বাংলা থেকে কয়েক হাজার মাইল দুরের এক প্রদেশের। পরের পর্বে তিনি স্বাধীনতা যু্দ্ধে নিবেদিত প্রাণ বিপ্লবীদের অন্যতম একজন। সব শেষে বাংলা থেকে বহুদূরে সুদূর দাক্ষিণ্যত্যে চলে যাওয়া একজন যোগীপুরুষ।

 

অরবিন্দের জীবনের এই চারটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের ভিতরে সমন্বয় সাধন করে ব্যক্তি অরবিন্দকে জানার চেষ্টা খুব একটা হয়েছে বলে জানা যায় না। কাজটি কঠিন সন্দেহ নাই। ভাবলে খুবই অবাক হয়ে যেতে হয়। যিনি ব্রিটিশ রাজের আমলা হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে বিদ্যাশিক্ষা অর্জন করলেন। তিনি সেই কাজে না গিয়ে অধ্যাপনার কাজ দিয়ে জীবন শুরু করলেন। সেই তিনিই আবার দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনের উদ্দেশ্য মাথায় নিয়ে বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। নিন্দুকেরা যাই বলুক না কেন। ব্রিটিশের হাতে ধরা পড়ে তাঁর হঠাৎ যোগী শ্রী অরবিন্দ হওয়া নিয়ে। কিন্তু একথাও সত্য। আলিপুর বোমা মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর চিরদিনের মতো বাংলা ত্যাগ করে সুদূর পণ্ডিচেরীতে গিয়ে যোগ সাধনায় সিদ্ধিলাভের বিষয়টি সাধারণ বাঙালির কাছে আজও বোধগম্য নয়। তাই অনেকের কাছেই তিনি আজও পলায়নবাদী ব্যর্থ বিপ্লবী হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রয়ে গিয়েছেন। বিপ্লবী না যোগী? কে আসল আরবিন্দ? এই প্রশ্ন আজ হয়তো অবান্তর। কিন্তু সাধারণ বাঙালির মনে এই প্রশ্নের আজও কোন মীমাংসা হয়েছে কিনা সন্দেহ।

 

তবে এই সব পরিচয় ছাড়িয়েও যে অরবিন্দের আরও একটি সত্য পরিচয় রয়েছে। আমরা অনেকেই প্রায় ভুলতে বসেছি সেই কথা। শ্রী অরবিন্দের সাহিত্যকীর্তির বিষয়ে আসলে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। জানি না তাঁর রচিত মহাসৃষ্টি মহাকাব্য সাবিত্রী’র কথাও। না, ক্ষুদ্র একটি লেখায় শ্রী অরবিন্দকে ধরা কোনভাবেই সম্ভব নয়। সম্ভব নয় সমগ্র অরবিন্দের সম্বন্ধে সামগ্রিক একটি ধারণায় পৌঁছানো। সেই চেষ্টাও করছি না আমরা। আমরা শুধু বিস্ময়ের সাথে উপলব্ধি করছি। একজন মানুষ। কিন্তু কি বহুমুখী কর্মকাণ্ডের এক মহাজীবন! যে জীবনের কোন একটি পর্বের সাথে অন্য একটি পর্বকে মেলানো সাধারণ জীবনবোধের ব্যাপ্তিতে প্রায় অসাধ্য!

 

কিন্তু স্বয়ং অরবিন্দ! ঠিক কি চেয়েছিলেন তিনি নিজে? আমাদের মতো সাধারণের বোধগম্য কোন অবস্থায় কি পৌঁছাতে চেয়েছিলেন তিনি? মেলাতে চেয়েছিলেন নিজের জীবনের বহুবিধ দিগন্তকে কোন এক উচ্চতর মহত্তর স্বরূপে? না’কি এই পার্থিব জগতের মায়া মোহ লোভ থেকে মুক্তি পাওয়াই ছিল তাঁর সাধনার লক্ষ্য? এই প্রসঙ্গে স্বভাবতঃই স্মরণে আসে গৌতম বুদ্ধের কথা। অরবিন্দের জন্মের কয়েক হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধও কি যোগের পথে বোধিলাভ করেননি? আসলে গৌতম বু্দ্ধের ‘নিবার্ণ লাভে’র মূল লক্ষ্য ছিল চারপাশের এই ইন্দ্রিয়জগত থেকে নিস্কৃতি। তাঁর সাধনা ছিল জীবনলীলার প্রকাশচক্র থেকে অব্যাহতি পাওয়া। পক্ষান্তরে শ্রী অরবিন্দের লক্ষ্য ছিল ‘জীবনের পূর্ণ রূপান্তর’। অরবিন্দ কোনভাবেই বাস্তব জীবনকে পরিহার করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন বস্তু জগতকে অধ্যাত্মের আলোয় আলোকিত করে তুলতে। তিনি আমাদের জগতের একটি মূলগত রূপান্তর ঘটানোর সাধনায় এগোতে চেয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বস্তুজগত একাধিক চেতনাস্তরে বিদ্যমান। নিম্নতম চেতনা স্তর থেকে উর্ধতম চেতনা স্তরের ভিতরে যাতায়াতের একটা রাজপথ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য। কারণ তিনি জানতেন নিম্নতম চেতনা স্তর থেকে ক্রমাগত উর্ধতর চেতনা স্তরে উন্নত হওয়াই এই বিশ্বজগতের অন্তঃস্বরূপ। তিনি বিশ্বাস করতেন। একাধিক চেতনা স্তরের অবস্থানে। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, মানুষের সভ্যতা বর্তমানে এমন একটি নিম্নতর চেতনাস্তরে বিদ্যমান। যে স্তরে এত অন্ধকার। এত অসুখ। এত অজ্ঞানতা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, হাজার বার সৎ পরামর্শ দিয়েও মানুষকে এই নিম্নতর চেতনাস্তর থেকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বলেই গৌতম বুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত কেউই মানবজতিকে উদ্ধার করতে পারেননি। তাঁরা সকলেই একটি জায়গায় ভুল করে বসে ছিলেন। সেটি হল, মানুষ যতক্ষণ না পরবর্তী উর্ধতর চেতনাস্তরে উন্নীত না হচ্ছে। ততক্ষণ কোন মহাপুরুষের সৎ পরামর্শেই কোন কাজ হবে না। আর এইখানেই শ্রী অরবিন্দের অনন্যতা। তিনিই প্রথম ব্যক্তি। যিনি টের পেয়েছিলেন এই মহা সত্যের। নিম্নতর চেতনা স্তরে অবস্থানরত মানবজাতিকে যতক্ষণ না পর্যন্ত উর্ধতর চেতনাস্তরে টেনে তোলা সম্ভব হবে। ততক্ষণ গৌতম বুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ। কোন মহামানবেরই দেখানো কোন পথই মানুষের কোন কাজে আসবে না।

 

ফলে শ্রী অরবিন্দই প্রথম উপলব্ধি করলেন, যদি কোনভাবে উর্ধতর চেতনা স্তরের আলো ও শক্তিকে নিম্নতর চেতনালোকে নামিয়ে নিয়ে আসা যায়। একমাত্র তবেই সম্ভব হবে বর্তমানে যে নিম্নতর চেতনাস্তরে আমাদের অবস্থান। সেই চেতনাস্তর থেকে উর্ধতর চেতনালোকে মানবজাতিকে টেনে তোলা। না হলে আমাদের মুক্তি নেই। আর নয়তো অপেক্ষা করতে হবে ডারউইনবাদের অভিযো‌জন তত্ত্বের নির্দেশ মতো। বাঁদরের চেতনাস্তর থেকে যে পথে আমরা আজ মানুষের চেতনাস্তরে এসে পৌঁছিয়েছি। একদিন হয়তো সেই পথেরই ক্রমবিকাশে আমরা গিয়ে পৌঁছাবো অতিমানবের চেতনালোকে। কোন একদিন। কবি জীবনানন্দের ভাষায়, “সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;- সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ”। কিন্তু না, শ্রী অরবিন্দ অত দিনের জন্য নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। চেতনালোকের এই একাধিক স্তরের ভিতরে একটি রাজপথ যদি একবার গড়ে তোলা যায়। তাহলে সময়ের হাতে দৈবের উপরে ভরসা করে ডারউইনবাদের মতো তত্ত্বের উপরে নির্ভর করে বসে থাকতে হবে না লক্ষ লক্ষ বছর। তার অনেক আগেই সেই রাজপথ দিয়ে উর্ধতর চেতনাস্তরের আলোকিত শক্তিকে নীচে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে আমাদের এই নিম্নতর চেতনালোকে। আর একবার সেই কাজটি সাফল্যের সাথে করে ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। নিম্নতর চেতনালোকে অবস্থানরত এই মানবজাতিকে তখন উর্ধতর চেতনালোকের শক্তিতেই পরবর্তী উর্ধতর চেতনা স্তরে টেনে তোলা সম্ভব হব। আমূল বদলিয়ে যাবে মানব সভ্যতার রূপ ও বিকাশ। চিন্তা চেতনা, বোধ ও শক্তি। স্বরূপ এবং অন্তরাত্মা।

 

তাই শ্রী অরবিন্দকে চিনতে হলে। আমাদের শুরু করতে হবে ঠিক এইখান থেকেই। ঠিক কি করতে চেয়েছিলেন মানুষটি। তিনি কি সত্যই ব্রিটিশরাজকে মুচলেকা দিয়ে সন্ন্যাস নিয়ে ফরাসী অধিকৃত পণ্ডিচেরী পালিয়ে ছিলেন আত্মরক্ষার তাগিদে? না’কি সমগ্র মানবজাতিকে সীমাহীন অজ্ঞানতা লোভ ঔদ্ধত্য, অপরিমেয় নীচতা ক্রূরতা শঠতা’র এই নিম্নস্তরীয় চেতনালোক থেকে উদ্ধার করতেই যোগ সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত? বিশ্বাস করেছিলন। এক অসম্ভবকে সম্ভব করার আশা! শ্রী অরবিন্দের মৃত্যুর পর এখনো একশ বছরই পার হয়নি। ফলে আপাতদৃষ্টিতে তাঁর পরিকল্পনা এবং সাধনার কোন বাস্তব প্রতিফলন, জগতের কোথাও দেখা না গেলেও। তিনি বা তাঁর মত ও পথ যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ছিল। ব্যর্থ ছিল তাঁর সাধনা। একথা বলার সময় আজও আসেনি। কে বলতে পারে। তিনি যে পথের রূপরেখা দিয়ে গিয়েছেন। সেই পথের দিশাতেই সদূর ভবিষ্যতের মানুষ ও মনীষা সেই পথটিই বাস্তবিক ভাবে তৈরী করে ফেলতে পারবে না? খুলে যাবে না একাধিক চেতনাস্তরের ভিতরে চলাচলের এক উন্মুক্ত দিগন্ত? আমাদের আজকের সীমাবদ্ধ চেতনা শক্তিতে যে সম্ভাবনা অলীক স্বপ্নের মতো লাগছে। বিশেষ করে, ফিরে আসি যদি জীবনানন্দেরই সেই অমোঘ উচ্চারণে,  সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;- সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ”। না, তাই বলছিলাম। শ্রী অরবিন্দকে বিস্মৃত হওয়ার সময় এখনো আসেনি। এখনই বলা সম্ভব নয়। শ্রী অরবিন্দের মত ও পথ ভ্রান্ত। বরং এখনই সময়। আরও বেশি করে তাঁর মত ও পথ নিয়ে নিরন্তর আলচনা ও সাধনা শুরু করার। তাই আজকের দিনটিতে যদি আমরা তাঁকেও স্মরণ করতে পারি। উপকার ছাড়া ক্ষতি হবে না কোন।

 

১৫ই আগস্ট ২০২৩

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত


শিক্ষার বলি

 

স্বল্পশিক্ষিত মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত এমনকি আধাশিক্ষিত দরিদ্র পরিবারেও অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, সন্তান হলেই অভিভাবকদের মাথায় সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার উত্তুঙ্গ আগ্রহ এবং অদম্য একটা জেদ চেপে যায়। যে অভিভাবক নিজের শিক্ষাপর্বে পড়াশুনায় যত বেশি ফাঁকি দিয়ে থাকে। অধিকাংশ সময়েই সেই অভিভাবকই আপন সন্তানের শিক্ষাপর্বে কঠোর অনুশাসন চালিয়ে থাকে। লক্ষ্য একটাই। যেভাবেই হোক সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত করে তুলতে হবে। সে কাজ, গাধা পিটিয় ঘোড়া করা প্রয়াসের মতো মুর্খামি হলেও। এটি একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। এবং এই প্রবণতা সাধারণত স্বল্প শিক্ষিত ও আধাশিক্ষিত অভিভাবকদের ভিতরেই বেশি চোখে পড়ে। এবং বিশেষ করে যে সকল অভিভাবক নিজেদের শিক্ষাপর্বে পড়াশুনায় অতিরিক্ত পরিমাণে ফাঁকি দিয়ে থাকে, তারাই আপন সন্তানের শিক্ষাপর্বে অতিরিক্ত নজরদারী চালিয়ে থাকে কড়া ভাবে।

 

এর ফলে, শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষা একটি ভয়াবহ অবতার রূপে আবির্ভুত হয়। আমাদের বাংলায়, ব্রিটিশ প্রবর্তিত করণিক উৎপাদনের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষার খাতায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তিকেই শিক্ষার মানদণ্ড বলে গণ্য করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এর থেকে বড়ো অশিক্ষা আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু সেই ব্যবস্থাই চলে আসছে শতকের পর শতক ধরে। অন্তত পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর থেকে। ফলে অধিকাংশ অভিভাবকদের লক্ষ্যই থাকে আপন সন্তান কোন বিষয়ে পরীক্ষার খাতায় কত বেশি নম্বর পেল, সেইদিকে। আর নম্বর তোলার এই প্রতিযোগিতাকেই শিক্ষা বলে ভুল করে বসে অধিকাংশ স্বল্পশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত অভিভাবক।

 

একেবারে শৈশব থেকেই এই সকল স্বল্প শিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত অভিভাবকদের সন্তানরা পড়াশুনা বলতেই পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতাকেই জেনে থাকে। প্রায় ঘরে ঘরে, কোন শিক্ষার্থী কত বেশি নম্বর পেল। সেটাই যখন ভালো ছাত্র কিংবা ছাত্রী হওয়ার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তখন গোটা সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে যায়। পরিতাপের বিষয়, সেই নড়বড়ে ভিতের উপরেই বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দী ধরে। অনেকেই ভাবতে পারেন। দাঁড়িয়েই যখন আছে। একেবারে ধ্বসে পড়ে যখন যায়নি। তখন আর এই নিয়ে চিন্তা করারই বা কি আছে? সত্যই তো পরীক্ষার খাতায় কে কত বেশি নম্বর তুলতে পারলো, সেটি না জানা গেলে, কে মেধাবী শিক্ষার্থী বোঝা যাবে কি করে? ঠিক কথা। একমাত্র মধ্যমেধার কিংবা নিম্নমেধার সমাজই ঠিক এই ভাবে ভেবে থাকে। আর বিশেষ করে সেই ধারণা একবার যদি সাগরপারের উন্নত কোন জাতি মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে যায়। তবে তো আর কথাই নেই।

 

এখানে একটা বিস্ময়ও রয়েছে। আমাদের বাংলায় প্রচলিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তক সেই ব্রিটিশ এই দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে সাতদশকের বেশি সময় হয়ে গেল। আমাদের দেশের বহু রথী এবং মহারথীরা দেশ বিদেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার খোলনলচের সাথে খুব ভালো করেই পরিচিত। কিন্তু তারপরেও আমাদের বাংলায় শিক্ষা পরিকাঠামোর কোন বদল ঘটে না। বিস্ময়টুকু এইখানেই। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির কলা এবং কৌশলকেই আমাদের সমাজে শিক্ষা বলে ধরে নেওয়া হয়। এবং মান্যতা দেওয়া হয় সেই তাঁদেরকেই, যাঁরা সেই কলা এবং কৌশলে যত বেশি পরিমাণে দক্ষ। তাঁদেরকেই আমরা মহা শিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত বলে গণ্য করে থাকি। এই যে একটা সার্বিক অশিক্ষা। এবং আগাগোড়া একটা ফাঁকিবাজি। শিক্ষার মতোন একটা প্রাথমিক এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। এই ফাঁকিবাজিই একটি জাতিকে, একটি সমাজকে বিশ্বসভায় সার্বিক ভাবে পিছনের সারিতে কোণঠাসা করে রাখার জন্য যথেষ্ঠ।

 

তাই জাতিসমূহের দরবারে, জাতি হিসাবে বাঙালি আজও পিছিয়ে থাকা একটি অনুন্নত জাতির ছবিই তুলে ধরে। এবং সেই পরিচয়েই প্রথমসারির দেশগুলি বাঙালিকে বিচার করে থাকে। অনেকেই সমস্বরে প্রতিবাদ করে উঠবেন। সেকি কথা। আমাদের রবীন্দ্রনাথ। আমাদের সত্যজিত রায়। বিবেকানন্দ, নেতাজী। আমাদের ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারী। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। এবং মুজিবর রহমান! না, এঁদের কাউকে দিয়েই, কোন ঘটনা দিয়েই একটি জাতির পরিচয় সার্থক হয় না। জাতির পরিচয় সার্থক হয়, বিশ্বসভায় তার দান দিয়ে। অন্যান্য জাতিগুলি আমাদেরকে কতটা অনুসরণ করলো। আমাদের কাছে কতটা এবং ঠিক কিভাবে ঋণী থাকলো। সেই বিচারেই বিশ্বসভায় জাতিসমূহের দরবারে বাঙালির আসল পরিচয়। এখন অব্দি বিশ্বসভায় একটা আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস ছাড়া, বাঙালির আর কোন অবদান নেই।

 

এবং এই না থাকার পিছনের গল্পটাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক পরিকাঠামো, সার্বিক চিত্র। এবং বিশেষ করে জনমানসে শিক্ষা এবং শিক্ষার্জনের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণার এক নিদারুণ ছবিই তুলে ধরে। প্রায় ঘরে ঘরে অর্ধশিক্ষিত স্বল্পশিক্ষিত অভিভাবকদের সন্তানরা দেশের ভ্রান্ত শিক্ষানীতির খপ্পরে পড়ে এবং অভিভাবকদের শিক্ষার অভাবের শিকার হয়ে প্রকৃত শিক্ষার সম্পূর্ণ উল্টো দিকে এগিয়ে চলতে থাকে। দশকের পর দশক ধরে। আর আশ্চর্য্যের কথা, দেশ বিদেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাগুলির সাথে যাঁরা পরিচিত। তাঁরাও নিজের দেশের শিক্ষা পরিকাঠামোকে ভ্রান্ত দিশা থেকে উদ্ধারের কোন চেষ্টাও করেন না। আর এখানেই আসল রাজনীতি। সমাজের উচ্চশিক্ষিত অংশ কখনোই চায় না, দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত শিক্ষার আলোয় শক্তিশালী হয়ে উঠুক। সেটি হলে আর সমাজের বৃহত্তর জনগণের উপরে পুঁজিবাদী শোষণ চালানো সম্ভব হবে না। ফলে পুঁজিবাদী স্বার্থকেই রক্ষা করতে, আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিতরা নিজ দেশের শিক্ষার পরিকাঠামোর অন্ধকার দিকগুলিতে কোনরকম আলো ফেলতে আগ্রহী নন।

 

না ধান ভানতে শিবের গীত নয়। মূল প্রেক্ষাপট পরিস্কার না হলে বোঝা যাবে না, সমাজদেহে প্রায় ঘরে ঘরে কেন এবং কিভাবে, কোন পথে এই বিপুল পরিমাণ অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিত অভিভাবকদের আবির্ভাব ঘটলো। এটি কোন একটি নির্দিষ্ট যুগের অভিশাপ নয়। এইটি শত শত বছরের আবহমান সমাজ রাজনীতি। যার পশ্চাতে রয়েছে অর্থনীতির গল্প। ব্রিটিশ আগমনের পূর্বে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজেও এই রাজনীতিরই অন্য একটি মুখ প্রকট ছিল। সমাজে ব্রাহ্মণ ছাড়া, উচ্চ শ্রেণী ছাড়া কারুর শিক্ষার অধিকার ছিল না। পাছে গোটা সমাজ শিক্ষিত হয়ে গেলে ব্রাহ্মণ সহ সমাজের উচ্চশ্রেণী অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার হারিয়ে ফেলে। সেই ভয়েই সমাজের বৃহত্তর অংশের জন্য শিক্ষার্জনের দরজা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ব্রিটিশ আসাতে কালে কালে সেই দরজা খুলে গেলেও সুরাহা হলো না কোন। সুরাহা যাতে না হয়, সেইভাবেই ব্রিটিশ শাসকেরা এদেশে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন করেছিল। আর সেই কাজে তাদের প্রধান সহায় ছিল, সেই ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চশ্রেণীর সুবিধেভোগী সমাজই। ফলে কালের নিয়মে ব্রিটিশকে চলে যেতে হলেও তাদের এদেশীয় দালাল সমাজ শিক্ষাব্যবস্থাটিকেই সামগ্রিক ভাবে পঙ্গু করে রেখে দেওয়ার পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে ফেলে। পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষার পর পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তিকেই দেশ জুড়ে মানুষ শিক্ষার্জন বলে ধরে নিল। যাতে কেবল মাত্র বেতনভুক একটা সমাজ পুঁজিবাদের সকল স্বার্থকে কায়েম রাখতে পুঁজির দালালি করে যেতে পারে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।

 

এই যে একটি সার্বিক যাঁতাকল। সেই যাঁতাকলেরই সার্থক সৃষ্টি অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্প শিক্ষিত প্রায় নিরেট অভিভাবকশ্রেণী। যাঁরা পুঁজির স্বার্থেই আপন সন্তানদেরকেই প্রকৃতপক্ষে অশিক্ষিত করে রাখার সার্বিক চক্রান্তের শিকার হয়ে হাত মেলাবেন পুঁজিবাদী শক্তির সাথেই। এবং ঘরে ঘরে বলি হতে থাকবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত। ঘরে ঘরে পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক শিক্ষার্থী তৈরী করার কার্যক্রমে চলতে থাকবে। যে কার্যক্রমে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিত হয়ে পরবর্তীতে অভিভাবক অবতারে ধ্বংস করতে পারেন আপন সন্তানের শিক্ষার ভবিষ্যৎ। এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। অপর দিকে সেই যাঁতাকলের ভিতর দিয়েই যাঁরা যত বেশি উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠবেন। তাঁরাই সেই যাঁতাকলটিকে আরও সুদৃঢ় করে তোলার জন্য ঝাঁপাবেন এবং তত বেশি করে শতাব্দীব্যাপি কায়েম করে রাখার রাজনীতি করে যাবেন।

 

১০ই আগস্ট ২০২৩

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত

 

 


কবিতার ভালো মন্দ

 

কবিতার ভালো মন্দ হয় কি? না বোধহয়। কবিতা শুধু কবিতাই। আর কবিতা না হলে তা অকবিতা। স্থান কাল পাত্র এবং জাতি ধর্ম দেশ নিরপেক্ষ ভাবে। চিরকালই কবিতা মুষ্টিমেয় মানুষের চর্চার বিষয়। কবি এবং পাঠক উভয়ই সংখ্যালঘু। আমাদের বাংলায় কবিতার অবস্থানটুকু ঠিক কি রকম? অন্তত প্রচলিত ধারণায়, বাঙালি মাত্রেই প্রায় কবি। শুনতে খটকা লাগলে বরং বলা যেতে পারে, অধিকাংশ বাঙালিই কবিতা প্রেমী। এই যে একটি প্রচলিত ধারণা। বাঙালির কবিতাপ্রেম প্রায় সর্বজনীন। এর বাস্তব সত্যতা ঠিক কতটুকু? এর সঠিক উত্তর দেওয়া নিশ্চয় সহজ কথা নয়। কিন্তু একথাও ঠিক। ‘আপনি কি করেন?’ এরকম প্রশ্নের উত্তরে কোন বাঙালির মুখে যদি শোনা যায়, ‘আমি কবিতা লিখি’। তবে যিনি সেই কথা বলবেন। মানুষের সমাজে তার সম্বন্ধে খুব একটা উঁচু ধারণা হবে কি? আমি কিংবা আপনি, সকলেই কিন্তু এই বিষয়ে একমত। শুধুমাত্র কবিতা লেখা কারুর পরিচিতি হতে পারে না। একটা মানুষ যদি সারাজীবন শুধু কবিতাই লিখে যান, তবে সমাজের চোখে। অন্তত বাংলার সমাজ মানসিকতায় তিনি সোজা ভাষায় ‘নিষ্কর্মা’ বলেই গণ্য হবেন। কিন্তু, নানাবিধ পেশায় দক্ষতার সাথে কর্মজীবন যাপনের সাথে সাথে কবিতার চর্চা করলে। তাঁকে কবি বলে মেনে নিতে আমাদের বাধা নেই। কিন্তু কোন নিষ্কর্মাকে কবি বলে মেনে নিতে বাঙালির অসুবিধে রয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই কবিতার চর্চা, কবিতা লেখা। কারুর পেশা হতে পারে না। শুধুমাত্র কবিতার প্রকাশিত বইয়ের রয়ালটি’র উপর নির্ভর করে একজন কবি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়র উকিল অধ্যাপকের মতো স্বাধীন জীবন যাপন করছেন। এমন ঘটনা বাংলার সমাজে বিরল। এই যে একটি মহাসত্য, এর পিছনের মূল কারণটা কিন্তু আমরাই। দৈন্দিন খরচের খাতায় আমাদের কারুর হিসাবেই কবিতার বই ধরা থাকে না। তাই বলে কি আমরা কবিতার বই কিনি না? কিনি, কদাচিৎ। কিনলেও কয়টি কবিতা পড়ে দেখি? পড়লেও। কতুটুকু সময়ে আমরা কবিতার ভিতরে বসবাস করি? অধিকাংশ বাঙালির কাছেই কবিতার বই কেনা, একটি বাজে খরচ। এবং কবিতার বই পড়া বাজে সময় নষ্ট।

 

আমাদের দৈন্দিন জীবনের ধারে কাছে কোথাও কবিতা নেই। এবং এমন নিদারুণ ভাবেই নেই যে, আমরা জানিই না ‘কবিতা কাকে বলে’। সরাসরি ভাবে তার দুইটি প্রভাব পড়ে সমাজে। এক, কবিতা লেখা কারুর পেশা হতে পারে না। শুধুমাত্র কবিতা লিখে কেউ জীবনধারণ করতে পারে না। আর, কবিতার বদলে ‘অকবিতা’কেই আমরা অধিকাংশ মানুষ কবিতা বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে দিই। এই অবস্থা কেবল মাত্র এই শতকের নয়। এই অবস্থা পূর্ববর্তী সকল শতকেই বিদ্যমান ছিল। ফলে বলা যেতে পারে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কবিতার অবস্থান কোন যুগেই বলার মতো ছিল না। আর ঐতিহাসিক ভাবে সেটাই যদি শেষ সত্য হয়। তবে মানুষের জীবনে কবিতার অপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে পরিতাপ করার কোন মানেও হয় না। এমনটাই তো হওয়ার কথা। কবিতা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নয়। যদি হতো। তবে তা এমন মহার্ঘ্য হতো না। কবিতা চিরকালেই মহার্ঘ্য। এমনকি যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের গর্বের কোন শেষ নেই। সেই বিশ্বকবিও বহু অকবিতা লিখে বসে রয়েছেন। ‘দুই বিঘা জমি’, দেবতার গ্রাস’, বীর পুরুষ’র মতো তাঁর অকবিতাগুলিই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তার কারণ সেই একই। আমরা অধিকাংশ মানুষ জানিই না ‘কবিতা কাকে বলে’। হয়তো বলা ভালো জানতে চাইও না। হয়তো সেই অনীহাতেই আহত হয়ে কবি শঙ্খ ঘোষ বলেই ফেলেছিলেন। ‘বাঙালি স্বঃভাবতই কবিতা বিমুখ’। হ্যাঁ মাত্র কিছুদিন আগে যিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। সেই শঙ্খ ঘোষেরই কথা এইটি। বাঙালির কবিতা প্রেমের মিথকে ভেঙে তছনছ করে দিয়ে, এই অমোঘ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গিয়েছেন, আর কেউ নন। স্বয়ং শঙ্খ ঘোষ। আজীবন কবিতার সাথে বসবাস করে, এই তার বাঙালির কবিতা প্রেম সম্বন্ধে মূল উপলব্ধি।

 

শঙ্খ ঘোষের কন্ঠে এই সত্য যখন উচ্চারিত হচ্ছিল। আশির দশকের সেই সময়। কোথায় ইন্টারনেট। কোথায় সোশ্যাল মিডিয়া। আর কোথায় মুঠোয় মুঠোয় স্মার্ট ফোন! আজকের মতো ভার্চ্যুয়াল ওয়াল জুড়ে অকবিতার এমন সুনামি আছড়িয়ে পড়া শুরু হয়নি তখন। আজকের মতো, কয়েক লাইন মনের কথা, ভাবনার কথা, আবেগের কথা লিখে ফেললেই ওয়ালে ওয়ালে ব্লগে ব্লগে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না তখনো। আজকের মতো ঘরে ঘরে স্বঘোষিত কবির সংক্রমণ ছিল না সেই সময়ে। তখনো পত্রিকার পাতা জুড়ে কবিতার সাথে এমন বন্যার মতো অকবিতার প্লাবন শুরু হয়নি। বহু ঘরেই ডায়রির পাতায় পাতায় অক্ষম হাতের ভালোবাসায় জন্ম হওয়া অকবিতার স্থান হতো নীরবে নিভৃতে। প্রকাশিত কবিতার প্রাঙ্গণ তখন অনেক সমৃদ্ধ ছিল। শুধু ছিল না পাঠকের কাম্য সান্নিধ্য। সেই সান্নিধ্যের অভাবই পীড়িত করেছিল। আমাদের কবিকে। গভীর দুঃখের সাথে। নিদারুণ যন্ত্রণার সাথে। ফলে এইকথা বলার কোন জায়গা নেই। ইন্টারনেট বিপ্লবের সুযোগে আজকের এই অকবিতার সুনামিই বাঙালির কবিতা বিমুখতার কারণ। বাঙালির কবিতা বিমুখতার কারণগুলি কবি শঙ্খ ঘোষ, আশির দশকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া ‘আমাদের কবিতা পড়া’ শীর্ষক তাঁর বক্তৃতায় অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন। যে বক্তৃতাতেই তিনি সেই অমোঘ সত্যকে সকলের সামনে তুলে ধরে ছিলেন, ‘স্বভাবতই বাঙালি কবিতা বিমুখ’।

 

আজকে যাঁরা কবিতা লিখছেন। বলা ভালো তাঁদের কবিতাগুলি হারিয়ে যাচ্ছে অকবিতার সুনামিতে। স্যোশাল মিডিয়া, ব্লগ আর ওয়েবসাইট জুড়ে মূলত অকবিতার প্রাবন। কে কবি আর কে কবি নন। ঘুলিয়ে যাচ্ছে সব সীমারেখা। জনপ্রিয়তাই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়। পরিচয়ও নয়। শ্রেষ্ঠত্বের একটিই মাপকাঠি। সেটি সাহিত্যিক উৎকর্ষতা। বহু সাধনায়, সেই উৎকর্ষতার নাগাল পাওয়া যায়। কাগজ কলম কালি, টাচ ফোন, ডেস্কটপ ল্যাপটপ কোলে টেনে নিয়ে বসে পড়লেই সেই উৎকর্ষতায় পৌঁছানো যায় না। অনেকেরই ধারণা, আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশেই কবিতার জন্ম। অনেকেরই ধারণা মনের কথা ছন্দে তালে প্রকাশ করতে পারলেই কবিতা লেখা হয়ে যায়। অনেকেই ভাবেন দশটা পাঁচটা কবিতা পড়ে নিলেই। আর একটি কবিতা লিখে ফেলা যায়। অনেকেই বিশ্বাস করেন। কবিতা ভালোবাসলেই কবিতা লেখা যায়। অনেকেই বলতে পারেন। কবিতা হোক না হোক। এই যদি প্রকৃত চিত্র হয়। তবে বাঙালি নিশ্চয় কবিতা বিমুখ জাতি নয়। বরং এই চিত্রই প্রমাণ করে বাঙালি মাত্রেই কবিতাপ্রেমী। আর এইখানেই মূল সমস্যা। আমরা ভুলে যাই। কবিতা আর অকবিতার সীমারেখা। আমরা ভুলে যাই কবি আর অকবি’র সীমারেখা। আমরা ভুলে যাই, কবিতার চর্চা আর  কবিতার প্রকাশ নিয়ে নাচানাচি এক কথা নয়। আমরা ভুলে যাই, কবিতা চর্চার থেকে আমরা শতমাইল দূরে থাকতেই ভালোবাসি। আমরা ভুলে যাই, সোশ্যালসাইটে প্রতিদিন কবিতা প্রকাশ করার হাত ধরে আসলে আমরা একটা সামাজিক পরিচিতি গড়ে তোলায় মগ্ন। কবিতাচর্চার ভুবনের সাথে যার কোন রকম সংযোগ নেই। সংযোগ নেই আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের সাথে কবিতাচর্চারও।

 

এইখানে পৌঁছিয়ে কেউ বলতেই পারেন। কবিতা লেখা কবিতা পড়া। কবিতাচর্চার ভুবন সকলের জন্য নয়। খুব সঠিক কথা। সেটাই সামাজিক বাস্তব। এবং সত্য। কিন্তু একথাও সমান সত্য। কবিতাচর্চার ভুবন যত বেশি সংরক্ষিত সীমারেখায় বদ্ধ থাকবে। একটি জাতির সংস্কৃতি কৃষ্টি তত বেশি অপুষ্টির শিকার হবে। ফলে আমরা আসলেই একটা অদ্ভুত পরিস্থিতিতে রয়েছি। একদিকে কবিতাচর্চার ভুবন। সংরক্ষিত সীমারেখায় যা সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে অকবিতার ব্যাপক জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি।

 

একথাও ঠিক। আজকে যাঁরা সত্য অর্থেই কবিতাচর্চার সাধনায় মগ্ন। তাঁরা কোনভাবেই সংগঠিত নন। প্রত্যেকেই এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো আপন সাধনায় মগ্ন। উল্টোদিকে অকবিতার কাণ্ডারীরা অনেক বেশি সংঘবদ্ধ। তাঁরা ক্রমাগত জনপ্রিয়তার একটা নেটওয়ার্ক তৈরী করে চলেছেন। এক একটি গোষ্ঠী। আর নতুন নতুন নেটওয়ার্ক। সেখানে পরস্পর পিঠচাপড়ানি থেকে শুরু করে কখন কাকে কবি থেকে সভাকবি। কবি থেকে মহাকবি হিসাবে তুলে ধরা হবে। সেই রাজনীতির বিস্তৃত প্রসার। এর সাথে আবার, কে শাসকদলের কবি। কে বিরোধী দলের কবি। কারা রাজধানীর কবি। কারা মফঃস্বলের কবি। নানান রকমের হিসাব নিকাশ। নানারকম বিভাজন নিয়েও একটা বৃহত্তর সংঘবদ্ধতা। সকলেরই লক্ষ একটাই। স্পটলাইটের আলোয় থাকতে হবে। ক্যামেরার ফোকাসের বৃত্তে ঘুরতে হবে। তবেই একজন কবি। তবেই না কবিতা লেখার সার্থকতা।

 

না, তাই বলে যাঁরা নিভৃতে নীরবে কবিতাচর্চার সাধনায় মগ্ন। তাঁদেরকেও এমন ভাবেই সংঘবদ্ধ হয়ে অকবিতার সুনামির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দেওয়াল তুলে ধরতে হবে। এমন দাবি করারও বিশেষ কোন অর্থ হয় না। একজন সৃষ্টিশীল সৃজনশীল ব্যক্তি সাংগঠনিক শক্তিরও অধিকারী হবেন। এমন কোন দাবি করাও সঙ্গত নয়। তবুও কিছু কথা তো থেকেই যায়। সাদাকে সাদা। কালো কে কালো বলার মতে সৎসাহসটুকু অন্তত সকলেরই থাকা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা প্রকৃত সাহিত্যপ্রেমী। আপনার চারপাশে কোথায় অকবিতা নিয়ে নাচানাচি বেশি হচ্ছে। সেই বিষয়টুকু অন্তত সর্বসমক্ষে তুলে ধরাটুকু একজন কবির কাছ থেকেই প্রত্যাশিত। সেই সাথেই এইটুকুও প্রত্যাশিত। কবিতাচর্চার ভুবনটুকুকে আপন সাধ্য মতো বিস্তৃত করাই যে এই সময়ের সবচেযে জরুরী লড়াই। সেই চেতনাটুকুর প্রসার ঘটানোও একজন কবির কাছে বেশি করে প্রত্যাশিত। আর এইটুকু ভুমিকা পালন করতে করতেই হয়তো গড়ে উঠতে পারে একটা সঙ্ঘবদ্ধতা। যে সঙ্ঘবদ্ধতার হাত ধরে একে একে সামিল হতে পারেন, আরও যাঁরা কবিতাচর্চার সাধনায় ব্যাপৃত। এবং এই করেই হয়তো তৈরী হয়ে যেতে পারে প্রকৃত কবিতাচর্চার একটা বৃহত্তর প্রাঙ্গণ। এক এবং একাধিক প্রাঙ্গণ। যেখানে শুধুই যে কবিতার চর্চা বিস্তৃত হতে থাকবে তাই নয়। কবিতা আর অকবিতার ভিতরের সীমারেখাটাও আরও বেশি করে সুস্পষ্ট হতে থাকবে বৃহত্তর সমাজদেহে। আর সেইটুকুই এই সময়ে। এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অধিকতর জরুরী। অকবিতার এবং অকবির সংক্রমণের বিরুদ্ধে একমাত্র জরুরী প্রতিষেধক।

 

২৩শে জুলাই ২০২৩

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত


শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির শিকড়

 

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ঘটনায়, রাজ্যের সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। মনে হয় না রাজ্যবাসীর মনে সেই বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ রয়েছে। বুথে বুথে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে যে যাকেই ভোট দিন না কেন। অনুমান, অন্তত এই একটি বিষয়ে রাজ্যবাসীর মনের গহনে কোন বিতর্ক নাই। মুখে আমরা যে যাই বলি না কেন।

 

এদিকে এই শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ভিতরে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। যেমন, অশিক্ষিত এবং অযোগ্য প্রার্থীরা লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে শিক্ষাদানের মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। তার ফলাফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সেটি অনুমান করতে খুব বেশি বিদ্যা শিক্ষার দরকার হয় না। রাজ্যের সব শ্রেণীর মানুষই সেইটুকু অনুমান করতে পারেন। এবং তার গুরুত্বও কম বেশি অনুধাবন করতে সক্ষম।

 

শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির আরও একটি বড় দিক রয়েছে। সরকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার উপরে মানুষের আশা ভরসার শেষটুকুও অন্তর্হিত হয়ে যাওয়া। তাতে কিন্তু একটি মস্ত বড়ো লাভ রয়েছে। লাভ এইটুকুই, পাড়ায় পাড়ায় বেসরকারী স্কুলের রমরমে ব্যাবসা আরও বেশি করে, আরও সর্বাত্মক ভাবে জাঁকিয়ে বসার অনন্ত সম্ভাবনার দরজা খুলে যাওয়া। সেখানে কারা শিক্ষা দেবেন। তাদেরই বা শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শিক্ষাদানের সক্ষমতা কতটুকু। আমরা কিন্তু সেইসব দেখতেও যাবো না। আমরা জলে কুমীর দেখেই ডাঙায় উঠে পড়ে নিশ্চিন্ত! এইসব বেসরকারী স্কুল কলেজগুলিতে যারা লগ্নী করেন। তাদের কিন্তু আরো পৌষমাস।

 

অন্যদিকে, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির আরও একটি বড়ো দিক, সরকারী বিদ্যালয়গুলিতে অসংখ্য শিক্ষক পদ খালি পড়ে থাকা। ছাত্র শিক্ষক অনুপাত দিনে দিনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার ফলে শিক্ষার মান যে দ্রুতহারে নীচের দিকে নামতে থাকবে। সেকথা বলাই বাহুল্য। প্রথমে স্কুল আছে ছাত্রও আছে। কিন্তু শিক্ষক কম। পড়াশুনো নামে মাত্র। দিনে দিনে ছাত্র সংখ্যা কমতে থাকা। এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধের হাত ধরে। একদিন দেখা যাবে স্কুল আছে ছাত্রও নেই শিক্ষকও নেই। ফলে দিনে দিনে একের পর এক সরকারী স্কুল উঠে যাওয়ার ঘটনাকে মানুষও স্বাভাবিক বলে হজম করে নেবে। অনেকেই তলিয়ে দেখতে যাবে না। সরকারী স্তরে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সরকারের হাত গুটিয়ে নেওয়ার প্রয়াসে, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির একটি বড়ো প্রভাব রয়ে যাবে।

 

অন্যদিকে বেসরকারী স্কুল কলেজে পঠন পাঠনের খরচের ক্রমবর্ধমান উর্ধগতিতে সমাজের একটা বড়ো শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ হারাতে বাধ্য হবে। এবং যে সামান্য অংশের ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে উঠবে। তাদের শিক্ষার মান নিয়েও সংশয় থেকে যাবে। এমনিতেই বেসরকারী স্কুল কলেজগুলিতে শিক্ষক শিক্ষিকাদের যোগ্যতার বিষয়ে নিশ্চিন্তে ভরসা রাখা দায়। তার প্রধান কারণ, প্রায় নামমাত্র বেতনে প্রধানত অস্থায়ী ভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে, এই সকল স্কুল কলেজগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। পুঁজির ধর্মই হলো মুনাফার সর্বোচ্চ বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ। ফলে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই বেসরকারী স্কুল কলেজের অর্থ লগ্নীকারীরা যথাসম্ভব কম বেতনে চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী ভাবেই শিক্ষক নিয়োগ করে মুনাফার নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধি ঘটাতে থাকবে। এই ব্যবস্থার আরও একটি দিক রয়েছে। প্রকৃত যোগ্য শিক্ষকরা নিশ্চিত ভাবেই এইরকম কম বেতনের অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পিছনে ছুটবেন না। তাঁরা তাদের যোগ্যতা অনুসারে দেশ বিদেশের সেইসব স্কুল কলেজে পড়াতে ছুটবেন। যেখানে প্রকৃত যোগ্য শিক্ষকের প্রকৃত কদর রয়েছে। ফলে বেসরকারী স্কুল কলেজে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে পড়লেই যে শিক্ষার্থীরা তাদের বিষয়গুলিতে দক্ষ এবং উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠবে। তার কোন নিশ্চয়তা নাই।

 

অর্থাৎ এইটি বেশ পরিস্কার। সমাজ দুইটি শ্রেণীতে ভাগ হয়ে থাকবে। শিক্ষা লাভে সমর্থ্য। আর শিক্ষা লাভে অক্ষম। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বেসরকারীকরণে শিক্ষার মানও একটি সাধারণ স্তরে আটকা পড়ে থাকবে। প্রকৃত শিক্ষিত এবং সুদক্ষ কর্মপ্রার্থীর অভাব দিনে দিনে দ্রুতগতিতে দ্রুতহারে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। যে যে বিষয়েই পড়াশুনা করুক না কেন। কোন বিষয়েই তারা যথেষ্ঠ এবং সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না। এটি কিন্তু এক ভয়াবহ সম্ভাবনা। যদি সত্যিই এই পরিণতি ঘটে। তবে এই রাজ্যের ভবিষ্যত সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

 

রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি সাম্প্রতিক কোন ঘটনা নয়। প্রায় এক দশকের উপরে এই দূর্নীতি চলে আসছে। ফলে এর কু-প্রভাবগুলি দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রাখতে শুরু করে দিয়েছে। একদিকে একশ্রেণীর মানুষের কাছে এটি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। যাদের হাতে অর্থ রয়েছে। কিন্তু বিদ্যাশিক্ষা নাই। তারা রাতারাতি সমাজে শিক্ষক অবতারে আবির্ভুত হয়ে মাসে মাসে সরকারী বেতনের এমন সুযোগ ছাড়তে রাজি নন। তার জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা বাজি রাখতেও পিছপা নন তারা। কিন্তু এঁদের সংখ্যা তো খুব বেশি নয়। একটা রাজ্যের অধিকাংশ অধিবাসীই যদি সরকারী চাকরির মাস মাহিনার লোভে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে সক্ষম হতো। তবে তো কথাই ছিল না। আসলে এই যারা লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে একটি সমাজে শিক্ষক হয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে। সোজা পথে বাঁকা পথে তাদের আয়ের উৎস একাধিক। একেবারে ঘটিবাটি বেচে দিয়ে। গাছতলায় পৌঁছিয়ে কেউ নিশ্চয় দশ কুড়ি লক্ষ টাকায় বাঁকা পথে চাকরি জোগার করছে না। ফলে, যাঁদের একাধিক পথে আয়ের উৎস রয়েছে। মোটামুটি অর্থের অভাব নাই। কিন্তু বিদ্যের অভাব রয়েছে ষোলআনা। তারাই চলমান শিক্ষক দুর্নীতির মূল সহায়ক। এই শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা কম হলেও। একেবারে হাতেগোণাও নয়। সেরকম হলে। এক দশকের বেশি সময় ধরে এমন রমরমিয়ে শিক্ষক দুর্নীতির কারবার চলতে পারতো না কিছুতেই।

 

এবং বাকিদের ভিতরে অনেকেরই চেষ্টা কিভাবে এই দুর্নীতির সুযোগে একটি সরকারী চাকরি বাগিয়ে নেওয়া যায়। অর্থাৎ দশ কুড়ি লক্ষ টাকায় বাঁকা পথে চাকরি কেনার সামর্থ্য না থাকা মনেই কিন্তু এমনও নয় যে, সামগ্রিক এই প্রক্রিয়ার বিরোধী হয়ে ওঠা। সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলেই বাঁকা পথের সুবিধে নেওয়ার মানুষ, এই রাজ্যে কমও নেই। অর্থাৎ একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে। রাজ্যবাসীর একটি বড়ো অংশই দুর্নীতির প্রশ্রয়দাতা। কেউ সরাসরি। কেউ প্রচ্ছন্ন ভাবে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির এইরকম রমরমা কারবারের পেছনে এটাই আসল চালিকা শক্তি। নয়তো, টিভির স্ক্রিনে সরাসরি নেতা থেকে মন্ত্রীদের লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতে দেখার পরেও, একটি রাজ্যের মানুষ সেই সকল দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা মন্ত্রীদেরকেই বুথে বুথে বিপুল ভোটে জয়ী করে কি করে? এবং একবার দুইবার নয়। একাধিকবার। নির্বাচনের পর নির্বাচনে। না, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির শিকড় শুধুমাত্র কয়েকজন হাজতবাসী নেতা মন্ত্রী আমলাদের ভিতরেই সীমাবদ্ধ নয়। এর শিকড় শুধুই শাসকদলের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। এর শিকড় বাঁকাপথের প্রশ্রয়দাতা সকলের ভিতরে ছড়িয়ে রয়েছে।

 

এখন প্রশ্ন। তাহলে ধর্মের কল বাতাসে নড়লো কিভাবে? ধর্মের কল কোনদিনই বাতাসে নড়ে না। মানুষকেই বহু সংগ্রামে, সেই কলকে নাড়াতে হয়। আবার নাড়ালেই যে ধর্ম প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। বিষয়টি আদৌ তেমন একরৈখিকও নয়। বলতে গেলে প্রায় যে কয়কজন কর্মপ্রার্থী পরীক্ষায় যোগ্যতার মান পার করেও, অন্যায় ভাবে চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদেরই সম্মিলিত সংগ্রামে আপাতত হাজতবাসী হতে হয়েছে সেই সব হোমড়া এবং চোমড়াদের। যাদের সরাসরি হাত ছিল এই দুর্নীতিতে। কিন্তু মনে রাখতে হবে। তদন্ত কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। সকলে এখনো ধরাও পড়েনি। মাত্র যে কয়েকজন ধরা পড়েছেন। তাদেরও বিচার প্রক্রিয়া এখনো শুরুই হয়নি। আর ভারতবর্ষের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রীতার কথা স্মরণে রাখলে, ধর্মের কলের এইটুকু নড়াচড়া আদৌ কোনদিন ফলবতী হবে কিনা। সত্যিই বলা মুশকিল। ততদিনে গঙ্গা দিয়ে বহু ঘাটের জল গড়িয়ে যাবে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। এই সাথে একথাও মনে রাখতে হবে। বঞ্চিত প্রার্থীরা অধিকাংশই আজও চাকরির নিয়োগপত্র পাননি। এবং বাঁকা পথে চাকরি পাওয়া প্রতিটি অযোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকারও এখনো চাকরি চলে যায়নি। লড়াই চলছে। লড়ছে দুই পক্ষই। বঞ্চিত যোগ্য প্রার্থীরা। আর শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মূল কারবারীরা। সেই অসম যুদ্ধে শেষমেশ কোন পক্ষ জেতে। কোন পথে জেতে। ধর্মের কলের নড়নচড়ন নির্ধারিত হবে সেই পথেই।

 

২৭শে জুন ২০২৩

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত