জন্মতিথিতে শ্রীঅরবিন্দ
“কারুর পক্ষেই আমার জীবনী লেখা সম্ভব নয় কারণ আমার
জীবনী মানুষের দৃষ্টিগোচরেই অনুপস্থিত” । বক্তা শ্রী অরবিন্দ। শিষ্য দিলীপ কুমার রায়’কে একটি
পত্রে তিনি এই কথা লিখে জানিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ শ্রী অরবিন্দের কথা কেন? আমাদের অনেকেরই
স্মরণে থাকে না। এই পনেরোই আগস্টই অরবিন্দের জন্মতিথি। সংখ্যার হিসাবে অধিকাংশ বাঙালির
কাছেই এই দিনটি শোকের। শুধুমাত্র মাতৃভাষাকে রক্ষার উদ্দেশে বিশ্বের একমাত্র স্বাধীনতা
অর্জনকারী দেশ বাংলাদেশের জাতির পিতার মৃত্যুদিন আজ। তাই এই দিনটি সেদেশে শোকদিবস।
বাঙালির বাকি অংশের কাছে এই দিনটি ভারতের অন্যান্য জাতির মতোই আনন্দের একটি দিন। দিনটি
পরাধীনতার থেকে মুক্তির দিন। দিনটি স্বাধীনতা দিবস। কাঁটাতারের উভয় প্রান্তের বাঙালির
কাছেই তাই এই দিনটি দুইটি ভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে হিসাবে এই দিনটি আপামর
সকল বাঙালিরই গর্বের দিন। অর্থাৎ বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান শ্রী অরবিন্দের জন্মদিন।
সেই হিসেবে প্রায় কোন বাঙালিই এই দিনটি পালন করেন না। না, তার কার্যকারণ নিয়ে আজকের
আলোচনা নয়। অনেকে এও বলতে পারেন। অরবিন্দ কি নিজেকেই কোনদিন বাঙালি বলে অনুভব করতে
পেরেছিলেন? অনেকে এও বলতে পারেন। শ্রী অরবিন্দের মতো মহাপুরুষদের দেশ কাল জাতির পরিচয়ে
বাঁধা সম্ভব নয়। সেই চেষ্টাও অবান্তর। স্বামী বিবেকানন্দ তো নিজ মুখেই বলে গিয়েছিলেন।
তিনি নির্দিষ্ট কোন দেশের, জাতির বন্ধনে আবদ্ধ নন। কথাটা এক অর্থে ঠিকই। মহামানবরা
যে দেশেই জন্মান। যে জাতিরই অংশ হন না কেন। তাঁরা সকল দেশের সকল জাতির। এবং সকল কালের।
এখানেই তাঁদের মহত্ত।
দুঃখের বিষয়। এমনই মহত্তর একজন ব্যক্তি
শ্রী অরবিন্দের জন্মতিথিটি বাঙালি হিসাবে আমরা প্রায় ভুলেই থাকি। একথাও সত্য, শ্রী
অরবিন্দ তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই বাংলার ত্রিসীমানার বাইরেই কাটিয়ে গিয়েছেন। ফলে
বাংলা ও বাঙালির সাথে তাঁর সম্পর্ক গভীর হওয়ার কোন রকম সুযোগ পায়নি। তিনি নিজে কতটুকু
বাঙালি জাতিকে চিনেছিলেন। সেটা তত বড়ো কথা নয়। কারণ তাঁর সাধনা সকল মানবের মুক্তির
জন্য। নির্দিষ্ট ভাবে কোন জাতির জন্য নয়। কিন্তু বাঙালি হিসাবে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই।
তাঁকে কিছুটা অন্তত চেনার চেষ্টা করার দরকার আছে বইকি। ব্যক্তি স্বার্থেই হোক আর সমষ্টির
স্বার্থেই হোক। দুঃখের বিষয়, আমাদের অধিকাংশ বাঙালির কাছেই শ্রী অরবিন্দ, স্কুল পাঠ্য
রচনা বইয়ের ভিতরেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়ে গিয়েছেন আজও। তার বাইরে তাঁকে চেনার বা জানার চেষ্টা
কিন্তু আমরা বিশেষ করিনি। ফলে আমাদের কাছে তিনি প্রথমে ব্রিটিশ রাজের আমলা হওয়ার লক্ষ্যে
স্বচেষ্ট হওয়া আরও পাঁচজন শিক্ষিত পরাধীন ভারতবাসীর মতোন একজন। পরে কলেজের একজন অধ্যাপক,
অধ্যক্ষ। তাও বাংলা থেকে কয়েক হাজার মাইল দুরের এক প্রদেশের। পরের পর্বে তিনি স্বাধীনতা
যু্দ্ধে নিবেদিত প্রাণ বিপ্লবীদের অন্যতম একজন। সব শেষে বাংলা থেকে বহুদূরে সুদূর দাক্ষিণ্যত্যে
চলে যাওয়া একজন যোগীপুরুষ।
অরবিন্দের জীবনের এই চারটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের
ভিতরে সমন্বয় সাধন করে ব্যক্তি অরবিন্দকে জানার চেষ্টা খুব একটা হয়েছে বলে জানা যায়
না। কাজটি কঠিন সন্দেহ নাই। ভাবলে খুবই অবাক হয়ে যেতে হয়। যিনি ব্রিটিশ রাজের আমলা
হওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে বিদ্যাশিক্ষা অর্জন করলেন। তিনি সেই কাজে না গিয়ে অধ্যাপনার
কাজ দিয়ে জীবন শুরু করলেন। সেই তিনিই আবার দেশমাতৃকার শৃঙ্খলমোচনের উদ্দেশ্য মাথায়
নিয়ে বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। নিন্দুকেরা যাই বলুক না কেন। ব্রিটিশের হাতে
ধরা পড়ে তাঁর হঠাৎ যোগী শ্রী অরবিন্দ হওয়া নিয়ে। কিন্তু একথাও সত্য। আলিপুর বোমা মামলা
থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর চিরদিনের মতো বাংলা ত্যাগ করে সুদূর পণ্ডিচেরীতে গিয়ে যোগ
সাধনায় সিদ্ধিলাভের বিষয়টি সাধারণ বাঙালির কাছে আজও বোধগম্য নয়। তাই অনেকের কাছেই তিনি
আজও পলায়নবাদী ব্যর্থ বিপ্লবী হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রয়ে গিয়েছেন। বিপ্লবী না যোগী? কে
আসল আরবিন্দ? এই প্রশ্ন আজ হয়তো অবান্তর। কিন্তু সাধারণ বাঙালির মনে এই প্রশ্নের আজও
কোন মীমাংসা হয়েছে কিনা সন্দেহ।
তবে এই সব পরিচয় ছাড়িয়েও যে অরবিন্দের
আরও একটি সত্য পরিচয় রয়েছে। আমরা অনেকেই প্রায় ভুলতে বসেছি সেই কথা। শ্রী অরবিন্দের
সাহিত্যকীর্তির বিষয়ে আসলে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। জানি না তাঁর রচিত মহাসৃষ্টি
মহাকাব্য সাবিত্রী’র কথাও। না, ক্ষুদ্র একটি লেখায় শ্রী অরবিন্দকে ধরা কোনভাবেই সম্ভব
নয়। সম্ভব নয় সমগ্র অরবিন্দের সম্বন্ধে সামগ্রিক একটি ধারণায় পৌঁছানো। সেই চেষ্টাও
করছি না আমরা। আমরা শুধু বিস্ময়ের সাথে উপলব্ধি করছি। একজন মানুষ। কিন্তু কি বহুমুখী
কর্মকাণ্ডের এক মহাজীবন! যে জীবনের কোন একটি পর্বের সাথে অন্য একটি পর্বকে মেলানো সাধারণ
জীবনবোধের ব্যাপ্তিতে প্রায় অসাধ্য!
কিন্তু স্বয়ং অরবিন্দ! ঠিক কি চেয়েছিলেন
তিনি নিজে? আমাদের মতো সাধারণের বোধগম্য কোন অবস্থায় কি পৌঁছাতে চেয়েছিলেন তিনি? মেলাতে
চেয়েছিলেন নিজের জীবনের বহুবিধ দিগন্তকে কোন এক উচ্চতর মহত্তর স্বরূপে? না’কি এই পার্থিব
জগতের মায়া মোহ লোভ থেকে মুক্তি পাওয়াই ছিল তাঁর সাধনার লক্ষ্য? এই প্রসঙ্গে স্বভাবতঃই
স্মরণে আসে গৌতম বুদ্ধের কথা। অরবিন্দের জন্মের কয়েক হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধও কি
যোগের পথে বোধিলাভ করেননি? আসলে গৌতম বু্দ্ধের ‘নিবার্ণ লাভে’র মূল লক্ষ্য ছিল চারপাশের
এই ইন্দ্রিয়জগত থেকে নিস্কৃতি। তাঁর সাধনা ছিল জীবনলীলার প্রকাশচক্র থেকে অব্যাহতি
পাওয়া। পক্ষান্তরে শ্রী অরবিন্দের লক্ষ্য ছিল ‘জীবনের পূর্ণ রূপান্তর’। অরবিন্দ কোনভাবেই
বাস্তব জীবনকে পরিহার করতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন বস্তু জগতকে অধ্যাত্মের আলোয় আলোকিত
করে তুলতে। তিনি আমাদের জগতের একটি মূলগত রূপান্তর ঘটানোর সাধনায় এগোতে চেয়েছিলেন।
তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। বস্তুজগত একাধিক চেতনাস্তরে বিদ্যমান। নিম্নতম চেতনা
স্তর থেকে উর্ধতম চেতনা স্তরের ভিতরে যাতায়াতের একটা রাজপথ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর প্রাথমিক
লক্ষ্য। কারণ তিনি জানতেন নিম্নতম চেতনা স্তর থেকে ক্রমাগত উর্ধতর চেতনা স্তরে উন্নত
হওয়াই এই বিশ্বজগতের অন্তঃস্বরূপ। তিনি বিশ্বাস করতেন। একাধিক চেতনা স্তরের অবস্থানে।
তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, মানুষের সভ্যতা বর্তমানে এমন একটি নিম্নতর চেতনাস্তরে
বিদ্যমান। যে স্তরে এত অন্ধকার। এত অসুখ। এত অজ্ঞানতা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, হাজার
বার সৎ পরামর্শ দিয়েও মানুষকে এই নিম্নতর চেতনাস্তর থেকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। সম্ভব
নয় বলেই গৌতম বুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ পর্যন্ত কেউই মানবজতিকে উদ্ধার
করতে পারেননি। তাঁরা সকলেই একটি জায়গায় ভুল করে বসে ছিলেন। সেটি হল, মানুষ যতক্ষণ না
পরবর্তী উর্ধতর চেতনাস্তরে উন্নীত না হচ্ছে। ততক্ষণ কোন মহাপুরুষের সৎ পরামর্শেই কোন
কাজ হবে না। আর এইখানেই শ্রী অরবিন্দের অনন্যতা। তিনিই প্রথম ব্যক্তি। যিনি টের পেয়েছিলেন
এই মহা সত্যের। নিম্নতর চেতনা স্তরে অবস্থানরত মানবজাতিকে যতক্ষণ না পর্যন্ত উর্ধতর
চেতনাস্তরে টেনে তোলা সম্ভব হবে। ততক্ষণ গৌতম বুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ।
কোন মহামানবেরই দেখানো কোন পথই মানুষের কোন কাজে আসবে না।
ফলে শ্রী অরবিন্দই প্রথম উপলব্ধি করলেন,
যদি কোনভাবে উর্ধতর চেতনা স্তরের আলো ও শক্তিকে নিম্নতর চেতনালোকে নামিয়ে নিয়ে আসা
যায়। একমাত্র তবেই সম্ভব হবে বর্তমানে যে নিম্নতর চেতনাস্তরে আমাদের অবস্থান। সেই চেতনাস্তর
থেকে উর্ধতর চেতনালোকে মানবজাতিকে টেনে তোলা। না হলে আমাদের মুক্তি নেই। আর নয়তো অপেক্ষা
করতে হবে ডারউইনবাদের অভিযোজন তত্ত্বের নির্দেশ মতো। বাঁদরের চেতনাস্তর থেকে যে পথে
আমরা আজ মানুষের চেতনাস্তরে এসে পৌঁছিয়েছি। একদিন হয়তো সেই পথেরই ক্রমবিকাশে আমরা গিয়ে
পৌঁছাবো অতিমানবের চেতনালোকে। কোন একদিন। কবি জীবনানন্দের ভাষায়, “সুচেতনা, এই পথে
আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;- সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ”। কিন্তু
না, শ্রী অরবিন্দ অত দিনের জন্য নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। তিনি উপলব্ধি
করেছিলেন। চেতনালোকের এই একাধিক স্তরের ভিতরে একটি রাজপথ যদি একবার গড়ে তোলা যায়। তাহলে
সময়ের হাতে দৈবের উপরে ভরসা করে ডারউইনবাদের মতো তত্ত্বের উপরে নির্ভর করে বসে থাকতে
হবে না লক্ষ লক্ষ বছর। তার অনেক আগেই সেই রাজপথ দিয়ে উর্ধতর চেতনাস্তরের আলোকিত শক্তিকে
নীচে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে আমাদের এই নিম্নতর চেতনালোকে। আর একবার সেই কাজটি সাফল্যের
সাথে করে ফেলতে পারলেই কেল্লাফতে। নিম্নতর চেতনালোকে অবস্থানরত এই মানবজাতিকে তখন উর্ধতর
চেতনালোকের শক্তিতেই পরবর্তী উর্ধতর চেতনা স্তরে টেনে তোলা সম্ভব হব। আমূল বদলিয়ে যাবে
মানব সভ্যতার রূপ ও বিকাশ। চিন্তা চেতনা, বোধ ও শক্তি। স্বরূপ এবং অন্তরাত্মা।
তাই শ্রী অরবিন্দকে চিনতে হলে। আমাদের
শুরু করতে হবে ঠিক এইখান থেকেই। ঠিক কি করতে চেয়েছিলেন মানুষটি। তিনি কি সত্যই ব্রিটিশরাজকে
মুচলেকা দিয়ে সন্ন্যাস নিয়ে ফরাসী অধিকৃত পণ্ডিচেরী পালিয়ে ছিলেন আত্মরক্ষার তাগিদে?
না’কি সমগ্র মানবজাতিকে সীমাহীন অজ্ঞানতা লোভ ঔদ্ধত্য, অপরিমেয় নীচতা ক্রূরতা শঠতা’র
এই নিম্নস্তরীয় চেতনালোক থেকে উদ্ধার করতেই যোগ সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন জীবনের শেষ
দিন পর্যন্ত? বিশ্বাস করেছিলন। এক অসম্ভবকে সম্ভব করার আশা! শ্রী অরবিন্দের মৃত্যুর
পর এখনো একশ বছরই পার হয়নি। ফলে আপাতদৃষ্টিতে তাঁর পরিকল্পনা এবং সাধনার কোন বাস্তব
প্রতিফলন, জগতের কোথাও দেখা না গেলেও। তিনি বা তাঁর মত ও পথ যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ছিল।
ব্যর্থ ছিল তাঁর সাধনা। একথা বলার সময় আজও আসেনি। কে বলতে পারে। তিনি যে পথের রূপরেখা
দিয়ে গিয়েছেন। সেই পথের দিশাতেই সদূর ভবিষ্যতের মানুষ ও মনীষা সেই পথটিই বাস্তবিক ভাবে
তৈরী করে ফেলতে পারবে না? খুলে যাবে না একাধিক চেতনাস্তরের ভিতরে চলাচলের এক উন্মুক্ত
দিগন্ত? আমাদের আজকের সীমাবদ্ধ চেতনা শক্তিতে যে সম্ভাবনা অলীক স্বপ্নের মতো লাগছে।
বিশেষ করে, ফিরে আসি যদি জীবনানন্দেরই সেই অমোঘ উচ্চারণে, “সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;- সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর
কাজ”। না, তাই বলছিলাম। শ্রী অরবিন্দকে বিস্মৃত হওয়ার সময় এখনো আসেনি। এখনই বলা সম্ভব
নয়। শ্রী অরবিন্দের মত ও পথ ভ্রান্ত। বরং এখনই সময়। আরও বেশি করে তাঁর মত ও পথ নিয়ে
নিরন্তর আলচনা ও সাধনা শুরু করার। তাই আজকের দিনটিতে যদি আমরা তাঁকেও স্মরণ করতে পারি।
উপকার ছাড়া ক্ষতি হবে না কোন।
১৫ই আগস্ট ২০২৩
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
শিক্ষার বলি
স্বল্পশিক্ষিত মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত
এমনকি আধাশিক্ষিত দরিদ্র পরিবারেও অধিকাংশ সময়েই দেখা যায়, সন্তান হলেই অভিভাবকদের
মাথায় সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করার উত্তুঙ্গ আগ্রহ এবং অদম্য একটা জেদ চেপে যায়। যে অভিভাবক
নিজের শিক্ষাপর্বে পড়াশুনায় যত বেশি ফাঁকি দিয়ে থাকে। অধিকাংশ সময়েই সেই অভিভাবকই আপন
সন্তানের শিক্ষাপর্বে কঠোর অনুশাসন চালিয়ে থাকে। লক্ষ্য একটাই। যেভাবেই হোক সন্তানকে
উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত করে তুলতে হবে। সে কাজ, গাধা পিটিয় ঘোড়া করা প্রয়াসের মতো মুর্খামি
হলেও। এটি একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। এবং এই প্রবণতা সাধারণত স্বল্প শিক্ষিত ও আধাশিক্ষিত
অভিভাবকদের ভিতরেই বেশি চোখে পড়ে। এবং বিশেষ করে যে সকল অভিভাবক নিজেদের শিক্ষাপর্বে
পড়াশুনায় অতিরিক্ত পরিমাণে ফাঁকি দিয়ে থাকে, তারাই আপন সন্তানের শিক্ষাপর্বে অতিরিক্ত
নজরদারী চালিয়ে থাকে কড়া ভাবে।
এর ফলে, শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষা একটি
ভয়াবহ অবতার রূপে আবির্ভুত হয়। আমাদের বাংলায়, ব্রিটিশ প্রবর্তিত করণিক উৎপাদনের শিক্ষা
ব্যবস্থায় পরীক্ষার খাতায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তিকেই শিক্ষার মানদণ্ড বলে গণ্য করা
হয়। প্রকৃতপক্ষে এর থেকে বড়ো অশিক্ষা আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু সেই ব্যবস্থাই চলে
আসছে শতকের পর শতক ধরে। অন্তত পলাশীর প্রান্তরে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর
থেকে। ফলে অধিকাংশ অভিভাবকদের লক্ষ্যই থাকে আপন সন্তান কোন বিষয়ে পরীক্ষার খাতায় কত
বেশি নম্বর পেল, সেইদিকে। আর নম্বর তোলার এই প্রতিযোগিতাকেই শিক্ষা বলে ভুল করে বসে
অধিকাংশ স্বল্পশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত অভিভাবক।
একেবারে শৈশব থেকেই এই সকল স্বল্প শিক্ষিত
এবং অর্ধশিক্ষিত অভিভাবকদের সন্তানরা পড়াশুনা বলতেই পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতাকেই
জেনে থাকে। প্রায় ঘরে ঘরে, কোন শিক্ষার্থী কত বেশি নম্বর পেল। সেটাই যখন ভালো ছাত্র
কিংবা ছাত্রী হওয়ার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তখন গোটা সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতটাই
নড়বড়ে হয়ে যায়। পরিতাপের বিষয়, সেই নড়বড়ে ভিতের উপরেই বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাঠামো
দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দী ধরে। অনেকেই ভাবতে পারেন। দাঁড়িয়েই যখন আছে। একেবারে ধ্বসে
পড়ে যখন যায়নি। তখন আর এই নিয়ে চিন্তা করারই বা কি আছে? সত্যই তো পরীক্ষার খাতায় কে
কত বেশি নম্বর তুলতে পারলো, সেটি না জানা গেলে, কে মেধাবী শিক্ষার্থী বোঝা যাবে কি
করে? ঠিক কথা। একমাত্র মধ্যমেধার কিংবা নিম্নমেধার সমাজই ঠিক এই ভাবে ভেবে থাকে। আর
বিশেষ করে সেই ধারণা একবার যদি সাগরপারের উন্নত কোন জাতি মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে যায়। তবে
তো আর কথাই নেই।
এখানে একটা বিস্ময়ও রয়েছে। আমাদের বাংলায়
প্রচলিত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তক সেই ব্রিটিশ এই দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছে সাতদশকের
বেশি সময় হয়ে গেল। আমাদের দেশের বহু রথী এবং মহারথীরা দেশ বিদেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার
খোলনলচের সাথে খুব ভালো করেই পরিচিত। কিন্তু তারপরেও আমাদের বাংলায় শিক্ষা পরিকাঠামোর
কোন বদল ঘটে না। বিস্ময়টুকু এইখানেই। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তির কলা এবং কৌশলকেই
আমাদের সমাজে শিক্ষা বলে ধরে নেওয়া হয়। এবং মান্যতা দেওয়া হয় সেই তাঁদেরকেই, যাঁরা
সেই কলা এবং কৌশলে যত বেশি পরিমাণে দক্ষ। তাঁদেরকেই আমরা মহা শিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত
বলে গণ্য করে থাকি। এই যে একটা সার্বিক অশিক্ষা। এবং আগাগোড়া একটা ফাঁকিবাজি। শিক্ষার
মতোন একটা প্রাথমিক এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে। এই ফাঁকিবাজিই একটি জাতিকে,
একটি সমাজকে বিশ্বসভায় সার্বিক ভাবে পিছনের সারিতে কোণঠাসা করে রাখার জন্য যথেষ্ঠ।
তাই জাতিসমূহের দরবারে, জাতি হিসাবে বাঙালি
আজও পিছিয়ে থাকা একটি অনুন্নত জাতির ছবিই তুলে ধরে। এবং সেই পরিচয়েই প্রথমসারির দেশগুলি
বাঙালিকে বিচার করে থাকে। অনেকেই সমস্বরে প্রতিবাদ করে উঠবেন। সেকি কথা। আমাদের রবীন্দ্রনাথ।
আমাদের সত্যজিত রায়। বিবেকানন্দ, নেতাজী। আমাদের ভাষা আন্দোলন। একুশে ফেব্রুয়ারী। আমাদের
মুক্তিযুদ্ধ। এবং মুজিবর রহমান! না, এঁদের কাউকে দিয়েই, কোন ঘটনা দিয়েই একটি জাতির
পরিচয় সার্থক হয় না। জাতির পরিচয় সার্থক হয়, বিশ্বসভায় তার দান দিয়ে। অন্যান্য জাতিগুলি
আমাদেরকে কতটা অনুসরণ করলো। আমাদের কাছে কতটা এবং ঠিক কিভাবে ঋণী থাকলো। সেই বিচারেই
বিশ্বসভায় জাতিসমূহের দরবারে বাঙালির আসল পরিচয়। এখন অব্দি বিশ্বসভায় একটা আন্তর্জাতিক
ভাষা দিবস ছাড়া, বাঙালির আর কোন অবদান নেই।
এবং এই না থাকার পিছনের গল্পটাই আমাদের
শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক পরিকাঠামো, সার্বিক চিত্র। এবং বিশেষ করে জনমানসে শিক্ষা এবং
শিক্ষার্জনের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণার এক নিদারুণ ছবিই তুলে ধরে। প্রায় ঘরে ঘরে
অর্ধশিক্ষিত স্বল্পশিক্ষিত অভিভাবকদের সন্তানরা দেশের ভ্রান্ত শিক্ষানীতির খপ্পরে পড়ে
এবং অভিভাবকদের শিক্ষার অভাবের শিকার হয়ে প্রকৃত শিক্ষার সম্পূর্ণ উল্টো দিকে এগিয়ে
চলতে থাকে। দশকের পর দশক ধরে। আর আশ্চর্য্যের কথা, দেশ বিদেশের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাগুলির
সাথে যাঁরা পরিচিত। তাঁরাও নিজের দেশের শিক্ষা পরিকাঠামোকে ভ্রান্ত দিশা থেকে উদ্ধারের
কোন চেষ্টাও করেন না। আর এখানেই আসল রাজনীতি। সমাজের উচ্চশিক্ষিত অংশ কখনোই চায় না,
দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত শিক্ষার আলোয় শক্তিশালী হয়ে উঠুক। সেটি হলে আর সমাজের বৃহত্তর
জনগণের উপরে পুঁজিবাদী শোষণ চালানো সম্ভব হবে না। ফলে পুঁজিবাদী স্বার্থকেই রক্ষা করতে,
আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিতরা নিজ দেশের শিক্ষার পরিকাঠামোর অন্ধকার দিকগুলিতে কোনরকম
আলো ফেলতে আগ্রহী নন।
না ধান ভানতে শিবের গীত নয়। মূল প্রেক্ষাপট
পরিস্কার না হলে বোঝা যাবে না, সমাজদেহে প্রায় ঘরে ঘরে কেন এবং কিভাবে, কোন পথে এই
বিপুল পরিমাণ অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিত অভিভাবকদের আবির্ভাব ঘটলো। এটি কোন একটি
নির্দিষ্ট যুগের অভিশাপ নয়। এইটি শত শত বছরের আবহমান সমাজ রাজনীতি। যার পশ্চাতে রয়েছে
অর্থনীতির গল্প। ব্রিটিশ আগমনের পূর্বে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজেও এই রাজনীতিরই অন্য একটি
মুখ প্রকট ছিল। সমাজে ব্রাহ্মণ ছাড়া, উচ্চ শ্রেণী ছাড়া কারুর শিক্ষার অধিকার ছিল না।
পাছে গোটা সমাজ শিক্ষিত হয়ে গেলে ব্রাহ্মণ সহ সমাজের উচ্চশ্রেণী অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ
করার অধিকার হারিয়ে ফেলে। সেই ভয়েই সমাজের বৃহত্তর অংশের জন্য শিক্ষার্জনের দরজা পুরোপুরি
বন্ধ ছিল। ব্রিটিশ আসাতে কালে কালে সেই দরজা খুলে গেলেও সুরাহা হলো না কোন। সুরাহা
যাতে না হয়, সেইভাবেই ব্রিটিশ শাসকেরা এদেশে আধুনিক শিক্ষার প্রচলন করেছিল। আর সেই
কাজে তাদের প্রধান সহায় ছিল, সেই ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চশ্রেণীর সুবিধেভোগী সমাজই। ফলে
কালের নিয়মে ব্রিটিশকে চলে যেতে হলেও তাদের এদেশীয় দালাল সমাজ শিক্ষাব্যবস্থাটিকেই
সামগ্রিক ভাবে পঙ্গু করে রেখে দেওয়ার পাকাপাকি বন্দোবস্ত করে ফেলে। পরীক্ষার পড়া মুখস্থ
করে পরীক্ষার পর পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তিকেই দেশ জুড়ে মানুষ শিক্ষার্জন বলে
ধরে নিল। যাতে কেবল মাত্র বেতনভুক একটা সমাজ পুঁজিবাদের সকল স্বার্থকে কায়েম রাখতে
পুঁজির দালালি করে যেতে পারে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
এই যে একটি সার্বিক যাঁতাকল। সেই যাঁতাকলেরই
সার্থক সৃষ্টি অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্প শিক্ষিত প্রায় নিরেট অভিভাবকশ্রেণী। যাঁরা পুঁজির
স্বার্থেই আপন সন্তানদেরকেই প্রকৃতপক্ষে অশিক্ষিত করে রাখার সার্বিক চক্রান্তের শিকার
হয়ে হাত মেলাবেন পুঁজিবাদী শক্তির সাথেই। এবং ঘরে ঘরে বলি হতে থাকবে শিক্ষার্থীদের
ভবিষ্যত। ঘরে ঘরে পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করে সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক শিক্ষার্থী তৈরী করার
কার্যক্রমে চলতে থাকবে। যে কার্যক্রমে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই অর্ধশিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিত
হয়ে পরবর্তীতে অভিভাবক অবতারে ধ্বংস করতে পারেন আপন সন্তানের শিক্ষার ভবিষ্যৎ। এবং
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। অপর দিকে সেই যাঁতাকলের ভিতর দিয়েই যাঁরা যত বেশি উচ্চশিক্ষিত
হয়ে উঠবেন। তাঁরাই সেই যাঁতাকলটিকে আরও সুদৃঢ় করে তোলার জন্য ঝাঁপাবেন এবং তত বেশি
করে শতাব্দীব্যাপি কায়েম করে রাখার রাজনীতি করে যাবেন।
১০ই আগস্ট ২০২৩
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
কবিতার ভালো মন্দ
কবিতার ভালো মন্দ হয় কি? না বোধহয়। কবিতা শুধু কবিতাই।
আর কবিতা না হলে তা অকবিতা। স্থান কাল পাত্র এবং জাতি ধর্ম দেশ নিরপেক্ষ ভাবে। চিরকালই
কবিতা মুষ্টিমেয় মানুষের চর্চার বিষয়। কবি এবং পাঠক উভয়ই সংখ্যালঘু। আমাদের বাংলায়
কবিতার অবস্থানটুকু ঠিক কি রকম? অন্তত প্রচলিত ধারণায়, বাঙালি মাত্রেই প্রায় কবি। শুনতে
খটকা লাগলে বরং বলা যেতে পারে, অধিকাংশ বাঙালিই কবিতা প্রেমী। এই যে একটি প্রচলিত ধারণা।
বাঙালির কবিতাপ্রেম প্রায় সর্বজনীন। এর বাস্তব সত্যতা ঠিক কতটুকু? এর সঠিক উত্তর দেওয়া
নিশ্চয় সহজ কথা নয়। কিন্তু একথাও ঠিক। ‘আপনি কি করেন?’ এরকম প্রশ্নের উত্তরে কোন বাঙালির
মুখে যদি শোনা যায়, ‘আমি কবিতা লিখি’। তবে যিনি সেই কথা বলবেন। মানুষের সমাজে তার সম্বন্ধে
খুব একটা উঁচু ধারণা হবে কি? আমি কিংবা আপনি, সকলেই কিন্তু এই বিষয়ে একমত। শুধুমাত্র
কবিতা লেখা কারুর পরিচিতি হতে পারে না। একটা মানুষ যদি সারাজীবন শুধু কবিতাই লিখে যান,
তবে সমাজের চোখে। অন্তত বাংলার সমাজ মানসিকতায় তিনি সোজা ভাষায় ‘নিষ্কর্মা’ বলেই গণ্য
হবেন। কিন্তু, নানাবিধ পেশায় দক্ষতার সাথে কর্মজীবন যাপনের সাথে সাথে কবিতার চর্চা
করলে। তাঁকে কবি বলে মেনে নিতে আমাদের বাধা নেই। কিন্তু কোন নিষ্কর্মাকে কবি বলে মেনে
নিতে বাঙালির অসুবিধে রয়েছে। আর ঠিক এই কারণেই কবিতার চর্চা, কবিতা লেখা। কারুর পেশা
হতে পারে না। শুধুমাত্র কবিতার প্রকাশিত বইয়ের রয়ালটি’র উপর নির্ভর করে একজন কবি ডাক্তার
ইঞ্জিনিয়র উকিল অধ্যাপকের মতো স্বাধীন জীবন যাপন করছেন। এমন ঘটনা বাংলার সমাজে বিরল।
এই যে একটি মহাসত্য, এর পিছনের মূল কারণটা কিন্তু আমরাই। দৈন্দিন খরচের খাতায় আমাদের
কারুর হিসাবেই কবিতার বই ধরা থাকে না। তাই বলে কি আমরা কবিতার বই কিনি না? কিনি, কদাচিৎ।
কিনলেও কয়টি কবিতা পড়ে দেখি? পড়লেও। কতুটুকু সময়ে আমরা কবিতার ভিতরে বসবাস করি? অধিকাংশ
বাঙালির কাছেই কবিতার বই কেনা, একটি বাজে খরচ। এবং কবিতার বই পড়া বাজে সময় নষ্ট।
আমাদের দৈন্দিন জীবনের ধারে কাছে কোথাও কবিতা নেই।
এবং এমন নিদারুণ ভাবেই নেই যে, আমরা জানিই না ‘কবিতা কাকে বলে’। সরাসরি ভাবে তার দুইটি
প্রভাব পড়ে সমাজে। এক, কবিতা লেখা কারুর পেশা হতে পারে না। শুধুমাত্র কবিতা লিখে কেউ
জীবনধারণ করতে পারে না। আর, কবিতার বদলে ‘অকবিতা’কেই আমরা অধিকাংশ মানুষ কবিতা বলে
বিশ্বাস করতে শুরু করে দিই। এই অবস্থা কেবল মাত্র এই শতকের নয়। এই অবস্থা পূর্ববর্তী
সকল শতকেই বিদ্যমান ছিল। ফলে বলা যেতে পারে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কবিতার অবস্থান
কোন যুগেই বলার মতো ছিল না। আর ঐতিহাসিক ভাবে সেটাই যদি শেষ সত্য হয়। তবে মানুষের জীবনে
কবিতার অপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে পরিতাপ করার কোন মানেও হয় না। এমনটাই তো হওয়ার কথা। কবিতা
নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী নয়। যদি হতো। তবে তা এমন মহার্ঘ্য হতো না। কবিতা চিরকালেই
মহার্ঘ্য। এমনকি যে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমাদের গর্বের কোন শেষ নেই। সেই বিশ্বকবিও বহু
অকবিতা লিখে বসে রয়েছেন। ‘দুই বিঘা জমি’, দেবতার গ্রাস’, বীর পুরুষ’র মতো তাঁর অকবিতাগুলিই
সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তার কারণ সেই একই। আমরা অধিকাংশ মানুষ জানিই না ‘কবিতা কাকে বলে’।
হয়তো বলা ভালো জানতে চাইও না। হয়তো সেই অনীহাতেই আহত হয়ে কবি শঙ্খ ঘোষ বলেই ফেলেছিলেন।
‘বাঙালি স্বঃভাবতই কবিতা বিমুখ’। হ্যাঁ মাত্র কিছুদিন আগে যিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
সেই শঙ্খ ঘোষেরই কথা এইটি। বাঙালির কবিতা প্রেমের মিথকে ভেঙে তছনছ করে দিয়ে, এই অমোঘ
সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গিয়েছেন, আর কেউ নন। স্বয়ং শঙ্খ ঘোষ। আজীবন কবিতার সাথে
বসবাস করে, এই তার বাঙালির কবিতা প্রেম সম্বন্ধে মূল উপলব্ধি।
শঙ্খ ঘোষের কন্ঠে এই সত্য যখন উচ্চারিত হচ্ছিল। আশির
দশকের সেই সময়। কোথায় ইন্টারনেট। কোথায় সোশ্যাল মিডিয়া। আর কোথায় মুঠোয় মুঠোয় স্মার্ট
ফোন! আজকের মতো ভার্চ্যুয়াল ওয়াল জুড়ে অকবিতার এমন সুনামি আছড়িয়ে পড়া শুরু হয়নি তখন।
আজকের মতো, কয়েক লাইন মনের কথা, ভাবনার কথা, আবেগের কথা লিখে ফেললেই ওয়ালে ওয়ালে ব্লগে
ব্লগে ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না তখনো। আজকের মতো ঘরে ঘরে স্বঘোষিত কবির সংক্রমণ ছিল
না সেই সময়ে। তখনো পত্রিকার পাতা জুড়ে কবিতার সাথে এমন বন্যার মতো অকবিতার প্লাবন শুরু
হয়নি। বহু ঘরেই ডায়রির পাতায় পাতায় অক্ষম হাতের ভালোবাসায় জন্ম হওয়া অকবিতার স্থান
হতো নীরবে নিভৃতে। প্রকাশিত কবিতার প্রাঙ্গণ তখন অনেক সমৃদ্ধ ছিল। শুধু ছিল না পাঠকের
কাম্য সান্নিধ্য। সেই সান্নিধ্যের অভাবই পীড়িত করেছিল। আমাদের কবিকে। গভীর দুঃখের সাথে।
নিদারুণ যন্ত্রণার সাথে। ফলে এইকথা বলার কোন জায়গা নেই। ইন্টারনেট বিপ্লবের সুযোগে
আজকের এই অকবিতার সুনামিই বাঙালির কবিতা বিমুখতার কারণ। বাঙালির কবিতা বিমুখতার কারণগুলি
কবি শঙ্খ ঘোষ, আশির দশকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া ‘আমাদের কবিতা পড়া’ শীর্ষক তাঁর
বক্তৃতায় অত্যন্ত সুষ্পষ্ট ভাবেই ব্যক্ত করেছিলেন। যে বক্তৃতাতেই তিনি সেই অমোঘ সত্যকে
সকলের সামনে তুলে ধরে ছিলেন, ‘স্বভাবতই বাঙালি কবিতা বিমুখ’।
আজকে যাঁরা কবিতা লিখছেন। বলা ভালো তাঁদের কবিতাগুলি
হারিয়ে যাচ্ছে অকবিতার সুনামিতে। স্যোশাল মিডিয়া, ব্লগ আর ওয়েবসাইট জুড়ে মূলত অকবিতার
প্রাবন। কে কবি আর কে কবি নন। ঘুলিয়ে যাচ্ছে সব সীমারেখা। জনপ্রিয়তাই শ্রেষ্ঠত্বের
মাপকাঠি নয়। পরিচয়ও নয়। শ্রেষ্ঠত্বের একটিই মাপকাঠি। সেটি সাহিত্যিক উৎকর্ষতা। বহু
সাধনায়, সেই উৎকর্ষতার নাগাল পাওয়া যায়। কাগজ কলম কালি, টাচ ফোন, ডেস্কটপ ল্যাপটপ কোলে
টেনে নিয়ে বসে পড়লেই সেই উৎকর্ষতায় পৌঁছানো যায় না। অনেকেরই ধারণা, আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত
প্রকাশেই কবিতার জন্ম। অনেকেরই ধারণা মনের কথা ছন্দে তালে প্রকাশ করতে পারলেই কবিতা
লেখা হয়ে যায়। অনেকেই ভাবেন দশটা পাঁচটা কবিতা পড়ে নিলেই। আর একটি কবিতা লিখে ফেলা
যায়। অনেকেই বিশ্বাস করেন। কবিতা ভালোবাসলেই কবিতা লেখা যায়। অনেকেই বলতে পারেন। কবিতা
হোক না হোক। এই যদি প্রকৃত চিত্র হয়। তবে বাঙালি নিশ্চয় কবিতা বিমুখ জাতি নয়। বরং এই
চিত্রই প্রমাণ করে বাঙালি মাত্রেই কবিতাপ্রেমী। আর এইখানেই মূল সমস্যা। আমরা ভুলে যাই।
কবিতা আর অকবিতার সীমারেখা। আমরা ভুলে যাই কবি আর অকবি’র সীমারেখা। আমরা ভুলে যাই,
কবিতার চর্চা আর কবিতার প্রকাশ নিয়ে নাচানাচি
এক কথা নয়। আমরা ভুলে যাই, কবিতা চর্চার থেকে আমরা শতমাইল দূরে থাকতেই ভালোবাসি। আমরা
ভুলে যাই, সোশ্যালসাইটে প্রতিদিন কবিতা প্রকাশ করার হাত ধরে আসলে আমরা একটা সামাজিক
পরিচিতি গড়ে তোলায় মগ্ন। কবিতাচর্চার ভুবনের সাথে যার কোন রকম সংযোগ নেই। সংযোগ নেই
আমাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের সাথে কবিতাচর্চারও।
এইখানে পৌঁছিয়ে কেউ বলতেই পারেন। কবিতা লেখা কবিতা
পড়া। কবিতাচর্চার ভুবন সকলের জন্য নয়। খুব সঠিক কথা। সেটাই সামাজিক বাস্তব। এবং সত্য।
কিন্তু একথাও সমান সত্য। কবিতাচর্চার ভুবন যত বেশি সংরক্ষিত সীমারেখায় বদ্ধ থাকবে।
একটি জাতির সংস্কৃতি কৃষ্টি তত বেশি অপুষ্টির শিকার হবে। ফলে আমরা আসলেই একটা অদ্ভুত
পরিস্থিতিতে রয়েছি। একদিকে কবিতাচর্চার ভুবন। সংরক্ষিত সীমারেখায় যা সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে
অকবিতার ব্যাপক জনপ্রিয়তার ব্যাপ্তি।
একথাও ঠিক। আজকে যাঁরা সত্য অর্থেই কবিতাচর্চার সাধনায়
মগ্ন। তাঁরা কোনভাবেই সংগঠিত নন। প্রত্যেকেই এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো আপন সাধনায়
মগ্ন। উল্টোদিকে অকবিতার কাণ্ডারীরা অনেক বেশি সংঘবদ্ধ। তাঁরা ক্রমাগত জনপ্রিয়তার একটা
নেটওয়ার্ক তৈরী করে চলেছেন। এক একটি গোষ্ঠী। আর নতুন নতুন নেটওয়ার্ক। সেখানে পরস্পর
পিঠচাপড়ানি থেকে শুরু করে কখন কাকে কবি থেকে সভাকবি। কবি থেকে মহাকবি হিসাবে তুলে ধরা
হবে। সেই রাজনীতির বিস্তৃত প্রসার। এর সাথে আবার, কে শাসকদলের কবি। কে বিরোধী দলের
কবি। কারা রাজধানীর কবি। কারা মফঃস্বলের কবি। নানান রকমের হিসাব নিকাশ। নানারকম বিভাজন
নিয়েও একটা বৃহত্তর সংঘবদ্ধতা। সকলেরই লক্ষ একটাই। স্পটলাইটের আলোয় থাকতে হবে। ক্যামেরার
ফোকাসের বৃত্তে ঘুরতে হবে। তবেই একজন কবি। তবেই না কবিতা লেখার সার্থকতা।
না, তাই বলে যাঁরা নিভৃতে নীরবে কবিতাচর্চার সাধনায়
মগ্ন। তাঁদেরকেও এমন ভাবেই সংঘবদ্ধ হয়ে অকবিতার সুনামির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দেওয়াল
তুলে ধরতে হবে। এমন দাবি করারও বিশেষ কোন অর্থ হয় না। একজন সৃষ্টিশীল সৃজনশীল ব্যক্তি
সাংগঠনিক শক্তিরও অধিকারী হবেন। এমন কোন দাবি করাও সঙ্গত নয়। তবুও কিছু কথা তো থেকেই
যায়। সাদাকে সাদা। কালো কে কালো বলার মতে সৎসাহসটুকু অন্তত সকলেরই থাকা উচিত। বিশেষ
করে যাঁরা প্রকৃত সাহিত্যপ্রেমী। আপনার চারপাশে কোথায় অকবিতা নিয়ে নাচানাচি বেশি হচ্ছে।
সেই বিষয়টুকু অন্তত সর্বসমক্ষে তুলে ধরাটুকু একজন কবির কাছ থেকেই প্রত্যাশিত। সেই সাথেই
এইটুকুও প্রত্যাশিত। কবিতাচর্চার ভুবনটুকুকে আপন সাধ্য মতো বিস্তৃত করাই যে এই সময়ের
সবচেযে জরুরী লড়াই। সেই চেতনাটুকুর প্রসার ঘটানোও একজন কবির কাছে বেশি করে প্রত্যাশিত।
আর এইটুকু ভুমিকা পালন করতে করতেই হয়তো গড়ে উঠতে পারে একটা সঙ্ঘবদ্ধতা। যে সঙ্ঘবদ্ধতার
হাত ধরে একে একে সামিল হতে পারেন, আরও যাঁরা কবিতাচর্চার সাধনায় ব্যাপৃত। এবং এই করেই
হয়তো তৈরী হয়ে যেতে পারে প্রকৃত কবিতাচর্চার একটা বৃহত্তর প্রাঙ্গণ। এক এবং একাধিক
প্রাঙ্গণ। যেখানে শুধুই যে কবিতার চর্চা বিস্তৃত হতে থাকবে তাই নয়। কবিতা আর অকবিতার
ভিতরের সীমারেখাটাও আরও বেশি করে সুস্পষ্ট হতে থাকবে বৃহত্তর সমাজদেহে। আর সেইটুকুই
এই সময়ে। এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অধিকতর জরুরী। অকবিতার এবং অকবির সংক্রমণের বিরুদ্ধে
একমাত্র জরুরী প্রতিষেধক।
২৩শে জুলাই ২০২৩
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির শিকড়
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ঘটনায়, রাজ্যের
সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থা ঠিক কোন পর্যায়ে পৌঁছিয়েছে। মনে হয় না রাজ্যবাসীর
মনে সেই বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ রয়েছে। বুথে বুথে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে যে যাকেই ভোট
দিন না কেন। অনুমান, অন্তত এই একটি বিষয়ে রাজ্যবাসীর মনের গহনে কোন বিতর্ক নাই। মুখে
আমরা যে যাই বলি না কেন।
এদিকে এই শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির ভিতরে
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। যেমন, অশিক্ষিত এবং অযোগ্য প্রার্থীরা লক্ষ লক্ষ
টাকার বিনিময়ে শিক্ষাদানের মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। তার
ফলাফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সেটি অনুমান করতে খুব বেশি বিদ্যা শিক্ষার দরকার হয় না।
রাজ্যের সব শ্রেণীর মানুষই সেইটুকু অনুমান করতে পারেন। এবং তার গুরুত্বও কম বেশি অনুধাবন
করতে সক্ষম।
শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির আরও একটি বড় দিক
রয়েছে। সরকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার উপরে মানুষের আশা ভরসার শেষটুকুও অন্তর্হিত
হয়ে যাওয়া। তাতে কিন্তু একটি মস্ত বড়ো লাভ রয়েছে। লাভ এইটুকুই, পাড়ায় পাড়ায় বেসরকারী
স্কুলের রমরমে ব্যাবসা আরও বেশি করে, আরও সর্বাত্মক ভাবে জাঁকিয়ে বসার অনন্ত সম্ভাবনার
দরজা খুলে যাওয়া। সেখানে কারা শিক্ষা দেবেন। তাদেরই বা শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শিক্ষাদানের
সক্ষমতা কতটুকু। আমরা কিন্তু সেইসব দেখতেও যাবো না। আমরা জলে কুমীর দেখেই ডাঙায় উঠে
পড়ে নিশ্চিন্ত! এইসব বেসরকারী স্কুল কলেজগুলিতে যারা লগ্নী করেন। তাদের কিন্তু আরো
পৌষমাস।
অন্যদিকে, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির আরও
একটি বড়ো দিক, সরকারী বিদ্যালয়গুলিতে অসংখ্য শিক্ষক পদ খালি পড়ে থাকা। ছাত্র শিক্ষক
অনুপাত দিনে দিনে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার ফলে শিক্ষার মান যে দ্রুতহারে
নীচের দিকে নামতে থাকবে। সেকথা বলাই বাহুল্য। প্রথমে স্কুল আছে ছাত্রও আছে। কিন্তু
শিক্ষক কম। পড়াশুনো নামে মাত্র। দিনে দিনে ছাত্র সংখ্যা কমতে থাকা। এবং নতুন শিক্ষক
নিয়োগ বন্ধের হাত ধরে। একদিন দেখা যাবে স্কুল আছে ছাত্রও নেই শিক্ষকও নেই। ফলে দিনে
দিনে একের পর এক সরকারী স্কুল উঠে যাওয়ার ঘটনাকে মানুষও স্বাভাবিক বলে হজম করে নেবে।
অনেকেই তলিয়ে দেখতে যাবে না। সরকারী স্তরে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে সরকারের হাত গুটিয়ে নেওয়ার
প্রয়াসে, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির একটি বড়ো প্রভাব রয়ে যাবে।
অন্যদিকে বেসরকারী স্কুল কলেজে পঠন পাঠনের
খরচের ক্রমবর্ধমান উর্ধগতিতে সমাজের একটা বড়ো শ্রেণীর ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সুযোগ হারাতে
বাধ্য হবে। এবং যে সামান্য অংশের ছেলেমেয়েরা শিক্ষিত হয়ে উঠবে। তাদের শিক্ষার মান নিয়েও
সংশয় থেকে যাবে। এমনিতেই বেসরকারী স্কুল কলেজগুলিতে শিক্ষক শিক্ষিকাদের যোগ্যতার বিষয়ে
নিশ্চিন্তে ভরসা রাখা দায়। তার প্রধান কারণ, প্রায় নামমাত্র বেতনে প্রধানত অস্থায়ী
ভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে, এই সকল স্কুল কলেজগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। পুঁজির ধর্মই
হলো মুনাফার সর্বোচ্চ বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ। ফলে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই বেসরকারী স্কুল
কলেজের অর্থ লগ্নীকারীরা যথাসম্ভব কম বেতনে চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী ভাবেই শিক্ষক নিয়োগ
করে মুনাফার নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধি ঘটাতে থাকবে। এই ব্যবস্থার আরও একটি দিক রয়েছে। প্রকৃত
যোগ্য শিক্ষকরা নিশ্চিত ভাবেই এইরকম কম বেতনের অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পিছনে
ছুটবেন না। তাঁরা তাদের যোগ্যতা অনুসারে দেশ বিদেশের সেইসব স্কুল কলেজে পড়াতে ছুটবেন।
যেখানে প্রকৃত যোগ্য শিক্ষকের প্রকৃত কদর রয়েছে। ফলে বেসরকারী স্কুল কলেজে লক্ষ লক্ষ
টাকা খরচ করে পড়লেই যে শিক্ষার্থীরা তাদের বিষয়গুলিতে দক্ষ এবং উচ্চশিক্ষিত হয়ে উঠবে।
তার কোন নিশ্চয়তা নাই।
অর্থাৎ এইটি বেশ পরিস্কার। সমাজ দুইটি
শ্রেণীতে ভাগ হয়ে থাকবে। শিক্ষা লাভে সমর্থ্য। আর শিক্ষা লাভে অক্ষম। রাজ্যের শিক্ষা
ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বেসরকারীকরণে শিক্ষার মানও একটি সাধারণ স্তরে আটকা পড়ে থাকবে।
প্রকৃত শিক্ষিত এবং সুদক্ষ কর্মপ্রার্থীর অভাব দিনে দিনে দ্রুতগতিতে দ্রুতহারে বৃদ্ধি
পেতে থাকবে। যে যে বিষয়েই পড়াশুনা করুক না কেন। কোন বিষয়েই তারা যথেষ্ঠ এবং সঠিক জ্ঞান
অর্জন করতে পারবে না। এটি কিন্তু এক ভয়াবহ সম্ভাবনা। যদি সত্যিই এই পরিণতি ঘটে। তবে
এই রাজ্যের ভবিষ্যত সম্পূর্ণ অন্ধকারে।
রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি সাম্প্রতিক
কোন ঘটনা নয়। প্রায় এক দশকের উপরে এই দূর্নীতি চলে আসছে। ফলে এর কু-প্রভাবগুলি দীর্ঘস্থায়ী
ছাপ রাখতে শুরু করে দিয়েছে। একদিকে একশ্রেণীর মানুষের কাছে এটি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।
যাদের হাতে অর্থ রয়েছে। কিন্তু বিদ্যাশিক্ষা নাই। তারা রাতারাতি সমাজে শিক্ষক অবতারে
আবির্ভুত হয়ে মাসে মাসে সরকারী বেতনের এমন সুযোগ ছাড়তে রাজি নন। তার জন্য লক্ষ লক্ষ
টাকা বাজি রাখতেও পিছপা নন তারা। কিন্তু এঁদের সংখ্যা তো খুব বেশি নয়। একটা রাজ্যের
অধিকাংশ অধিবাসীই যদি সরকারী চাকরির মাস মাহিনার লোভে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে সক্ষম
হতো। তবে তো কথাই ছিল না। আসলে এই যারা লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে একটি সমাজে শিক্ষক
হয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে। সোজা পথে বাঁকা পথে তাদের আয়ের উৎস একাধিক। একেবারে
ঘটিবাটি বেচে দিয়ে। গাছতলায় পৌঁছিয়ে কেউ নিশ্চয় দশ কুড়ি লক্ষ টাকায় বাঁকা পথে চাকরি
জোগার করছে না। ফলে, যাঁদের একাধিক পথে আয়ের উৎস রয়েছে। মোটামুটি অর্থের অভাব নাই।
কিন্তু বিদ্যের অভাব রয়েছে ষোলআনা। তারাই চলমান শিক্ষক দুর্নীতির মূল সহায়ক। এই শ্রেণীর
মানুষের সংখ্যা কম হলেও। একেবারে হাতেগোণাও নয়। সেরকম হলে। এক দশকের বেশি সময় ধরে এমন
রমরমিয়ে শিক্ষক দুর্নীতির কারবার চলতে পারতো না কিছুতেই।
এবং বাকিদের ভিতরে অনেকেরই চেষ্টা কিভাবে
এই দুর্নীতির সুযোগে একটি সরকারী চাকরি বাগিয়ে নেওয়া যায়। অর্থাৎ দশ কুড়ি লক্ষ টাকায়
বাঁকা পথে চাকরি কেনার সামর্থ্য না থাকা মনেই কিন্তু এমনও নয় যে, সামগ্রিক এই প্রক্রিয়ার
বিরোধী হয়ে ওঠা। সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলেই বাঁকা পথের সুবিধে নেওয়ার মানুষ, এই রাজ্যে
কমও নেই। অর্থাৎ একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে। রাজ্যবাসীর একটি বড়ো অংশই দুর্নীতির
প্রশ্রয়দাতা। কেউ সরাসরি। কেউ প্রচ্ছন্ন ভাবে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির এইরকম রমরমা
কারবারের পেছনে এটাই আসল চালিকা শক্তি। নয়তো, টিভির স্ক্রিনে সরাসরি নেতা থেকে মন্ত্রীদের
লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিতে দেখার পরেও, একটি রাজ্যের মানুষ সেই সকল দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা
মন্ত্রীদেরকেই বুথে বুথে বিপুল ভোটে জয়ী করে কি করে? এবং একবার দুইবার নয়। একাধিকবার।
নির্বাচনের পর নির্বাচনে। না, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির শিকড় শুধুমাত্র কয়েকজন হাজতবাসী
নেতা মন্ত্রী আমলাদের ভিতরেই সীমাবদ্ধ নয়। এর শিকড় শুধুই শাসকদলের মধ্যেও সীমাবদ্ধ
নয়। এর শিকড় বাঁকাপথের প্রশ্রয়দাতা সকলের ভিতরে ছড়িয়ে রয়েছে।
এখন প্রশ্ন। তাহলে ধর্মের কল বাতাসে নড়লো
কিভাবে? ধর্মের কল কোনদিনই বাতাসে নড়ে না। মানুষকেই বহু সংগ্রামে, সেই কলকে নাড়াতে
হয়। আবার নাড়ালেই যে ধর্ম প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। বিষয়টি আদৌ তেমন একরৈখিকও নয়। বলতে গেলে
প্রায় যে কয়কজন কর্মপ্রার্থী পরীক্ষায় যোগ্যতার মান পার করেও, অন্যায় ভাবে চাকরি থেকে
বঞ্চিত হয়েছে। তাদেরই সম্মিলিত সংগ্রামে আপাতত হাজতবাসী হতে হয়েছে সেই সব হোমড়া এবং
চোমড়াদের। যাদের সরাসরি হাত ছিল এই দুর্নীতিতে। কিন্তু মনে রাখতে হবে। তদন্ত কিন্তু
এখনো শেষ হয়নি। সকলে এখনো ধরাও পড়েনি। মাত্র যে কয়েকজন ধরা পড়েছেন। তাদেরও বিচার প্রক্রিয়া
এখনো শুরুই হয়নি। আর ভারতবর্ষের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রীতার কথা স্মরণে রাখলে,
ধর্মের কলের এইটুকু নড়াচড়া আদৌ কোনদিন ফলবতী হবে কিনা। সত্যিই বলা মুশকিল। ততদিনে গঙ্গা
দিয়ে বহু ঘাটের জল গড়িয়ে যাবে। নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। এই সাথে একথাও মনে রাখতে হবে।
বঞ্চিত প্রার্থীরা অধিকাংশই আজও চাকরির নিয়োগপত্র পাননি। এবং বাঁকা পথে চাকরি পাওয়া
প্রতিটি অযোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকারও এখনো চাকরি চলে যায়নি। লড়াই চলছে। লড়ছে দুই পক্ষই।
বঞ্চিত যোগ্য প্রার্থীরা। আর শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মূল কারবারীরা। সেই অসম যুদ্ধে
শেষমেশ কোন পক্ষ জেতে। কোন পথে জেতে। ধর্মের কলের নড়নচড়ন নির্ধারিত হবে সেই পথেই।
২৭শে জুন ২০২৩
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
রবীন্দ্রবলয়ের চক্রব্যূহে
তাহলে কি আমরা রবীন্দ্রনাথেই আটকিয়ে গেলাম শেষমেশ?
তাঁর তিরোধানের পর আট আটটি দশক গত হয়ে গিয়েছে। মাত্র দুই দশক বাদেই তাঁর মৃত্যুও শতবর্ষ
পেরিয়ে যাবে। কিন্তু জাতিগত ভাবে বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথের অপরিহার্য্যতা একই জায়গায়
দাঁড়িয়ে থাকলে। বাঙালির পক্ষে সেটি কতটা সৌভাগ্যের আর কতটা দুর্ভাগ্যের। সেটি কিন্তু
সত্যই ভাবনার বিষয়। প্রতি বছরের মতোই বাঙালির আত্মশ্লাঘার দুইটি দিনের একটি, অর্থাৎ
সেই পঁচিশে বৈশাখে এসেও যদি আমরা এখনও এই বিষয়টি এড়িয়ে যেতেই থাকি। তবে সেটি নেহাতই
দুর্ভাবনার বিষয়। রবীন্দ্রনাথ, বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন। সন্দেহ নাই। সেটি নিয়ে আমরা
প্রজন্মের পর প্রজন্ম গর্ব অনুভব করবো। অনুপ্রাণিত হব। অনুরণন অনুভব করবো। খুব ভালো
কথা। বিশ্বের অন্যান্য জাতিগুলিও যেমন তাঁদেরর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের দ্বারা শতাব্দীর পর
শতাব্দী অনুপ্রাণিত হতে থাকে। সোফোক্লস থেকে দান্তে। সেকসপীয়র থেকে গ্যয়েথে। বোদলেয়র
থেকে পুশকিন। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় একটিই। ইউরোপের এই বিভিন্ন জাতিগুলির জীবনে এঁরা
কিন্তু কেউই আমাদের রবীন্দ্রনাথের মতো অপরিহার্য্য নন। তার প্রধান কারণ। ইউরোপের এই
সকল জাতিগুলি স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিজেদের আইকন স্বরূপ মহাপুরুষদের কাছেই আটকিয়ে থাকে
নি। সেই সেই মহাপুরুষদেরকে পেরিয়ে, বহু ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে আরও অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে।
প্রশ্ন এখানে তাই একটাই। আমরা বাঙালিরা কি আদৌ। আমাদের নয়নের মণি সর্বোত্তম আশ্রয়স্থল
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথকে পেরিয়ে যেতে সমর্থ্য হয়েছি? চেয়েছি কি চাইনি। সেটাও একটা বড়ো
প্রশ্ন হতেই পারে। কিন্তু মূল কথা, পেরেছি কি পারিনি, সেটাই।
অনেকেই ভাবতে পারেন। সফোক্লস থেকে দান্তে।
সেকসপীয়র থেকে গ্যয়েথে। বোদলেয়র থেকে পুশকিন। ইউরোপের জাতিগুলি যতটা সময় পেরিয়ে এসেছে।
রবীন্দ্রনাথ থেকে আমরা ততটা সময় এখনো পেরিয়ে আসতেই পারিনি। মাত্রই আটটি দশক আমরা রবীন্দ্রনাথকে
হারিয়েছি। ফলে ইউরোপের জাতিসমূহের সাথে আমাদের তুলনা করার সময় আসেনি এখনো। অর্থাৎ ঘটনাটি
সময় ঘটিত। এইভাবে ভাবতে পারলে অসুবিধে থাকে না। দিবানিদ্রা না হোক সুখনিদ্রায় কোনরকম
ব্যাঘাত ঘটে না। কিন্তু ঘটনাটি যদি সময় ঘটিত না হয়ে। বাঙালির প্রকৃতি ঘটিত হয়? তাহলে
কিন্তু, ভাবনার বিষয় রয়েছে বইকি। এখানে আরও একদল প্রশ্ন তুলতেই পারেন। সে কি করে হয়।
যেখানে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই, আজ থেকে মোটামুটি এক শতাব্দী আগেই বাংলার কবি সাহিত্যিকদের
একটা প্রধান অংশ রবীন্দ্রনাথের সুদূরপ্রসারী প্রভাব কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রথম থেকেই আদাজল
খেয়ে উঠে পড়ে লেগেছিল? আমাদের স্মরণে থাকবেই তাঁদের কথা। বুদ্ধদেব বসু থেকে জীবনানন্দ।
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত থেকে বিষ্ণু দে। অমিয় চক্রবর্তী থেকে সমর সেন। এঁদের প্রত্যেকেই
কিন্তু সম্পূর্ণ সজ্ঞানে এবং সচেতন প্রয়াসে রবীন্দ্রবলয়ের সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে নিজেদেরকে
মুক্ত করার যজ্ঞে সামিল হয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তার সাক্ষী। খুবই সত্যি কথা।
তাঁদের সেই সচেতন প্রয়াস বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাঁরা কেউই
কি বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রোত্তর এমন কোন প্রভাব ফেলতে সমর্থ হয়েছেন। যাতে
জাতি হিসাবে আমরা রবীন্দ্রনাথকে পেরিয়ে অনেকটাই অগ্রসর হতে পেরেছি? এর একটাই উত্তর।
না। না, আর অন্যরকম উত্তর আমাদের হাতে নেই। বাঙালির সবচেয়ে বড়ো সমস্যা আসলে কিন্তু
সেখানেই। না, আমরা কোনভাবেই রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে, তাঁকে পেরিয়ে আর এগোতে পারিনি। বাঙালি
আটকিয়ে গিয়েছে। তার একমেবদ্বিতীয়ম রবীন্দ্রনাথেই। হোক না মাত্রই আট দশক। অতিক্রান্ত
হয়েছে তাঁর তিরোধানের পর। একথা আজ স্বীকার করার সময় এসেছে। আমরা বাঙালিরা হয়তো প্রায়
কায়মনবাক্যেই আটকিয়ে রয়েছি। আমাদেরই রবীন্দ্রনাথে। যতই আমরা রবীন্দ্রনাথকে পুজো করার
ছলে রবীন্দ্রনাথকেই ভুলে থাকি না কেন। আমরা কিন্তু তাঁকে পেরিয়ে আর এগোতে পারিনি। অন্তত
এখনো। দিবানিদ্রা কিংবা সুখনিদ্রার যতই ব্যাঘাত ঘটুক না কেন। সেকথা যেন আর আমরা অস্বীকার
না করি।
আমাদের এই না পারার পেছনে। একটা ইতিহাস
রয়েছে। কবি’র কথা ধার করে বলাই যায়। আমাদের এই না পারার পিছনে প্রধান কারণ একটাই।
‘তোমার পুজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি’র মতোনই। আমরাও রবীন্দ্রপুজার ছলে ভুলে থেকেছি আমাদেরই
রবীন্দ্রনাথকে। আমরা কেবলই তাঁকে ভাঙিয়ে চলেছি। নিজের নিজের প্রয়োজন থেকে শুরু করে
সার্থ সিদ্ধির কাজে। সেটিকেই আমরা বলতে পারি ‘রবীন্দ্রপুজা’। কিন্তু আমরা রবীন্দ্রনাথকে
অন্তরে ধারণ করতে পারিনি। যদি পারতাম। তাহলে ঠিক পথ খুঁজে পাওয়া যেত। রবীন্দ্রনাথে
আটকিয়ে না থেকে। তঁকে ছাড়িয়ে। তাঁকে পেরিয়ে যাওয়ার মতো দরকারি রসদ। মানুষটি নিজের হাতেই
আমাদেরকে জুগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে সঠিক পুষ্টি অর্জন করতে পারলেই আমরা সেই
পথটুকু খুঁজে পেতাম। যে পথে একটি জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানকেও ছাড়িয়ে আরও অনেকটা দূর
এগিয়ে যেতে পারে। মানুষের সভ্যতার ইতিহাস তার সাক্ষী। বারে বারে। কালে কালে। দেশে দেশে।
এই একই ঘটনা ঘটেছে। শুধুমাত্র এক ইউরোপের দিকে তাকালেই আমাদের বুঝতে অসুবিধে হওয়ার
কথা নয়। কিভাবে ইংরেজরা সেকসপীয়রকেও ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে পেরেছে। সেটা সেকসপীয়রের পুজোর
ছলে তাঁকে ভুলে গিয়ে সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়েছে, তাঁকে ভিতরে ধারণ করে। জাতিগত ভাবে নিজেদের
সমৃদ্ধ করে তুলতে পারার মধ্যে দিয়েই। সেটাকেই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে পারা যায়। আত্মশক্তি।
এই আত্মশক্তি শুধুই ইংরেজরা অর্জন করেনি। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি জাতিই কোন না কোন ভাবে
অর্জন করতে সম্ভব হয়েছে। তাই গ্যয়েথেকে ছাড়িয়ে গিয়েও জার্মানরা ব্রেষটে পৌঁছাতে পেরেছিল।
দান্তেকে ছাড়িয়ে ইতালিয়ানরা মাইকেলাঞ্জেলোতে গিয়ে পৌঁছাতে পেরিছিল। ফরাসী আর রাশিয়ানদের
তো কথাই নেই। বোদলেয়র থেকে পুশকিন। জাতি হিসাবে এঁরা তাদের পেরিয়ে আরও কতদূর অগ্রসর
হয়ে গিয়েছে। সেকথা কম বেশি অনেকেই আমরা ভালো জানি।
একথা ঠিক। রবীন্দ্রনাথকে পেরিয়ে যাওয়া
তো দূরস্থান। বাঙালি এখনো রবীন্দ্রনাথেই আটকিয়ে রয়েছে। জন্মের প্রথম শুভক্ষণ থেকে শ্রাদ্ধবাসরের
অনুষ্ঠান অব্দি। এই মানুষটির কাছে গিয়েই আমাদের হাত পেতে দাঁড়াতে হয় আজও। দেশের স্বাধীনতা
আনার যজ্ঞে আত্মাহুতি দেওয়ার লগ্নে। ফাঁসীকাঠে ঝোলার পূর্বেই হোক। আর হানাদার বৈদেশিক
শত্রুর হাত থেকে নিজেদের দেশকে মুক্ত করার মুক্তিযুদ্ধই হোক। রবীন্দ্রনাথই বাঙালির
শেষ আশ্রয়স্থল। বল এবং ভরসা। শিক্ষিত শ্রেণীর বাঙালির জীবনে যতই দুঃখের তিমির রাত্রি
ঘনিয়ে আসে। ততই এই মানুষটির কাছে গিয়ে নিজের সমস্ত রিক্ততা আর দীনতা নিয়ে দাঁড়াতে হয়।
দুহাত পেতে। ভরসা একটাই। আমাদের সমস্ত রিক্ততা, সমস্ত দীনতায় শুশ্রূষার উপশম এই একজনের
কাছেই রয়েছে। অফুরান। এমনটি আর অন্য কোন বাঙালির ঝুলিতে নেই। হ্যাঁ। দুঃখের বিষয় হলেও।
প্রায় প্রতিটি বাঙালিই সেই সত্য সম্বন্ধে অবহিত। এমনটা মনে করার কোন কারণ নেই। এটি
নতুন কোন কথা। বাঙালি মাত্রেই এই বাস্তব সত্যটুকু সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। ফলে
আমরা চাই বা না চাই। আমাদেরকে অনেকটাই কলুর বলদের মতোই ঘুরপাক খেয়েই যেতে হচ্ছে। একমেবদ্বিডীয়ম
রবীন্দ্রবলয়ের চারপাশেই।
আশা করা যায়, একথা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ
থাকার কথা নয়। একটি জাতি যত দিন, যত কাল একজন মহাপুরুষের প্রভাবের খুঁটিতে বাঁধা থাকবে।
ততদিন সেই জাতি’র মুক্তি নেই। উন্নতি নেই। সেই জাতির জীবনে স্থবিরতা আসতে বাধ্য। অর্থাৎ
জাতির জীবনেই হোক। আর সম্প্রদায়ের জীবনেই হোক। শ্রেষ্ঠ সন্তানকেও ছাড়িয়ে, পেরিয়ে এগিয়ে
যাওয়াই একটি জাতিকে কিংবা সম্প্রদায়কে বাকিদের থেকে অনেক দূর এগিয়ে দেয়। কিন্তু যাঁরা
কোন একজন মহাপুরুষের খুঁটিতে একবার বাঁধা পড়ে যায়। তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়া ছাড়া
আর উপায় কি? বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ যতটা অপরিহার্য্য। তেমনটি আর কেউ নন। কিন্তু
সুখের কথা, ইংরেজদের জীবনে শুধুই সেকসপীয়র, ইটালিয়ানদের জীবনে শুধুই দান্তে, জার্মানদের
জীবনে শুধুই গ্যয়েথে, রাশিয়ানদের জীবনে শুধুই পুশকিন তেমনটি অপরিহার্য্য নন। আমাদের
রবীন্দ্রনাথের মতো। আবার তার মানে এও তো নয়। রবীন্দ্রনাথ একাই এঁদের সকলকে ছাড়িয়ে আরও
বড়ো এমন এক অমোঘ উচ্চতায় উঠে বসে রয়েছেন যে। তাঁর সাথে আর কারুর তুলনা চলে না। যদি
সত্যিই ঠিক তেমনটিই ঘটতো। তবে আমাদের রবীন্দ্রনাথ বিশ্বের প্রতিটি জাতির জীবনেই অপরিহার্য্য
হয়ে উঠতেন। তেমনটি কিন্তু ঘটেনি। ঘটেও না কোনদিন। বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথের এই অমোঘ
অপরিহার্য্যতাই বাঙালির কাল হয়ে উঠছে না তো? অন্তত স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, আমাদের জন্য
যে ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকার রেখে গিয়েছিলেন। তাতে কিন্তু তেমনটি হওয়া উচিত ছিল না। আমরা
বাঙালিরা জাতি হিসাবে, ব্যক্তি হিসাবে নয়। যদি সেই ঐতিহ্য এবং উত্তরাধিকারকে ধারণ করতে
সক্ষম হতাম। তবে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই অমোঘ অপরিহার্য্যতার চক্রব্যূহের ভিতর থেকে
বার হতে পারতাম। দুঃখের বিষয়, বাঙালি জাতি সেই অত্যন্ত দরকারি কাজটি করতে সক্ষম হয়নি।
সে রবীন্দ্রবলয়ের অপরিহার্য্যতার চক্রব্যূহেই আটকা পড়ে গিয়েছে। ব্রিটিশ আমলের চিরস্থায়ী
বন্দোবস্তের যুগে। বেশ কিছু জমিদারদের উত্তরপুরুষ, পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ধন সম্পত্তি
ভাঙিয়ে খেতে খেতে একদিন দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। আমাদের বাঙালি জাতির অবস্থাও কি সেই দিকেই
এগিয়ে চলেছে না? পিতৃপুরুষের রেখে যাওয়া ধনকে কি করে আরও বাড়িয়ে তোলা যায়। সেই চেষ্টা
না করে। কেউ যদি সেই ধন ভাঙিয়েই চালিয়ে যেতে থাকে। তবে রাজার গোলাও একদিন নিঃশেষ হয়ে
যেতে বাধ্য। রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে যা দিয়ে গিয়েছেন। তা নিঃশেষ না হলেও। আমরা যেভাবে
তাঁকে ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে নিজেদেরকে ভুলিয়ে রেখে চলেছি। তাতে আর যাই হোক আমাদের কোন সম্পদবৃদ্ধি
হচ্ছে না নতুন করে। অর্থাৎ আমরা রবীন্দ্রনাথের পর অন্য কোন দিশায় গিয়ে আর পৌঁছাতে পারিনি
আজও। সেই একই রবীন্দ্রবলয়ের ভিতরে বসে বসে আমাদের দিন কেটে যাচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম
ধরে। আমরা বলতে চাইছি। ‘এ বড়ো সুখের সময় নয়’। এ মোটেই কাজের কথা নয়। বাঙালির জাতীয়
জীবনে এ কোন গর্বের বিষয়ও নয়।
বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ গর্বের বিষয়
সন্দেহ নাই। কিন্তু আজ যদি তিনি ফিরে আসতে পারতেন। তবে তাঁর নিজের জাতিকে নিয়ে গর্ব
করার মতো কোন অবলম্বন তাঁর থাকতো কি? এই একটা অতি মূল্যবান প্রশ্ন। ইংরেজদের জীবনে,
ফরাসীদের জীবনে, ইটালিয়ানদের জীবনে, জার্মানদের জীবনে, রাশিয়ানদের জীবনে। আজ যদি সেকসপীয়র
বোদলেয়র দান্তে গ্যয়েথে পুশকিনরা ফিরে আসতে পারতেন। তবে তাঁদের স্ব স্ব জাতিকে নিয়ে
গর্ব করার মতো বহু অবলম্বন তাঁরা খুঁজে পেতেন। পরিতাপের কথা। রবীন্দ্রনাথের কিন্তু
সেই সৌভাগ্য হতো না। বাঙালির জীবনে এমনই তাঁর অপরিহার্যতা যে, বাঙালি তাঁকে ছাড়িয়ে,
তাঁকে পেরিয়ে আর এগিয়ে যেতে পারেনি। পারেনি এমন কোন সম্পদ তৈরী করতে। পারেনি এমন কোন
নতুন ভুবন গড়ে তুলতে। যেখানে জাতি হিসাবে বাঙালির একটা আশ্রয় জোটে। যেমনটা জোটে রবীন্দ্রনাথে।
এরপরেও যদি কেউ মনে করতে চান। ক্ষতি কি। আমাদের তো রবীন্দ্রনাথই রয়েছেন। সেই মহা আশ্রয়
ছেড়ে আমরা অন্য কোন আশ্রয়ে পৌঁছাতে যাবই বা কেন? তবে সত্যিই কিছু বলার নেই। কেউ পিতৃপুরুষের
জমিদারীতে বসে খেতে চাইলে। তাকে যেমন বাঁচানো যায় না। ঠিক তেমনই যতদিন বাঙালি রবীন্দ্রানাথকেই
অপরিহার্য্য জ্ঞানে, তাঁকে ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে চলতে চাইবে। ততদিন বাঙালিকেও কেউ উদ্ধার করতে
পারবে না।
২৫শে বৈশাখ ১৪৩০
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
চ্যাট জিপিটি আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ
চ্যাট জিপিটি আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ
বেশ একটা গালভরা নাম। এ আই। আর্টিফিশিয়াল
ইন্টিলিজেন্স। বাংলা করলে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা! এখন প্রায় হাতের মুঠোয়। প্রায় সারাদিন
যাঁদের কেটে যায় নেট দুনিয়ায়। নেটে ঢুকলেই হাতছানি দিতে থাকে। চ্যাটজিপিটি। গুগুল গ্রাড।
এক একটি সংস্থার এক একটি এ আই। মানুষের চিন্তা ভাবনার কাজগুলি নাকি এখন থেকে এরাই করে
দিতে পারবে। আরও বড়ো কথা। আজকের তারিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে সক্ষমতা আগামী বছর
সেই সক্ষমতা কিন্তু সেখানেই থেমে থাকবে না। বৃদ্ধি পাবে আরও কয়েকগুণ। ফলে প্রকৃতিগত
ভাবে যাঁরা যত অলস। তাঁদের মুখের হাসি তত চওড়া হয়ে উঠতেই পারে। চিন্তা ভাবনার ঝামেলা
নাই। চ্যাট জিপিটিকে নির্দেশ দিলেই হলো। নিমিষেই কাজ সম্পন্ন। হ্যাঁ, ঠিক এই মুহুর্তে
আমরা অনেকেই জানি না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে, আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মের কতটা
সুরাহা হবে। কি ভাবে হবে। অনেকটাই ঝাপসা এখনো। তবে এইটুকু অনুমান করাই যায়, এই কৃত্তিম
বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে মানুষের কর্মসংস্থানের পরিসর অত্যন্ত দ্রুতহারে সংকীর্ণ হতে থাকবে।
অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা। মাত্র চার দশক
পূর্বে, আশির দশকের শুরুতে। রাজ্যজুড়ে, অফিসে কারখানায় কম্পিউটার চালু করার বিরুদ্ধে
তৎকালীন শাসকদলের পরিচালনায় সংগঠিত আন্দোলনের কথা। কিন্তু কালের নিয়মে। সেই আন্দোলন
অঙ্কুরেই বিফলে যায়। সেই একই শাসকদলের আমলেই রাজ্যজুড়ে কম্পিউটার সুনামি আছড়ে পড়েছিল
নব্বই দশকের গোড়াতেই। তারপরের তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লব তো একটা ইতিহাস। ফলে অনেকেই মনে
করতে পারেন বইকি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও তেমন দুঃশ্চিন্তার কোন কারণ থাকার কথা
নয়। বরং প্রযুক্তির এই অভুতপূর্ব উন্নতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও উন্নততর করে তুলবে।
সন্দেহ নাই। তেমনটাই আশা অধিকাংশের।
কিন্তু কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা? তাঁদের অধিকাংশই
সিঁদুরে-মেঘ দেখছেন। কৃত্রিম এই বুদ্ধিমত্তাকে ব্যাপক ভাবে কাজে লাগানো শুরু হয়ে গেলেই।
বহু মানুষ কাজ হারাবেন। শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থানের সুযোগগুলি একে একে কমে
যেতে থাকবে। ফলে দেশে দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। যদিও এখনো স্পষ্ট
নয়। ঠিক কোন ধরণের কাজগুলিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে এক নিমেষেই করে ফেলা
সম্ভব হবে। তবে এটা পরিস্কার। এই সম্ভাবনা ব্যাপক। দিনে দিনে বিভিন্ন ধরণের কাজ এই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব সহজেই করে ফেলতে পারবে। কেননা বর্তমানে এই প্রযুক্তি এক অনন্ত
সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে গতে বাঁধা দপ্তরিক কাজগুলি তো খুব সহজেই
মানুষের বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে করে ফেলা সম্ভব। শোনা যাচ্ছে ভাষান্তরের
কাজগুলি অর্থাৎ এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের কাজ। এই প্রযুক্তিতে অত্যন্ত সহজেই
করে ফেলা যাচ্ছে। নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়ে থাকা অনেকেই অবশ্য ইতিমধ্যেই এর নমুনা
দেখে থাকবেন। চলতি কথায় ব্যাক অফিসের যাবতীয় কাজের জন্য অদূর ভবিষ্যতেই আর কোন মানুষের
প্রয়োজন হবে না। এবং শিক্ষাক্ষেত্র। এমনিতেই অনলাইন ক্লাসের সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ হয়ে
উঠছে শিক্ষার্থীরা। দিনে দিনে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকবে। স্কুল কলেজে গিয়ে
লেখাপড়ার চল একদিন হয়তো উঠেই যাবে। কিন্তু তাতে প্রথমেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন
যাঁরা। তাঁরা হলেন শিক্ষককুল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই ক্লাস পরিচালনা। শিক্ষা দেওয়া।
নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া। এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির মূল্যায়ণ করার কাজগুলি নিমেষের ভিতরেই
সম্পন্ন করে ফেলতে সক্ষম হবে। এবং অনলাইনে। তার জন্য আলাদা করে দালান কোঠা তৈরীর কোন
বিপুল ব্যায়ভার বহন করার দরকার নেই। দরকার নেই শিক্ষক থেকে শিক্ষাকর্মীদের বেতন দিয়ে
পোষারও। ফলে শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে শিক্ষাকর্মীদেরও আর চাকরিতে প্রয়োজন পড়বে না।
মোবাইলে ল্যাপটপে বিভিন্ন কোর্সের অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে ইন্সটল করে নিলেই হবে।
মোটা টাকায় তাতে রেজিস্ট্রশন করে নিয়ে শুরু করতে হবে শিক্ষাদীক্ষা। একেবারে প্রাথমিক
থেকে ধরে বেঁধে। স্কুল কলেজের দালানকোঠায় গিয়ে লেখাপড়ার দিন শেষ হতে চলেছে।
ঠিক সেই রকমই। চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন
অ্যাপ্লিকেশন নামিয়ে। নাম রেজিস্ট্রেশন করে নিতে হবে। শরীরে সমস্যা হলে। সেই অ্যাপেই
জানাতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই তখন চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে। প্রেসকিপশন থেকে শুরু
করে কি কি পরীক্ষা করাতে হবে। সব জানা যাবে বাড়িতে বসেই। ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে নাম
লিখিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষার দরকার নেই। এমনকি, রক্ত পরীক্ষা থেকে যাবতীয় পরীক্ষাই
হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হয়ে যাবে। সেখানেও প্যাথোলজিস্ট রেডিয়োলজিস্টদের দরকার হবে
না আর। শুধু নমুনা সংগ্রহের জন্য যে কয়জনের দরকার। এবং বিভিন্ন যন্ত্র চালানোর মতো
টেকনেশিয়ান। চিকিৎসকের প্রয়োজন পড়বে অত্যন্ত জটিল রোগের ক্ষেত্রে। অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির
ক্ষেত্রে। কে বলতে পারে। শল্যচিকিৎসাও হয়ত একদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিচালনায় সম্পন্ন
হতে শুরু করে দেবে। প্রতিষ্ঠানগুলি অধিকতর মোটা প্যাকেজের দর হাঁকবে। মানুষের হাতে
রুগীর মৃত্যু হতেই পারে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সেই ভুলের আশংকা এবং সম্ভবাবনা
নাই প্রচার করে।
এবং ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরের তো কথাই নেই।
দেখা যাবে অধিকাংশ নকশা তৈরীর কাজ। কলকব্জা উদ্ভাবনের কাজও অনায়াসে করে দিতে পারবে
এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই। হ্যাঁ অবশ্যই কিছু সুদক্ষ টেকনেশিয়ানের দরকার থাকবেই। সঠিক
তথ্যগুলি শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আপলোড করার জন্য। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার
জন্য কোন বড়ো অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়রের দরকার আর নাই পড়তে পারে। সময় খারাপ হতে চলেছে।
ম্যানেজমেন্টের কাজে দক্ষতা অর্জনকারীদের। ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত যাবতীয় কাজই নিমেষের
ভিতরে সুসম্পন্ন হয়ে যাবে। উন্নত মানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। ফলে একটি সংস্থায়
আর গণ্ডায় গণ্ডায় ম্যানেজার পোষার দরকার থাকবে না। একেবারে উচ্চপদে কর্মরত দুই তিনজন
দিয়েই সমগ্র প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজেরিয়াল কাজ চালিয়ে নেওয়া যাবে। শুধু এখনো বোঝা যাচ্ছে
না। উকিল ব্যারিস্টরদের উপরে এর প্রভাব কতটা এবং কিভাবে পড়তে চলেছে। কিন্তু আদালতের
দপ্তরিক সকল কাজই যে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চালিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। সেটি বলাই বাহুল্য।
আর হ্যাঁ। যে দুইটি ক্ষেত্রে মানুষের সরাসরি প্রয়োজন আরও দীর্ঘদিন বজায় থাকবে। সেটি
প্রধানত পুলিশ। এবং মিলিটারি। যদিও আজকের মতো এমন বিপুল সংক্ষক কর্মীর দরকার থাকবে
না। বিশেষ করে নজরদারী করার কাজে মানুষের ভুমিকা অনেক গৌণ হয়ে যাবে। ওদিকে যুদ্ধক্ষেত্রেও
দ্রোন প্রযুক্তির হাত ধরে। আরও একটি বিপ্লবের সামনে আমরা। তবুও পুলিশ এবং মিলিটারিতে
যথার্থ্য মানুষের প্রয়োজন কমতে থাকলেও। অনেকটাই থাকবে। বিশেষ করে কম উন্ননত আধা উন্নত
দেশগুলিতে।
তবে যাঁরা সেকসপীয়রের মতো নাটক লিখতে চান। কিংবা শরৎ সুনীল হুমায়ুন আহমেদের মতো উপন্যাস। কিংবা রবি ঠাকুর কি জীবনানন্দের মতো কবি হয়ে উঠতে চান। তাঁরা বসে বসে গোঁফে তা দিতেই পারেন। শুধু নিজের মর্জি মাফিক নির্দেশ দিলেই হলো। আপনার নিজস্ব ম্যাকবেথ থেকে গীতাঞ্জলী সব কিছুই লিখে দিতে পারবে আপনার জন্য। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর সেই সুখেই যাঁরা আশায় আশায় রয়েছেন। তাঁদেরও কিন্তু মনে রাখা দরকার। একদিন এমন দিনও আসতে চলেছে। যেদিন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই আপনার সমস্ত ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে দেবে। অন্তত, বিশেষজ্ঞদের সেইরকমই আশংকা। আমরা অবশ্য আজকে সুখনিদ্রা দিতেই পারি। হাতের কাছে এমন আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ নাগালের ভিতরে এসে যাওয়াতে। বিশ্বাস করতে শুরুও করে দিতে পারি। দিন আসছে। নো চিন্তা ডু ফুর্তি’র। তবে দিনে দিনে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রযুক্তির কোন চড়ায় গিয়ে ঠেকবে। সেটা একমাত্র টের পাওয়া যাবে অদূর ভবিষ্যতেই। শুধু এখনো বলা যাচ্ছে না। পাড়ার কাউন্সিলর থেকে দেশের প্রধান। চ্যাটজিপিটি দিয়েই এঁদের কাজগুলি করিয়ে নেওয়া যাবে কিনা। গেলে, শিল্পপতিদের আর পায় কে। অনেক অনেক কম খরচেই দেশ চালানোর মেকানিজম তাদের হাতের মুঠোয় তখন। বছর ভর পার্টি ফাণ্ডে কোটি কোটি টাকা ঢেলে নিজেদের বশংবদ নেতামন্ত্রী তৈরীর চাষ করতে হবে না আর। সমস্যা শুধু একটিই। গণতন্ত্রের এই গালভরা হোর্ডিংটা তখন কোন জাদুবলে জনতার চোখের সামনে নাচানো যাবে? না, সে উত্তর বিশেষজ্ঞদেরও আয়ত্তে নেই এখনো। একমাত্র সময়ই বলতে পারবে সময়ের কথা।
৩রা মে ২০২৩
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত
হিজাবে আগুন
হিজাবে আগুন
মাহশা আমিনি। বছর বাইশের তরুনী। উত্তর
পশ্চিম ইরানের শহর, সাকিজের কুর্দিশ বাসিন্দা। কুর্দ একটি জাতি গোষ্ঠী। যাদের নিজেদের
কোন দেশ নেই। প্রধানত তুর্কি ইরাক সিরিয়া ইরানের অংশ জুড়ে এদের বাস। গত ১৩ই সেপটেম্বর
মাহশা তেহেরানের মরালিটি পুলিশের হাতে বন্দি হয়। অভিযোগ, ঠিক মতো করে হিজাব না পরার
মতো দণ্ডনীয় অপরাধ করায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এবং পুলিশ কাস্টডিতেই শারীরীক নিগ্রহের
শিকার হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে তিনদিন কোমায় থেকে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনা এইটুকুই।
সামান্য হিজাব ঠিক মতো করে পরা না পরা নিয়ে একটি মেয়ের জীবন চলে গেল অকালে। এই ঘটনায়
গোটা ইরান উত্তাল হয়ে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের অধিকাংশ ছেলেমেয়ে বাধ্যতামূলক ভাবে হিজাব
পরার বিরুদ্ধে পথে নেমে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছে। শহরে শহরে পথে পথে আগুন জ্বেলে হিজাব
পোড়ানো হচ্ছে। ইরানী তরুণীরা মাথার চুল কেটে ফেলে দিচ্ছে। বোরখা খুলে ফেলে দিয়ে পোাশাক
নিয়ে ধর্মীয় বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করছে। খবরে প্রকাশ এই আন্দোলনের
ফলে জনতা পুলিশের খণ্ডযুদ্ধে এখন অব্দি তিরিশের বেশি কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকারী
হিসাবে যেটি সতেরো।
ইরান থেকে ফিরে আসা যাক ভারতে। গত ডিসেম্বরে
কর্ণাটকের কিছু কলেজে হিজাব পরে ক্লাসে ঢোকা বন্ধ করার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন কলেজের ছাত্রীরা
বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করে। তাদের দাবি ছিল। হিজাব ইউনিফর্মের অংশ নয়। হিজাব তাদের
সংস্কৃতির সাথে জড়িত। তাই হিজাব এবং বোরখা পরে ক্লাস করতে দিতে হবে। বিজেপি শাসিত কর্ণাটকে
এই নিয়ে জোর তরজা শুরু করে দেয় হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলি। তারা হিন্দু ছাত্রছাত্রীদেরকে
দিয়ে হিজাব নিষিদ্ধ করার আন্দোলন শুরু করে দেয়। ফলে গোটা বিষয়টি আর হিজাবেই সীমাবদ্ধ
থাকে না। সেটি রাজনৈতিক রঙ পেয়ে যায়। বিশেষ করে পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের
প্রক্কালে। হিন্দু মুসলিম মেরুকরণের রাজনীতি থেকেই কর্ণাটকের কয়েকটি কলেজে হিজাব নিষিদ্ধ
ঘোষণা করা হয়েছিল। যার রাজনৈতিক ফলাফল পরবর্তী নির্বাচনী ফলাফলেও ফলবতী হয়েছিল।
এবারে যাওয়া যাক বাংলাদেশে। সেখানে গত
দুই এক দশকে হিজাব পরার বিষয়টি একটি ফ্যাশনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। বিষয়টির সাথে
অবশ্যই ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ইসলামী মৌলবাদী চেতনার একটা সংযোগ রয়েছে। যেটি আবার পরিচালিত
হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণে। আর এইসব যোগাযোগের হাত ধরে বিশেষ করে নবীন প্রজন্মের
কাছে গারমেন্ট ব্যাবসায়ীরা হিজাবকে ফ্যাশন সমগ্রী হিসাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ফলস্বরূপ
বাংলাদেশ হিজাব এখন খুবই জনপ্রিয়। অথচ বাঙালি মুসলিম নারীদের কাছে হিজাব পরার বিষয়টি
একান্তই বিদেশী একটি সংস্কৃতি। ধর্মের নামে রাজনীতির স্বার্থে সেটিকে বর্তমানে বাংলাদেশে
সমাজিক সংস্কৃতি বানিয়ে তোলা হয়েছে। অত্যন্ত সাফল্যের সাথে। বাংলায় আবহমান কাল ধরে
হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের রমণীদের ভিতরেই অল্প বিস্তর মাথায় ঘোমটা দেওয়ার প্রচলন
ছিল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে। মাথায় ঘোমটা দেওয়ার ভঙ্গি দুই সম্প্রদায়ের ভিতরে ভিন্ন
থাকলেও। শাড়ির আঁচল দিয়েই সেই কাজটি সম্পন্ন হয়ে যেতো। তার জন্য বাড়তি কাপড়ের দরকার
হতো না কোন কালেই। বাড়তি কাপড়ের দরকার দেখা দিয়েছে প্রধানত হাল আমলেই। সোভিয়েত ইউনিয়নের
পতনের পরে বিশ্বজুড়ে গ্লোবালাইজেশনের যুগেই। যখন ধর্ম আর মৌলবাদ। ব্যাবসা আর রাজনীতি।
টেররিজম আর ‘ওয়ার অন টেররিজম’। প্রতিটি বিষয়ই
পরস্পর পরস্পরের সাথে জড়িয়ে একটি চক্রব্যূহ তৈরী করে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের উপরে সর্বাত্মক
নিয়ন্ত্রণকে কায়েম করতে। ঠিক যে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতেই ইদানিং ফ্রান্সে হিজাব পরা নিষিদ্ধ
ঘোষণা করা হয়েছে।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে হিজাব পরা আর না পরা।
বিষয়টি নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারের বিষয় নেই আর। অনেকেই তর্ক করতে
পারেন। এই বিষয়টি কোন কালেই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা কিংবা মৌলিক অধিকারের বিষয় ছিল
না। এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ধর্ম আর রাজনীতির বিষয়। ঠিক কথা। কিন্তু সেটি কি শুধুই
হিজাবেই সীমাবদ্ধ? ছিল এবং আছে? নিশ্চয় নয়। বাড়ির সদ্য বাল্যবিধবা হওয়া মেয়েটি কবে
নির্জলা উপবাস করবে আর কোন নিয়মে কি কি খাদ্য খেতে পারবে আর পারবে না। সারদিন কত হাত
শাদা থানে নিজের কতখানি শরীর ঢেকে রাখবে কে বা কারা ঠিক করে দিতো সেই সব? আমাদের এই
সোনার বাংলায়? ফলে এটা ঠিক। একটি মেয়ে কোন পোশাক পরবে। আর কোন কোন পোশাক পরতে পারবে
না। সেই স্বাধীনতা এবং অধিকার সেই মেয়েটির হাতে কোনদিনই ছিল না। অতীত ইতিহাসের কথা
বলতে গিয়ে প্রায়শই আমরা বলে থাকি। অতীতের অন্ধকার যুগ পেরিয়ে এসেছি আমরা। সত্যিই কি
তাই?
সত্যিই কি অতীতের অন্ধকার যুগ পেরিয়ে এসেছি
আমরা? জানি। অনেকেই বলে উঠবেন। নারী শিক্ষার বিকাশের কথা। নারীর ক্ষমতায়নের কথা। নারীর
অর্থোপার্জনের সুযোগ এবং সুবিধে বৃদ্ধির কথা। ইত্যাদি ইত্যাদি। নারীর মৌলিক অধিকারগুলির
আইনি স্বীকৃতি লাভের কথা। না, কোন কথাই ভুল নয়। এবং শুনতেও বেশ সুন্দর। কিন্তু সব কথার
গোড়ার কথা নারীমনের স্বাধীন ইচ্ছের কথা। কয়জন নারী সেই কথা প্রাণখুলে বলার সুযোগ এবং
সুবিধে পেয়েছে? কিংবা পাচ্ছে এখনো? একজন নারীই জানে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ কতটা মেপে
মেপে ফেলতে হয়। প্রতিটি কাজের পিছনে সামাজিক অনুমোদনের বিষয়গুলি কতখানি গুরুত্ব দিয়ে
হিসাব করে নিতে হয় প্রাথমিক ভাবে। তারপর তো নারী স্বাধীনতা। অর্থাৎ যে সমাজ নারীকে
যখন যতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছে বা দেবে। একজন নারী খুব বেশি হলে তখন ততটুকুই স্বাধীনতা
ভোগ করতে পারে যদি না তার ঘরের মানুষ প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। এই যে নারী স্বাধীনতার বৃত্ত।
এই বৃত্ত ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশেও যেমন। ভারত বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো অনুন্নত দেশেও
তেমন। ইরানের মতো মৌলবাদী রাষ্ট্রেও ঠিক একই রকম। এই অব্দি পড়ে থাকলে আপনিও হয়তো অনেকেরই
মতো রে রে করে উঠতে পারেন। সেকি কথা? ফ্রান্সের মতো উন্নত এবং তথাকথিত মত প্রকাশের
স্বাধীনতার পীঠস্থানের সাথে ইরানের মতো মৌলবাদী রাষ্ট্রকে এক আসনে বসানো? কিংবা ফ্রান্সের
মতো উন্নত দেশের সাথে পাকিস্তানের মতো একটি পিছিয়ে থাকা অন্ধকার যুগের দেশের তুলনা?
না, তুলনার কথাও হচ্ছে না। খেয়াল করে দেখতে
হবে। ফ্রান্সের মতো তথাকথিত উন্নত দেশে যখন হিজাব নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন কিন্তু
সেটি আসলেই নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ। নারীর মৌলিক অধিকারের উপরে রাষ্ট্রীয় হস্তখেপ।
আবার এর উল্টো পিঠে, ইরানে হিজাব বোরখা বাধ্যতামূলক করাও ঠিক একই রকম ভাবে নারীর ব্যক্তি
স্বাধীনতা হরণ। নারীর মৌলিক অধিকারের উপরে রাষ্ট্রীয় হস্তখেপ। কর্ণাটকের যে ছাত্রীরা
হিজাব পরে ক্লাস করার অধিকারের দাবিতে সরব হয়। আর ইরানের নারীরা যখন হিজাব পুড়িয়ে হিজাব
না পরার অধিকার রক্ষায় সরব হয়। দুটি ক্ষেত্রেই নারীর অবস্থান কিন্তু একই জায়গায়। সে
কি পরবে আর কি পরবে না। সেটি ঠিক করার অধিকারটুকুই তাকে দেওয়া হচ্ছে না। ছিনিয়ে নেওয়া
হচ্ছে তার কাছ থেকেই। এবং ঐতিহাসিক ভাবেই সেই উন্নত ফ্রান্স। মত প্রকাশের স্বাধীনতার
তথাকথিত পীঠস্থান! সেখানেও একজন নারীর হিজাব পরার মৌলিক অধিকারটুকুই কেড়ে নেওয়া হয়েছে
সম্প্রতি। না, সেই নিয়ে আবিশ্ব অবশ্য কোন কোলাহল শোনা যায়নি। শোনা যায়নি, কারণ। পাশ্চাত্য
মিডিয়া যে পক্ষের নিয়ন্ত্রাণাধীন। সেই পক্ষ হিজাবের বিরুদ্ধে। সোজা হিসাব। আর ঠিক সেই
কারণেই ইরানের হিজাব পোড়ানো আন্দোলন নিয়ে কোলাহল তো হবেই। এখন অনেকেই ইরানের হিজাব
বিরোধী আন্দোলনে মারা যাওয়া সাঁইত্রিশ জনের জীবনের মূল্যের কথা তুলে ধরে বর্তমান কোলাহলের
স্বপক্ষে যুক্তি সাজাতে চাইবেন। কিন্তু তাঁদেরকেই যদি প্রশ্ন করা যায়। প্রতিবছর ইজরায়েলী
রকেট হানায় যে হাজার হাজার প্যালেস্টাইনীরা মারা যায়। তাঁদের মৃত্যু নিয়ে এমন কোলাহল
হয় না কেন? না, সে কথার জবাবদিহির দায় তো আমাদের নাই। সকলেই তখন হাত ধুয়ে নিতে ব্যস্ত।
আসল বিষয়টি একটি আন্দোলনে কয়জন মারা গেলেন। সেটি নয়। বিষয়টি আন্দোলনের কারণ নিয়ে। কেন
আন্দোলন? আন্দোলন হিজাব পরা কিংবা না পরা নিয়ে নয়। কর্ণাটকের ছাত্রীরা হিজাব পরার অধিকার
নিয়ে আন্দোলন করছিলো। ইরানের নারীরা হিজাব না পরার অধিকার নিয়ে আন্দোলন করছে। হিজাব
এখানে মূল বিষয়ই নয়। মূল বিষয়। নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকার। সেই স্বাধীনতা
এবং অধিকার তাঁর পোশাক নির্বাচন থেকে পেশা নির্বাচন। জীবনযাপনের ধরণ নির্বাচন থেকে
জীবনসাথী নির্বাচন। স্বপ্ন সাধ সাধনার চর্চা থেকে স্বঅভিভাবকত্বের চর্চা। প্রতিটি বিষয়জুড়ে
পরিব্যাপ্ত। আর সেই পরিব্যপ্তিতে ফ্রান্স হোক কিংবা ইরান। ভারত হোক কিংবা বাংলাদেশ।
বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কোন অধিকারই কারুর থাকার কথা নয়। আমি জানি না। কয়জন মানুষ এই সত্যভুমিতে
দাঁড়িয়ে সমগ্র বিষয়গুলি বিচার করার হিম্মত রাখেন। সত্যিই আমার জানা নেই।
ধর্মীয় অনুশাসন থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক
বিধিনিষেধ। পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে শুরু করে সমাজিক সংস্কৃতি। সাংবিধানিক রীতিনীতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আইনকানুন। সবকিছুই
পুরুষতন্ত্র নির্মিত। এবং পরিচালিত। সেখানে নারীর কোন স্থানই নেই। কোন কালেই ছিল না।
কোন কালেই নেই। ফলে দেশে দেশে। সমাজে সমাজে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে। এই পুরুষতন্ত্রই
ধর্ম থেকে সম্প্রদায়। পরিবার থেকে সমাজ। সংবিধান থেকে রাষ্ট্র। নারীকে নিজেদের স্বার্থে
ব্যবহার এবং ভোগ করার লক্ষ্যেই তার উপরে যাবতীয় বিধিনিষেধ আরোপ করে এসেছে। এবং দেশে
দেশে। পরিবারে পরিবারে। সমাজে সমাজে। কালে কালে। নারী যখন যতটুকু স্বাধীনতা লাভ করেছে।
নারী যতটুকু অধিকার লাভ করেছে। সবটাই সেই পুরুষতন্ত্রেরই বদান্যতায়। মনে রাখতে হবে
বদান্যতাও স্বার্থেরই আর এক পিঠ। ফলে আজকের নারী স্বাধীনতাকে নারীর লড়াই করে প্রাপ্ত
অর্জন বলে মনে করা এবং বিশ্বাস করার ভিতরে যে শান্তি। সেটি মুর্খের শান্তি। না, নারীর
ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারগুলির কোনটিই নারীর নিয়ন্ত্রণে নেই আজকেও। বিশ্বের
কোন দেশেই নেই। থাকলে আর যাই হোক ব্যক্তিস্বাধীনতার তথাকথিত পীঠস্থান। সেই ফ্রান্সেই
হিজাব নিষিদ্ধ করা হতো না কোনভাবেই। উল্টে হিজাব পরার অধিকার এবং হিজাব না পরার অধিকার
রক্ষার আইন প্রণয়ন করা হতো। সেটিই ছিল নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা এবং মৌলিক অধিকার
রক্ষার একমাত্র মাপকাঠি।
না, ঠিক এই ভাবে। এই দিক দিয়ে নারীর ব্যক্তি
স্বাধীনতা। নারীর মৌলিক অধিকারের বিষয়টি বা বিষয়গুলি আমরা প্রায় কেউই বিচার করে দেখি
না। তার একটি বড়ো কারণ রয়েছে। নারী এবং পুরুষ। প্রায় সকলেই সেই একই পুরুষতন্ত্রের যাঁতাকলে
পিষ্ট হয়ে একটি সমাজিক পদার্থে পরিণত হয়। ফলে, কী নারী। কী পুরুষ। দেখার দৃষ্টিভঙ্গির
ভিতরে বিশেষ কোন পার্থক্য থাকে না। এই যে এক সমাজিক পদার্থে পরিণত হয়ে যাওয়া। এটাই
মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড়ো আভিশাপ। আমরা যতটা না সমাজিক জীব। তার থেকে অনেক বেশি সামজিক
পদার্থ। ফলে আমাদের নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র দেখার দৃষ্টি গড়ে ওঠে না। স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন
চেতনার বিকাশ হয় না। আমরা সেটাই দেখি। স্থান কাল পাত্র ভেদে। আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য।
আমাদের সাম্প্রদায়িক চরিত্র। আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি এবং আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধান
যতটুকু দেখার অনুমোদন দেয়। এবং যেভাবে দেখার অনুমোদন দেয়। পারিবারে পারিবারে। সম্প্রদায়ে
সম্প্রদায়ে। সমাজে সামজে। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে। দেখার এবং ভাবনার ধরণের ভিতরে যত পার্থক্যই
থাক। সেটি ভঙ্গিমার পার্থক্য। চরিত্রের পার্থক্য নয়। গোটাটাই বিশ্বজুড়ে এবং কালপ্রবাহ
জুড়ে নিয়ন্ত্রীত হচ্ছে সেই এক পুরুষতন্ত্রের হাতে। ফলে হিজাব নিষিদ্ধ করা। হিজাব বাধ্যতামূলক
করা। একই অপরাধের দুই মুখ। অপরাধটা নারীকে পুরুষতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণাধীন করে রেখে দেওয়ার।
হিজাব পরতে চাওয়া। হিজাব না পরতে চেয়ে হিজাব পোড়ানো। একই আন্দোলনের দুই ভিন্ন চিত্র
মাত্র। আন্দোলনটা নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের।
নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা। নারীর মৌলিক
অধিকারগুলি। রক্ষার লড়াইটা কিন্তু নারীরকেই করতে হবে। সেই লড়াই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে
লড়াই। পুরুষতন্ত্রকে শিরোধার্য্য করে নিলে। কোনদিনও সেই লড়াই শুরু করা যাবে না। এবং
লড়াই শুরু করতে হবে ঘরের ভিতর থেকেই। এই লড়াইটা একজন মায়ের পক্ষে সবচেয়ে জরুরী। নারীর
গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানের ভিতরে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বীজমন্ত্রকে অঙ্কুরিত
করা দরকার সকলের আগে। স্থান কাল পাত্র ভেদে তার ধরণ ভিন্ন হতেই পারে। হবেও। কিন্তু
চরিত্রটা হবে এক এবং অভিন্ন। নিজের ছেলে এবং মেয়ের চেতনায় পুরুষতন্ত্রের ইতিহাস সম্বন্ধে
একটা স্পষ্ট ধারণা গড়ে দেওয়া দরকার। দরকার সেই চেতনার বিকাশে ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং
মৌলিক অধিকারের ধারণাগুলিকেও সবল করে তোলা। এই একটি কাজ যদি ঘরে ঘরে মায়েরা সংঘটিত
করতে শুরু করে। তার একটা সর্বাত্মক ফল সমাজের বুকে আছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। না, দুই এক প্রজন্মে
হয়তো কোন কিছুই বদলাবে না। সমাজ বিবর্তন অত্যন্ত ধীর গতিতে সম্পন্ন হয়। কিন্তু হবে
একদিন। লক্ষ্য যদি অবিচল থাকে। বিষয়টি শুধুমাত্র নারীর পোশাক নিয়ে নয়। পোশাক একটি বড়ো
বিষয়। সন্দেহ নাই। নিজের ইচ্ছেয় নিজের মনের মতো পোশাক ব্যবহার করতে না পারা কোন ছোটখাটো
বিষয় নয়। কিংবা নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে অপছন্দের পোশাক ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়া অত্যন্ত
জঘন্য বিষয় সন্দেহ নাই। কিন্তু আমরা পূর্বেই দেখিয়েছি। মূল বিষয়টি আসলে, নিজের ইচ্ছেমত
চলার অধিকার। থাকা এবং না থাকা। নিজের মনের মতো করে নিজেকে সাজিয়ে তোলার অধিকার। কেউ
যদি হিজাবেই নিজের সৌন্দর্য্য নিজে অনুভাব করতে চায়। তবে সেটাই তার মৌলিক অধিকার। ঠিক,
কেউ যদি বিকিনিতেই নিজের সৈন্দর্য্যের অনুভবে পুলকিত আনন্দে মেতে উঠতে চায়। তবে সেটাই
তার অধিকার। সমুদ্রস্নানে কে শাড়ি পরে ঢেউয়ের সাথে নাচবে। আর কে বিকিনি পরে নাচবে।
সেটা ঠিক করার অধিকার তার নিজের। অন্য কারুর নয়। হ্যাঁ এটা ঠিক সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে
অতিরিক্ত পোশাকে ছেলেখেলা করতে গেলে জীবনটাই চলে যেতে পারে। ঠিক যেমন মরুভুমির দেশে
উন্মুক্ত হাত পা নিয়ে চলাফেরা করতে গেলে মুশকিল রয়েছে। ফলে একজন নারী কোন পরিবেশে,
কোন জলবায়ুতে কোন পোশাক পরিধান করবে। তার সাথে আত্মরক্ষার বিষয়টিও জড়িয়ে থাকে। আর থাকে
বলেই। এক এক ভুখণ্ডে মানুষের পোশাক পরিচ্ছদ সেই সেই ভুখণ্ডের জলবায়ুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ
হওয়ার দরকার। সেই সামঞ্জস্য ঠিক করার ভারও নারীর উপরেই থাক না। এমনতো নয়। নারী তার
ভালোমন্দের বিচার করতে অপারগ।
আর এক শ্রেণীর মানুষ রয়েছেন। নারীর শ্লীলতা
নিয়ে যাদের মাথাব্যথা বেশি। কোন পোশাকে বাড়ির মেয়েদের শ্লীলতা রক্ষা হবে। আর কোন পোশাকে
শ্লীলতা রক্ষা হবে না। সেটি বিচার করার দায়ও তারা সেই পুরুষতন্ত্রের উপরে ছেড়ে দিয়ে
রেখেছেন। সেই তন্ত্রই স্থান কাল পাত্র ভেদে ঠিক করে চলেছে, কোন কালে কোন সমাজে কোন
কোন পোশাক নারীর জন্য শ্লীল। আর কোন কোন পোশাক অশ্লীল। এবং ঠিক করার এই ঠিকাদারির কোন
শেষ নেই। তাই মেয়েদের জামার মাপ আর হাতার কাট নিয়ে তাদের চিন্তারও শেষ নেই। আগ্রহেরও
অভাব নেই। নজরদারীতেও ক্লান্তি নেই। খরবদারী করতে পেলে তো কথাই নেই। দলবেঁধে সে কি
উল্লাস। সেকি উৎসাহ। এবং এই শ্রেণীর মানুষরাই ধর্ষণের কারণ খোঁজেন মেয়েদের জামার মাপে
আর হাতার কাটে। তারা ধর্ষকের বিকৃত রুচি ও অপরাধ মনস্কতার ভিতরে ধর্ষণের কারণ দেখতে
পান না। এঁরাই কিন্তু আবার মেয়েদের পোশাক পরিচ্ছদের শ্লীলতার দিকটির দেখাশোনা করে থাকেন
স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে। এবং অক্লান্ত উৎসাহে। একটু তলিয়ে দেখলে দেখতে পাওয়া যায়। এই শ্রেণীর
মানুষরাও ধর্ষক। এঁরা ধর্ষণ করেন নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতাকে। এঁরা ধর্ষণ করেন নারীর
মৌলিক অধিকারগুলিকে। নারীর শরীরকে ধর্ষণ করেন যত মানুষ। তার থেকে অনেক বেশি সংখ্যক
মানুষ নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারগুলিকে ধর্ষণ করে চলেছেন। পরিবার থেকে
সমাজে। সম্প্রদায় থেকে সংবিধানে। ঠিক এই ধর্ষকরাই ফ্রান্সে বসে ঠিক করে দেন। হিজাব
পরা যাবে না। যার জন্য আইন তৈরী করে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়। এঁরাই আবার ইরানে বসে ঠিক
করেন হিজাব পরতেই হবে। যে কারণে আইন তৈরী করে হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। ঠিক যাঁদেরকে
দেখা যায় ভারত পাকিস্তান আফগানিস্তান বাংলাদেশ। সর্বত্র। যাঁরা তসলিমা নাসরিনের মাথার
দাম নির্ধারণ করে তাঁকে দেশছাড়া করেন। আবার যাঁরা সেই তসলিমার কলমকেই ব্যবহার করে রাজনৈতিক
মাইলেজ আদায় করতে আদাজল খেয়ে উঠে পড়ে লাগেন দেশে দেশে। এইভাবেই পুরুষতন্ত্রের হাতে
ধর্ষিত হতে থাকে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা থেকে মৌলিক অধিকারগুলি। নারীর মন থেকে তার
শরীর। কোনকিছুই পুরুষতন্ত্রের ধর্ষণের এক্তিয়ার থেকে বাদ যায় না।
২৩শে সেপটেম্বর’ ২০২২
©
শ্রীশুভ্র
দর্পণে শ্রীমুখ
তোড়া তোড়া
নোটের বাণ্ডিল। থোকা থোকা সোনার গহনা। এবেলা ওবেলা নিত্য নতুন ফ্ল্যাটের সংখ্যা বৃদ্ধি।
বিঘে বিঘে জমি। জেলায় জেলায় বাগান বাড়ি। একের পর এক বান্ধবী। সকলের
নামেই একাধিক সম্পত্তি। কেউই বঞ্চিত নয়। যে যেমন বিনোদনের জোগান দিয়েছে। যতটা পরিমাণে
আমোদ প্রমোদে ভরিয়ে দিতে পেরেছে। ততধিক পরিমাণে সম্পত্তির মালিক হয়ে গিয়েছে। এ যেন
সেই হাতিশালে হাতি আর ঘোড়াশালে ঘোড়া। সিন্দুক ভরা মোহর আর অঙ্গভরা হীরে জহরত। দেশ জোড়া
রাজত্ব, আর হারেম ভরা রাণী’র গল্প। ভালোই চলছিল। শক্ত সমর্থ্য হাতে স্টিয়ারিং ধরে অশ্বমেধ
ঘোড়া ছুটছিল। বাদ সাধল কিছু বেয়াড়া উকিল আর আদালত। অশ্বমেধের ঘোড়ার লাগাম এখন ইডি’র
হাতে। আর হুইলচেয়ারে মন্ত্রী। বান্ধবীর চোখে জল। বাকি বান্ধবীদের কপালে ঘাম। আতঙ্কের
প্রহর ইডির কড়া নাড়ার আশঙ্কায়।
বান্ধবী বলেছেন। টাকা তাঁর নয়। হুইলচেয়ার
মন্ত্রীও বলেছেন টাকা তাঁর নয়। জনগণও জানে টাকাগুলি কাদের। কারা গোছা গোছা নোটের বাণ্ডিল
দিয়ে মেধা তালিকার বেড়া ডিঙিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে সরকারী চাকরি হাসিল করে নিয়েছেন। কিভাবে
নিয়েছেন। জনগণের কিছুই অজানা নয়। ফলে টাকার মালিকানা নিয়ে কারুর মনের কোন সন্দেহ নেই।
কিন্তু সেই টাকাগুলিই যখন রাজ্যের হেভিওয়েট নেতার প্রিয় বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে। দক্ষিণ
থেকে উত্তরে। উদ্ধার হতে থাকে। দিনের পর দিন। তখন সেই সুপারহিট ব্রেকিং নিউজে হুইলচেয়ারের
মন্ত্রী’র ভুমিকা নিয়ে জনগণের মনে কোন সংশয় থাকে না। থাকার কথাও নয়। কিন্তু কথায় বলে
ভাঙবে তবু মচকাবে না। ফলে আপনি যদি আশা করে বসে থাকেন। মন্ত্রীমশাই একদিন তাঁর পাপ
স্বীকার করে নেবেন। তবেই হয়েছে। সে গুড়ে বালি। মন্ত্রী’র নেত্রীও নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে
বসে নেই। আপনিও জানেন। তাঁর হাতে কত লম্বা!। এর আগেও বারংবার রাজ্যবাসী সে প্রমাণ পেয়েছে।
ধরে নিন, এবারেও পাবে। কিন্তু মন্ত্রী’র কথা থাক। মন্ত্রী’র নেত্রীর কথা থাক। মন্ত্রীর
বান্ধবীদের কথা থাক। প্রিয় বান্ধবীর ভেজা চোখে, আর না পেরে ওঠার হাহাকারের কথা থাক।
আজ আসুন। আপনার কথাটি বলুন দেখি!
হ্যাঁ, আপনার নিজের কথা। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ
নাই। আপনিও আমাদের বাকি সকলের মতো একেবারেই ধোয়া তুলসী পাতা। সেই আপনার কথা বলুন দেখি।
আপনি তো বেশ রয়েছেন। নিজের ওয়াল থেকে বন্ধুর ওয়ালে ঘুরে ঘুরে এই কয়দিন হুইলচেয়ার মন্ত্রী
আর তাঁর কোটিপতি বান্ধবীদের নিয়ে রগড় তো আর কম করলেন না। ফেসবুক থেকে টুইটার। যেখানে
আপনি। সেখানেই রগড়। ছড়া বলুন। ছবি বলুন। মিম বলুন। কমেন্ট বলুন। সবেতেই বাঙালির সেই
চিরকালীন রঙ্গরসের ঠাট্টা আর তামাশায় আপনারও তো জুড়ি মেলা ভার। আপনি, সাহিত্যসম্রাট
বঙ্কিমের সেই বাবু সম্প্রদায়ের একুশ শতকের বংশধর! ভুল বলিনি নিশ্চয়ই। গত দিনদশক বাঙালি
তাঁর ভাঁড়ার উজার করে রঙ্গরসের সে সুনামি বইয়ে দিলো। সেখানে আপনার অবদানও তো কম নয়?
কি বলেন!
না, সত্যিই আপনিও কিন্তু ভেবে দেখেননি।
একবারের জন্যে হলেও। গোটা একটা দশক জুড়ে এই বাংলার শিক্ষাক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ শূন্যপদ
খালি পড়ে রয়েছে। তাতে কারা বঞ্চিত হচ্ছে? আপনাকে প্রশ্ন করলেই আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়া
হবে। কেন, চাকুরি প্রার্থীরা। কথাটা ভুলও নয়। কিন্তু গোটা একটা দশকের সময় জুড়ে কোন
একটি দেশের শিক্ষাক্ষেত্রের লক্ষ লক্ষ শূন্যপদ খালি পড়ে থাকলে প্রথমেই যারা বঞ্চিত
হয়। তারাই হলো জাতির ভবিষ্যৎ। জাতির নবীন প্রজন্ম। যারা শিক্ষার্থী। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্রছাত্রী। না, এই দৃষ্টিশক্তি আপনার নেই। সেটা হতে পারে না। দৃস্টিশক্তি ছিল নিশ্চয়।
কিন্তু তাতে রাজনীতির ছানি পড়ে গিয়েছে। তাতে যুগের ছানি পড়ে গিয়েছে। তাই আপনি প্রথমেই
ক্ষয়ক্ষতির মূলে নজর দিতে পারেননি। আপনি দেখছেন। কারা চাকরি পেল না। আপনি দেখতে পেলেন
না। একটা দশক ধরে কি ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রে একটা জাতির মেরুদণ্ডকে পক্ষাঘাতে পঙ্গু করে দেওয়ার
ব্যবস্থা করা হলো। স্কুলের পর স্কুলে কলেজের পর কলেজে শিক্ষা দেওয়ার শিক্ষক নেই। শিক্ষাবর্ষগুলি
কিন্তু তাই বলে বসে থাকেনি। ছাত্র এবং ছাত্রীদের বয়সও কিন্তু থেমে থাকেনি। সবই বৃদ্ধি
পেয়েছে। কিন্তু কোটি কোটি ছেলেমেয়ে লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সঠিক শিক্ষা
গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রতিটি বছর। দলে দলে শিক্ষক অবসর নিয়েছেন। বয়সের
নিয়মে। কিন্তু তাঁদের কাজটি করার জন্য নতুন নতুন শিক্ষক নিযুক্ত হননি। সেই শূন্যপদ
প্রেতাত্মার হাহাকারের মতো জাতির সর্বাঙ্গ জুড়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর শিক্ষকের
অভাবে। পঠন পাঠনের সুযোগের অভাবে যে মস্ত বড়ো ফাঁকটা তৈরী করে দিয়েছে নির্বাচিত সরকার।
সেই ফাঁক দিয়েই বছর বছর অশিক্ষিত ছাত্রছাত্রী প্রসব করে গিয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা।
এই যে মহা ফাঁকি। সেই ফাঁকিটা আমার আপনার চোখের ঠুলিতে আজ হয়তো ধরা পড়ছে না। পড়লো না।
কিন্তু আগামী কয়েক দশকের ভিতরেই এই ফাঁকিটা সমাজের পরতে পরতে যে পক্ষাঘাতের সৃষ্টি
করবে। সেই ক্ষত কিন্তু কোন রঙের ঠুলিতেই আটকিয়ে রাখা যাবে না। কোন তর্ক বিতর্ক কাদা
ছোঁড়াছুঁড়ি দিয়েও আর ঢেকে রাখা যাবে না। সেই ক্ষত আগামী সময়ে আপনার উত্তরাধিকারীদের
জীবনেও ছায়াপাত ঘটাবে। সেদিনের রাজনীতিতে। সেদিনের সংস্কৃতিতে। তখন যদি তাঁরা ক্যালেণ্ডারের
পাতা পিছনের দিকে উল্টিয়ে পিছনের দিকে তাকায়? নিজেদের পূর্বপুরুষদের সামাজিক ভুমিকার
আজকের এই ওয়াল কালচারের চেহারাটা তাদের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে বেআব্রু ভাবে উন্মোচিত
হয়ে যায়?
তাঁরা দেখতে পাবে। আজ যখন আমাদের বাড়িতে
আগুন লেগেছিল। আমরা তখন আগুন নেভাতে না ছুটে। আগুন আর ছাইয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি
নিয়ে ঠাট্টা তামাশায় বিভোর ছিলাম। বছরের পর বছর রাজ্যের স্কুল কলেজগুলিতে লক্ষ লক্ষ
শিক্ষক পদে নিয়োগ বন্ধ। আমরা নিশ্চুপ। মেধা তালিকা নিয়ে নেতামন্ত্রীরা বছর বছর লুকোচুরি
খেলে চলেছে চাকুরি প্রার্থীদের সাথে। আমাদের মুখে কুলুপ আঁটা। ঘরে ঘরে শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরা
শিক্ষক নিয়োগের চাকরির পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েও বেকার হয়ে বছরের পর বছর পার করে দিতে
বাধ্য হচ্ছে। আমরা নীরব। লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে পরীক্ষার খাতায় একটা আঁচড় না কেটেও
একদল ছেলেমেয়ে নেতামন্ত্রীদের নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে সরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষক শিক্ষিকা
হয়ে যাচ্ছে। তাতে আমাদের কি? ক্লাসে ক্লাসে অযোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকারা শিক্ষার্থীদের
মস্তিষ্কগুলি পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিচ্ছে। আমাদের বয়ে গেল। ওদিকে মাসের পর মাস একদল
নাছোড়বান্দা চাকুরিপ্রার্থী রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ন্যায্য দাবিতে পথে বসে রয়েছে।
সেদিকে আমাদের দৃষ্টি নেই। আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে। কোন মন্ত্রীর কয়টি বান্ধবী। কে
কার উপপত্নী। কোন কোন মেয়ে কোন কোন নেতামন্ত্রী ধরে আখের গোছাতে ব্যস্ত। কোন মন্ত্রী
বান্ধবীর সংখ্যায় বাকিদের টেক্কা দিয়ে এগিয়ে গেল। কার বান্ধবী বেশি সুন্দরী। কোন মন্ত্রী’র
কয়টি কেলেঙ্কারী। কে পরকীয়ায় বেশি দক্ষ। আদিরসে কে বেশি এগিয়ে। যুবতী তন্বীদের মিছিল
কোন মন্ত্রীর দরজায়। কার কয়টি ফ্ল্যাট। কার কয়টি বিদেশী গাড়ী। কার ঘরে কতো কোটি টাকার
নোটের বাণ্ডিল পাওয়া গেল। কোন মন্ত্রী আইনকে কিভাবে কাঁচকলা দেখাচ্ছে। জনগণকে বোকা
বানাতে কারা বেশি দক্ষ। জনতা চোরেদের পক্ষে। না লুঠেরাদের পক্ষে।
আমরা সেই দিকেই নজর রাখছি। ফলে আপনিও আমাদের
মতোই এতেই মজে রঙ্গরসে হাবুডুবু খাচ্ছেন। সবজীর বাজার থেকে মুদীর দোকান। চায়ের ঠেক
থেকে বাসের ভীড়। অফিস থেকে বৌয়ের কোল। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। কোন মিমটা বেদম মজার। কোন
ছড়াটা অব্যর্থ। সত্যিই বাঙালির মতো রসিক বোধহয় আর কোন জাতিই নয়। একটা সমাজ রাজনীতি
আর দুর্নীতির সংক্রমণে পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে চলতে পারছে না ঠিক মতো। আর আমরা ল্যাংড়ার
চলা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপে মশগুল। রাজনীতি আমদের এমন ভাবেই সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। যে
ঘটনা প্রবাহে। আমদের পথে নেমে গিয়ে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠার কথা। যে ঘটনা প্রবাহকে
সামনে থেকে প্রতিরোধ করার জন্যে সর্বস্ব পণ করে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। যে ঘটনা প্রবাহে
সকলে মিলে জমাট বেঁধে অসুখের মূল শুদ্ধ চিরকালের মতো উপড়িয়ে ফেলার কথা। সেই ঘটনা প্রবাহে
আজকে আমরা আমোদ করছি। সেই ঘটনা প্রবাহের ভিতর থেকেই আমরা বিনোদনের খোরাক জোগাড় করছি।
সেই ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আমারা আমাদের মেধার খেল দেখাচ্ছি। কার মিম বেশি ইনটেলেকচ্যুয়াল।
সেই ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আমরা তামাশা করছি। রঙ্গ করছি। আর এই অতলান্ত মুর্খামির প্রতিটি
মুহুর্ত বাকি সকলের সাথে শেয়ার করে চলেছি। নেট রেভ্যুলিউশন আমাদের হাতে হাতে প্রত্যেকের
জন্য এক একটি ওয়াল দিয়ে রেখেছে। সেই সব মুর্খামি আর্কাইভ করে রাখার জন্য। না তাতে আর
লজ্জা কি? আমরা সবাই বেহায়া আমাদের এই মুর্খের স্বর্গে!
জানি। আপনি বলবেন। কেন মানুষ তো পথে নেমেই
প্রতিবাদ করছে। করছে বই কি। রাজনৈতিক নেতানেত্রীর পদস্খলনের প্রতিবাদ রাজনৈতিক ব্যানার
পতাকা আর রাজনীতির স্বার্থ নিয়ে, রাজনৈতিক দলগুলি করবে বই কি। সেটাই তো তাদের কাজ।
কিন্তু আপনি কি করছেন? কি করছি আমি? পথে নেমেছি? নিজের প্রতিবাদটুকু নিজের কন্ঠে নিজের
ভাষায় জানান দিয়েছি? দিতে চেয়েছি? নিশ্চয় না। দিতেই যদি চাইতাম। তবে কোন দলকে ভোট দিয়েছি।
আর কোন দলকে ভোট দেবো। সেই সূক্ষ্ম হিসাব নিকাশ করে সেই দলের মিছিলের শেষে পা মেলাতে
যেতাম না নিশ্চয়। সেই দলের স্ক্রিপ্ট মুখস্ত করে প্রতিবাদের সংলাপ আউড়াতাম না নিশ্চয়।
নিজের কথাটা বলতে নিজের কন্ঠের উপরেই ভরসা করতে পারতাম। এক এক করে নিজেরা সমবেত হওয়ার
চেষ্টা করতাম। হাতে হাতে ধরে ধরে পায়ে পায়ে প্রতিরোধের সরণী গড়ে তুলতে চাইতাম। কিন্তু
সেইটুকু করতে গেলে আগে তো টের পেতে হবে। পোড়া গন্ধটা আমারই গৃহের। আমারই পাড়ার। পোড়া
ক্ষতগুলো আমারই দেহের। আমারই জাতির। না, সেটুকু টের পাওয়ার মতো শিক্ষিত কিন্তু আমি
আপনি, আমরা কেউই নই। সেই শিক্ষা অর্জনের পথটুকু হারিয়ে গিয়েছে গত শতকে সত্তর দশকের
শেষেই। তারপর থেকে। আর দেশ নয়। জাতি নয়। সমাজ নয়। শুধু আমি ও আমার পরিবারটুকু। তার
বাইরে প্রলয় আসুক। সুনামি আসুক। দুনিয়া উচ্ছন্নে যাক। আমার তাতে কি এসে যায়। আমাকে
আমারটুকু গুছিয়ে নিতে হবে। গত শতকের সত্তর দশকের শেষ থেকে এই একটি শিক্ষাই আমাদেরকে
সংক্রমিত করে তুলেছে। লক্ষ আমাদের সকলের একটিই। আমারটুকু আমাকেই গুছিয়ে নিতে হবে্।
আখের গুছিয়ে নেওয়ার সেই সংস্কৃতি। আখের গুছিয়ে নেওয়ার সেই রাজনীতিই আজকের গোটা সিস্টেমটাকে
নিয়ন্ত্রীত করছে। আর হুইলচেয়ার মন্ত্রী ও তাঁর প্রিয় বান্ধবীও সেই কাজটাই করেছেন মাত্র।
তাই তাঁরা যদি অপরাধী হন। তবে আমি কিংবা আপনি। আমরাও কম অপরাধী নই। অসুখের মূল শুদ্ধ
উপড়িয়ে ফেলার সময়ে। আমরা যারা নিজের নিজের আখের গুছিয়ে নিয়ে সফল। তাঁরা আজও রঙ্গরসে
নিমজ্জিত। হুইলচেয়ার মন্ত্রী ও তাঁর প্রিয় বান্ধবী নিয়ে আসুন আরও একটু তামাশা হয়ে যাক।
এই তামাশাও একদিন শেষ হবে। কিন্তু আমাদের আজকের পাপের ইতিহাস সেদিন কিন্তু মুছে যাবে
না। সবটাই আর্কাইভ হয়ে থেকে যাবে আগামীতে। এই বাংলার পক্ষাঘাতগ্রস্ত ইতিহাসের এই পর্বে।
৩১শে জুলাই’ ২০২২
কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত













